📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ইউরোপে যুদ্ধ

📄 ইউরোপে যুদ্ধ


দার্দানেলিস প্রণালির মুখ্য নিয়ন্ত্রক তাইদানুস ও লাইমানুস আইল্যান্ড দুটি উসমানি নৌবহরের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ভেনিসের নৌবহর উসমানি নৌবহরের ওপর আক্রমণ চালিয়ে দ্বীপ দুটি দখল নিতে সমর্থ হয়। যার কারণে খাদ্যবাহী জাহাজগুলো ইস্তাম্বুলে এসে পৌঁছতে পারেনি। এ কারণে সে সময় বাজারে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রীর পদে মুহাম্মাদ কুবরিলি

উসমানি সাম্রাজ্যের ইতিহাসে প্রধানমন্ত্রীর পদে যারা আসীন ছিলেন, তাদের মাঝে মুহাম্মাদ কুবরিলি, তার সন্তান ও বংশধরদের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত। তাদের এরূপ ক্ষমতা লাভের কারণ হলো, ইউরোপে যুদ্ধ পরিচালনা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে তাদের পরম ভূমিকা ছিল।

১০৬৭ হিজরিতে (১৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দে) কুবরিলি দায়িত্ব গ্রহণ করেই অভ্যন্তরীণ বিষয়সমূহ নিয়ন্ত্রণে রাখার কাজ শুরু করে দেন। তিনি জেনিসারি বাহিনীকে সমুচিত শিক্ষা দেন এবং তাদের অনেককেই হত্যা করেন। দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অন্যতম নায়ক পোপ প্যাট্রিয়াককে হত্যা করেন। অতঃপর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি স্থিতিশীলতা লাভ করে। এর মধ্য দিয়ে তিনি ইউরোপে অভিযান চালানোর সুযোগ লাভ করেন। প্রথম পদক্ষেপে তিনি সেসব আইল্যান্ড ও বন্দর মুক্ত করেন, যা ভেনিস বাহিনী দখল করে রেখেছিল।

ট্রান্সসিলভানিয়া, ওয়ালাচিয়া ও মোলদাভিয়ার শাসকদের বিদ্রোহ

সুইডেন ও পোল্যান্ডের মাঝে যুদ্ধ চলাকালে সুইডেন উসমানিদের কাছে এ মর্মে সাহায্যের প্রস্তাব করে যে, উসমানিরা পোল্যান্ডে ব্যাপক অভিযান চালানোর সুযোগ লাভ করবে। কিন্তু মুহাম্মাদ কুবরিলি এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তবে সুইডেন ওয়ালাচিয়া, মোলদাভিয়ার ও ট্রান্সসিলভানিয়ার শাসকদেরকে পক্ষে টানতে সমর্থ হয়। এজন্য প্রধানমন্ত্রী ক্ষুদ্ধ হয়ে এতদঞ্চলের শাসকদেরকে বরখাস্ত করেন। প্রতিবাদে বরখাস্ত হওয়া ট্রান্সসিলভানিয়ার শাসক উসমানিদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী দ্রুততার সাথে পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাকে পরাভূত করেন। তারপর ওয়ালাচিয়ার আমিরও বিরোধিতার চেষ্টা করলে প্রধানমন্ত্রী তাকে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করেন।

প্রধানমন্ত্রী পদে আহমাদ কুবরিলি

প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মাদ কুবরিলি ১০৭২ হিজরিতে (১৬৬২ খ্রিষ্টাব্দে) ইনতেকাল করার পর তার ছেলে আহমাদ কুবরিলি প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্ত হন। তিনি তার পিতার মতোই রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষায় নিয়োজিত হন।

উসমানিদের নতুন নতুন বিজয়াভিযান

অস্ট্রিয়া ও ভেনিস উসমানিদের সাথে শান্তিচুক্তির প্রস্তাব করলে আহমাদ কুবরিলি তা প্রত্যাখ্যান করেন। প্রধানমন্ত্রী অস্ট্রিয়ার ভূমিতে প্রবেশ করতে সক্ষম হন এবং নুহাজাল নামক প্রসিদ্ধ দুর্গ জয় করতে সক্ষম হন। এভাবে তার বিজয়াভিযান অব্যাহত থাকে। চেকপ্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়ার মাঝে অবস্থিত মোরাগিয়া ও পোল্যান্ডের সিনজিয়া অঞ্চল দখলে নিতে তিনি সক্ষম হন।

ফ্রান্সের সাথে সম্পর্কের অবনতি

ফরাসিরা ক্রিট দ্বীপের ব্যাপারে ভেনিসকে সহযোগিতা করলে উসমানিদের সাথে ফ্রান্সের সম্পর্কে ফাটল ধরে। অতঃপর অস্ট্রিয়ার সাথে যুদ্ধ চলাকালে সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটে। উসমানিদের সাথে ধারাবাহিক পরাজয় বরণের পর অস্ট্রিয়া পোপের সাহায্য চায়। পোপ অস্ট্রিয়ার ডাকে সাড়া দেয় এবং ফ্রান্স তাদের সাহায্যে ছয় হাজার সৈন্য প্রেরণ করে।

উভয় দেশের মাঝে বেশকিছু যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং উভয় দেশই জয়-পরাজয়ের মুখোমুখি হয়। পরিশেষে উসমানিদের সাথে অস্ট্রিয়ার চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তির বর্ণনা মতে, হাঙ্গেরি উভয় দেশের মাঝে বণ্টিত হবে। এ চুক্তির পরও উত্তর আফ্রিকার বন্দরসমূহের ওপর ফরাসি জলদস্যুরা আক্রমণ অব্যাহত রাখে। এমনকি তারা মুসলমানদের জাহাজসমূহের ওপরও আক্রমণ করত।

পরবর্তী সময়ে ফ্রান্স উসমানিদের সাথে চুক্তি নবায়নের চেষ্টা করে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আহমাদ কুবরিলি এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। উসমানিদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য ফ্রান্স নৌবহর প্রেরণের চেষ্টা করলে চুক্তি প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি আরও জোরালো হয়। অতঃপর ফ্রান্সের জনৈক মন্ত্রী উসমানিদের সাথে নমনীয়তা অবলম্বন করার জন্য রাজার প্রতি আহ্বান জানান। রাজা মন্ত্রীর প্রস্তাবমতো কোমল রাজনীতি শুরু করলে উভয় দেশের মাঝে ১০৮৪ হিজরিতে (১৬৭৩ খ্রিষ্টাব্দে) নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং উভয় দেশের মাঝে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকে।

পোল্যান্ডের সাথে যুদ্ধ

ককেশাস অঞ্চল উসমানিদের অধীনে চলে আসার ঘোষণা দিলে পোল্যান্ড ক্ষুব্ধ হয় এবং তারা ককেশাস অঞ্চলে আক্রমণ করে বসে (বর্তমান ইউক্রেনের অধিকাংশ অঞ্চল ককেশাসের অন্তর্ভুক্ত ছিল)। এতে খলিফা নিজেই সৈন্যদের নিয়ে পোল্যান্ডের সাথে যুদ্ধ করেন এবং পোল্যান্ডকে পরাজিত করেন। পরবর্তী সময়ে পোল্যান্ড নতুন করে চুক্তির প্রস্তাব করে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী ১০৮৩ হিজরিতে (১৬৭২ খ্রিষ্টাব্দে) দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তির শর্তানুযায়ী ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় বোদোলিয়া অঞ্চল উসমানি সাম্রাজ্যের সাথে যুক্ত হবে এবং ইউক্রেনের অবশিষ্টাংশ ককেশাসের অধীনে চলে যাবে। আর পোল্যান্ড ২,২০,০০০ ভেনিসীয় স্বর্ণমুদ্রা বার্ষিক কর প্রদান করবে। পোল্যান্ডের জনগণ তাদের এ চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে। তাদের নেতা সুবেসকি উসমানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বের হয় এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিজয় অর্জনে সক্ষম হয়। অবশেষে পোল্যান্ড ও উসমানিদের মাঝে আরেকটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। পূর্ববর্তী চুক্তিতে উসমানিদের জন্য যে অঞ্চল বরাদ্দ ছিল, তার মধ্য হতে কতিপয় শহর বাদ দিয়ে অন্যান্য অঞ্চল উসমানিদের জন্য রাখার কথা বলা হয়। এই চুক্তিটি ১০৮৭ হিজরিতে (১৬৭৬ খ্রিষ্টাব্দে) সংঘটিত হয়। পরবর্তী সময়ে সুবেসকি পোল্যান্ডের রাজা হওয়ার পর উসমানিদের সাথে আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রাখে।

১০৮৭ হিজরিতে (১৬৭৬ খ্রিষ্টাব্দে) প্রধানমন্ত্রী আহমাদ কুবরিলি মৃত্যুবরণ করেন। তার স্থলে তার জামাতা কাররা মোস্তফা স্থলাভিষিক্ত হন। কিন্তু তিনি পূর্বসূরিদের মতো যোগ্য ছিলেন না। দেশের স্বার্থ বাদ দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থকে তিনি প্রাধান্য দেন। ক্ষমতায় এসে তিনি দেখতে পান যে, ককেশীয়রা উসমানিদের বিপক্ষে রাশিয়ার সাহায্য প্রার্থনা করছে। তারা ১০৮৮ হিজরিতে (১৬৭৭ খ্রিষ্টাব্দে) উসমানিদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, যা ১০৯২ হিজরি (১৬৮১ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। অতঃপর উভয় পক্ষ যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যেতে রাদজাইন চুক্তি সম্পাদন করেন। উভয় পক্ষের মাঝে চুক্তি সম্পাদিত হলেও ককেশাসীয়রা উসমানিদেরকে অপছন্দ করে ক্রমান্বয়ে রাশিয়ানদের প্রতি ঝুঁকতে থাকে।

অস্ট্রিয়ার সাথে নতুন করে যুদ্ধ

১০৯২ হিজরিতে অস্ট্রিয়ার সাথে বেশ কয়েকবার যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
কাররা মোস্তফা বড় আকারে যুদ্ধ শুরু করলেও তা বামনের ন্যায় খাটো হয়ে আসে। এই যুদ্ধ উসমানি সাম্রাজ্যের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনে। প্রাথমিক পর্যায়ে উসমানিরা ব্যাপক বিজয় লাভ করে। তারা দ্বিতীয়বারের মতো ভিয়েনায় পৌঁছতে এবং তা অবরোধ করতে সক্ষম হয়। ইতিপূর্বে খলিফা সুলাইমান কানুনি ভিয়েনা অবরোধ করেছিলেন।

কাররা মোস্তফা অস্ট্রিয়ায় বিজিত অঞ্চলে নিরাপত্তার ব্যাপারে সজাগ ছিলেন না। তিনি ভিয়েনা জয়ের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু ইউরোপ তাকে লক্ষ্যপানে পৌঁছতে সুযোগ দিতে চায়নি। তাই পোপ অস্ট্রিয়ার সাহায্যে এগিয়ে আসতে ইউরোপের প্রতি আহ্বান জানায়।

অতঃপর উসমানিরা ভিয়েনার কাছাকাছি পৌঁছতেই ইউরোপীয় বাহিনী তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সুবেসকি পোপের নির্দেশে উসমানিদের সাথে চুক্তি ভঙ্গ করে যুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়। তাকে সহযোগিতা করে জার্মান স্টেটস, জাখসেন ও বায়ার্ন। সাহসিকতার সাথে মুসলমানগণ যুদ্ধ চালিয়ে গেলেও উসমানিরা টিকতে না পেরে সৈন্য ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। সুবেসকি পেছন থেকে মুসলিম বাহিনীর যাকেই হাতের কাছে পেয়েছে তাকেই হত্যা করেছে।

উসমানিদের বিরুদ্ধে ক্রুসেডারদের জোট

খলিফা উসমানিদের পরাজয়ের সংবাদ জানার পর কাররা মোস্তফাকে মৃত্যুদণ্ড দেন এবং তদস্থলে ইবরাহিম পাশাকে স্থলাভিষিক্ত করেন। সে সময় ইউরোপ বিজয়ের আনন্দে ভাসছে। ভেনিস, অস্ট্রিয়া, হল্যান্ড, রাশিয়া ও মাল্টার পোপ সম্প্রদায় পোপের নেতৃত্বে উসমানিদেরকে পৃথিবী থেকে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে ক্রুসেড জোট গঠন করে।

অস্ট্রিয়া হাঙ্গেরি ফ্রন্টে আক্রমণ করে পেস্ট নগর দখল করে এবং হাঙ্গেরিতে প্রবেশ করে বিশাল অঞ্চল তার দেশের সাথে যুক্ত করে নেয়। তারা ১০৯৭ হিজরিতে (১৬৮৬ খ্রিষ্টাব্দে) বুদা নগরী দখলে নিতে সক্ষম হয়। উসমানিরা এই নগরী হাতছাড়া করার পর দ্বিতীয়বার আর দখল করতে সক্ষম হয়নি। অনুরূপভাবে অস্ট্রিয়া সিলভানিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল দখলে নিতে সক্ষম হয়। একই সময়ে হল্যান্ড সুবেসকির নেতৃত্বে মোলদাভিয়ার ওপর আক্রমণ চালায়। এদিকে ভেনিস ও মাল্টার পোপেরা নৌবহরের সাহায্যে মুরা দ্বীপের বিভিন্ন শহর দখল করতে সক্ষম হয়। দেশব্যাপী বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়লে আলেমগণ ও দ্বিতীয় মন্ত্রী পরামর্শ করে খলিফা চতুর্থ মুহাম্মাদকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। তারা ১০৯৯ হিজরিতে (১৬৮৮ খ্রিষ্টাব্দে) খলিফাকে বরখাস্ত করে তার ভাই দ্বিতীয় সুলাইমানকে খলিফা নিযুক্ত করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00