📄 ইসলামি দেশসমূহে উসমানিদের কার্যক্রম
সিরীয় শাসকশ্রেণির বিদ্রোহ
জানবার্দি গাজালি প্রথম সেলিমের মৃত্যুর সংবাদ শোনার সাথে সাথে বিদ্রোহ করে বসে। এমনকি মিশরের শাসককে তার পদাঙ্ক অনুসরণের প্রস্তাব দেয়। মিশরের শাসক সম্মতি প্রকাশ করে তাকে আটকিয়ে ফেলেন। তিনি সিরীয় শাসকের প্রস্তাবের কথা খলিফা সুলাইমানের নিকট ফাঁস করে দেন। এদিকে সিরীয় শাসক হালাব তথা আলেপ্পো অবরোধের মাধ্যমে তার বিদ্রোহ শুরু করে। উসমানি বাহিনী আলেপ্পো পৌঁছালে সে পিছু হটে যায়। অবশেষে দামেশকে ঘাঁটি তৈরি করে উসমানিদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং পরাজয় বরণ করে। অচেনা বেশে পলায়নকালে তার জনৈক সমর্থক তাকে আটক করে উসমানিদের হাতে তুলে দিলে উসমানি বাহিনী তাকে হত্যা করে।
পারস্যে (সাফাভি শিয়াদের রাষ্ট্রে) তাদের কার্যক্রম
৯৪১ হিজরিতে (১৫৩৪ খ্রিষ্টাব্দে) উসমানিরা দ্বিতীয়বারের মতো তাবরিজে প্রবেশ করে। সেখান থেকে বাগদাদ যাত্রা করে এবং বাগদাদকে উসমানি খিলাফতের অধীনে নিয়ে নেয়। ৯৫৪ হিজরিতে (১৫৪৭ খ্রিষ্টাব্দে) শাহ সাফাভির ভাই তার বিরুদ্ধে সুলতান সুলাইমানের নিকট সাহায্য চায়। উসমানিরা তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে তৃতীয়বারের মতো তাবরিজে প্রবেশ করে।
আরব দেশে
স্পেন ও পর্তুগিজ ক্রুসেডারদের ক্রোধের আগুন মুসলমানদের ওপর ছড়িয়ে পড়ে। তারা স্পেনের সর্বশেষ মুসলিম ঘাঁটি দখলে নেওয়ার পর মুসলমানদেরকে এ মর্মে প্রতিশ্রুতি দেয় যে, মুসলমানগণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করার পাশাপাশি ধর্মীয় রীতিনীতি চর্চা করতে পারবে। কিন্তু তারা অল্পসময়ের মধ্যে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং স্পেনের মুসলমানদেরকে খ্রিষ্টান বানানোর জঘন্য প্রক্রিয়া শুরু করে। এজন্য দাস বানানো, অপমানজনক আচরণ, বিতাড়ন ও জাতিগত নির্মূলের মতো ঘৃণ্যকর পন্থা গ্রহণ করে, যা কাগজে-কলমে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এর ফলে স্পেনের মুসলিমগণ মুখ থুবড়ে পড়ে। তাদের এক শ্রেণিকে ধ্বংস করা হয়, এক শ্রেণি খ্রিষ্টান সমাজের সাথে মিশে যায় এবং অপর এক শ্রেণি ঈমান বাঁচাতে মুসলিম দেশসমূহে পাড়ি জমায়।
স্পেনিশ ও পর্তুগিজরা স্পেন দখল করেই নিভৃত হয়নি; বরং এখানে তাদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত হওয়ার পর অন্যান্য মুসলিম দেশে অনুরূপ ট্রাজেডি তৈরি করার অভিপ্রায় নিয়ে তারা অভিযান শুরু করে। এ অভিযানের মধ্য দিয়ে তারা উত্তর আফ্রিকার ত্রিপোলি, আলজেরিয়া, বিজার্ট, ওরান ইত্যাদি কেন্দ্রীয় স্থানসমূহ দখল করে নেয়। উসমানিরা স্পেনের হাত থেকে উত্তর আফ্রিকাকে মুক্ত করে স্পেন অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করার সংকল্প গ্রহণ করে।
নাবিক খাইরুদ্দিন বারবারোসা ও তার ভাই আরুজ
