📄 রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ
রাশিয়ার অনুগত ককেশাস অঞ্চল উসমানি সাম্রাজ্যের সীমান্তে আগ্রাসন চালালে উসমানিরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। যুদ্ধে ক্রিমিয়ার খান কারিম কুরাই নেতৃত্ব দেন এবং রুশদের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করেন। ১১৮২ হিজরিতে (১৭৬৮ খ্রিষ্টাব্দে) এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে অনেক রুশ সৈন্য বন্দি হয়। খলিফা ও তার অনুসারীরা যে-সকল নিত্যনতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল, তার মধ্যে একটি ছিল প্রধানমন্ত্রী বা সেনাপ্রধান যুদ্ধে পরাজিত হলে তাদেরকে হত্যা করা। এরূপ কাজের উদ্দেশ্য অন্যদের সতর্ক করা। রুশ কর্তৃক অবরুদ্ধ নগরীসমূহের অবরোধ ভাঙতে ব্যর্থতার দায়ে প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করা হয়। নতুন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় এসে দিনান্তর নদী অতিক্রম করার চেষ্টা করেন। তখন নদীটি খরস্রোতা ছিল। ফলে বহু সৈন্য ডুবে যায় এবং উসমানিরা পরাজিত হয়। এ ঘটনাটি ১১৮৩ হিজরিতে (১৭৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) ঘটে। অতঃপর রাশিয়া ওয়ালাচিয়া ও মোলদাভিয়া অঞ্চল দুটি দখল করে নেয়। তবে রাশিয়া ট্রাবজোন(৫৬) দখল করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।
পরবর্তী সময়ে ১১৮৫ হিজরিতে (১৭৭১ খ্রিষ্টাব্দে) তারা ক্রিমিয়াকে উসমানি সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে সক্ষম হয়। রুশ সম্রাট জাহিন কুরাই সম্রাজ্ঞী প্রথম ক্যাথরিনকে রাশিয়ার সম্রাজ্ঞী হিসেবে নিয়োজিত করে। সে অস্ট্রিয়া যুদ্ধ বন্ধের জন্য মধ্যস্থতা করে। কিন্তু রাশিয়া কিছু অস্বচ্ছ শর্তারোপ করে। তারা জানে যে, এ শর্তগুলো উসমানিরা প্রত্যাখ্যান করবে। এরূপ অনৈতিক শর্তারোপের পেছনে রুশদের উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ অব্যাহত রাখা এবং উসমানিদের মালিকানাধীন অংশে আগ্রাসন চালিয়ে যাওয়া। এভাবে যুদ্ধের দাবানল নতুনভাবে জ্বলে ওঠে। কিন্তু রুশদের ইচ্ছা ব্যর্থ হয়। উসমানি বাহিনী রুশদের আগ্রাসনে বাধার সৃষ্টি করে এবং তাদেরকে সাম্রাজ্যের দখলকৃত অঞ্চল থেকে উৎখাত করতে সক্ষম হয়।
টিকা:
৫৬. ট্রাবজোন: তুরস্কের উত্তরপূর্বাঞ্চলে কৃষ্ণসাগর উপকূলীয় একটি শহর। -সম্পাদক
📄 অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা
রুশরা উসমানি সাম্রাজ্যের ভেতরে বিশৃঙ্খলা উসকে দেওয়ার চেষ্টা করে। তারা ভেতরে-বাহিরে উসমানিদের ওপর আঘাত করার উদ্দেশ্যে এরূপ কাজের আশ্রয় নেয়。
মুরার খ্রিষ্টানদের বিদ্রোহ
রুশরা মুরা অঞ্চলের খ্রিষ্টানদের উসকে দেয় এবং তাদের বিদ্রোহের সমর্থনে নৌবহর প্রেরণ করে। কিন্তু তাদের নৌবহর পরাজিত হয়। তবে তাদের পলায়নপর কিছু জাহাজ উসমানি নৌবহরের বড় একটা অংশকে জ্বালিয়ে দিয়ে যায়। অতঃপর তারা লুমনোস দ্বীপ দখলের জন্য অগ্রসর হলে উসমানি বাহিনী তাদেরকে পিছু হটতে বাধ্য করে। এভাবে উসমানিরা মোরা অঞ্চলের বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হয়। এ ঘটনাটি ১১৮৫ হিজরিতে (১৭৭১ খ্রিষ্টাব্দে) সংঘটিত হয়।
মিশরে সিনিয়র আলি বেগের বিদ্রোহ
উসমানিরা রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকার সুযোগে মিশরের গভর্নর সিনিয়র আলি বেগ সাম্রাজ্যে হস্তক্ষেপ করার প্রয়াস পায়। এজন্য রাশিয়া তার ওপর সন্তুষ্ট হয় এবং তাকে প্রয়োজনীয় সাহায্য প্রদানের জন্য ভূমধ্যসাগরে রুশ নৌবহর প্রেরণ করে। আলি বেগ বিনা বাধায় সিরিয়ায় প্রবেশ করে। রুশ নৌবহর তাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে আসে। এদিকে আলি বেগের প্রতিনিধি মুহাম্মাদ আবু জাহাব মিশরে বিদ্রোহ করে বসেন।
তাই তিনি আবু জাহাবকে দমন করতে মিশর ফিরে আসেন। এখানে তিনি আবু জাহাবের নিকট পরাজিত হন। তারপর তিনি জাহির উমরের শরণাপন্ন হন। সে একজন ডাকাত ছিল। তদপুরি সে ছিল ট্যাক্স উসুলকারী। তার সমর্থনে আলি বেগ সিরিয়ায় অগ্রসর হতে থাকেন। খলিফা রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকার কারণে আলি বেগের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেননি। কিন্তু যখন সে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে তখন উসমানিরা সিদোন(৫৭) শহরে তার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। এ যুদ্ধে আলি বেগ জয়লাভ করেন। সিরিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে বোমা ফেলতে রুশ নৌবহর তাকে সাহায্য করে।
তারপর আলি বেগ আনাতোলিয়ায় আক্রমণ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। রাশিয়ার সাথে তার এরূপ চুক্তি হয় যে, সে দক্ষিণ দিক থেকে এবং রাশিয়া উত্তর দিক থেকে আক্রমণ করবে। ফলে উসমানিরা উভয় দিক থেকে ফাঁদে পড়বে। কিন্তু এ যুদ্ধের আগে সে মিশরে বিদ্রোহ ঘোষণাকারী মুহাম্মাদ আবু জাহাবের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেয়। রাশিয়া তাকে চারশ সৈন্য দিয়ে সাহায্য করে। ১১৮৭ হিজরিতে (১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে) উভয় পক্ষ যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এ যুদ্ধে আলি বেগ চরমভাবে পরাভূত হয় এবং সে যুদ্ধে আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। তাকে সাহায্যকারী রুশ সেনারা বন্দি হয়। এভাবে সাম্রাজ্য তার বিশ্বাসঘাতকতা থেকে পরিত্রাণ পায়। মুহাম্মাদ আবু জাহাবকে তার নিষ্ঠা ও দেশের সেবায় আত্মত্যাগের জন্য মিশরের গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। অতঃপর খলিফা মোস্তফা ১১৮৭ হিজরিতে (১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে) ইনতেকাল করেন।
টিকা:
৫৭. সিদোন (স্থানীয় ভাষায় সাইদা): লেবাননের তৃতীয় বৃহত্তম শহর। -সম্পাদক