📄 সংযুক্ত আরব-আমিরাত
ওমানের আলোচনা করতে গিয়ে আমরা উল্লেখ করেছিলাম, সংযুক্ত আবর-আমিরাত ছিল ওমানেরই একটি অংশ। তারপর ওমানিদের মাঝে বিভক্তি ও দুর্বলতা দেখা দিলে আমিরাত স্বাধীন হতে শুরু করে। একপর্যায়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পরিণত হয়।
ওমানে আবু সাইদ পরিবারের শাসন শুরু হওয়ার পূর্বে আমিরাত ইয়ারেবিদের অধীনে পরিচালিত হতো। তারপর কাসিম বাহিনীর আত্মপ্রকাশ ঘটে। তারা বিপুল নৌবাহিনী নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। বর্তমানে যে ভৌগোলিক সীমাজুড়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রতিষ্ঠিত, কাসিমদের কমান্ডার রহমত বিন মাতর সেই ভূখণ্ডের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। আহমাদ আবু সাইদ তা সমর্থন করেন। রহমত বিন মাতর রাস আল-খাইমাহকে রাজধানী বানান।
তারপর ইংরেজ ঔপনিবেশিকদের থাবা পড়ে আমিরাত ভূখণ্ডে। ইংরেজরা কাসিমদের সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়। একসময় ইংরেজরা তাদের কর্তৃত্ব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। ১৩৩৫ হিজরিতে আমিরাতের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সাথে ইংরেজরা একটি চুক্তি সম্পাদিত করে। সেই চুক্তিতে আমিরাত-ভূখণ্ডে ব্রিটিশ-নেতৃত্বের স্বীকরোক্তি চাপিয়ে দেওয়া হয়।
ইংরেজরা কর্তৃত্ব দখল করে আমিরাত-ভূখণ্ডকে ভাগ করতে শুরু করে। পুরো আমিরাতকে সাতটি আমিরাতে ভাগ করে। আমিরাতগুলো এই : আবুধাবি, শারজাহ, দুবাই, রাস আল-খাইমাহ, ফুজাইরাহ, উম্ম আল-কোয়াইন ও আজমান।
১৩৯০ হিজরিতে (১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে) ইংরেজরা উপসাগর ত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার আগ পর্যন্ত ইংরেজ উপনিবেশ জারি ছিল। ইংরেজরা আমিরাত ত্যাগ করার পর সাত আমিরাত এক হয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। কুয়েত, কাতার ও বাহরাইন আরব আমিরাতের অন্তর্ভুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানায়। সাত আমিরাতকে সংযুক্ত করার ব্যাপারে শাইখ জাইদ বিন সুলতানের প্রচেষ্টা ছিল সবচেয়ে বেশি। এই ঐক্যবদ্ধ আমিরাতের নেতৃত্বের জন্য তাকেই নির্বাচন করা হয়। আমিরাত উন্নতি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকে। সেই সাথে বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হয়। বেশকিছু ইসলামি রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রকল্পে আমিরাত কার্যকরী অর্থায়নে অংশগ্রহণ করে।
📄 কুয়েত
বর্তমান যে ভূখণ্ডকে কুয়েত বলে অভিহিত করা হয়, অতীতে তার তেমন কোনো গুরুত্ব ছিল না। বরং কেউ সেখানে বাস করত না। একসময় সাবাহ-পরিবার কুয়েতে আগমন করে এবং উসমানি খিলাফতের আনুগত্য ঘোষণা করে সেই বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডে আবাস গড়ে তোলে। সাবাহ-পরিবারের সাথে খলিফা-পরিবার এবং জালাহমারাও আবাস গড়েছিল। কিন্তু পরে খলিফা-পরিবার পৃথক হয়ে কাতারে বসবাস শুরু করে। তারপর জালাহমা ও সাবাহ-পরিবারের মাঝে বিরোধ দেখা দেয়। বিরোধের জের ধরে সাবাহ-পরিবার জালাহমাকে কুয়েত থেকে বিতাড়িত করে।
১১৬৮ হিজরিতে (১৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দে) পারসিকরা যখন উসমানিদের হাত থেকে বসরা দখল করে তখন কুয়েত গুরুত্ববহ হয়ে ওঠে। পারসিকরা চার বছর কুয়েত দখল করে রাখে। সে সময়ে ইংরেজরা ভারত যাওয়ার জন্য ভূমধ্যসাগর, তারপর বসরা, অতঃপর আরব উপসাগরের রুটের ওপর নির্ভর করত। ইংল্যান্ড বসরার পরিবর্তে কুয়েত হয়ে আরব উপসাগরে যাওয়া শুরু করে। এদিকে উসমানি খিলাফতের দুর্বলতা ও ইংরেজদের ক্রমবর্ধমান শক্তির কারণে সাবাহ-পরিবারের শাসকগণ ইংরেজদের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করতে শুরু করে। কিন্তু ইংরেজরা উসমানিদের সাথে এই ভূখণ্ড নিয়ে কোনো বিরোধে জড়ায়নি। কারণ, কুয়েত তখনও তেমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। মূলত ব্রিটেনের বিশেষ আগ্রহ ছিল পুরো উসমানি সাম্রাজ্যের প্রতি।
তারপর শাইখ মুবারক আস-সাবাহের শাসন শুরু হয় এবং পূর্বের মতো ইংরেজদের প্রতি দুর্বলতা বহাল থাকে। ইংরেজরা সে সময়কে কুয়েতে কর্তৃত্ব বিস্তারের জন্য উপযুক্ত বলে মনে করে। একই সময়ে উসমানিদের সাথে কুয়েতের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলতে থাকে। উসমানিরা পূর্বে কুয়েতকে বসরা-গভর্নরের অধীন করে দিয়েছিল।
তারপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে কুয়েত ইংরেজদের পক্ষ নেয়। ইংরেজরা কুয়েতে কর্তৃত্ব বিস্তার করে। ১৩৮১ হিজরিতে (১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে) ইংরেজরা কুয়েতকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার আগ পর্যন্ত কুয়েত ইংরেজ কর্তৃক শাসিত হতে থাকে। শাইখ আবদুল্লাহ বিন সালিমের শাসনামলে কুয়েত স্বাধীনতা লাভ করে। ইরাকের রাষ্ট্রপতি আবদুল করিম কাসিম তখন ঘোষণা দেন যে, তিনি কুয়েতকে ইরাকের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন। কারণ, উসমানি খিলাফতের সময়ে কুয়েত বসরা- গভর্নমেন্টের অধীনে ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুন নাসের ইরাককে হুমকি দেয় যে, কুয়েত দখলের যেকোনো চেষ্টা সে প্রতিহত করবে।
জামাল আবদুন নাসেরের হুমকিতে ইরাক তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। পেট্রোলের খনি ও তেল উৎপাদনে আরববিশ্বের মাঝে দ্বিতীয় কেন্দ্র হওয়ায় কুয়েত ব্যাপক সমৃদ্ধি লাভ করে। অথচ কুয়েতের আয়তন যেমন ছোট, তেমনই অধিবাসীর সংখ্যাও কম। এ তেল-সম্পত্তির বদৌলতেই রাষ্ট্রটি সচ্ছলতা ও সমৃদ্ধি ভোগ করছে।
এরপর ১৪১১ হিজরিতে (১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে) কুয়েতে ইরাকিদের আক্রমণ শুরু হয়। ইরাকের আলোচনায় আমরা এই যুদ্ধের কথা উল্লেখ করব। ১৪১২ হিজরিতে (১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে) কুয়েত স্বাধীনতা লাভ করে। বর্তমানে শাইখ জাবির আস-সাবাহ কুয়েত শাসন করছেন।