সুলতান প্রথম সেলিমের যুগে জনৈক নাবিকের প্রকাশ ঘটে। ইসলামের ইতিহাসে তার উজ্জ্বল অধ্যায় রয়েছে। তার নাম নাবিক খাইরুদ্দিন বারবারোসা। তিনি এজিয়ান সমুদ্র দ্বীপপুঞ্জে জলদস্যুতা করতেন এবং খ্রিষ্টধর্মের অনুসারী ছিলেন। তিনি ও তার ভাই আরুজ ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নিজেদেরকে ইসলামের সেবায় উৎসর্গ করেন। খ্রিষ্টান জলদস্যুরা মুসলিমদের জাহাজ থামিয়ে যাত্রীদের দাস বানিয়ে নিত। তারা জাহাজের মালামাল লুণ্ঠন করত। তারা দুজন তাদের অপকর্মের প্রতিশোধ নিতেন। তারাও অনুরূপভাবে খ্রিষ্টানদের জাহাজ আটকিয়ে যাত্রীদের দাস হিসেবে বিক্রয় করে দিতেন। একদা তারা খ্রিষ্টানদের নিকট হতে জব্দকৃত একটি জাহাজ সুলতান প্রথম সেলিমের নিকট উপঢৌকন হিসেবে প্রেরণ করেন। খলিফা তাদের উপহার গ্রহণ করেন। তারা দুই ভাই উসমানিদের আনুগত্য ও সেবা করার কথা ঘোষণা করেন।
আলজেরিয়াকে উসমানি সাম্রাজ্যের সাথে যুক্তকরণ
দুই ভাই আফ্রিকা উপকূলকে ক্রুসেডারমুক্ত করতে বেরিয়ে পড়েন। আরুজ বারবারোসা প্রথমে আলজেরিয়া এবং টেলেমসেন শহর দুটি মুক্ত করেন। অতঃপর সুলতান প্রথম সেলিম খাইরুদ্দিনকে আলজেরিয়ার গভর্নর নিযুক্ত করেন। ফলে আলজেরিয়া উসমানি রাষ্ট্রের সাথে একীভূত হয়।
পশ্চিম ত্রিপোলিকে (লিবিয়া) যুক্তকরণ
স্পেন ত্রিপোলি দখল করার পর সেখানকার মুসলিম অধিবাসীগণ খলিফার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেন। খলিফা তাদের সাহায্যে মুরাদ আগার নেতৃত্বে ৯২৬ হিজরিতে (১৫২০ খ্রিষ্টাব্দে) একটি ক্ষুদ্র নৌবাহিনী প্রেরণ করেন। কিন্তু মুরাদ ত্রিপোলি মুক্ত করতে ব্যর্থ হন। অতঃপর খলিফা তুরগুল বেকের নেতৃত্বে উসমানি নৌবহর প্রেরণ করেন। তুরগুল স্পেনিশদের বিতাড়িত করে ত্রিপোলি মুক্ত করেন। এভাবে বিভিন্ন মুসলিম শহর স্পেনের দখল হতে মুক্ত হতে থাকে। মুসলিম বাহিনী বাজার্ট (৪৬), ওরান (৪৭), গাজামুয়ুরাকা (এটি দক্ষিণ-পূর্ব স্পেনের বেলিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপ) ও কোর্সিকা(৪৮) মুক্ত করার মধ্য দিয়ে পশ্চিম ত্রিপোলিকে (লিবিয়া) উসমানি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন।
তিউনিসিয়ায় উসমানিদের কার্যক্রম
খলিফা সুলাইমান নাবিক খাইরুদ্দিনকে ডেকে পাঠান এবং তাকে রাজা হাফসির নিকট থেকে তিউনিসিয়াকে মুক্ত করার প্রস্তুতি নিতে আদেশ দেন। চরম ইসলামবিদ্বেষী ফ্রান্সের রাজা শার্লকানের সাথে হাফসি গোপন সম্পর্ক বজায় রাখে। তার এ গোপন সম্পর্কের কথা ফাঁস হয়ে যায়। অতঃপর খাইরুদ্দিন তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি বিরাট নৌবহর প্রস্তুত করেন। অতঃপর তিনি দার্দানেলিস প্রণালি ধরে তিউনিসিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি মাল্টা ও ইতালির দক্ষিণাঞ্চলে আক্রমণ করেন, যেন কেউ তার মূল টার্গেট বুঝতে না পারে। তারপর তিনি খুব সহজে তিউনিসিয়া আক্রমণ করেন এবং সুলতানকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। অতঃপর তদস্থলে হাফসির ভাইকে নিযুক্ত করেন।
