📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ 📄 সুলতান ফাতিহের ইউরোপ অভিযান

📄 সুলতান ফাতিহের ইউরোপ অভিযান


ইস্তাম্বুল বিজয়ের পর, নগরের যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রাচীরগুলো দ্রুত মেরামত করা হয়। তারপরই সুলতান ঝাঁপিয়ে পড়েন তার বিজয় অভিযান সম্পূর্ণ করতে।

সার্বিয়ার চূড়ান্ত বিজয়

আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি, সবসময় সুলতানগণ সার্বিয়াকে পরাজিত করেও তা পুরোপুরি দখল না করে জিজিয়ার বিনিময়ে শাসকদের বহাল রাখতেন। কিন্তু তারা এর মর্যাদা রক্ষা করতে পারেনি। যখনই সুযোগ পেয়েছে তখনই উসমানিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। জিজিয়া দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। উসমানিরা আবার নতুন করে সেখানে অভিযান চালিয়েছে। এসব কারণে সুলতান ফাতিহ চাইলেন সার্বিয়াকে স্থায়ীভাবে উসমানি প্রদেশে পরিণত করতে। এই লক্ষ্যে অভিযান চালিয়ে ৮৫৮ হিজরিতে (১৪৫৪ খিষ্টাব্দে) তিনি সার্বিয়া দখল করে নিলেন। কিন্তু রাজধানী বেলগ্রেড জয় করা গেল না। কারণ, হাঙ্গেরির রাজা সে সময় যুদ্ধে যোগ দিয়ে বেলগ্রেড প্রতিরক্ষাকে মজবুত করে তোলে। যাইহোক, এই অভিযানে রাজধানী ছাড়া সমগ্র সার্বিয়া স্থায়ীভাবে উসমানি প্রদেশে পরিণত হয়। উসমানিরা হাস্সেরি রাজাকে আহত করতে সক্ষম হয়। এই আঘাতেই কিছুদিন পর তাঁর মৃত্যু ঘটে।

মুরা বিজয় (দক্ষিণ গ্রিস)

সুলতান ফাতিহ ৮৬৩ হিজরিতে (১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দে) মুরা জয় করেন। সেই সাথে গ্রিস উপকূলের বিখ্যাত এজিয়ান সাগরের অধিকাংশ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন।

ওয়াল্যাচিয়া বিজয় (বর্তমান রোমানিয়ার একাংশ)

কয়েকজন উসমানি বণিক ওয়াল্যাচিয়ায় বাণিজ্য করতে গিয়ে সেখানকার শাসকের নির্যাতনের শিকার হয়। সুলতান ফাতিহের কাছে সে সংবাদ পৌঁছলে তিনি ওয়াল্যাচিয়া অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। সুলতানের প্রস্তুতির খবর পেয়ে ওয়াল্যাচিয়ার রাজা বার্ষিক দশ হাজার দিরহাম জিজিয়ার বিনিময়ে সন্ধির প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু তার সব আচরণে বোঝা যাচ্ছিল, মূলত উসমানিদের সাথে লড়াইয়ের জন্য হাস্সেরির সাথে যোগাযোগ করতে সময় ক্ষেপণ করাই ছিল জিজিয়া প্রস্তাব দেওয়ার উদ্দেশ্য। সুলতান বিষয়টি নিশ্চিত হতে দুজন দূত প্রেরণ করেন। ওয়াল্যাচিয়ার রাজা সে দূতদের হত্যা করে ফেলে। শুধু এটুকুই না, উসমানিদের অধীনে থাকা বুলগেরিয়া রাজ্যে আক্রমণ করে। বুলগেরিয়ায় তারা লুটতরাজ ও গণহত্যা চালায়। ২৫ হাজার বন্দি সাথে নিয়ে নিজ দেশে ফিরে যায়। বন্দিদের কথা চিন্তা করে সুলতান একদল প্রতিনিধি প্রেরণ করেন। বন্দি ফিরিয়ে দিয়ে উসমানিদের অধীনতা মেনে নিতে আহ্বান জানান। রাজা এবারও চরম ধৃষ্টতা দেখায়। প্রতিনিধি দলকে নির্দেশ দেয় রাজার সম্মানে মাথার পাগড়ি খুলতে। কিন্তু তারা তাতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রাজা লোহার পিন দিয়ে পাগড়ি তাদের মাথার সাথে স্থায়ীভাবে লাগিয়ে দিতে নির্দেশ দেয়।

