📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 বাহরাইন

📄 বাহরাইন


কাতার থেকে বসরা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলকে বাহরাইন বলা হতো। বর্তমানে যেসব দ্বীপ বাহরাইন নামে পরিচিত, সেই দ্বীপগুলোও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারপর বাহরাইনের ভূখণ্ড সংকুচিত হতে শুরু করে। শেষপর্যন্ত শুধু সেই দ্বীপগুলোই বাকি থাকে, যা নিয়ে আজকের বাহরাইন গঠিত হয়েছে।

হিজরির দশম শতাব্দীতে বাহরাইনে পর্তুগিজ দখলদারি শুরু হয়। পর্তুগিজ কর্তৃত্ব পৌঁছে যায় আরব সাগরে। উসমানিরা জাজিরাতুল আরবে তাদের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেয়। আরব্য, উসমানি কিংবা পারসিক মুসলিমদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পর্তুগিজরা কখনো তাদের ভিত মজবুত করতে পারেনি। শুধু এতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং পর্তুগিজদের সাথে ইংরেজ এবং ড্যানিশরাও দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। জাজিরাতুল আরব থেকে পর্তুগিজদের উৎখাত করার পেছনে বড় ধরনের ভূমিকা ছিল ওমানিদের।

ওমান থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর যেসব অঞ্চলে পর্তুগিজ শাসন ছিল, সেসব অঞ্চল থেকেও তাদেরকে উৎখাত করা হয়।

১০১১ হিজরিতে (১৬০২ খ্রিষ্টাব্দে) পর্তুগিজরা বাহরাইন থেকে বিতাড়িত হয়। পর্তুগিজ শাসন উঠে যাওয়ার সাথে সাথে বাহরাইনে পারসিক শাসন কায়েমের জন্য ইংরেজরা পারস্যকে সাহায্য করে। পারস্য তাদের আরব প্রতিনিধি হিসেবে বাহরাইনকে সাহায্য করতে শুরু করে। তারপর আস্তে আস্তে পারস্য দুর্বল হয়ে পড়ে। ১১৯৭ হিজরিতে (১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে) জুবারার যুদ্ধে আলে খলিফা বাহরাইনে অবস্থানরত পারসিক গভর্নরকে পরাজিত করে বাহরাইনের দ্বীপে প্রবেশ করে। ১২১৫ হিজরিতে (১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে) ওমানিরা বাহরাইনকে ওমানের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। বাহরাইনের শাসক শাইখ সুলাইমান বিন আহমাদ বিন মুহাম্মাদ বিন খলিফা সৌদি আরবের কাছে সাহায্য চান। তখন সৌদি আরব ইবনে আফিসানের নেতৃত্বে বাহিনী দিয়ে তাকে সাহায্য করে। শাইখ সুলাইমান বাহরাইন থেকে ওমানিদেরকে উৎখাত করেন। কিন্তু ইবনে আফিসান সাহায্য করতে এসে নিজেই বাহরাইন দখল করে বসে। তখন আলে খলিফা তার সৈন্যবাহিনী একত্র করে ইবনে আফিসানকে বাহরাইন থেকে তাড়াতে সক্ষম হয়। ইবনে আফিসান পালিয়ে কাতারে চলে যায়। পুনরায় বাহরাইনের ক্ষমতা ফিরে আসে আলে খলিফার হাতে।

শাইখ মুহাম্মাদ বিন খলিফা বিন সালমানের শাসনামলে বাহরাইনে ইংরেজ কর্তৃত্ব বিস্তার লাভ করে। এমনকি ইংরেজরা শাসক নিয়োগ ও বরখাস্ত করার মতো বিষয়ও নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। শাইখ মুহাম্মাদকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে তারা খলিফা পরিবারের ইসা বিন আলিকে শাসক হিসেবে নিযুক্ত করে। ১৩৯১ হিজরিতে (১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে) স্বাধীনতা লাভ করার আগ পর্যন্ত বাহরাইনে ইংরেজ কর্তৃত্ব বহাল থাকে। শাইখ ইসা বিন সালমান বিন হামদ আলে খলিফার শাসনামলে বাহরাইন স্বাধীন হয় এবং আরবলিগে যোগদান করে।

