📄 আলজেরিয়া দখল
ফ্রান্স অতীব স্থুল ও দুর্বল কারণ দেখিয়ে ১২৪৫ হিজরিতে (১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দে) আলজেরিয়া আক্রমণ করে। আবদুল কাদিরের নেতৃত্বে সাহসী প্রতিরোধ গড়া হলেও তারা আলজেরিয়া দখলে রাখতে সক্ষম হননি। অবশেষে ১২৬৩ হিজরিতে (১৮৪৭ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি আত্মসমর্পণ করেন।
📄 জেনিসারি বাহিনী বাতিল
জেনিসারি বাহিনী উসমানি সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে। তারা খলিফা নিয়োগ, অপসারণ, হত্যা এমনকি তৃতীয় কোনো পক্ষকে খলিফা নিয়োগ করার মতো দুঃসাহস দেখাত। নিয়মিত বাহিনী সন্তোষজনক অবস্থায় পৌঁছার পর খলিফা দ্বিতীয় মাহমুদ জেনিসারি বাহিনীকে ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মিশরে মুহাম্মাদ আলি পাশার বাহিনীর সফলতাও তাকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ করে।
খলিফা রাষ্ট্রের মুফতির বাড়িতে সভা ডাকেন। সাম্রাজ্যের কর্তা ব্যক্তি ও বিশেষ বাহিনী (জেনিসারি)-এর নেতাদেরকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সভায় এ বাহিনীকে ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু বিশেষ বাহিনী এ সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ। তারা ইস্তাম্বুলের একটি ময়দানে বিদ্রোহের উদ্দেশ্যে সমবেত হয়। ১২৪০ হিজরিতে (১৮২৫ খ্রিষ্টাব্দে) উসমানিদের ক্ষেপণাস্ত্রের মুখে তারা লন্ডভন্ড হয়ে যায়। খলিফা নিয়মিত বাহিনী গঠনের ঘোষণা দেন। তিনি সৈন্যদের প্রশিক্ষণের জন্য ইউরোপীয় প্রশিক্ষক নিয়োগ দেন। এভাবে একটি মুসলিম দেশ ইউরোপীয় বেশভূষা গ্রহণ করলে পাগড়ির পরিবর্তে সেখানে হেলমেট স্থান করে নেয়।
📄 মুহাম্মাদ আলির অতি লোভ
মুহাম্মাদ আলি হিজায ও ক্রিট অঞ্চলকে তার সাম্রাজ্যের সাথে যুক্ত করেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং সে ১২৪৭ হিজরিতে (১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে) ছেলে ইবরাহিম পাশার নেতৃত্বে সিরিয়ায় অভিযান প্রেরণ করে। ইবরাহিম অন্যান্য গভর্নরের পক্ষ হতে আসা বাধা ঠেলে সামনে এগিয়ে যায়। পাশ থেকে মিশরীয় নৌবহর তাকে সমর্থন ও প্রয়োজনীয় সাহায্য করে। এভাবে সে আনাতোলিয়ায় পৌঁছে যায় এবং উসমানি সেনাকমান্ডার রশিদ পাশাকে পরাজিত করে বন্দি করে। অতঃপর অগ্রসর হতে হতে সে ইস্তাম্বুলের সন্নিকটে পৌঁছে যায়।
📄 কোতাহিয়া চুক্তি
ইউরোপ প্রাথমিক পর্যায়ে মুহাম্মাদ আলিকে উৎসাহিত করলেও মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধিতে শঙ্কাবোধ করে। তারা বুঝতে পারে যে, এ শক্তি একদিন তাদের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাই রাশিয়া উসমানিদের সাহায্যে পনেরো হাজার সৈন্য প্রেরণ করে। রাশিয়ার এমন প্রভাব বিস্তারকে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স বিপজ্জনক ভাবতে শুরু করে। তাই তারা মুহাম্মাদ আলির সাথে চুক্তি করার জন্য মধ্যস্থতা করতে এগিয়ে আসে ও উভয় পক্ষের মাঝে চুক্তি করে।
১২৪৮ হিজরিতে (১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দে) কোতাহিয়া চুক্তি সই হয়। চুক্তির বর্ণনায় রয়েছে:
১. মুহাম্মাদ আলি আনাতোলিয়া হতে পিছিয়ে তাউরুস(৬০) পর্বতমালার বাহিরে চলে যাবে।
২. মুহাম্মাদ আলি তার জীবদ্দশায় মিশর শাসন করবে।
৩. মুহাম্মাদ আলির পুত্র ইবরাহিম আদানা(৬১) অঞ্চলে গভর্নর নিয়োজিত হবে। এটি আনাতোলিয়ার বৃহত্তম একটি অঞ্চল।
৪. মুহাম্মাদ আলি সিরিয়ার চারটি প্রদেশে গভর্নর নিয়োগ দেবে। প্রদেশসমূহ হলো একে, ত্রিপোলি, দামেশক ও আলেপ্পো। ক্রিট দ্বীপেও সে গভর্নর নিয়োগ দেবে।
মুহাম্মাদ আলি কোতাহিয়া চুক্তিতে তুষ্ট হতে পারেনি। সে মিশর, সিরিয়া ও আরব-দ্বীপ অধীনে নিয়ে আসতে চাইল। তার আরও ইচ্ছা ছিল, তার অবর্তমানে সন্তানেরা এসকল অঞ্চল শাসন করুক। এ বিষয়ে ইউরোপ দুপক্ষের মাঝে মধ্যস্থতা করে। উসমানিরা তার সাথে পরামর্শ করে ঐকমত্যে পৌঁছে যে, মিশর, জাজিরাতুল আরব মুহাম্মাদ আলি ও তার সন্তানদের উত্তরাধিকার হিসেবে থাকবে। আর সে যতদিন জীবিত থাকবে ততদিন সিরিয়া শাসন করবে। পরবর্তী সময়ে তাউরুস পর্বতমালা দখল নিয়ে দুপক্ষের মাঝে বিরোধ দেখা দেয়। এ পর্বতমালা সিরিয়া ও আনাতোলিয়ার মাঝে প্রাকৃতিকভাবে দেয়াল হয়ে আছে।
উসমানিরা হাফিজ পাশার নেতৃত্বে অভিযান প্রেরণ করে। জার্মান সেনাপতি হেলমুট ফন মোল্টকে তাদেরকে সহযোগিতা করে। উভয় দল নাসিব নামক স্থানে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। যুদ্ধে ইবরাহিম পাশা বিজয় লাভ করে এবং উসমানি বাহিনী অস্ত্রশস্ত্র ফেলে পলায়ন করে। খলিফা দ্বিতীয় মাহমুদ ১২৫৫ হিজরিতে (১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে) ইনতেকাল করেন。
টিকা:
৬০. তাউরুস: তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত পর্বতমালা।
৬১. আদানা: তুরস্কের দক্ষিণের বৃহৎ একটি শহর।