📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 কনস্টান্টিনোপল জয়

📄 কনস্টান্টিনোপল জয়


উসমানিদের আগেও বহুবার মুসলিম বাহিনী কনস্টান্টিনোপল জয়ের চেষ্টা করেছিল। এ ক্ষেত্রে তাদের উৎসাহিত করেছে প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস: আবু কাবিল রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস রা.-এর নিকট বসা ছিলাম। তাকে প্রশ্ন করা হলো, কনস্টান্টিনোপল নাকি রোম, কোন নগর আগে জয় হবে? তখন তিনি পুরাতন একটি বাক্স আনতে বললেন। তারপর সেখান থেকে একটি কিতাব বের করে বললেন, আমরা একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট কিছু লেখার জন্য বসা ছিলাম। তখন তাকে এই প্রশ্নই জিজ্ঞেস করা হলো। তিনি উত্তর দিলেন, হিরাকলার শহর (কনস্টান্টিনোপল) প্রথমে জয় হবে। (৪২)

কনস্টান্টিনোপল অভিযানের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

• কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের উদ্দেশ্যে মুসলিম বাহিনীর অভিযানের সূচনা হয় সেই উসমান রা.-এর সময়ে। মুআবিয়া রা. তখন শামের গভর্নর। তারই নেতৃত্বে ৩২ হিজরি মোতাবেক ৬৫৩ খ্রিষ্টাব্দে একটি স্থলবাহিনী কনস্টান্টিনোপল রওনা করে। স্থলপথে এশিয়া মাইনর অতিক্রম করে তারা বসফরাস উপকূলে পৌঁছে যান। এদিকে তাদের সহায়তায় একটি নৌবাহিনী বুসর বিন আবি আরতাতের নেতৃত্বে রওনা দেয়। পশ্চিম ত্রিপোলি থেকে এই বাহিনী কনস্টান্টিনোপলের পথ ধরে। কিন্তু এই যাত্রায় মুসলিম বাহিনীকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়।

• মুআবিয়া রা.-এর শাসনকালে ৪৪ হিজরি মোতাবেক ৬৬৪ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয়বার কনস্টান্টিনোপল অভিযান চালানো হয়। কিন্তু আবারও তা ব্যর্থ হয়।

• ৪৯ হিজরিতে ৬৬৯ খ্রিষ্টাব্দে আবারও সৈন্য প্রেরণ করেন মুআবিয়া রা.। এবার এক বিশাল বাহিনী পাঠানো হয়। বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন সুফিয়ান বিন আওফ। সহ-অধিনায়ক ইয়াজিদ বিন মুআবিয়া। এই বাহিনীর সদস্য ছিলেন আবু আইয়ুব আনসারি রা., ইবনে উমর রা., ইবনে আব্বাস রা., ইবনে জুবাইর রা.-এর মতো মহান সাহাবিগণ। এবারও বুসর বিন আবি আরতাতের নেতৃত্বে একটি নৌবাহিনী সাথে ছিল। নৌবহর বিনা বাধায় দার্দানেলিস প্রণালি অতিক্রম করে ফেলে। জলে-স্থলে দীর্ঘ ৭ বছর অনিয়মিতভাবে নগরী অবরোধ করে রাখা হয়। শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে তাদের ফিরে আসতে হয়। ৫৮ হিজরি মোতাবেক ৬৭৮ খ্রিষ্টাব্দে তারা ফিরে আসেন।

