📄 প্রথম সৌদি সাম্রাজ্য (১১৫৭-১২৩৩ হি./১৭২৫-১৮১৮ খ্রি.)
সৌদিদের বংশ-পরম্পরার মূলে রয়েছেন সউদ বিন মুহাম্মাদ বিন মুকরিন। সউদের দাদা মুকরিন নাজদের হানিফা নামক অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন। সউদরা সিরিয়ার দারাইয়া থেকে আরব সাগর হয়ে হানিফায় আগমন করেছিল। হানিফায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করার পর তারা হানিফা উপত্যকাকে দারাইয়া নামে ডাকতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে এই দারাইয়া দিরিইয়াহ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে।
বাদশাহ সউদ আদ-দিরিইয়াহর(১) চারপাশে সাম্রাজ্য সম্প্রসারিত করতে শুরু করেন। সউদের পর তার ছেলে মুহাম্মাদ বিন সউদ ক্ষমতা গ্রহণ করেন। মুহাম্মাদ বিন সউদকেই সৌদি রাষ্ট্রের প্রথম প্রতিষ্ঠাতা মনে করা হয়। মুহাম্মাদ বিন সউদের শাসনকালেই শাইখ মুহাম্মাদ বিন আবদুল ওয়াহহাব আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি মুসলিম উম্মাহকে ইসলামের দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানান। ইসলামি শরিয়ার বাস্তবায়ন ও মুসলিমবিশ্বে ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়া বিদআতের মূলোটপাটনের জন্য সালাফে সালেহিনের অনুসরণের আহ্বান জানান তিনি। মুহাম্মাদ বিন সউদ শাইখ মুহাম্মাদ বিন আবদুল ওয়াহহাবের দাওয়াতের ইসলামি নীতিমালাকে স্বাগত জানান এবং জাজিরাতুল আরবে এই আহ্বান ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কাজ শুরু করেন। এজন্যই সৌদি রাষ্ট্রের দুটি দিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয়। তার পূর্বের চিন্তা, পরিবর্তন হয়ে ইসলামি চিন্তা রূপ নেয়।
সউদরা জাজিরাতুল আরবের অনেক অঞ্চলকে তাদের রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়। শাইখ আবদুল আজিজ বিন মুহাম্মাদ বিন সউদ তার পিতার রেখে যাওয়া ধারা অব্যাহত রাখেন। তার শাসনকালে রাষ্ট্রের সীমা বৃদ্ধি লাভ করে। আবদুল আজিজের পর সউদ বিন আবদুল আজিজের শাসনামলে সৌদি আরব অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়। সউদ বিন আবদুল আজিজের উপাধি সউদ আল-কাবির বা বড় সউদ। তার শাসনামলেই ওমান, ইয়ামেন, হিজায ও সমগ্র জাজিরাতুল আরব সৌদি আরবের অন্তর্ভুক্ত হয়। সৌদি আরবের সীমারেখা পৌঁছে যায় সুদূর সিরিয়ায়।
সউদ বিন আবদুল আজিজের শাসনামলের শেষদিকে উসমানি খলিফা মুহাম্মাদ আলি পাশা (মৃত্যু: ১৮১৯ খ্রি.) জাজিরাতুল আরবে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সৌদি আরবে আক্রমণের নির্দেশ দেন। প্রথম আবদুল্লাহর শাসনকালে এই অভিযান পরিচালিত হয়। ১২৩৩ হিজরিতে (১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে) মুহাম্মাদ আলি পাশার বাহিনীর আদ-দিরিইয়াহয় প্রবেশের মধ্য দিয়ে প্রথম সৌদি সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।
টিকাঃ
১. আদ-দিরিইয়াহ: সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের নিকটবর্তী শহর। -সম্পাদক
📄 দ্বিতীয় সৌদি সাম্রাজ্য (১২৩৪-১৩০৯ হি./১৮১৯-১৮৯২ খ্রি.)
জাজিরাতুল আরবে মিশরীয় কর্তৃত্বের প্রভাব কমতে শুরু করে। একসময় মিশরীয় প্রভাব হিজাযের মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। নাজদ থেকে প্রত্যাহৃত হয় তারা। ১৮২১ খ্রিষ্টাব্দে কেবল নামকাওয়াস্তে মিশরীয় শাসন জারি থাকে। অবশেষে ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে মিশরীয় বাহিনী হিজায ছাড়তে বাধ্য হয়। হিজাযের শাসনক্ষমতা গ্রহণ করে উসমানি শাসকদের অনুসারী অভিজাত পরিবারের ব্যক্তিরা। এরই মাঝে সৌদি আমিররা নাজদের ক্ষমতা গ্রহণ করে এবং তাদের মাঝে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত সৃষ্টি হতে শুরু করে। সৌদিদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে বিন রশিদ পরিবার তাদের রাষ্ট্র দখল করে নেয়। সৌদি পরিবারের যারা বেঁচে ছিল, তারা কুয়েতের সাবাহ-পরিবারের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করে। বিন রশিদের পরিবারের হাতে পরাজয় বরণ করার মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় সৌদি সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘটে।
📄 তৃতীয় সৌদি সাম্রাজ্য (১৩১৯ হি./১৯০১ খ্রি.)
