📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 দেশের ভেতরে

📄 দেশের ভেতরে


জাতীয়তাবাদের ধারণা প্রচার

উসমানি সাম্রাজ্যে জাতীয়তাবাদের ধারণা ব্যাপক প্রচার পায়। ইতিপূর্বে কখনো এরূপ ঘটেনি। ইউরোপের প্রতি বিমোহিত মুসলমান ও খ্রিষ্টানরা এ কাজের নেতৃত্বে ছিল। খ্রিষ্টানরা এ ধারণা প্রচারের চেষ্টা করে। কারণ, তাদের প্রভাব বিস্তারের এটিই একমাত্র পথ। আরও কারণ হলো, খ্রিষ্টানরা ধর্মীয় গোঁড়ামির পথ অবলম্বন করলে তা দমন করা হতো। কারণ, মুসলমানদের তুলনায় তারা সংখ্যালঘু ছিল। ইউরোপ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাথে যুক্ত লোকদের সহযোগিতা করত। তারা খ্রিষ্টান মিশনারির মাধ্যমে বা দেশজয়ের মাধ্যমে এ সাহায্য করত। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বিজিত এলাকাকে জাতীয়তাবাদী সংগঠনের সদর দপ্তর বা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।

দোনমে ইহুদিদের প্রভাব বৃদ্ধি

খলিফা সুলাইমান কানুনির স্ত্রী রোকসালানার সার্বিক সহযোগিতায় সুলতান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইহুদিদেরকে পুনর্বাসিত করেছিলেন। ধীরে ধীরে তারা দেশে প্রভাব বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং দেশধ্বংসের কার্যক্রম শুরু করে। অথচ রাষ্ট্র তাদের সেবায় সকল কিছু উজাড় করে দিয়েছিল। এরূপ করার প্রধান কারণ হলো, তারা মুসলমানদেরকে চিরন্তন শত্রু ভেবে থাকে এবং তাদেরকে ঘৃণা করে। যেমন, আল্লাহ তাআলার বাণী :

لَتَجِدَنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَدَاوَةٌ لِلَّذِينَ آمَنُوا الْيَهُودَ وَالَّذِينَ أَشْرَكُوا

'অবশ্যই আপনি দেখতে পাবেন, মুমিনদের জন্য কঠোরতর শত্রুতা পোষণকারী মানুষ হচ্ছে ইহুদি ও মুশরিকরা।'
[সুরা আল-মায়িদা: ৮২]

দোনমে বারাজ একজন ইহুদি বংশোদ্ভূত লোক। তাকে ইজমিরে সাবাতি নামে ডাকা হয়। ১০৫৭ হিজরিতে সে নিজেকে মাসিহ (যিশু) দাবি করে। ইহুদিরা তাকে হত্যার পদক্ষেপ নিলে সে পলায়ন করে উসমানি সাম্রাজ্যের সীমানায় পৌঁছে যায়। অতঃপর সে পুনরায় ইজমির ফিরে যায়। লোকেরা তাকে আটক করে এডির্নে প্রেরণ করে। এ সময় সে শাস্তির আশঙ্কায় ইসলাম গ্রহণ করেছে মর্মে দাবি করে। উসমানিদেরকে ধোঁকা দিয়ে বলে, আমি ইহুদিদের মাঝে ইসলাম প্রচার করব। মূলত সে ইহুদিদেরকে বাহ্যিকভাবে ইসলাম প্রকাশ করে মুসলমানদের কাতারে অনুপ্রবেশ করার দাওয়াত দিতে থাকে। তার উদ্দেশ্য হলো, ইহুদিদেরকে রাষ্ট্রের কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া এবং ক্ষমতার লাগাম হাতে নিয়ে মুসলমানদের মাঝে সর্বাত্মক শত্রুতার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা।

বাস্তবিকই ইহুদিরা তার এ ভাবনাকে অভিবাদন জানায় এবং তারা এ পরিকল্পনার সাথে কাজ করতে থাকে। দ্বিতীয় আবদুল হামিদের আমলে ইহুদিদের জন্য একটি রাষ্ট্র গঠনের দাবি নিয়ে হার্টজেল (৬৩) আত্মপ্রকাশ করে। ফিলিস্তিনকে ইহুদিরাষ্ট্র ঘোষণার দাবি অব্যাহতভাবে জানাতে থাকে সে। ১৩১৪ হিজরিতে (১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে) সুইজারল্যান্ডের বাসেল শহরে অনুষ্ঠিত ইহুদি সমাবেশে সে এ দাবি উত্থাপন করে। হার্টজেল দ্বিতীয় আবদুল হামিদের নিকটবর্তী হওয়ার চেষ্টা করে। যেন খলিফাকে ফিলিস্তিনে ইহুদিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে প্রলোভিত করতে পারে। কিন্তু খলিফা হার্টজেলের উদ্দেশ্য জানতেন। তাই তিনি তার উদ্দেশ্য সফল হতে দেননি। তিনি ফিলিস্তিনে ইহুদিদের মাইগ্রেসনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। অতঃপর হার্টজেল ইহুদিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ইউরোপের সাহায্য লাভের প্রত্যাশায় ইউরোপে গমন করে। এ সফরে সে ইউরোপের বিরাট সমর্থন লাভ করতে সক্ষম হয়। তার এ প্রচেষ্টা উসমানি সাম্রাজ্যের পতনের কারণ হয়ে ওঠে।

সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ হার্টজেলের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তাকে যে পত্র লিখেছেন তার ভাষ্য হলো,

'তোমরা ড. হার্টজেলকে জানিয়ে দাও যে, সে যেন আজকের পর এ কাজ (ফিলিস্তিনে ইহুদিরাষ্ট্র গঠন) করার কোনোরূপ প্রচেষ্টা না করে। কেননা, আমি এ দেশের এক বিগত জায়গা অন্যর জন্য খালি করতে প্রস্তুত নই। দেশ আমার সম্পদ নয়; বরং এটি জাতির সম্পদ, যা তাদের রক্তে সিক্ত। সুতরাং ইহুদিরা যেন সংযত হয়। মুসলমানরা আমাকে বাইতুল মুকাদ্দাস রক্ষার যে দায়িত্ব দিয়েছে, আমি বাইতুল মুকাদ্দাসকে ইহুদিদের নিকট বিক্রি করে সে দায়িত্ব খিয়ানত করার ছাপ ইতিহাসে বহন করতে প্রস্তুত নই।’ (৬৪)

হার্টজেল খিলাফতের কোষাাগারে পঞ্চাশ মিলিয়ন স্বর্ণমুদ্রা এবং খলিফার ব্যক্তিগত কোষাগারে পাঁচ মিলিয়ন স্বর্ণমুদ্রা দানের প্রস্তাব করে। অধিকন্তু সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রকল্পে আর্থিক সহযোগিতারও প্রস্তাব করে।

ইহুদি ফ্রিমেনসারি আতঙ্ক

এটি একটি ইহুদি সংগঠন। এ সংগঠনের উদ্দেশ্য পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত জাতিকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করা এবং এ সকল দলের মাঝে স্থায়ী দ্বন্দ্ব-বিরোধ জাগিয়ে রাখা। এভাবেই ইহুদিরা জমিনে বসবাসকারী জাতিসমূহকে নিশ্চিহ্ন করে পৃথিবীতে নিজেরা একাই বসবাস করার বাসনা লালন করে। ফ্রিমেনারিরা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে সাহায্য করে এবং নেতৃত্বলোভী ব্যক্তিকে সমর্থন দিয়ে থাকে। তাদের সদস্য সংখ্যা অনেক, যারা পরস্পরকে সাহায্য করে। উসমানি সাম্রাজ্যের ফ্রিমেনসনরা তাদের কাজ করার ক্ষেত্র পেয়ে যায়। এ ভূমি তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য উর্বর। তাই তারা এ সাম্রাজ্যে প্রভাব বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যায়।

ঐক্য ও উন্নয়ন সংগঠন

ইউরোপপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদীরা তাদের চিন্তাধারার ধারক-বাহক বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন তৈরি করে। এ সকল সংগঠন নাগরিকদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। ইহুদি, খ্রিস্টান ও ফ্রিমেনসনের বহু সদস্যকে লক্ষ্য হাসিলের উদ্দেশ্যে দলে টেনে নেওয়া হয়। এ সকল সংগঠনের মাঝে রয়েছে তুর্কি মহিলা সমিতি, যা প্যারিসে প্রতিষ্ঠিত হয়। বার্লিনে এ সমিতির বেশকিছু শাখা রয়েছে। উসমানি সাম্রাজ্যের সেলুনিক ও ইস্তাম্বুল শহরে তাদের শাখা ছিল। তারা সেনাদের মাঝে অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম হয়। উসমানি ঐক্য সংগঠন নামে তাদের একটি সামরিক ইউনিট ছিল। তাদের একটি সিভিল শাখা ছিল, যার নাম ‘শৃঙ্খলা ও উন্নয়ন’। উভয় শাখা ‘ঐক্য ও উন্নয়ন’ নামে তাদের সংগঠন করার পক্ষপাতী ছিল। ফ্রিম্যাসনারিরা তাদের প্রজ্ঞাপন ও মুখপত্র ছিল। পেছনে থেকে ইসলামের শত্রুদের সকলে এ সংগঠনের পক্ষে কাজ করে যায়।

দেশে ঐক্য ও উন্নয়ন সংগঠনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। ইস্তাম্বুলের ফার্স্ট ক্রন্স অফিসারদের অনেকে এ দলে যোগ দেয়। অনুরূপ ইউরোপে নিয়োজিত দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির অফিসারগণও এ দলে যোগ দেয়।

ঐক্য ও উন্নয়ন পার্টি প্রকাণ্ড রূপ ধারণ করে এবং সৈন্যদের মাঝে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। পার্টির নেতারা সরকারের ওপর সংবিধান ঘোষণার জন্য চাপ দেয়। তাদের বিরুদ্ধে যাওয়ার ক্ষমতা খলিফার ছিল না। তাই তিনি সংবিধান ঘোষণা করেন।

ইউনাইটেড পার্টি পার্লামেন্টে মেজরিটি আসন দখল করে নেয়। তারা দেখতে পেল যে, খলিফা তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নে অসমর্থ, তাই তারা দেশে অস্থিতিশীলতাকে উসকে দেয়। একটি অংশ পার্লামেন্ট অভিমুখে যাত্রা করে। তারা সংবিধানের বিরোধিতা করে এবং ইসলামি আইন বাস্তবায়নের দাবি তোলে। তারা ঐক্য ও উন্নয়ন পার্টির সদস্যদেরকে বরখাস্ত করার জন্য খলিফার নিকট দাবি জানায়।

এ সকল বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরির পেছনে ঐক্য ও উন্নয়ন পার্টির হাত রয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য হলো, বিশৃঙ্খলাকে কারণ দেখিয়ে সেলোনিকিতে অবস্থানকারী সৈন্যরা যেন সংবিধান ও সংসদ রক্ষার যুক্তিতে এগিয়ে আসে। বাস্তবেই তারা ইস্তাম্বুল দখলে নিতে সমর্থ হয়। তারা খলিফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদকে বরখাস্ত করে এবং তৎস্থলে খলিফার ভাই পঞ্চম মুহাম্মাদকে স্থলাভিষিক্ত করে। এভাবেই সর্বময় ক্ষমতা খলিফার হাত থেকে ঐক্য ও উন্নয়ন পার্টির হাতে চলে আসে। তারপর তারা দেশকে ধ্বংস গহ্বরের কিনারায় নিয়ে যায়। দ্বিতীয় আবদুল হামিদই শেষ খলিফা, যার দেশব্যাপী শাসন চলেছে। পরবর্তী সময়ে যারা খলিফা হয়েছেন, তারা বাহ্যত ক্ষমতায় ছিলেন। প্রকৃত ক্ষমতা ঐক্য ও উন্নয়ন পার্টির লোকদের হাতে ছিল।

খলিফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদ তার আমলে মাদরাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, লাইব্রেরি, হাসপাতাল, শিক্ষক প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি পানির পাইপ, দামেশক হতে মদিনা পর্যন্ত রেললাইন ইত্যাদি স্থাপন করেন। জার্মান সেনা-অফিসার দ্বারা সেনাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। এ ছাড়া আরও অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন। ইসলামের শত্রুরা তাকে তার কাজ সম্পূর্ণ করার সুযোগ দেয়নি।

ইউরোপের রাজ্যসমূহে বিদ্রোহ

ইউরোপ উসমানি সাম্রাজ্যের সর্বত্র বিদ্রোহ ছড়িয়ে দিতে কাজ করে। বিশেষত ইউরোপের প্রদেশসমূহে তারা এরূপ করেছে, যেন এ বিদ্রোহ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভূমিকাস্বরূপ কাজ করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপে যেন মুসলমানদের ক্ষমতা অবশিষ্ট না থাকে।

এ সকল বিদ্রোহের মাঝে হার্জেগোভিনার বিদ্রোহও রয়েছে। খলিফা এ বিদ্রোহ দমন করেন। ইউরোপ বিদ্রোহের সুযোগে উসমানি সাম্রাজ্যে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ খুঁজতে থাকে। তারা সাম্রাজ্যের ওপর খ্রিষ্টানদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবিদাওয়ার তালিকা চাপিয়ে দেয়। বুলগেরিয়াতেও বিদ্রোহ হয়েছে। রুশরা কতিপয় শারকাসিয়ান পরিবারের ভূমি দখল করার পর উসমানিরা তাদেরকে বুলগেরিয়ায় পুনর্বাসন করে। এজন্য তাদের মাঝে বিদ্রোহ সৃষ্টি হয়। রুশরা এ বিদ্রোহের মূল ইন্ধনদাতা। অস্ট্রিয়া রুশদের দোসর ছিল। এ দুটি রাষ্ট্র বুলগেরিয়া, সার্বিয়া, মন্টেনিগ্রো ও অন্যান্য স্থানে স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনকারীদেরকে উসকানি দিত।

সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রোর বিদ্রোহ

রাশিয়া ও অস্ট্রিয়া মিলে সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রোকে উসমানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে উৎসাহিত করে। অস্ট্রিয়া বসনিয়া-হার্জেগোভিনা দখল করতে চেয়েছে। অপরপক্ষে রাশিয়া ওয়ালাচিয়া, মোলদাভিয়া ও বুলগেরিয়া দখল করতে চেয়েছে। রাশিয়া ও অস্ট্রিয়া উভয়ে মিলে সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রোকে প্রতিশ্রুতি দেয় যে, যুদ্ধ বেধে গেলে তারা পাশে থাকবে। অতঃপর সার্বিয়া বসনিয়ার বিদ্রোহ দমানোর দাবি করার মাধ্যমে যুদ্ধের সূত্রতা হয়। এদিকে মন্টেনিগ্রো হার্জেগোভিনায় বেশিরভাগ অংশ দাবি করে। খলিফা তাদের দাবির প্রতি কোনো গুরুত্বই দেননি। যার কারণে তাদের সৈন্যরা উসমানি ভূখণ্ডে প্রবেশ করা শুরু করে। মূলত এরা ছিল রুশ সৈন্য, যারা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। রুশদের সাথেই যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে খলিফা বিজয় লাভ করেন। বিশেষত মিশরীয় বাহিনী পৌঁছার পর সার্বদের ওপর বিজয় নিশ্চিত হয়। এ বাহিনী বেলগ্রেডের উপকণ্ঠে পৌঁছে যায়। তবে ইউরোপের হস্তক্ষেপে যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যায়।

ইউরোপের রাষ্ট্রদূতগণ বুলগেরিয়াকে দুটি প্রদেশে বিভক্ত করার একটি পরিকল্পনা খলিফার নিকট পেশ করে। যাতে উল্লেখ রয়েছে যে, দুদেশে দুজন খ্রিষ্টান শাসক নিয়োগ করা হবে। রক্ষীবাহিনী সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অর্ধেক খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী থাকবে। বসনিয়া হার্জেগোভিনাতেও অনুরূপ পদ্ধতি গ্রহণের প্রস্তাব করে তারা। তাদের দাবির মাঝে আরও রয়েছে যে, সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রোকে হার্জেগোভিনায় কিছু অংশ দিতে হবে। খলিফা তাদের দাবি প্রত্যাখ্যান করলে রাষ্ট্রদূতরা উসমানি রাষ্ট্র ছেড়ে যায়। যা এক প্রকার রাজনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রতি ইঙ্গিতবহ ঘটনা ছিল।

খলিফা এককভাবে সার্বিয়ার সাথে চুক্তি করে। সার্বিয়ার দাবি অনুসারে খলিফা তার বাহিনীকে ফেরত নেবে। সার্বিয়া নতুন দুর্গ নির্মাণ না করার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং সার্বিয়াতে সার্বিয়ার ও উসমানি পতাকা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত হয়। তা দ্বারা এ কথা বোঝানো উদ্দেশ্য যে, সার্বিয়া উসমানিদের তত্ত্বাবধানে ও তাদের রক্ষণাবেক্ষণে আছে।

টিকা:
৬৩. থিওডোর হার্টজেল : ইহুদি জায়নবাদের জনক এবং ইসরাইলের প্রস্তাবদাতা।
৬৪. আল ইয়াহুদ ওয়াদ দাওলাতুল উসমানিয়া : ১১৬

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 বিদেশের মাটিতে উসমানিদের কার্যক্রম

📄 বিদেশের মাটিতে উসমানিদের কার্যক্রম


রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ

ইউরোপীয় দেশসমূহ উসমানি সাম্রাজ্যে বসবাসরত খ্রিষ্টানদের জীবনযাপন সুন্দর করতে খলিফার নিকট একটি প্রস্তাব পেশ করে। প্রস্তাবে পরিস্থিতি সুন্দর করার কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করার জন্য ইউরোপকে সুযোগ দিতে আহ্বান করা হয়।

খলিফা প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ, প্রস্তাবটি রাষ্ট্রীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল। রাশিয়া এ প্রত্যাখ্যানকে সুযোগ মনে করে। সে এটিকে যুদ্ধের কারণস্বরূপ যথেষ্ট মনে করে। এবারে ইউরোপ উসমানি সাম্রাজ্যে যথেচ্ছ হস্তক্ষেপ করতে রাশিয়ার জন্য লাগাম ছেড়ে দেয়। রাশিয়া ওয়ালাচিয়া ও মোলদাভিয়ার সাথে এ মর্মে চুক্তি করে যে, রাশিয়া খিলাফতরাষ্ট্রে হস্তক্ষেপকালে তারা উভয়ে তাদের সর্বাত্মক ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। রাশিয়া ওয়ালাচিয়া ও মোলদাভিয়া প্রবেশ করে। অতঃপর দানিয়ুব নদী পার হয়ে বুলগেরিয়ায় প্রবেশ করে এবং এডির্নে দখল করে নেয়। এগোতে এগোতে তারা ইস্তাম্বুলের ৫০ কিলোমিটার নিকটে পৌঁছে যায়। একই সময় পূর্ব দিক থেকে রুশদের অপর একটি বাহিনী আনাতোলিয়ায় এসে পৌঁছে। এ সময় সুযোগ বুঝে সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রো স্বাধীনতা ঘোষণা করে। উসমানিরা বাধ্য হয়ে রাশিয়ার সাথে শান্তিচুক্তি করে।

উল্লেখ্য যে, বুলগেরিয়ার খ্রিষ্টানরা রাশিয়ার অনুপ্রবেশের সুযোগে সেখানে বসবাসরত মুসলিমদের নিধন করা শুরু করে। তারা বীভৎস অপরাধ সংঘটিত করে। মুসলমানদের একাংশ যার যার মতো পালিয়ে যায়, কেউ কেউ পাহাড়ে আশ্রয় নেয় এবং বুলগেরিয়ায় অপরাধ সংঘটনকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নেয়।

সান স্টেফানো চুক্তি

যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পর ১২৯৫ হিজরিতে (১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) রাশিয়া ও অন্যান্য দেশের সাথে খলিফা সান স্টেফানো চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তির বর্ণনা নিম্নরূপ:

• সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রো উসমানি রাষ্ট্র হতে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করবে।
• ওয়ালাচিয়া ও মোলদাভিয়া স্বাধীন হয়ে রোমানিয়া রাজ্য গঠিত হবে, যাতে ট্রান্সসিলভানিয়া ও বেসারাবিয়া যোগ দেবে।
• বুলগেরিয়া প্রশাসনিক স্বাধীনতা লাভ করবে এবং তা উসমানি সৈন্যমুক্ত থাকবে।
• যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাবদ খলিফা রাশিয়াকে ২৪, ৫২, ১৭, ৩৯১ সোনার লিরা প্রদান করবে। আর এ মুদ্রার পরিবর্তে রাশিয়া উসমানি রাষ্ট্রের ভূমিও গ্রহণ করতে পারবে।
• উসমানিরা যে ভূমি হারিয়েছে তা তারা ফেরত পাবে না। সেখানে বসবাসকারী মুসলমানগণ সেই এলাকা ছেড়ে যাবে। তবে তাদের জন্য তাদের জায়গা বিক্রি করে যাওয়ার সুযোগ থাকবে।
• উসমানি প্রণালিসমূহে রাশিয়ার জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা থাকবে।
• উসমানি সাম্রাজ্যে বসবাসকারী খ্রিষ্টানদের জীবনযাপনের অবস্থা ভালো করতে হবে。

ইউরোপের অবশিষ্ট দেশসমূহ উসমানি সাম্রাজ্যের অন্যান্য অংশও গ্রাস করতে চেয়েছে। ইংল্যান্ড রুশদের পক্ষ হতে ঝুঁকি বৃদ্ধির আশঙ্কায় সাইপ্রাস রক্ষার নামে তা দখল করে নেয়। খলিফা বাধ্য হয়ে ইংল্যান্ডের এ দখলদারি মেনে নেন। অতঃপর ইউরোপের উসমানি রাজ্যসমূহ ইউরোপের মাঝে বণ্টনের লক্ষ্যে বার্লিন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১২৯৫ হিজরিতে (১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) বার্লিন চুক্তি সম্পাদিত হয়। এ চুক্তিতে সান স্টেফানো চুক্তির পরিবর্তন আনা হয়। চুক্তির ভাষ্য হলো:

• চূড়ান্তভাবে বুলগেরিয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হবে।
• অস্ট্রিয়াকে বসনিয়া-হার্জেগোভিনা প্রদান করা হবে।
• রাশিয়াকে বেসারাবিয়া প্রদান করা হবে এবং রোমানিয়া দুবরুজা প্রদেশ নিয়ন্ত্রণ করবে।

ইউরোপে উসমানিদের এক রাজ্য থাকবে, যার নাম পূর্ব রুমেলি। এটি গঠিত হবে বুলগেরিয়া, মেসিডোনিয়া, আলবেনিয়া, কসোভা ও গ্রিসের একাংশ নিয়ে। রাশিয়া ও উসমানি সাম্রাজ্য প্রতিরক্ষার দায়িত্বে থাকবে। আর প্রশাসক হবে একজন খ্রিষ্টান।

উত্তরে গ্রিসের সীমানা বৃদ্ধি পাবে। অথচ যুদ্ধে গ্রিস কোনো পক্ষেই ছিল না。

তিউনিসিয়া দখল

ফ্রান্স ১২৯৯ হিজরিতে (১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে) তিউনিসিয়া দখল করতে সক্ষম হয়। তাদের মোকাবিলায় উসমানিরা কিছুই করতে পারেনি।

মিশর দখল

ইংল্যান্ড মিশরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে। তারা ১২৯৯ হিজরিতে গ্রেট হিল যুদ্ধের পর মিশর দখল করে নেয়।

সুদান দখল

মুহাম্মাদ আলি সুদান জয়ের পর থেকে সুদান মিশরের শাসনাধীন ছিল। ইংরেজরা মিশর দখল করার পর সুদানের প্রতি তাদের চোখ পড়ে। প্রতীক্ষিত মাহদি দাবিদারের মাহদিয়া আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে ইংরেজরা সুদানের অধিকাংশ এলাকা দখল করে নেয়। তারা মাহদিয়া আন্দোলনকে দমন করে সুদানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

মিশরের নিয়ন্ত্রণাধীন পূর্ব আফ্রিকা

ফ্রান্স ও ইতালি ইথিওপিয়ার সাথে এ দেশটি ভাগাভাগি করে নেয়।
খলিফাকে অপসারণের পর তিনি ১৩৩৬ হিজরিতে (১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে) ইনতেকাল করেন。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00