📄 ইউরোপের পরিস্থিতি
রাশিয়ার সাথে উসমানিদের যুদ্ধ অব্যাহতভাবে চলছেই। তারা সার্বিয়াকে উসমানি সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীন হয়ে যেতে উসকানি দিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়া উসমানি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। এমনই মুহূর্তে রাশিয়ার সাথে ফ্রান্সের তীব্র দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ফ্রান্সের সাথে লড়তে রাশিয়া উসমানিদের সাথে বুখারেস্ট শান্তিচুক্তি সম্পাদন করে। চুক্তি মোতাবেক ইউফোরিয়া, মোলদাভিয়া ও সার্বিয়ায় উসমানি কর্তৃত্ব রাশিয়া মেনে নেয়। অপরদিকে বেসারাবিয়ায় রাশিয়ার সার্বভৌমত্ব উসমানিরা মেনে নেয়। ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধে উসমানিরা বিজয় লাভ করে। নেপোলিয়ন তার পরাজয় ও রাশিয়ার বিজয়ের মাঝে উসমানিদের বিশ্বাসঘাতকতার গন্ধ পায়। সে তার পরাজয়ের জন্য উসমানিদেরকে দায়ী করে।
📄 সার্বিয়ার বিদ্রোহ
বুখারেস্ট চুক্তিতে সার্বিয়াকে উসমানিদের অধীনে দেওয়ায় সার্বরা ক্রুদ্ধ হয় এবং বিদ্রোহ করে বসে। উসমানিরা তাদের বিদ্রোহ দমন করে। অতঃপর বিদ্রোহী নেতারা অস্ট্রিয়ায় পালিয়ে যায়। নেতাদের মাঝে কেবল টিউড্রপ্টাস উসমানিদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে থেকে যায়। মূলত সে উসমানিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং সেখানকার নাগরিকদের মাঝে বিচ্ছিন্নতার বীজ রোপণ করার জন্য কাজ করে। একপর্যায়ে তার শক্তি বৃদ্ধি পেলে ১২৩০ হিজরিতে (১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে) সে বিদ্রোহ করে বসে। উসমানি বাহিনী তার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে সে পুনরায় উসমানিদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। সে ওয়াদা করে যে, সার্বিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাবে না এবং সার্বিয়ার দুর্গে একমাত্র উসমানিদের ক্ষমতা চলবে। উসমানিরা তার আবেদনে সম্মত হয়।
📄 গ্রিসের বিদ্রোহ
উসমানিরা বিজিত অঞ্চলের লোকদের ধর্মবিশ্বাস, সভ্যতা ও ভাষার ওপর হস্তক্ষেপ না করার কারণে তাদের সাথে উসমানিদের গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। এ সকল বিজিত দেশের মাঝে রয়েছে গ্রিস। গ্রিসের কিছু নাগরিক বিচ্ছিন্নতার ছক তৈরির জন্য ইউরোপে পাড়ি জমায়। তারা অস্ট্রিয়া ও রাশিয়াতে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। অতঃপর তারা প্রস্তুত হয়ে উসমানিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। খুরশিদ পাশা তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু পরাভূত হয়ে তিনি শেষপর্যন্ত আত্মহত্যা করে বসেন।
মিশরের গভর্নর মুহাম্মাদ আলি সুদান জয় করে। অতঃপর খলিফা তাকে গ্রিসের বিদ্রোহ দমনের নির্দেশ দেন। মুহাম্মাদ আলি বিদ্রোহ দমনের জন্য স্বীয় পুত্র ইবরাহিমকে গ্রিসে প্রেরণ করে। মিশরীয় বাহিনী গ্রিসে বিজয় ছিনিয়ে নেয়। যুদ্ধে ইউরোপীয়রা গ্রিসকে পূর্ণ সহায়তা দিয়েছিল। মুহাম্মাদ আলি ১২৪১ হিজরিতে (১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দে) গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। তাকে বাধা দিতে রাশিয়া ও ইংল্যান্ড হস্তক্ষেপ করে। তারা উসমানিদেরকে ১২৪২ হিজরিতে আক কিরমান চুক্তি সম্পাদনের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, উভয় দেশ যে চুক্তিটি সম্পাদন করে তাতে গ্রিসের প্রসঙ্গ উল্লেখ ছিল না। চুক্তির অন্যতম ধারা হলো, কৃষ্ণসাগরে রাশিয়া ও ইংল্যান্ডের নৌবহর চলাচলের স্বাধীনতা থাকবে এবং কোনোরূপ তল্লাশি ব্যতীত রুশরা বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালি অতিক্রম করার অধিকার সংরক্ষণ করবে। অধিকন্তু রাশিয়া ওয়ালাচিয়া ও মোলদাভিয়ার শাসক নির্বাচিত করবে। উসমানিরা রাশিয়ার সম্মতি ব্যতীত এদেরকে বরখাস্ত করার অধিকার রাখবে না।
অপরদিকে সার্বিয়া পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবে। উসমানিরা বেলগ্রেডদুর্গসহ মোট তিনটি দুর্গ অধিকারে রাখতে পারবে।
📄 লন্ডন সম্মেলন
ইউরোপীয়রা উসমানিদেরকে যুদ্ধে জড়াতে অস্থির হয়ে পড়ে। ১২৪২ হিজরিতে (১৮২৭ খ্রিষ্টাব্দে) ইংল্যান্ড উসমানিদের দখলে থাকা খ্রিষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যসমূহ ও উসমানি সাম্রাজ্যের মধ্যবর্তী স্থানে একটি খ্রিষ্টানরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানায়। উসমানিরা এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে। ইউরোপীয়দের দাবি না মানার কারণে তারা উসমানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণ খুঁজে পায়। রাশিয়া, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স উসমানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে একজোট হয়। তারা দাবি করে যে, যদি উসমানিরা গ্রিসকে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান না করে, তাহলে তারা যুদ্ধ করবে। তারা খলিফাকে গ্রিস হতে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে এক মাসের সময় দেয়।
খলিফা তাদের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় রাশিয়া, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের নৌবহর গ্রিস অভিমুখে যাত্রা করে। তারা ইবরাহিম পাশাকে গ্রিস হতে সরে যেতে আদেশ করে। তিনি তাদের কথা মানেন না। ফলে ইউরোপীয় জোট উসমানি ও মিশরীয় নৌবহরের ওপর আক্রমণ করে এবং এগুলোকে গ্রিসের সীমানায় ধ্বংস করে দেয়। ইবরাহিম পাশা ক্রুসেডারদের সাথে যুদ্ধে ৩০ হাজার মিশরীয় সৈন্য হারান। অবশিষ্ট সৈন্যদেরকে নিয়ে তিনি মিশরে ফিরে যেতে বাধ্য হন। ইউরোপীয় জোট লন্ডন সম্মেলনের আয়োজন করে এবং সেখানে খলিফাকে আমন্ত্রণ জানায়। খলিফা সম্মেলনের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। সম্মেলনে ক্রুসেডারগণ গ্রিসকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করে। উসমানিরা তাদের সিদ্ধান্ত মানতে অস্বীকৃতি জানায়।