এ ঘটনার প্রেক্ষিতে স্পেনের রাজা শার্লকান এবং ইতালি, আফ্রিকা ও ইউরোপের অন্যান্য দেশসমূহ ক্ষুব্ধ হয়। শার্লকান তিউনিসিয়ায় স্বীয় প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে এবং একান্ত অনুগত রাজাকে তার রাজত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করে। শার্লকান নিজ নেতৃত্বে সৈন্যদের নিয়ে বের হয় এবং তিউনিসিয়ায় প্রবেশ করতে সমর্থ হয়। সে সৈন্যদেরকে মুসলমানদের সম্পদ লুট, মসজিদ ধ্বংস এবং তাদেরকে হত্যা, তাদের সম্মানহানি, বন্দি করা ও দাস বানানোর স্বাধীনতা প্রদান করে। অতঃপর সে খাইরুদ্দিনকে হটিয়ে বাজার্ট ও ইনাবাতে ক্ষমতাচ্যুত রাজা হাফসিকে পুনরায় ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়। এদিকে খাইরুদ্দিন টিকতে না পেরে তিউনিসিয়া ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন।
আরব উপদ্বীপ ও ভারতবর্ষে উসমানিদের কার্যক্রম
ইতিপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি যে, পর্তুগিজদের পক্ষ হতে বিপদের আশঙ্কা ছিল। তারা জাজিরাতুল আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় বেশকিছু জায়গা দখল এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহ মুবারক চুরি করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিল। অধিকন্তু মোঘল সুলতানদের শাসনাধীন ভারতবর্ষে পর্তুগিজদের হানা দেওয়ারও আশঙ্কা রয়েছিল।
খলিফা সুলাইমান জাজিরাতুল আরবকে পর্তুগিজমুক্ত করতে আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে আদেশ করেন। মুসলিম বাহিনী যথারীতি আক্রমণ করে ইয়েমেন, এডেন, মাস্কাট দখল করে এবং হরমুজ দ্বীপ অবরুদ্ধ করতে সক্ষম হয়। এর ফলে পর্তুগিজদের পক্ষ হতে আক্রমণ আসার পথ রুদ্ধ হয় এবং তাদের হীন উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। সে সময় ভারতবর্ষের মোঘল বাদশাহ পর্তুগিজ কর্তৃক দখলকৃত ভারতীয় উপকূল উদ্ধারের জন্য খলিফার সাহায্য প্রার্থনা করে। খলিফা মোঘলদের সাহায্যে একটি নৌবহর প্রেরণ করেন, যারা পর্তুগিজদের নিকট হতে বেশকিছু দুর্গ মুক্ত করতে সক্ষম হয়। তবে দেওয়ের (৪৯) সমুদ্র যুদ্ধে উসমানি নৌবাহিনী পরাজিত হলে তাদেরকে প্রত্যাহার করা হয়। এদিকে পর্তুগিজরা প্রচার করে যে, উসমানি খলিফা ভারতবর্ষকে তার খিলাফতের সাথে যুক্ত করতে চান। এরূপ ফিতনা সৃষ্টিকারী প্রচারণা হতে বেঁচে থাকার জন্য উসমানি সৈন্য সরিয়ে নেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে। অতঃপর উসমানি সৈন্যদের প্রত্যাহার করা হয়।
টিকা:
৪৬. বাজার্ট : তিউনিসিয়ার অন্তর্গত একটি শহর। -সম্পাদক