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 দ্বিতীয় আবদুল আজিজ
সৌদি আমির দ্বিতীয় আবদুল আজিজ পুনরায় সৌদি কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনার সংকল্প করেন। সে সময় জাজিরাতুল আরবের কর্তৃত্ব ছিল উসমানি ও ইংরেজদের হাতে। ইংরেজরা কুয়েত, বাহরাইন ও আরব সাগরের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো নিয়ন্ত্রণ করত। আর ইয়ামেন, হিজায ও নাজদ পরিচালিত হতো উসমানিদের আদেশে।
ইংরেজরা সৌদিদের সাহায্য করতে শুরু করে। এর বেশকিছু কারণ ছিল। তার মধ্যে একটি কারণ হলো, বিন রশিদ পরিবার—যারা ইতিপূর্বে সৌদিদের অধিকাংশ রাষ্ট্র দখল করে নিয়েছিল—উসমানি সালতানাতের আনুগত্য করত। আর সাবাহ-পরিবার আনুগত্য করত ইংরেজদের। এই সাবাহ-পরিবারের কাছেই সৌদিরা আশ্রয় গ্রহণ করেছিল এবং সাবাহ-পরিবার সৌদিদের সাহায্য করেছিল।
দ্বিতীয় আবদুল আজিজ রিয়াদে আক্রমণ করেন এবং বিন রশিদ পরিবারের হাত থেকে রিয়াদ ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হন। সবকিছু বিন্যস্ত করে তিনি ১৩৩২ হিজরিতে (১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে) আল-আহসা(২) পর্যন্ত সাম্রাজ্য সম্প্রসারিত করেন। এরপর হাইলে(৩) বসবাসরত বিন রশিদ পরিবার ও তাদের সহযোগী উসমানিদের সাথে জোটবদ্ধ হয়।
এরই মাঝে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল বেজে ওঠে। উসমানিরা আবরদেশ ত্যাগ করে। ফলে বিন রশিদ পরিবার দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৩৪০ হিজরিতে দ্বিতীয় আবদুল আজিজ হাইলকে সৌদি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেন। সেই সাথে ইদরিসি ও গাইজ পরিবার কর্তৃক শাসিত আসিরসহ (৪) অন্যান্য অঞ্চল দখল করতে সক্ষম হন।
১৩৪৯ হিজরিতে ইদরিসিদের আমির বাদশাহ আবদুল আজিজের কাছে সৌদি সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আবেদন জানায়। সৌদি বাহিনী গাইজ পরিবারের শাসনাধীন অঞ্চলগুলোকেও সৌদি সাম্রাজ্যের অধীন করে নেয়। এ সময় হিজাযের শাসকশ্রেণি ও সৌদিদের মাঝে প্রচণ্ড দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। উসমানি খিলাফতের পতনের পর হিজাযের শরিফ হুসাইন নিজেকে খলিফাতুল মুসলিমিন দাবি করে। প্রথমে তার সাথে ইংরেজদের ভালো সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্কের সুবাদে শরিফ হুসাইন তার ছেলে আবদুল্লাহকে পূর্ব জর্দানের শাসক ও ফয়সালকে ইরাকের বাদশাহ বানাতে পেরেছিল। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই তার সাথে ইংরেজদের বিরোধ দেখা দেয়। অতঃপর সে আবদুল আজিজ আলে সউদকে তার হাতে বাইআত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে চিঠি পাঠায়। এতে তার ও সৌদিদের মাঝে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সৌদিদের বিজয় ও সৌদি সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ সমাপ্ত হয়। ১৩৫১ হিজরিতে রাজকীয় সৌদি আরব প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়।
বাদশাহ আবদুল আজিজ তার শাসনামলে ইখওয়ানকেন্দ্রিক (৫) সমস্যার মুখোমুখি হন। ইখওয়ান ছিল তার বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী একটি দল, যারা কট্টরপন্থা অবলম্বন করত। এই দলটি শহরের; এমনকি গ্রামেরও অনেক মুসলিমকে কাফের বলত এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত। তারা আধুনিক সবকিছু; এমনকি আল্লাহ যা হারাম করেননি, সেসব জিনিসকেও প্রত্যাখ্যান করত। বাদশাহ আবদুল আজিজ তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান, তাদের সব শক্তি গুঁড়িয়ে দেন। তারপর থেকে এই দলটি সৌদি আরবের নিয়মিত সীমান্তরক্ষী হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে।
বাদশাহ আবদুল আজিজ ১৩৭৩ হিজরিতে (১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে) ইনতেকাল করেন। ইনতিকালের পর তার ছেলে বাদশাহ সউদ বিন আবদুল আজিজ ক্ষমতা গ্রহণ করেন।
টিকাঃ
২. আহসা : সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় একটি জেলা শহর। রাজধানী রিয়াদ থেকে দূরত্ব ৩২৮ কিলোমিটার। -সম্পাদক
৩. হাইল : নজদের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত সৌদি আরবের একটি শহর। -সম্পাদক
৪. আসির প্রদেশ : সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত একটি প্রদেশ। -সম্পাদক
৫. এই ইখওয়ান রাজনৈতিক দল 'ইখওয়ানুল মুসলিমিন' নয়। -সম্পাদক