৯৬ হিজরি মোতাবেক ৭১৫ খ্রিষ্টাব্দে খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন সুলাইমান বিন আবদুল মালিক। তিনি দায়িত্ব নিয়ে তার ভাই মাসলামা বিন আবদুল মালিককে কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করতে পাঠান। নির্দেশ দেন, শহর জয় কিংবা মৃত্যু আসা পর্যন্ত অবরোধ অব্যাহত থাকবে। মাসলামা ৯৮ হিজরি মোতাবেক ৭১৬ খ্রিষ্টাব্দে আনাতোলিয়ার মালভূমি পাড়ি দিয়ে কনস্টান্টিনোপল পৌঁছেন। পথিমধ্যে জয় করেন অনেক শহর-নগর। তারপর কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করলেন ৯৯ হিজরির ২ মুহাররম (১৫ আগস্ট ৭১৭ খ্রিষ্টাব্দ) তারিখে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ না যেতেই ১০ সফর ৯৯ হিজরিতে খলিফা সুলাইমান ইনতেকাল করেন। তার ওপর তখন শুরু হয়ে যায় শীতকাল। ইউরোপের শীতের তীব্রতায় আরবরা অভ্যস্ত ছিল না। ফলে মুসলিমরা অবরোধ তুলে নিয়ে শামের সীমান্তের দিকে ফিরে আসে।

তারপর বেশ কয়েকবার মুসলিম বাহিনী নগরীর কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন খিলাফতের পক্ষ থেকে কনস্টান্টিনোপল জয়ের জোর কোনো প্রচেষ্টা চালানো হয়নি।

প্রথম যুগের অভিযানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছিল আব্বাসীয় খলিফা মাহদির শাসনকালে। সেবার খলিফাপুত্র হারুনুর রশিদের নেতৃত্বে ১৬৫ হিজরি মোতাবেক ৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দের গ্রীষ্মে মুসলিম বাহিনী কনস্টান্টিনোপল যাত্রা করে। আনাতোলিয়ার মালভূমি অতিক্রম করে বাহিনী পৌঁছে যায় বসফরাসের এশীয় তীরে। কনস্টান্টিনোপলের ঠিক উল্টো পাশে বসফরাসের অপর প্রান্তে আসকোডার টিলাঞ্চলে তারা তাঁবু ফেলেন। সে সময় বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসা নাবালক শিশু ষষ্ঠ কনস্টান্টাইন। মূলত সাম্রাজ্য সামলাচ্ছিল তার মা আইরিন। হারুনুর রশিদের বাহিনী বীর বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাইজান্টাইনদের ওপর। যুদ্ধে বাইজান্টাইন সেনারা ভীষণ পর্যুদস্ত হলো। যুদ্ধ হয় বসফরাসের এশীয় তীরে। বিপদ বুঝে সন্ধি করতে এবং বাৎসরিক জিজিয়া প্রদান করতে বাধ্য হয়।

• উসমানি সুলতানদের মধ্যে প্রথম ৭৯৮ হিজরি মোতাবেক ১৩৯৫ খ্রিষ্টাব্দে কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেন সুলতান বায়েজিদ প্রথম। কিন্তু সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্তে তৈমুর লংয়ের আক্রমণ শুরু হলে তিনি অবরোধ উঠিয়ে সেদিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য হন।

মূলত প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই কনস্টান্টিনোপল বিজয় করাটাকে উসমানি সুলতানগণ টার্গেট করেছিলেন। কেমন যেন এটাই ছিল তাদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য। প্রথম উসমানি সুলতান গাজি উসমান তার বংশধরদের কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের অসিয়ত করে যান। এই অসিয়ত প্রজন্ম পরম্পরায় সুলতানদের মাঝে চলতে থাকে। অবশেষে সুলতান মুহাম্মাদ দ্বিতীয়কে আল্লাহ তাআলা এই মহাসৌভাগ্য দান করেন। তিনিই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী করে যাওয়া সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি। তিনিই ইসলামের ইতিহাসের একমাত্র সুলতান, যার উপাধি আল-ফাতিহ বা বিজেতা।

এই সবকিছু সামনে রেখেই সুলতান ফাতিহ কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। প্রথমেই তিনি একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন। কনস্টান্টিনোপলের নৌ-চলাচলের পথ হলো মারমারা উপসাগর ও কৃষ্ণ সাগরের মধ্যে সংযোগ সৃষ্টিকারী বসফরাস প্রণালি। এই প্রণালি দিয়েই বাইজানটাইনের জাহাজগুলো আসা যাওয়া করে। আবার এই প্রণালি দিয়েই প্রয়োজনীয় সাহায্য আসে ইউরোপ থেকে। তাই যুদ্ধ শুরু করার প্রথম ধাপ হিসেবে বসফরাসের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করাটা ছিল সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। আগের সুলতানদের মধ্যে সুলতান বায়েজিদ এই বিষয় টা গুরুত্ব দিয়ে অনুধাবন করেছিলেন। তাই তিনি বসফরাসের এশীয় তীরে একটি দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন, যেন দুর্গ থেকে প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এটা একটা শূন্যতা পূরণ করে, কিন্তু সম্পূর্ণ পথ রুদ্ধ করতে পারেনি। কারণ, জাহাজগুলো ইউরোপের তীরঘেঁষে চলাফেরা করতে পারত। তাই দুর্গ থেকে পুরো নৌপথের কর্তৃত্ব নেওয়া যায়নি।

সুলতান ফাতিহ ভালো করে বুঝতে পেরেছিলেন, ইউরোপের তীরে আরেকটি দুর্গ নির্মাণ করা ছাড়া এই পথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ সম্ভব না। তাই তিনি প্রথমেই খুব অল্প সময়ে আগের দুর্গের ঠিক উল্টো দিকে আরেকটি দুর্গ তৈরি করেন। এর নাম রোমেলির দুর্গ।

দুর্গ নির্মাণসহ সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহের অন্যান্য তৎপরতা দেখে কনস্টান্টিনোপলের সম্রাট বুঝতে পারে এই সুলতান কনস্টান্টিনোপল বিজয় করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাই সম্রাট নিজ থেকেই জিজিয়া দিয়ে সুলতানের বশ্যতা স্বীকার করে নেবে বলে প্রস্তাব পেশ করে। কিন্তু দৃঢ়প্রত্যয়ী সুলতান সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। সুলতানের এই মহাসমর সম্পর্কে আলোচনা শুরুর আগে কনস্টান্টিনোপলের সেই দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা প্রয়োজন বলে মনে করি। তাহলে হয়তো বুঝতে সহজ হবে, কেন কনস্টান্টিনোপল এত বছর এত অবরোধ উপেক্ষা করে টিকে ছিল। কী কারণে এই দুর্গ এত আক্রমণের মুখেও এমন দুর্জয়-দুর্লঙ্ঘ্য।

দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

প্রথমত, শহরটি ছিল তিন দিক থেকেই পানিবেষ্টিত। একদিকে মারমারা উপসাগর, একদিকে বসফরাস প্রণালি, আরেক দিকে গোল্ডেন হর্ন (৪৩) বা স্বর্ণ শিং খাড়ি। গোল্ডেন হর্নের প্রবেশমুখ আটকানো ছিল বিশাল ও ভারী এক শেকল দিয়ে। নিজেদের জাহাজ প্রবেশের সময় শেকল পানিতে অনেক নামিয়ে দেওয়া হতো। আর প্রতিপক্ষের জাহাজ দেখলেই শেকল ওপরে টেনে এনে জাহাজের পথ রুদ্ধ করা হতো।

দ্বিতীয়ত, সুউচ্চ দুর্গপ্রাচীর জল-স্থলের চারদিক থেকেই শহরটি ঘিরে রেখেছিল। স্থলভাগের প্রাচীর ছিল অনেক বিশাল ও অনেক বেশি দুর্ভেদ্য।

তৃতীয়ত, গোল্ডেন হর্নের প্রবেশমুখ শেকলের পাশাপাশি সামরিক দুর্গ দিয়েও সুরক্ষিত ছিল।

যুদ্ধের বিবরণ

বাইজান্টাইন সম্রাটের জিজিয়ার প্রস্তাব সুলতান প্রত্যাখ্যান করেন। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে সম্রাট ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক সাহায্য চেয়ে পাঠায়। তাতে সাড়া দিয়ে তৎকালীন জেনোয়া নামের এক রাজ্য থেকে ত্রিশটি জাহাজের একটি নৌবহর কনস্টান্টিনোপল এসে পৌঁছে। জাহাজগুলো যখন আসে ততদিনে উসমানি বাহিনী কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেছে চারদিক থেকে। তাই প্রথমেই জাহাজগুলো উসমানি নৌবহরের মুখোমুখি হয়। কিন্তু সুকৌশলে তাদের অতিক্রম করে যুদ্ধজাহাজগুলো গোল্ডেন হর্নে প্রবেশ করে। পিছু নিয়ে উসমানি জাহাজ গোল্ডেন হর্নে ঢোকার উপক্রম হতেই শেকল টেনে পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

উসমানি বাহিনীর পদাতিক সৈন্যের সংখ্যা ছিল প্রায় আড়াই লাখ। আর নৌবহরে ছিল প্রায় ১৮০টি যুদ্ধজাহাজ।

যুদ্ধের আগে সুলতান তার সেনাপতিদের জমায়েত করে বললেন—
‘মহান আল্লাহর অনুগ্রহে যদি আমাদের হাতে এই শহরের বিজয় হয়, তাহলে জেনে রেখো আমাদের দিয়েই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হবে। এটি হবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন্ত মুজিজা। আর আমরা হব সেই সৌভাগ্যবান কাফেলা, যাদের ব্যাপারে হাদিসে সুসংবাদ এসেছে। সুতরাং আমাদের সন্তানতুল্য সৈনিকদের প্রত্যেককে জানিয়ে দাও, যে মহৎ কাজে আমরা নেমেছি যদি তা অর্জিত হয় তাহলে সেটা হবে দ্বীনের জন্য পরম মর্যাদার এক ব্যাপার। আমাদের প্রত্যেক সৈনিকের জন্য জরুরি তারা যেন দ্বীনের শিক্ষাকে তাদের সামনে রাখে। কেউ যেন দ্বীনের শিক্ষার পরিপন্থী কোনো কাজ না করে। আর অবশ্যই বিধর্মীদের ইবাদতখানার নিরাপত্তা দেয়। সেগুলোতে আক্রমণ না করে। পাদরি পুরোহিত, নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্য হতে যারা যুদ্ধে অংশ নেয়নি, তাদের গায়ে যেন হাত না দেয়।'

যুদ্ধজয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল একসাথে চারদিক থেকে দুর্গের দেয়ালে গোলা নিক্ষেপ করা। কিন্তু গোল্ডেন হর্নের দিকটাতে পানিপথ রুদ্ধ থাকায় এই দিকটা ছিল সুরক্ষিত। অথচ এদিকের দেয়াল ছিল তুলনামূলক দুর্বল। তাই সুলতান ফাতিহ বুঝতে পারলেন যেকোনো মূল্যে গোল্ডেন হর্নে জাহাজ প্রবেশ করাতেই হবে। তখন তিনি এক বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত নিলেন, যা ছিল কল্পনাতীত। পৃথিবীর যুদ্ধ-ইতিহাসে এমন কৌশল ও দুর্জেয় মানসিকতার দ্বিতীয় উদাহরণ নেই। তিনি বনের গাছ কেটে অসংখ্য কাঠের ফলক তৈরি করলেন। তারপর বনের ভেতর দিয়েই মাটিতে কাঠের ফলক বিছিয়ে মারমারা ও বসফরাসের কোনা থেকে গোল্ডেন হর্ন পর্যন্ত রাস্তা তৈরি করলেন। কাঠের রাস্তাকে তেল ও চর্বি মেখে পিচ্ছিল করা হলো। তারপর অনেকগুলো জাহাজ মারমারা থেকে এই পিচ্ছিল পথে উঠিয়ে টেনে নিয়ে গোল্ডেন হর্নে নামিয়ে দিলেন। এভাবে দুর্বল প্রাচীরের কাছে পৌঁছে যায় উসমানি বাহিনী。