ইরান বাহরাইন দখলের চেষ্টা চালায়। বাহরাইনে শিয়াদের আধিক্য থাকায় ইরান বাহরাইনকে ইরানেরই একটি অংশ বলে মনে করে। কিন্তু ইংরেজরা তা প্রত্যাখ্যান করে। যাতে আরবের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন না হয়ে যায়। বাহরাইনে ইরানের মাতৃভাষা প্রচার, ফারসি শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং পরস্পরে দ্বন্দ্ব থাকা সত্ত্বেও বাহরাইনের ছেলেদের ইরানে পড়ার সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে আজও ইরান বাহরাইনকে নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু আরব দেশগুলো বাহরাইনের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। বাদশাহ ফাহাদ সেতু এই সম্পর্ক উন্নয়নের অন্যতম নিদর্শন, যা সৌদি ও বাহরাইনের মাঝে সংযোগ তৈরি করে দিয়েছে। অনুরূপ 'অ্যারাবিয়ান গালফ ইউনিভার্সিটি' প্রতিষ্ঠা, যা সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ওমানের মাঝে যোগসূত্র স্থাপন করেছে এবং বাহরাইনের কাছ থেকে তার স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছে। বর্তমানে বাহরাইন একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 কাতার

📄 কাতার


আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, কাতার বাহরাইনেরই একটি অংশ ছিল। তারপর হিজরি অষ্টম শতাব্দীতে কাতার ওমানিদের পদানত হয়। তারপর ৯২২ হিজরিতে (১৫১৬ খ্রিষ্টাব্দে) পর্তুগিজরা কাতার দখল করে নেয়। পর্তুগিজ উপনিবেশের কিছুদিন অতিবাহিত হতেই উসমানি খলিফা সুলাইমান কানুনি সেনাপতি সুলাইমান পাশার নেতৃত্বে একটি নৌবহর প্রেরণ করেন। সুলাইমান পাশা পর্তুগিজদের কাতার থেকে বিতাড়িত করে কাতারসহ আরব উপসাগরীয় আরও কিছু অঞ্চল উসমানি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। তারপর উসমানিদের প্রতিপত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ১০৮০ হিজরিতে (১৬৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) তারা কাতার ত্যাগ করে।

তারপর আবদুল আজিজ বিন মুহাম্মাদের শাসনামলে কাতার সৌদি আরবের অন্তর্ভুক্ত হয়। অতঃপর দিরইয়ার পতনের মধ্য দিয়ে সৌদি-ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন খলিফা-পরিবার কাতারে কর্তৃত্ব বিস্তার করে। খলিফা-পরিবারের রাজধানী ছিল কাতারের জুবারায়। পরবর্তী সময়ে রাজধানী সরিয়ে বাহরাইনের রাজধানী মানামা দ্বীপে আনা হয় এবং খলিফা-পরিবার সানি-পরিবারকে কাতারে তাদের প্রতিনিধি নিযুক্ত করে।

তারপর খলিফা-পরিবার ও সানি-পরিবারের মাঝে দ্বন্দ্ব দেখা দেয় এবং দুই পরিবারের মাঝে যুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠে। ইংল্যান্ড এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে হস্তক্ষেপ করে এবং কর্তৃত্ব বিস্তার করে। সানি-পরিবার ও খলিফা-পরিবারের মাঝে একটি চুক্তি সংঘটিত হয় এবং সেই চুক্তির প্রেক্ষিতে কাতার বাহরাইন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সানি-পরিবারের শাসনামল

📄 সানি-পরিবারের শাসনামল


অদ্যাবধি কাতারে সানি-পরিবারের শাসন বহাল রয়েছে। ইংরেজরা উসমানি খিলাফতকে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী উসমানিরা কাতারের সমস্ত অধিকার ছেড়ে দেয়। উসমানিদের চুক্তি করিয়ে ইংরেজরা ১৩৩১ হিজরিতে (১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে) কাতার দখল করে নেয়। সানি-পরিবারের শাইখ আবদুল্লাহ বিন কাসিম ইংল্যান্ডের সাথে কাতারের কর্তৃত্ব প্রদানের চুক্তি করতে বাধ্য হন। তার শাসনকালেই কাতারে প্রেট্রোল আবিষ্কার হয়।

কাতারে সানি-পরিবারের শাসন বহাল থাকে। কাতার ইংল্যান্ড থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৩৯১ হিজরিতে (১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে) কাতার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। শাইখ আহমাদ বিন আলির শাসনামলে কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

কাতারের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব আমির ও ক্রাউন প্রিন্সের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু পরে শাইখ আলি তার ছেলে আহমাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে আহমদের চাচাতো ভাই খলিফা বিন হামদকে ক্রাউন প্রিন্স ঘোষণা করেন। শাইখ খলিফা বিন হামদই ছিলেন কাতারের প্রকৃত শাসক। ১৩৯১ হিজরিতে (১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে) তিনিই ইংল্যান্ড থেকে কাতারের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

১৩৯১ হিজরির (১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের) শেষদিকে খলিফা বিন হামদ এক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একক ক্ষমতা লাভ করেন এবং কাতার পরিচালনা করে যেতে থাকেন। খলিফা বিন হামদের দেশের বাইরে অবস্থানের সুযোগে তার ছেলে ক্রাউন প্রিন্স হামদ একপ্রকার অভ্যুত্থান ঘটিয়ে শাসন-ক্ষমতা গ্রহণ করে খলিফার আসনে সমাসীন হন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সংযুক্ত আরব-আমিরাত

📄 সংযুক্ত আরব-আমিরাত


ওমানের আলোচনা করতে গিয়ে আমরা উল্লেখ করেছিলাম, সংযুক্ত আবর-আমিরাত ছিল ওমানেরই একটি অংশ। তারপর ওমানিদের মাঝে বিভক্তি ও দুর্বলতা দেখা দিলে আমিরাত স্বাধীন হতে শুরু করে। একপর্যায়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পরিণত হয়।

ওমানে আবু সাইদ পরিবারের শাসন শুরু হওয়ার পূর্বে আমিরাত ইয়ারেবিদের অধীনে পরিচালিত হতো। তারপর কাসিম বাহিনীর আত্মপ্রকাশ ঘটে। তারা বিপুল নৌবাহিনী নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। বর্তমানে যে ভৌগোলিক সীমাজুড়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রতিষ্ঠিত, কাসিমদের কমান্ডার রহমত বিন মাতর সেই ভূখণ্ডের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। আহমাদ আবু সাইদ তা সমর্থন করেন। রহমত বিন মাতর রাস আল-খাইমাহকে রাজধানী বানান।

তারপর ইংরেজ ঔপনিবেশিকদের থাবা পড়ে আমিরাত ভূখণ্ডে। ইংরেজরা কাসিমদের সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়। একসময় ইংরেজরা তাদের কর্তৃত্ব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। ১৩৩৫ হিজরিতে আমিরাতের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সাথে ইংরেজরা একটি চুক্তি সম্পাদিত করে। সেই চুক্তিতে আমিরাত-ভূখণ্ডে ব্রিটিশ-নেতৃত্বের স্বীকরোক্তি চাপিয়ে দেওয়া হয়।

ইংরেজরা কর্তৃত্ব দখল করে আমিরাত-ভূখণ্ডকে ভাগ করতে শুরু করে। পুরো আমিরাতকে সাতটি আমিরাতে ভাগ করে। আমিরাতগুলো এই : আবুধাবি, শারজাহ, দুবাই, রাস আল-খাইমাহ, ফুজাইরাহ, উম্ম আল-কোয়াইন ও আজমান।

১৩৯০ হিজরিতে (১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে) ইংরেজরা উপসাগর ত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার আগ পর্যন্ত ইংরেজ উপনিবেশ জারি ছিল। ইংরেজরা আমিরাত ত্যাগ করার পর সাত আমিরাত এক হয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। কুয়েত, কাতার ও বাহরাইন আরব আমিরাতের অন্তর্ভুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানায়। সাত আমিরাতকে সংযুক্ত করার ব্যাপারে শাইখ জাইদ বিন সুলতানের প্রচেষ্টা ছিল সবচেয়ে বেশি। এই ঐক্যবদ্ধ আমিরাতের নেতৃত্বের জন্য তাকেই নির্বাচন করা হয়। আমিরাত উন্নতি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকে। সেই সাথে বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হয়। বেশকিছু ইসলামি রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রকল্পে আমিরাত কার্যকরী অর্থায়নে অংশগ্রহণ করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00