📄 অভ্যন্তরীণ বিষয়
রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার সাথে চুক্তি সম্পাদন করার পর খলিফা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মনোনিবেশ করেন। বিশৃঙ্খলা ও পরাজয়ের মূল উৎস জেনিসারি বাহিনী থেকে পরিত্রাণ পেতে নিয়মিত বাহিনী গঠন করার চিন্তা করেন। ইউরোপের অনুরূপ দেশকে উন্নত করার উদ্দেশ্যে তিনি ইউরোপীয়দের অনুকরণ করেন। ফরাসি প্রযুক্তি অনুযায়ী জাহাজ তৈরি করেন। ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সুইডেনের সহযোগিতা গ্রহণ করেন। গণিত ও সামরিক শিল্পবিষয়ক বিজ্ঞানের গ্রন্থসমূহ অনুবাদ করার ব্যবস্থা করেন। নিয়মিত বাহিনী গঠনের পর জেনিসারি বাহিনী বিদ্রোহ শুরু করে। বিশেষত জেনিসারি বাহিনী থেকে নৌবহর ও ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে নিয়মিত বাহিনীকে প্রদান করা হলে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। বিশেষ বাহিনীর সাথে অন্যান্য বাহিনীও যোগ দিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তারা নিয়মিত বাহিনী বাতিল করার জন্য খলিফার ওপর চাপ প্রয়োগ করে। তারা শুধু এটুকুতেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং খলিফাকে ১২২২ হিজরিতে (১৮০৭ খ্রিষ্টাব্দে) অপসারণ করে।
📄 মিশরের ওপর ফ্রান্সের হামলা ও সম্পর্কের অবনতি
উল্লেখ যে, খলিফা তৃতীয় সেলিমের আমলে ফরাসি সেনাপতি নেপোলিয়ন মিশর আক্রমণ করে এবং ১২১৩ হিজরিতে (১৭৯৮ খ্রিষ্টাব্দে) সে মিশর দখলে নিতে সক্ষম হয়। এদিকে উসমানিদের একসময়ের চরমশত্রু রাশিয়া আজ বন্ধুতে পরিণত হয়েছে। রাশিয়া ফরাসিদের বিরুদ্ধে উসমানিদের সাহায্য দেওয়ার প্রস্তাব করে। অনুরূপভাবে ইংল্যান্ডও উসমানিদের সাহায্য করতে প্রস্তুত। নেপোলিয়ন উসমানি সাম্রাজ্যের একের পর এক অঞ্চল দখল করা অব্যাহত রাখে। সে সিরিয়ায় প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু একে অঞ্চলে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়।
একের গভর্নর আহমদ পাশার সাহসিকতাপূর্ণ প্রতিরোধ, পাশাপাশি ইংল্যান্ডের নৌবহরের সহযোগিতা এ ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে। অতঃপর ইংল্যান্ডের নৌবহর ১২১৩ হিজরিতে (১৭৯৮ খ্রিষ্টাব্দে) আলেকজান্দ্রিয়াতে ফরাসি নৌবহরকে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। এদিকে মিশরব্যাপী (নেপোলিয়ন-বিরোধী) বিদ্রোহের দাবানল জ্বলে ওঠে। এ বিদ্রোহে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরাট ভূমিকা ছিল। এ বিদ্রোহের গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো, ১২১৫ হিজরিতে (১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে) মিশরে নিয়োজিত নেপোলিয়নের প্রতিনিধি ক্লেভারের নিহত হওয়া।
এ যাত্রায় যেন ফরাসিরা একটি জলাশয়ে পতিত হয়ে বিরাট সংখ্যক সৈন্য হারালো। উসমানি ও ইংরেজ সৈন্যরা মিশরে প্রবেশ করে এবং কায়রো অভিমুখে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখে। ফরাসিরা বাধ্য হয়ে ১২১৬ হিজরিতে (১৮০১ খ্রিষ্টাব্দে) আরিশ চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে মিশর থেকে বিদায় নেয়। ফ্রান্সের সাথে উসমানিদের পূর্বের ন্যায় সম্পর্ক তৈরি হয় এবং ফ্রান্সকে নিত্যনতুন সুবিধা প্রদানের চুক্তি সম্পাদিত হয়। খলিফা রাশিয়ার সমর্থনপুষ্ট ওয়ালাচিয়া ও মোলদাভিয়ায় নিয়োজিত গভর্নরদ্বয়কে অপসারণ করেন। এজন্য রাশিয়া উসমানি সাম্রাজ্যের সাথে পুনরায় শত্রুতা শুরু করে। এ ক্ষেত্রে ইংল্যান্ড রাশিয়াকে সাহায্য করে। উভয় রাষ্ট্র হুমকি প্রদান করে যে, উসমানিরা ওয়ালাচিয়া, মোলদাভিয়া রাশিয়াকে ফিরিয়ে না দিলে তারা ইস্তাম্বুলে প্রবেশ করবে এবং ইংল্যান্ডকে উসমানি নৌবহর ও দার্দানেলিস দুর্গ দিয়ে দেবে。
প্রতিরোধের সামর্থ্য না থাকায় উসমানিরা এ সকল শর্ত প্রায় মেনেই নিতে যাচ্ছিল। কিন্তু বিভিন্ন দেশের মধ্যকার স্বার্থের দ্বন্দ্ব উসমানিদের জন্য ইলাহি সাহায্যে রূপ নেয়। ফরাসি রাষ্ট্রদূত খলিফার নিকট আগমন করে এবং ফ্রান্সের পক্ষ থেকে খলিফাকে সহযোগিতা করার প্রস্তাব দেয়। খলিফা প্রস্তাবে সম্মত হলে ফরাসি নৌবহর দার্দানেলিস প্রণালির প্রবেশদ্বারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। ফরাসি নৌবহরের লক্ষ্য মারমারা সমুদ্রে অবস্থিত ইংরেজ নৌবহরকে ঘেরাও করে রাখা। ইংল্যান্ড তাদের নৌবহর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভয়ে তা সরিয়ে নেয়। অতঃপর তারা তাদেরকে পলায়নে বাধ্য করার প্রতিশোধ নিতে ১২২২ হিজরিতে (১৮০৭ খ্রিষ্টাব্দে) ফ্রেজারের নেতৃত্বে মিশরের ওপর চরম আক্রমণ করে। কিন্তু মিশরের বীর রশিদের জাতি তাদেরকে এমন শিক্ষা দেয়, যা তারা কখনো ভুলবে না। অতঃপর তারা ক্ষতির আঁচল টানতে টানতে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে।
মিশর থেকে ফরাসিদেরকে বের করে দিতে উসমানিদের যে বাহিনী এসেছিল তাতে মুহাম্মদ আলিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। মিশরীয় সৈন্যদের সাথে মুহাম্মাদ আলিও সৈন্য হিসেবে যোগদান করে। সে মামলুক জনগোষ্ঠী, আলেমশ্রেণি ও সাধারণ জনগণকে জয় করে ১২২০ হিজরিতে (১৮০৫ খ্রিষ্টাব্দে) মিশরের গভর্নর নিযুক্ত হয়। ক্ষমতা পাকাপোক্ত হওয়ার পর ১২২৬ হিজরিতে (১৮১১ খ্রিষ্টাব্দে) দুর্গ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে মামলুকদের থেকে মুক্ত হয়। অন্যদিকে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হতে আলেমদের মাঝে বিশৃঙ্খলা উসকে দেয়।
খলিফা তৃতীয় সেলিমের যুগে ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহের চাপে গ্রিসে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এ রাষ্ট্রটি উসমানি সাম্রাজ্যের অধীনে থাকলেও পরবর্তী সময়ে তাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়।