সবকিছু শুনে সুলতান দেড় লাখ সৈনিকের বহর নিয়ে ওয়াল্যাচিয়া অভিমুখে যাত্রা করেন। রাজা তখন ভীষণ পর্যন্ত হয়ে হাস্সেরিতে পালিয়ে যায়। যাওয়ার সময় ২৫ হাজার বন্দিকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ কেটে হত্যা করে। রাজধানী বুখারেস্টের চারপাশ মৃতদেহে পূর্ণ হয়ে যায়। এই অভিযানের মধ্যে দিয়ে রোমানিয়া উসমানি প্রদেশে পরিণত হয়।

বসনিয়া বিজয় এবং দলে দলে বসনিয়ান নাগরিকের ইসলাম গ্রহণ

বসনিয়ার শাসক উসমানিদের প্রস্তাব অনুযায়ী জিজিয়া দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তাই সুলতান অভিযান চালিয়ে ৮৬৬ হিজরিতে (১৪৬২ খ্রিষ্টাব্দে) বসনিয়া দখল করে নেন। হাঙ্গেরির রাজা মেট্রিয়াস বসনিয়াকে উসমানিদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য একবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। বসনিয়া বিজিত হয়ে উসমানি সাম্রাজ্যভুক্ত হওয়ার সাথে সাথেই তারা দলে দলে মুসলমান হতে শুরু করে। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরাও ইসলাম গ্রহণ করে। ত্রিশ হাজার বসনিয়ান যুবক উসমানি সেনাবাহিনীতে যোগদান করে।

ইস্কান্দার বেগের পুনরায় বিদ্রোহের চেষ্টা

ইউরোপজুড়ে উসমানিদের বিজয়াভিযানের পর, বিশেষত কনস্টান্টিনোপল পতনের পর খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় গুরু পোপ ক্রুসেডের ডাক দেয়। কিন্তু বাস্তবায়নের আগেই পোপের মৃত্যু হয়ে যায়। ফলে ক্রুসেডও স্তিমিত হয়ে যায়। এদিকে পোপের উৎসাহে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয় আলবেনিয়ার রাজা ইসকানদার (মুরাদের হাত থেকে পালিয়ে আসা রাজপুত্র)। ক্রুসেড থেমে গেলেও তার আগ্রহে ভাটা পড়ল না। সে আর ক্রুসেডের অপেক্ষা না করে একাই উসমানিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল। বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হয়। দুই পক্ষই সমানে সমান যুদ্ধ করে। ৮৭১ হিজরিতে (১৪৬৭ খ্রিষ্টাব্দে) ইসকানদার মারা যায়। তার মৃত্যুর পর আলবেনিয়া সুলতান ফাতিহের অধীনে চলে আসে।

ক্রিমিয়া অঞ্চলে আধিপত্য ও মোলদাভিয়া অভিযানে ব্যর্থতা

সুলতান ফাতিহ ৮৭৮ হিজরিতে (১৪৭৩ খ্রিষ্টাব্দে) মোলদাভিয়ার শাসক চতুর্থ স্টিফেনকে বশ্যতা স্বীকার করে জিজিয়া দিতে আহ্বান জানান। সে তা অস্বীকার করলে উসমানি বাহিনী আক্রমণ করে তার ওপর জয়লাভ করে। কিন্তু সমস্ত অঞ্চল উসমানিরা জয় করতে সক্ষম হয়নি। এ সময় সুলতান ক্রিমিয়া উপদ্বীপে অভিযান চালিয়ে তথাকার ঘোড়সওয়ার দিয়ে মোলদাভিয়া জয়ের চিন্তা করেন। ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখলকারী জেনোভার সৈনিকদের তাড়িয়ে দেয় উসমানি বাহিনী। ক্রিমিয়া উপদ্বীপের মুসলিম তাতারদের সাথে বাৎসরিক খারাজ প্রদানের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

ক্রিমিয়া উপদ্বীপ থেকে উসমানি নৌবাহিনী দানিয়ুব নদীর মোহনায় যাত্রা করে মোলদাভিয়া পৌঁছে। সেখানকার সৈন্যরা রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে বনের মধ্যে প্রবেশ করে। উদ্দেশ্য ছিল সুলতানের বাহিনী পিছু নিয়ে বনে প্রবেশ করলে সেখানে তাদের সুবিধামতো হত্যা করা। এই কৌশলে তারা সফল হয়েছিল। ৮৮১ হিজরির (১৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে) এই যুদ্ধে সুলতানের বাহিনী পর্যুদস্ত হয়। এই সাহসিকতার জন্য স্টিফেনের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপজুড়ে। পোপ তাকে খ্রিষ্টজগতের সাহসী পুরুষ ও খ্রিষ্টধর্মের পৃষ্ঠপোষক উপাধি দেয়।