৪৭. ওরান : আলজেরিয়ার অন্তর্গত একটি শহর। -সম্পাদক
৪৮. কোর্সিকা : ভূমধ্যসাগরের অন্তর্গত একটি দ্বীপ। যা বর্তমানে ফ্রান্সের অধিভুক্ত একটি অঞ্চল। -সম্পাদক
৪৯. দেওয়ের সামুদ্রিক যুদ্ধ : ১৫০৯ খ্রিষ্টাব্দে আরব সাগর উপকূলীয় ভারতের দেও সমুদ্রবন্দরে পর্তুগিজ এবং উসমানিদের মাঝে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। -সম্পাদক
📄 ইউরোপে যুদ্ধ
স্পেনের মুসলমানদের ওপর নির্যাতন করার কারণে নাবিক খাইরুদ্দিন কর্তৃক প্রতিশোধ গ্রহণ
নাবিক খাইরুদ্দিন বারবারোসা ও তার ভাই আরুজ মুসলমানদের সাথে স্প্যানিশদের নির্মম আচরণের কথা জানার পর মুসলমানদেরকে সহযোগিতা করার উদ্যোগ নেন। খ্রিষ্টানরা মুসলমানদেরকে হত্যা করা শুরু করে। তারা তাদেরকে খ্রিষ্টান বানানোর চেষ্টাও অব্যাহত রাখে। এমতাবস্থায় মুসলমানদেরকে আপন দ্বীন নিয়ে মুসলিম দেশে পালানোর সুযোগ করে দিতে স্পেনের সমুদ্র উপকূলের উদ্দেশ্যে মুসলমানদের জাহাজসমূহ যাত্রা করে। সে সময় খাইরুদ্দিন মুসলমানদের পক্ষ হতে ইউরোপের সকল খ্রিষ্টানদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
অনুরূপ যারা দলে দলে মুসলিমদের ওপর অত্যাচার করতে মিলিত হয়েছিল এবং স্পেনে মুসলিম নিধনকে সাধুবাদ জানিয়েছিল তাদের থেকেও প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
খাইরুদ্দিন বারবারোসা ইতালি, ফ্রান্স ও স্পেনের বেশিরভাগ সমুদ্রতীরে আগ্রাসন চালিয়ে অনেক খ্রিষ্টানকে জোরপূর্বক জাহাজে টেনে তোলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে মুসলিম দেশসমূহে দাস হিসেবে বিক্রয় করা। যেন ইউরোপের খ্রিষ্টানরা বুঝতে পারে যে, মুসলমানগণ ক্ষমা ও উদারতার গুণে গুণান্বিত হওয়ার পাশাপাশি তাদের ভাইদের ওপর পরিচালিত নির্যাতনের জন্য প্রতিশোধও গ্রহণ করতে সক্ষম। উসমানি খিলাফত ও ফ্রান্সের মাঝে চুক্তি হওয়ার পর খাইরুদ্দিন স্পেনের ব্যাপারে অধিক গুরুত্ব দেন।
তিউনিসিয়া হতে খাইরুদ্দিনকে ফেরত পাঠানোর পর তিনি ৯৪৪ হিজরিতে (১৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দে) শার্লকানের নৌবহরকে পরাজিত করেন। অতঃপর তিনি কিরিট উপদ্বীপ জয় করার উদ্দেশ্যে অভিযানে বের হন। কিন্তু তিনি তা জয় করতে ব্যর্থ হন।
রোডস উপদ্বীপ জয়
ইউরোপের বিভিন্ন দেশ পরস্পরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। যেমন অস্ট্রিয়ার রাজা শার্লকান ফ্রান্স সম্রাট ফ্রাঁসোর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। অনুরূপভাবে ক্যাথলিকগণ প্রোটেস্ট্যাট খ্রিষ্টানদের সাথে ধর্মীয় বিরোধে জড়িয়ে ছিল। খলিফা তাদের এ যুদ্ধব্যস্ততাকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং ৯২৯ হিজরিতে (১৫২৩ খ্রিষ্টাব্দে) অভিযান প্রেরণ করে রোডস দ্বীপ জয় করেন। পোপ ইউহান্নার অশ্বারোহীরা রোডস ছেড়ে মাল্টায় পলায়ন করে। উল্লেখ্য যে, অস্ট্রিয়ার রাজা শার্লকান এ শহরটি ইউহান্নাকে উপঢৌকন হিসেবে দান করেছিল।
ক্রিমিয়াকে উসমানি খিলাফতের সাথে যুক্তকরণ
ক্রিমিয়ার শাসকগোষ্ঠী উসমানিদের আনুগত্য স্বীকার করত। পরবর্তী সময়ে উসমানিদের সাথে শাসকদের বিরোধ দেখা দিলে উসমানিরা ৯৩৯ হিজরিতে (১৫৩৩ খ্রিষ্টাব্দে) ক্রিমিয়ায় হস্তক্ষেপ করে এটিকে উসমানি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়।
ওয়ালাচিয়াকে উসমানি প্রদেশে পরিণতকরণ
সুলতান সুলাইমান ওয়ালাচিয়াকে উসমানি অঙ্গরাজ্যে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ৯৩১ হিজরিতে (১৫২৫ খ্রিষ্টাব্দে) ওয়ালাচিয়ায় প্রবেশ করেন। অতঃপর রাজধানী বুখারেস্ট দখল করে নেন। কিন্তু পরে সেখানকার লোকেরা ট্রান্সসিলভানিয়ার আমিরের সহযোগিতায় বিদ্রোহ করে নিজেদের জন্য নতুন একজনকে আমির নিযুক্ত করে। খলিফা অতিরিক্ত কর প্রদানের বিনিময়ে তাদের মনোনীত আমিরকে মেনে নিতে সম্মত হন।
ফরাসিদের সাথে উসমানিদের চুক্তি
ফ্রান্স অস্ট্রিয়ার রাজা শার্লকানের ব্যাপারে ভীষণ শঙ্কিত ছিল; বিশেষত যখন চতুর্দিক হতে সে ফ্রান্সকে ঘিরে ফেলেছিল। সে স্পেন, হল্যান্ড, জার্মানি ও ইতালির বিশাল অংশ তার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। ফরাসি সম্রাট খলিফাকে প্রস্তাব করে শার্লকানের সাম্রাজ্যে পূর্ব দিক থেকে অভিযান চালাতে। আর সে পশ্চিম দিক থেকে অভিযান চালাবে। খলিফা ফরাসি সম্রাটের চিন্তাধারার সাথে একমত হন।
বেলগ্রেড জয়
খলিফা হাঙ্গেরির রাজার নিকট কর প্রদানের আদেশসংবলিত পত্র প্রেরণ করেন। কিন্তু রাজা খলিফার দূতকে হত্যা করে। খলিফা ক্রুদ্ধ হয়ে নিজেই সৈন্যবাহিনী নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। হাঙ্গেরি পৌঁছার পথে বেলগ্রেড অবস্থিত। হাঙ্গেরিতে প্রবেশে বেলগ্রেডই কেবল বাধা। তাই খলিফা ৯২৭ হিজরিতে (১৫২১ খ্রিষ্টাব্দে) প্রথমে বেলগ্রেড জয় করেন।
হাঙ্গেরি জয়
খলিফা স্বয়ং এক লক্ষ সৈন্য, তিনশত ক্ষেপণাস্ত্র ও আটশ জাহাজ নিয়ে হাঙ্গেরির দক্ষিণে দানিয়ুব নদীতে পৌঁছেন এবং তিনি বেলগ্রেডে সেনাঘাঁটি স্থাপন করেন। পথিমধ্যে বেশকিছু দুর্গ জয় করেন। অতঃপর ৯৩২ হিজরিতে (১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে) হাঙ্গেরির রাজা ও তার যোদ্ধারা পরাজিত হয়। খলিফা হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট জয় করেন। অতঃপর দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে ট্রান্সসিলভানিয়ার রাজা গানজাবুলিকে হাঙ্গেরির নতুন রাজা হিসেবে নিয়োগ দেন।
অস্ট্রিয়ার সাথে যুদ্ধ ও ভিয়েনা অবরোধ
অস্ট্রিয়ার রাজা শার্লকানের ভাই ফার্ডিন্যান্স দাবি করে যে, হাঙ্গেরির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে এবং রাজধানী বুদাপেস্ট দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছে। তখন খলিফা কর্তৃক নিয়োজিত রাজা গানজাবুলি খলিফার সাহায্য চায়। ফলে উসমানি সৈন্যরা বুদাপেস্ট আক্রমণ করে। ফার্ডিন্যান্স যুদ্ধে টিকতে না পেরে পলায়ন করে। সৈন্যরা তাকে তাড়িয়ে অস্ট্রিয়ায় নিয়ে যায় এবং রাজধানী ভিয়েনা অবরোধ করে। তারা ভিয়েনার প্রাচীরে ফাটল ধরাতে সক্ষম হয়। কিন্তু তাদের রসদ শেষ হয়ে আসে। এদিকে শীতের মৌসুমও শুরু হয়ে যায়। যার কারণে খলিফা দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
৯৩৮ হিজরিতে (১৫৩২ খ্রিষ্টাব্দে) অস্ট্রিয়ার রাজা বুদাপেস্ট দখলের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। খলিফা তাকে দমন করতে পরের বছর আবার অভিযানের উদ্দেশ্যে বের হন। কিন্তু খলিফা শার্লকানের ব্যাপক যুদ্ধ প্রস্তুতির সংবাদ জানার পর যুদ্ধে না জড়িয়ে ফিরে যান।
উসমানিদের সাথে ফ্রান্সের চুক্তি ভঙ্গ
খ্রিষ্টান রাষ্ট্র ফ্রান্স উসমানি খলিফার সাথে শার্লকান ও খ্রিষ্টান সাম্রাজ্যের বিপক্ষে চুক্তি করে। এ ব্যাপারে ইউরোপের জনমনে বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়। এজন্য ফ্রান্সের রাজা ফ্রাঁসো খ্রিষ্টানদের মনস্তুষ্টির জন্য অস্ট্রিয়ার রাজার সাথে শান্তিচুক্তি করে এবং উসমানিদের সাথে কৃতচুক্তি ভঙ্গ করে। অস্ট্রিয়া সুযোগের সদ্ব্যবহার করে উসমানিদের সাথে যুদ্ধ খেলায় মেতে ওঠে। কিন্তু তারা ৯৪৩ হিজরিতে উসমানি বাহিনীর হাতে পরাজয় বরণ করে।
উসমানিদের বিরুদ্ধে মোলদাভিয়ার শাসককে প্ররোচনা
রাজা শার্লকানের ভাই উসমানিদের বিপক্ষে মোলদাভিয়ার শাসককে প্ররোচনা দেয়। সে প্ররোচিত হয়ে যথারীতি বিদ্রোহ করে বসে। উসমানিরা তাকে কাবু করতে সক্ষম হয়। অতঃপর মোলদাভিয়ার শাসকের পদে তার ভাইকে নিযুক্ত করে এবং এ শহরের সুরক্ষা আগের চেয়েও জোরদার করে।
অস্ট্রিয়ার সাথে অনবরত যুদ্ধ
হাঙ্গেরির রাজা গানজাবুলি ফার্ডিন্যান্সের বুদ্ধিতে হাঙ্গেরিকে বিভক্ত করতে সম্মত হয়। তাদের চিন্তাধারা হলো, হাঙ্গেরি ভাগ হয়ে গেলে উসমানিদের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা ক্ষয়প্রাপ্ত হবে। গানজাবুলি ও ফার্ডিন্যান্সের মাঝে সংঘটিত চুক্তির কপি ফ্যার্ডিন্যান্স গোপনে খলিফার নিকট প্রেরণ করে। যেন খলিফা জানতে পারে যে, তার প্রতি গানজাবুলির আনুগত্য নেই।
ইতিমধ্যে ৯৪৬ হিজরিতে (১৫৩৯ খ্রিষ্টাব্দে) গানজাবুলি মৃত্যুবরণ করে। তার মৃত্যুকে ফার্ডিন্যান্স হাঙ্গেরি দখলের সুযোগ মনে করে। সে দানিয়ুব নদীর এক তীরে অবস্থিত পেস্ট শহর দখল করে। (যার অপর তীরে অবস্থিত বুদা নামক শহর। পরবর্তীকালে বুদা ও পেস্ট মিলিত হয়ে যায়, যা বর্তমানে হাঙ্গেরির রাজধানী)। উসমানিরা ৯৪৭ হিজরিতে (১৫৪০ খ্রিষ্টাব্দে) বুদাপেস্ট আক্রমণ করার পর অস্ট্রীয় বাহিনী পলায়ন করে। তারপর থেকে হাঙ্গেরি উসমানিদের শাসনাধীনে চলে আসে। গানজাবুলির বিধবা স্ত্রী তার কিশোর ছেলে বড় হওয়া পর্যন্ত উসমানি শাসন বহালের পক্ষে সম্মতি জ্ঞাপন করে। নানা ঘটনাপ্রবাহের একপর্যায়ে উসমানিদের সাথে অস্ট্রিয়ার পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তি হয়। চুক্তি মোতাবেক অস্ট্রিয়া উসমানিদেরকে হাঙ্গেরি নিয়ন্ত্রণকালে কর প্রদান করবে মর্মে সম্মত হয়।
ট্রান্সসিলভানিয়া আক্রমণ
ইউরোপের খ্রিষ্টানরা একের পর এক চুক্তি ভঙ্গ করে চলেছে। গানজাবুলির বিধবা স্ত্রী ইসাবেলা ফার্ডিন্যান্সকে ক্ষমতা দিয়ে ট্রান্সসিলভানিয়ার সিংহাসন ছেড়ে দেয়। তার এ কার্যটি উসমানিদের সাথে অস্ট্রিয়ার যে দ্বি-পাক্ষিক চুক্তি ছিল তার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। যার কারণে ৯৫৭ হিজরিতে (১৫৫০ খ্রিষ্টাব্দে) উসমানিরা ট্রান্সসিলভানিয়া আক্রমণ করে।
ফ্রান্সের সাথে বিভিন্ন চুক্তি সম্পাদন
উসমানিরা ইউরোপীয় ক্রুসেডারদের একটি পক্ষের সমর্থন চেয়েছে। যেন কখনো তারা একজোট হতে না পারে। সে লক্ষ্যে ৯৪২ হিজরিতে ফ্রান্সের সাথে চুক্তি সই করে। এ চুক্তির ফলে ফ্রান্স বহুমুখী সুবিধা পেলেও উসমানিরা খিলাফতের পতন পর্যন্তই নানা প্রকারের অসুবিধার সম্মুখীন হয়। বিশেষ করে সুলাইমানের পরবর্তী খলিফাগণ ভিনদেশিদের এত বেশি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দিয়েছিল, যার ফলে সাম্রাজ্যের ভেতরে যেন গড়ে ওঠে বিদেশিদের এক ভিন্ন রাজত্ব। যেমন : ফরাসিরা উসমানি এলাকার ভেতরেও তাদের নিজস্ব আইনেই ফরাসি নাগরিকদেরকে শাসন করত, উসমানি আইনে নয়। মুসলিম অধিবাসীদের নাগরিক আইন তাদের ক্ষেত্রে কার্যকর হতো না। তাদের বিরুদ্ধে কর আদায়কারীদেরও অভিযোগ প্রদানের কোনো অধিকার ছিল না। একমাত্র সদরে আজমের (প্রধানমন্ত্রী) কাছেই অভিযোগ দেওয়া যেত; অন্যান্য লোকের ব্যাপারে সাধারণ আদালতে অভিযোগ করার নিয়ম চলমান থাকলেও ফরাসিদের বেলায় তা ছিল ব্যতিক্রম। কোনো ফরাসি নাগরিক উসমানি রাষ্ট্র হতে ঋণ গ্রহণের পর সে উসমানি রাষ্ট্র ছেড়ে নিজ দেশে বা অন্য কোথাও চলে গেলে তাকে ঋণের অর্থ পরিশোধের জন্য জবাবদিহি করতে হতো না। এরূপ ঘটনা ভুলের ভাঁজে পড়ে যেত। এ ছাড়া ফরাসিরা আরও অনেক সুবিধাভোগ করত। তাদের সুবিধা ভোগের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, তারা উসমানি সাম্রাজ্যে যা ইচ্ছে হতো তা-ই করতে পারত। তারা অবৈধ কাজ ও অশ্লীলতাকে বৈধ মনে করত। তাদেরকে কেউ কোনো কথা বলার সাহস পেত না। এমনকি উসমানিদের অঞ্চলে থাকা তাদের রাষ্ট্র পরিচালিত যে জেলখানাটি ছিল, সেখানে ফরাসি কয়েদিরা মদ, নারী ইত্যাদি ভোগ করার সুযোগ পেত। সেখানে তারা আনন্দঘন পরিবেশে সময় কাটাত।
অনুগত রাষ্ট্রসমূহ যতই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, ততই তারা সুযোগ-সুবিধা প্রদানের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে। তাদের এরূপ কর্মকাণ্ডের ফলে উসমানি সাম্রাজ্য বহিরাগত চাপের সাথে সাথে অভ্যন্তরীণ চাপেও কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল।
📄 সপিঞী রোকসালানা ও দোনমে ইহুদিগোষ্ঠী
তাতার মুসলিমগণ ক্রিমিয়ায় রুশবিরোধী কোনো এক অভিযানকালে অত্যন্ত সুন্দরী এক রুশ তরুণীকে আটক করে। তার নাম রোকসালানা। সৈন্যরা তাকে খলিফার দরবারে প্রেরণ করে। খলিফা তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। এক সূত্রমতে তরুণীটি ছিল রাশিয়ান ইহুদি। সে খলিফার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রের নানা কাজে হস্তক্ষেপ করা শুরু করে। স্পেন থেকে বিতাড়িত ইহুদিদেরকে উসমানি সমাজে ঠাঁই করে দিতে সে খলিফার নিকট আবেদন জানায়। এ সকল ইহুদিকে দোনমে ইহুদি বলা হয়ে থাকে। তাদেরকে স্পেন প্রত্যাখ্যান করার পর উসমানিরা কোলে তুলে নিয়েছিল। কিন্তু তারা উসমানি সাম্রাজ্যের প্রতি বিন্দুমাত্র কৃতজ্ঞতাবোধ দেখায়নি। পরবর্তী সময়ে উসমানি খিলাফতের পতনে তারাই প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।
এমনকি এ নারী খলিফাকে অনুরোধ করে, তিনি যেন তাতারদেরকে ক্রিমিয়ায় রুশদের সাথে লড়াই করা থেকে বিরত রাখেন। অথচ রুশরা তখন আগ্রাসন চালিয়ে তাতারদের অধিকাংশ এলাকা দখল করে নিয়েছিল এবং তারা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ঘৃণ্যতম অপরাধ সংঘটিত করেছিল।
রোকসালানা এতটুকুতে তুষ্ট ছিল না; বরং তার ঔরসজাত সন্তান সেলিমকে সুলাইমানের স্থলাভিষিক্ত করার প্রয়াস অব্যাহত রাখে। অথচ সেলিমের বড় ভাই মোস্তফা সিপাহি-জনতার ভালোবাসায় সিক্ত প্রধান সেনাপতি ছিলেন। তিনি ছিলেন খিলাফতের মসনদের যোগ্য উত্তরসূরি।
রুস্তম পাশা ছিলেন খলিফার সদরে আজম বা প্রধানমন্ত্রী। রোকসালানার সুপারিশে সে এ পদ অলংকৃত করে। খলিফা রোকসালানার গর্ভে জন্ম নেওয়া কন্যাকে তার নিকট বিবাহ দেন। রুস্তম নানা অভিযোগ তুলে খলিফাকে মোস্তফার বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলেন। রুস্তম খলিফার নিকট পত্র লেখেন যে, মোস্তফা খলিফাকে অপসারণ করে শাসনভার হাতে নিতে চায়। খলিফা উত্তেজিত হয়ে মোস্তফাকে দমাতে বের হন। তখন মোস্তফা শিয়া সাফাভিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। খলিফা তাকে তাঁবুতে ডেকে আনেন। মোস্তফা পিতার ডাকে সাড়া দিয়ে হাজির হওয়ামাত্র কতিপয় কর্মচারী তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে।
এ সর্পনারী মোস্তফাকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং তাঁর দুধের ছেলেকে হত্যা করার জন্য আততায়ী নিয়োগ করেছিল। ৯৭৪ হিজরিতে (১৫৬৭ খ্রিষ্টাব্দে) খলিফা মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর দ্বিতীয় সেলিম মসনদে আরোহণ করেন।
টিকা:
৫০. রোকসালানা। হুররেম সুলতানা নামেই সে অধিক কুখ্যাত। -সম্পাদক