📄 প্রণালি চুক্তি
উসমানি সাম্রাজ্যে রাশিয়ার প্রভাব খর্ব করতে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স হানকার এস্কেলেসি চুক্তি বাতিল করতে একমত হয়। তারা সবাই ১২৫৭ হিজরিতে (১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দে) ঐকমত্য পোষণ করে যে, উসমানি প্রণালি সকলের জন্য বন্ধ থাকবে।
📄 রাশিয়ার সাথে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ
পূর্বে ফ্রান্স বাইতুল মুকাদ্দাসের গির্জাসমূহের তত্ত্বাবধান করত। নেপোলিয়ন যুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় রাশিয়া ফ্রান্সের স্থলে এ দায়িত্ব পালন করে। অতঃপর ফ্রান্স তাদের দায়িত্ব ফিরে পেতে চায়। তখন খলিফা পোপদের একটি কমিটি গঠন করেন। এ কমিটি গির্জার তত্ত্বাবধানে ফ্রান্সের অগ্রাধিকার রয়েছে মর্মে রায় দেয়। অতঃপর রাশিয়া উসমানি খলিফাকে যুদ্ধের হুমকি দেয়।
রুশরা ইংল্যান্ডের সাথে সলাপরামর্শ করে পরিকল্পনা গ্রহণ করে যে, তারা উসমানি সাম্রাজ্যকে তাদের মাঝে ভাগ করে নেবে। সাম্রাজ্যের মিশর অংশ ইংল্যান্ডকে দেওয়া হবে। ইংল্যান্ড রাশিয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। পরবর্তী সময়ে রাশিয়া ফ্রান্সকেও অনুরূপ প্রস্তাব করে। প্রস্তাবে ফ্রান্সকে তিউনিসিয়া প্রদানের প্রস্তাব করা হয়। ফ্রান্স তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এ পর্যায়ে রাশিয়া খলিফাকে হুমকি দেয় যে, যদি উসমানি খলিফা হানকার এস্কেলেসি চুক্তি বহাল না রাখে তাহলে রাশিয়া ওয়ালাচিয়া ও মোলদাভিয়া দখল করে নেবে। আর রাশিয়াকে উসমানি সাম্রাজ্যে বসবাসকারী খ্রিষ্টানদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব প্রদান করতে হবে। খলিফা রাশিয়ার হুমকির পরোয়া করেননি। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স তাকে প্রতিশ্রুতি দেয় যে, তার বিরুদ্ধে যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তারা তা প্রতিহত করতে এগিয়ে আসবে।
অপেক্ষমাণ রুশ আক্রমণ প্রতিহত করতে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের রণতরী দার্দানেলিস নদের প্রণালিমুখে যাত্রা করে। রাশিয়া ওয়ালাচিয়া ও মোলদাভিয়া দখল করে নেয়। অস্ট্রিয়া দুপক্ষের মাঝে চুক্তি করতে ১২৬৯ হিজরিতে (১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে) ভিয়েনায় একটি সম্মেলন আয়োজন করার চেষ্টা করে। কিন্তু ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড সম্মেলনটি ব্যর্থ করার প্রয়াস পায়। তারা খলিফাকে সম্মেলনের সকল প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের জন্য উদ্বুদ্ধ করে।
রাশিয়া উসমানীয়দের হুমকি দিলে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, ইতালি বায়ুমন্ট সাম্রাজ্য ও সুইডেন এ পাঁচটি দেশ উসমানীয়দের পক্ষে থাকতে জোট গঠন করে। জোটবাহিনী ফ্রন্টে ফ্রন্টে বিভক্ত হয়ে চতুর্দিক থেকে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে এগোতে থাকে। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের নৌবহর ক্রিমিয়ার সেভাস্তোপোল বন্দরে আঘাত হানে। জোটবাহিনীর বিভিন্ন পোর্টে আঘাত করা হয়। অধিকন্তু কৃষ্ণসাগরে অবস্থিত রুশ বন্দরেও ব্যাপক আক্রমণ করা হয়। অতঃপর যৌথবাহিনী রাশিয়ার ভেতরে প্রবেশ করার পর রাশিয়া চুক্তির আহ্বান জানায়। ১২৫৬ সালে প্যারিসে এ চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তির ভাষ্যমতে :