ভেনিসের লড়াই

সুলতান ফাতিহ ৮৮২ হিজরিতে (১৪৭৭ খ্রিষ্টাব্দে) ভেনিসে অভিযান চালান। এই অভিযানে তিনি জয় করেন ক্রোয়েশিয়া ও তৎকালীন ডালমেসিয়া নামের রাজ্য (মন্টেনিগ্রো, আলবেনিয়ার কিছু ও ক্রোয়েশিয়ার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত)। এরপর স্কোদার শহরটিও জয় করে নেন। এতে ৮৮৭ হিজরিতে (১৪৮২ খ্রিষ্টাব্দে) ভেনিস সুলতানের সাথে সন্ধি করতে বাধ্য হয়।

ট্রান্সসিলভানিয়া (প্রাচীন পশ্চিম রোমানিয়া) রাজ্যের পরাজয়

উসমানি বাহিনী হাঙ্গেরির অধীনস্থ ট্রান্সসিলভানিয়ার দিকে অভিযান চালায়। সে অভিযানে উসমানি বাহিনী ভীষণভাবে পর্যুদস্ত হয়। অনেক সৈন্য নিহত হয়। হাঙ্গেরির রাজা উসমানি সৈনিকদের সাথে পাশবিক আচরণ করে। সমস্ত বন্দিকে হত্যা করা হয় এবং মুসলিম সৈনিকদের লাশের ওপর নিজ বাহিনীর খাবারের পাত্র পরিবেশন করে।

ইতালি জয়ের প্রচেষ্টা

সুলতান সবসময়ই ইতালি জয় করে রোম ও ভ্যাটিকানে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করার চিন্তা করতেন। কনস্টান্টিনোপল জয়ের কারণে এই চিন্তা তার মধ্যে অনেক বেশি কাজ করত। কারণ, হাদিসে কনস্টান্টিনোপল জয়ের পর রোম বিজয়ের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। তাই তিনি কসম করে বলতেন রোমের পিটার্স গির্জা তথা ভ্যাটিকানে অচিরেই তিনি দুর্গ স্থাপন করবেন।

ইতালি অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে তিনি দ্বীপরাষ্ট্র রোডস অভিযানের পরিকল্পনা করেন। রোডস ছিল সেন্ট ইউহান্নার শাসিত এলাকা। উসমানি নৌবাহিনী রোডস জয় করতে ব্যর্থ হয়ে ৮৮৫ হিজরিতে (১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দে) তাদের সঙ্গে সন্ধি করে নেয়। রোডস ত্যাগ করে সুলতান ফাতিহ ইতালির দিকে রোখ করেন। ইতালির উপকূলীয় অঞ্চলে নেমে ৮৮৫ হিজরিতেই (১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দে) অটারেন্ট শহর দখল করে নেন।

পরের বছর চূড়ান্ত বিজয়ের লক্ষ্যে একটি বৃহৎ আক্রমণ চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন। কিন্তু এ বছরই তার ইনতেকাল হয়ে যায়। তার ইনতেকালের পর উসমানি বাহিনী ইতালি অভিযানের ইচ্ছা ত্যাগ করে। পরবর্তী সুলতান অর্থাৎ দ্বিতীয় বায়েজিদ অত্যন্ত শান্তিপ্রিয় হিসেবে পরিচিত। তিনি অটারেন্ট থেকেও সব সৈন্য প্রত্যাহার করে নেন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ 📄 আনাতোলিয়াতে সুলতান ফাতিহের কার্যক্রম

📄 আনাতোলিয়াতে সুলতান ফাতিহের কার্যক্রম


সুলতান ফাতিহের সব বিজয় ছিল ইউরোপে। এশিয়ার মুসলিম শাসিত অঞ্চলগুলোর দিকে তিনি তেমন নজর দেননি। এখানে তার উল্লেখযোগ্য অভিযান ছিল হাতেগোনা। তিনি আনাতোলিয়ার সর্বশেষ খ্রিষ্টান রাজ্য ট্রাবজোন জয় করে নেন। এই রাজ্য জয়ের মাধ্যমে সমগ্র আনাতোলিয়া ক্রুসেডারদের থেকে মুক্তিলাভ করে। কিরমান রাজ্যকেও চূড়ান্তভাবে উসমানি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেন সুলতান ফাতিহ।
৮৭৪ হিজরিতে (১৪৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) তৈমুর লংয়ের উত্তরসূরিদের একটি বাহিনী পূর্ব আনাতোলিয়ায় আওজুন রাজ্য আক্রমণ করে। সুলতান তার বাহিনী প্রেরণ করে তাদের দমন করেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية