📄 আবু সাইদ পরিবার ও আহমাদ আবু সাইদ
আবু সাইদ পরিবার ইয়ামেন থেকে হিজরত করে ওমানে এসে স্থায়ী আবাস গড়ে তুলেছিল। সাইফ ইবনে সুলতান তার এক ছেলেকে উপদেষ্টা হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। এই ছেলেই ছিলেন আহমাদ আবু সাইদ। সাইফ বিন সুলতান তাকে সোহার প্রদেশের প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। ফরাসিরা ওমান পর্যন্ত কর্তৃত্ব বিস্তার করেছিল। তখন আহমাদ আবু সাইদ ওমানিদের মনোবল জাগিয়ে তোলেন। ওমানিরা কখনো কৌশল অবলম্বন করে, কখনো-বা যুদ্ধ করে ফরাসিদের দেশছাড়া করে। এভাবে ওমানে আবু সাইদদের শাসন শুরু হয়েছিল। কিন্তু তখন নানা দেশে বিভক্তি ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন শাসকশ্রেণির উদ্ভব ঘটেছিল। (পরবর্তী এসব শাসনব্যবস্থা মিলেই সংযুক্ত আরব-আমিরাত গঠিত হয়।) এভাবে ওমানের শাসনব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। অবশেষে ইংরেজরা এসে সেখানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
আবু সাইদ পরিবারের শাসনামলে পূর্ব-আফ্রিকায় ওমানিদের বড় ধরনের প্রভাব ছিল। এশিয়া অংশের ভূখণ্ড যখন হাতছাড়া হলো, তখন ওমানিরা সর্বশক্তি নিয়ে আফ্রিকার দিকে অগ্রসর হয়। আফ্রিকা শিরোনামের একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ে আমরা এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
১২৭২ হিজরিতে (১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে) সাইয়িদ সাইদ বিন সুলতানের মৃত্যুর পরে ওমান সাম্রাজ্য দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক ভাগ ছিল বর্তমানের ওমান, আর দ্বিতীয় ভাগটি ছিল পূর্ব-আফ্রিকা। সাইদ বিন সুলতানের দুই ছেলে তিওয়াইনি ও মাজিদের মাঝে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল। তিওয়াইনি ওমান পরিচালনা করত, আর মাজিদ শাসন করত পূর্ব-আফ্রিকা। এই দ্বন্দ্ব ইংরেজ ঔপনিবেশিকদের ওমান ও ওমানশাসিত আফ্রিকা অঞ্চলে কর্তৃত্ব বিস্তার করার সুযোগ করে দেয়। ইংরেজরা কিছু চুক্তি করতে শুরু করে, যার প্রেক্ষিতে তারা বিভিন্ন অঞ্চলে কর্তৃত্ব বিস্তারে সক্ষম হয়।
এরচেয়েও মন্দ বিষয় ছিল, আবু সাইদরা দুর্বল হয়ে যাওয়ার পর ১৩৩১ হিজরিতে ওমানে ইমাম পরিবার ফিরে আসতে শুরু করে। আবু সাইদ পরিবারের শাসনামলে যাদের আলো ছিল নিভুনিভু। এ সময় ওমানের এক অংশে কর্তৃত্ব করতে শুরু করে ইমামরা, আরেক অংশ আবু সাইদ পরিবারের নামে পরিচালিত হতে থাকে। ওমানে যাদের উপর কর্তৃত্ব চালাত ইংরেজরা।
ইংরেজরা একসময় আবু সাইদ পরিবারকে ইমামদের শাসিত অঞ্চল পর্যন্ত কর্তৃত্ব বিস্তৃত করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং আবু সাইদ পরিবারকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করে, যার মাধ্যমে আবু সাইদ পরিবার ইমামদের শাসিত ভূখণ্ডে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। আর এর মাধ্যমে ইংরেজরাও ওমানে পূর্ণরূপে কর্তৃত্ব বিস্তার করে। এরপর ১৩৯০ হিজরিতে (১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে) ওমান ইংরেজদের কবল থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।
তারপর সুলতান কাবুস বিন সাইদ ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং সব ক্ষেত্রে উন্নতি সাধনের পথ তৈরি করতে শুরু করেন। ১৩৯১ হিজরিতে (১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে) ওমান আরবলিগে যোগদান করে। সুলতান কাবুসের পিতা সুলতান সাইদের শাসনামলের শেষদিকে দোহার প্রদেশে কম্যুনিজম আন্দোলন শুরু হয়। কম্যুনিস্টরা সারা পৃথিবীতে সে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিল।
ওমানে লাগাতার আক্রমণ, নিরপরাধ মানুষ হত্যা এবং দোহারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য দোহারের বিদ্রোহীরা দক্ষিণ ইয়ামেনে ঘাঁটি বানিয়ে নিয়েছিল। প্রথমে সুলতান কাবুস বিদ্রোহীদের সঠিক পথে ফিরে আসার আহ্বান জানান। কিন্তু বিদ্রোহীরা সুলতানের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে। কারণ, সারা বিশ্বের কম্যুনিস্টরা আরব উপসাগরে সমাজতান্ত্রিক কর্তৃত্ব বিস্তারের জন্য বিদ্রোহীদেরকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখত। এই আন্দোলনের নাম শুরুতে ছিল 'দোহার লিবারেশন ফ্রন্ট'। পরবর্তী সময়ে কম্যুনিস্টরা এর নাম পাল্টে রাখে 'অ্যারাবিয়ান গালফ লিবারেশন ফ্রন্ট'। শেষপর্যন্ত ওমানের সেনাবাহিনী বিদ্রোহিদেরকে নির্মূল করতে সক্ষম হয়।
টিকাঃ
৭. মোম্বাসা : কেনিয়া উপকূলের একটি শহর। রাজধানী নাইরোবির পর এটি দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। -সম্পাদক