১. ওয়াল্যাচিয়া ও মোলদাভিয়া খলিফার অধীনে থাকবে।
২. যৌথবাহিনী কর্তৃক দখলকৃত রাশিয়ার ভূমি ফেরত দেওয়া হবে এবং সকল বন্দিকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
৩. সার্বিয়া স্বাধীনতা ভোগ করবে। তাদের সাথে উসমানি সাম্রাজ্যের সম্পর্ক থাকবে।
৪. রাশিয়া বা উসমানীয়রা কেউই কৃষ্ণসাগরে সামুদ্রিক যুদ্ধনীতি লঙ্ঘন করতে পারবে না। এ সাগরে সকলেই নৌ চলাচলের অধিকার রাখবে।
৫. দানিয়ুব নদীতে সকলের জন্য নৌ চলাচলের অধিকার থাকবে।
📄 অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা
ইউরোপের দেশসমূহ উসমানি সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলা ও বিদ্রোহ ছড়িয়ে দিতে কাজ করে। তারা ওয়াল্যাচিয়া ও মোলদাভিয়ার স্বায়ত্তশাসন চালু করার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করে। এ অঞ্চলের নাম দেওয়া হয় ইউনাইটেড স্টেটস গভর্নমেন্ট। এ দেশটি সকল ইউরোপীয় দেশের তত্ত্বাবধানে থাকে। তারা সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রোতে বিদ্রোহে সহযোগিতা করে যায় এবং উসমানীয়দেরকে এ বিদ্রোহ দমনের ব্যাপারে হুঁশিয়ার করে। জেদ্দাতে খ্রিস্টানদের ওপর আক্রমণ করা হয়। এ আক্রমণে ফ্রান্সের কন্সুলার আহত হয়। মক্কার গভর্নর পরিস্থিতি শান্ত করে। এ ঘটনায় ইংরেজরা জেদ্দায় ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছিল।
📄 সিরিয়ায় গোষ্ঠিগত সমস্যা
সিরিয়া-লেবানন পাহাড়ে দরজি, ম্যারোনাইট ও নাসিরিয়াসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বসবাস। দরজের জনগোষ্ঠী লেবানন পাহাড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাধর ছিল। তাদেরকে ইংল্যান্ড সমর্থন ও সহযোগিতা করে। আর ফ্রান্স সহযোগিতা করত ম্যারোনাইটদেরকে। ১২৫৭ হিজরিতে দরজিরা দাইরুল কামারে প্রবেশ করে ম্যারোনাইটদের ওপর আক্রমণ করে। তারা এদের সাথে ন্যক্কারজনক আচরণ করে। দুপক্ষের মাঝে আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ বৃদ্ধি পায়। খলিফা শান্তিপূর্ণ পন্থায় পরিবেশ শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। ফলে একদিকে ইউরোপ খিলাফতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পায়। অপরদিকে সাম্রাজ্যে খ্রিষ্টানরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে খলিফা সৈন্য প্রেরণ করেন। কিন্তু ইউরোপ খলিফাকে পরিস্থিতি সামাল দিতে তাদেরকে হস্তক্ষেপ করার অনুমতি দিতে বাধ্য করে। তাদের যুক্তি হলো, খলিফা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন না। ফ্রান্স ১২৭৭ হিজরিতে (১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে) ৬০০০ সৈন্য প্রেরণ করে লেবানন পর্বতমালায়। অতঃপর লেবাননি পর্বতকে উসমানিদের অধীনে রেখে স্বাধীনতা প্রদানের ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হবে একজন খ্রিষ্টান। সে তিন বছরকাল প্রেসিডেন্ট থাকবে। ইউরোপের সম্মতি ব্যতীত খলিফা তাকে বরখাস্ত করতে পারবেন না। এ চুক্তির ভিত্তিতে ফ্রান্স লেবানন হতে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। অতঃপর খলিফা আবদুল মাজিদ ১২৭৭ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন।