📄 মুসলিমবিশ্বকে একীভূত করার প্রতি মনোনিবেশ
সেলিম অত্যন্ত ক্ষমতাধর ও সামরিক মননশীল খলিফা ছিলেন। তিনি সকল ইসলামি দেশকে একীভূত করার ইচ্ছা পোষণ করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, স্পেনে মুসলমানদের পরাজয়ের পর ক্রুসেডারগণ ইউরোপ ও অন্যান্য দেশকে নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে ক্রুসেডীয় জোট গঠন করেছে, তার বিপক্ষে মুসলিমদের একক শক্তি গড়ে তোলা।
পর্তুগিজরা ইসলামি সাম্রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলের কিছু জায়গা দখল করে নেয়। তারা মদিনায় পৌঁছার কৌশল খুঁজছিল। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহ মুবারক চুরি করা এবং বাইতুল মুকাদ্দাস নিয়ে মুসলমানদের সাথে দরকষাকষি করা। একই সময় শিয়া সাফাবিগণ পূর্বাঞ্চলে সুন্নি মুসলমানদের উপর জুলুম-নির্যাতন শুরু করে। তারা শিয়া মতবাদ গ্রহণ করতে জোরজবরদস্তি শুরু করে। এমনকি সুন্নি মুসলমান ও উসমানি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে তারা ইসলামের শত্রু পর্তুগিজদের সাথে জোট গঠন করে। যার কারণে প্রথম সেলিম মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ করতে আরও বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
📄 শিয়া সাফাভিদের রাষ্ট্রে অভিযান : চালদিরানের যুদ্ধ
খলিফা প্রথম সেলিম সময় নষ্ট না করে সাফাভিদের বিরুদ্ধে অভিযানের প্রস্তুতি নেন। তিনি পথিমধ্যে উসমানি সাম্রাজ্যের সীমান্ত অঞ্চলে বসবাসকারী শিয়াদের পক্ষ হতে বাধার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা করেন। তাই তিনি সীমান্তবর্তী শিয়াদের হত্যার আদেশ দেন। অতঃপর তিনি সাফাভিদের রাজধানী তাবরিজের(৪৪) উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। সাফাভি বাহিনী উসমানি সৈন্যদের আটকিয়ে ফেলার কৌশল গ্রহণ করে। যেমন, তারা মুখোমুখি হওয়ার পর পালাবে। তখন তাদের পিছু নিতে গিয়ে সৈন্যরা ক্লান্ত হয়ে পড়বে। আর তখনই তারা পেছন থেকে তাদের ওপর আক্রমণ করবে।
অতঃপর ৯২০ সনে (১৫১৪ খ্রিষ্টাব্দে) আনাতোলিয়ার পূর্বাঞ্চলে চালদিরানে উভয় বাহিনী সংঘর্ষে জড়ায় এবং উসমানিরা বিজয় লাভ করে। দশদিন পর খলিফা প্রথম সেলিম তাবরিজে প্রবেশ করে অর্থভান্ডারের কর্তৃত্ব বুঝে নেন। এদিকে শীতের মৌসুম শুরু হয়ে যায়। তার বাহিনী যুদ্ধ করার সাহস হারিয়ে ফেলে। শীত শেষ হওয়া পর্যন্ত খলিফা অপেক্ষা করতে থাকেন। শীতের শেষে তিনি পুনরায় সাফাভি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযানে বের হন এবং আজারবাইজানের কিছু দুর্গ দখলে নেন। দেশে প্রত্যাবর্তনের পর যে সকল অফিসার শীতে অভিযানে যেতে রাজি হয়নি, তাদেরকে ডেকে হত্যা করেন। যেন পরবর্তী সময়ে আর কোনো জওয়ান আদেশ অমান্য করার সাহস না করে。
টিকা:
৪৪. তাবরিজ: ইরানের অন্তর্গত একটি শহর। সাফাভিদের সাম্রাজ্য প্রধানত ইরান এবং ইরাক অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত ছিল। -সম্পাদক
📄 মামলুকদের বিরুদ্ধে অভিযান
সাফাভিদের বিরুদ্ধে অভিযান শেষ করে খলিফা দুর্বল মামলুক শাসকদের বিরুদ্ধে অভিযানের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। মামলুক সাম্রাজ্য ও উসমানি সাম্রাজ্যের বিভক্তকারী সীমানায় জুলকাদেরের রাজ্য অবস্থিত। এ রাজ্যকে ঘিরে দুদেশের মাঝে চরম উত্তেজনা বিরাজমান থাকত।
📄 মারজাদাবেক যুদ্ধ (৯২২ হি./১৫১৬ খ্রি.)
খলিফা প্রথম সেলিম মামলুকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সিরিয়ার শাসকদেরকে তার পক্ষে নিতে সক্ষম হন। তিনি তাদেরকে এ মর্মে প্রতিশ্রুতি দেন যে, মামলুকদের বিপক্ষে বিজয় লাভ করতে পারলে তিনি শাসকদেরকে স্ব স্ব পদে বহাল রাখবেন। উসমানিদের প্রতিহত করতে প্রস্তুত মামলুক বাহিনীর বিরূদ্ধে যুদ্ধ করতে খলিফা বেরিয়ে পড়েন এবং ৯২২ হিজরিতে মারজদাবেক নামক স্থানে যুদ্ধ শুরু করেন। যুদ্ধ তীব্র রূপ ধারণের একপর্যায়ে গভর্নরগণ মামলুক খলিফার পক্ষ ত্যাগ করে সৈন্যদেরকে নিয়ে উসমানি বাহিনীর সাথে যোগ দেন। ফলে মামলুকগণ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পরাজয় বরণ করে। মামলুক সুলতান কানসুহ ঘুরি যুদ্ধে নিহত হয়। অতঃপর মামলুকদের শাসনাধীন সিরিয়া প্রথম সেলিমের কর্তৃত্বে চলে আসে। সিরিয়া ছিল পুরো মামলুক রাষ্ট্রের অর্ধেক পরিমাণ। মামলুকদের পরাজয়ের ফলে সম্পূর্ণ আনাতোলিয়া উসমানি খিলাফতের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।