📄 ওহাবি আন্দোলন
উসমানি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন গ্রন্থিতে দিন দিন যে মারাত্মক দুর্বলতা সৃষ্টি হয়েছিল, তার ফলস্বরূপ সমাজের মানুষের মাঝে দুটি ধারা সৃষ্টি হয়।
প্রথম ধারার মতে উসমানিদের যাবতীয় দুর্দশার একমাত্র কারণ ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়া। কারণ, পৃথিবীতে মুসলমানদের প্রভাব ও প্রতিষ্ঠার মূলপ্রাণ ইসলামি অনুশাসনকে আঁকড়ে ধরা।
দ্বিতীয় ধারার মতে রাষ্ট্রের উন্নতি ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশায় ইউরোপের অন্ধ অনুকরণ শুরু করে দেওয়া উচিত।
প্রথম ধারা আরব অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত ওহাবি আন্দোলনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। আর দ্বিতীয় ধারা মুহাম্মাদ আলির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। মুহাম্মাদ আলি ইউরোপের জ্ঞানবিজ্ঞান আহরণের জন্য বিভিন্ন মিশন প্রেরণ করে। ধর্মের সাথে বিরোধ থাকা জ্ঞান আমদানিকেও সে অনুমোদন দেয়। তার এরূপ ধর্মবিরোধী স্বভাব ও কার্যক্রমের কারণে ইউরোপীয়রা তাদের রচনাবলিতে মুহাম্মাদ আলির ভূয়সী প্রশংসা করে। তারা মুহাম্মাদ আলির যুগকেই রেনেসাঁসের যুগ হিসেবে অভিহিত করতে থাকে।
ওহাবিদের অনুসারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকায় ইউরোপসহ অন্যান্য শত্রুরা উসমানিদেরকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে, ওহাবি আন্দোলন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। সে সময় উসমানি বাহিনী ইউরোপে যুদ্ধরত। তারা মুহাম্মাদ আলিকে আন্দোলন দমানোর দায়িত্ব দেয়। মুহাম্মাদ আলি স্বীয় প্রভাব বিস্তার করতে যুদ্ধে সামর্থ্যবান একদল সৈন্য তৈরি করে। সে সৈন্যদেরকে লোহিত সাগরতীরে অবস্থিত ইয়ানবু বন্দরে স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে একটি নৌবহর গঠন করে। তার পুত্র তুসুনের নেতৃত্বে নৌবাহিনী যুদ্ধে বের হয় এবং তারা মদিনা শরিফ নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়। কিন্তু তায়েফে পৌঁছার পর তারা ওহাবিদের দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এ সংবাদ শোনার পর পিতা মুহাম্মাদ আলি এসে মক্কা মুকাররামা দখল করে এবং ছেলেকে মুক্ত করে।
অতঃপর তুসুন জাজিরাতুল আরবে অভিযান অব্যাহত রাখে। ওহাবি আন্দোলনের নেতা আবদুল্লাহ বিন সাউদ তুসুনের নিকট শান্তিচুক্তির প্রস্তাব দেয়। তুসুন আবদুল্লাহর প্রস্তাবে সম্মত হয়ে চুক্তি করে। অতঃপর সে সংবাদ পায় যে, মিশরে তার পিতার বাহিনী বিদ্রোহ করেছে। তাই বাধ্য হয়ে তাকে মিশর যেতে হয়। মিশরে পরিবেশ শান্ত হয়ে আসার পর মুহাম্মাদ আলি স্বীয় পুত্র ইবরাহিমের নেতৃত্বে নতুন করে ওহাবিদের বিরুদ্ধে বাহিনী প্রেরণ করে। ইবরাহিম ওহাবিদের ঘাঁটি দারইয়াতে পৌঁছে যেতে সক্ষম হয়। অতঃপর ওহাবিরা আত্মসমর্পণ করে এবং ১২৩৩ হিজরিতে (১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে) চুক্তি করে। এ চুক্তির মধ্য দিয়ে ওহাবি আন্দোলন নিঃশেষ হয়ে যায়। তাদের আমির আবদুল্লাহ সাউদ উসমানি খলিফার নিরাপত্তা পেয়ে ইস্তাম্বুল গমন করে। কিন্তু ইস্তাম্বুলে পৌঁছামাত্র তাকে হত্যা করা হয়।
📄 ইউরোপের পরিস্থিতি
রাশিয়ার সাথে উসমানিদের যুদ্ধ অব্যাহতভাবে চলছেই। তারা সার্বিয়াকে উসমানি সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীন হয়ে যেতে উসকানি দিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়া উসমানি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। এমনই মুহূর্তে রাশিয়ার সাথে ফ্রান্সের তীব্র দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ফ্রান্সের সাথে লড়তে রাশিয়া উসমানিদের সাথে বুখারেস্ট শান্তিচুক্তি সম্পাদন করে। চুক্তি মোতাবেক ইউফোরিয়া, মোলদাভিয়া ও সার্বিয়ায় উসমানি কর্তৃত্ব রাশিয়া মেনে নেয়। অপরদিকে বেসারাবিয়ায় রাশিয়ার সার্বভৌমত্ব উসমানিরা মেনে নেয়। ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধে উসমানিরা বিজয় লাভ করে। নেপোলিয়ন তার পরাজয় ও রাশিয়ার বিজয়ের মাঝে উসমানিদের বিশ্বাসঘাতকতার গন্ধ পায়। সে তার পরাজয়ের জন্য উসমানিদেরকে দায়ী করে।
📄 সার্বিয়ার বিদ্রোহ
বুখারেস্ট চুক্তিতে সার্বিয়াকে উসমানিদের অধীনে দেওয়ায় সার্বরা ক্রুদ্ধ হয় এবং বিদ্রোহ করে বসে। উসমানিরা তাদের বিদ্রোহ দমন করে। অতঃপর বিদ্রোহী নেতারা অস্ট্রিয়ায় পালিয়ে যায়। নেতাদের মাঝে কেবল টিউড্রপ্টাস উসমানিদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে থেকে যায়। মূলত সে উসমানিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং সেখানকার নাগরিকদের মাঝে বিচ্ছিন্নতার বীজ রোপণ করার জন্য কাজ করে। একপর্যায়ে তার শক্তি বৃদ্ধি পেলে ১২৩০ হিজরিতে (১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে) সে বিদ্রোহ করে বসে। উসমানি বাহিনী তার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে সে পুনরায় উসমানিদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। সে ওয়াদা করে যে, সার্বিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাবে না এবং সার্বিয়ার দুর্গে একমাত্র উসমানিদের ক্ষমতা চলবে। উসমানিরা তার আবেদনে সম্মত হয়।
📄 গ্রিসের বিদ্রোহ
উসমানিরা বিজিত অঞ্চলের লোকদের ধর্মবিশ্বাস, সভ্যতা ও ভাষার ওপর হস্তক্ষেপ না করার কারণে তাদের সাথে উসমানিদের গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। এ সকল বিজিত দেশের মাঝে রয়েছে গ্রিস। গ্রিসের কিছু নাগরিক বিচ্ছিন্নতার ছক তৈরির জন্য ইউরোপে পাড়ি জমায়। তারা অস্ট্রিয়া ও রাশিয়াতে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। অতঃপর তারা প্রস্তুত হয়ে উসমানিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। খুরশিদ পাশা তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু পরাভূত হয়ে তিনি শেষপর্যন্ত আত্মহত্যা করে বসেন।
মিশরের গভর্নর মুহাম্মাদ আলি সুদান জয় করে। অতঃপর খলিফা তাকে গ্রিসের বিদ্রোহ দমনের নির্দেশ দেন। মুহাম্মাদ আলি বিদ্রোহ দমনের জন্য স্বীয় পুত্র ইবরাহিমকে গ্রিসে প্রেরণ করে। মিশরীয় বাহিনী গ্রিসে বিজয় ছিনিয়ে নেয়। যুদ্ধে ইউরোপীয়রা গ্রিসকে পূর্ণ সহায়তা দিয়েছিল। মুহাম্মাদ আলি ১২৪১ হিজরিতে (১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দে) গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। তাকে বাধা দিতে রাশিয়া ও ইংল্যান্ড হস্তক্ষেপ করে। তারা উসমানিদেরকে ১২৪২ হিজরিতে আক কিরমান চুক্তি সম্পাদনের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, উভয় দেশ যে চুক্তিটি সম্পাদন করে তাতে গ্রিসের প্রসঙ্গ উল্লেখ ছিল না। চুক্তির অন্যতম ধারা হলো, কৃষ্ণসাগরে রাশিয়া ও ইংল্যান্ডের নৌবহর চলাচলের স্বাধীনতা থাকবে এবং কোনোরূপ তল্লাশি ব্যতীত রুশরা বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালি অতিক্রম করার অধিকার সংরক্ষণ করবে। অধিকন্তু রাশিয়া ওয়ালাচিয়া ও মোলদাভিয়ার শাসক নির্বাচিত করবে। উসমানিরা রাশিয়ার সম্মতি ব্যতীত এদেরকে বরখাস্ত করার অধিকার রাখবে না।
অপরদিকে সার্বিয়া পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবে। উসমানিরা বেলগ্রেডদুর্গসহ মোট তিনটি দুর্গ অধিকারে রাখতে পারবে।