তারপর খুব অল্প সময়ের মধ্যে দুর্গের দেয়াল ভেঙে পড়ল। ৮৫৭ হিজরি ১৫ জুমাদাল উলা মোতাবেক ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দের এক ভোরে উসমানি বাহিনী বিজয়ীর বেশে কনস্টান্টিনোপলে প্রবেশ করে। যুদ্ধে বাইজান্টাইন সম্রাট নিহত হয়। শহরের ওপর উসমানিদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়।

কনস্টান্টিনোপলেই ছিল প্রাচ্যের খ্রিষ্টানদের প্রধান গির্জা আয়া সোফিয়া। যা আবার অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের প্রধান কেন্দ্র, যেমন ক্যাথলিকদের জন্য রোমের ভ্যাটিকান। সুলতানের নির্দেশে আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তর করা হয়। হাজার বছরের খ্রিষ্টীয় গির্জা থেকে সেদিন আল্লাহু আকবারের সুর ধ্বনিত হতে থাকে। কনস্টান্টিনোপলের নাম বদলে রাখা হয় 'ইসলাম বুল' (ইস্তাম্বুল) বা ইসলামের শহর। তখন থেকেই চূড়ান্ত পতনের দিন পর্যন্ত ইস্তাম্বুলই ছিল উসমানি সাম্রাজ্যের রাজধানী। সুলতান ফাতিহের এই মহাবিজয়ের মাধ্যমে সুপ্রাচীন বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সর্বশেষ চিহ্নটুকুও মুছে যায়। শেষ হয় ইসলামের প্রাচীনতম দুশমন বাইজান্টাইনদের সাথে ৮০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকা সংঘর্ষ। (বাইজান্টাইন হলো পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য, এটিই কুরআনে বর্ণিত রোম, সেই হিরাকলার রোম, 'রোম-পারস্য' কিংবদন্তির রোম)।

নগরের সকল খ্রিষ্টানদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলো। শহরের অর্ধেক গির্জা কিনে মসজিদ বানানো হলো আর বাকি অর্ধেক খ্রিষ্টানদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হলো। (অথচ যুদ্ধের মাধ্যমে বিজিত অঞ্চলে বিজেতা শক্তি যেকোনো দালানের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, কেনার প্রয়োজন হয় না।)

অবরোধ চলাকালেই নগরপ্রাচীরের বাইরে মহান সাহাবি আবু আইয়ুব আনসারি রা.-এর কবর উদ্ধার হয়। এই মহান সাহাবি ইয়াজিদ বিন মুআবিয়ার আমলে শহরটি অবরোধ করতে এসে এখানেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। অসিয়ত অনুযায়ী তাকে প্রাচীরের কাছে কবর দেওয়া হয়েছিল। নগর বিজয়ের পর এখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। পরবর্তী সুলতানদের এই মসজিদেই অভিষেক কার্যক্রম সম্পন্ন হতো। এখানে সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা গাজি উসমান আর্তুগ্রুলের তরবারি গ্রহণ করার মাধ্যমে নতুন সুলতান দায়িত্ব বুঝে নিতেন।

টিকা:
৪২. মুসনাদে আহমাদ: ৬৬৪৫
৪৩. গোল্ডেন হর্নের বর্তমান নাম কাসিমপাশা। -সম্পাদক

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সুলতান ফাতিহের ইউরোপ অভিযান

📄 সুলতান ফাতিহের ইউরোপ অভিযান


ইস্তাম্বুল বিজয়ের পর, নগরের যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রাচীরগুলো দ্রুত মেরামত করা হয়। তারপরই সুলতান ঝাঁপিয়ে পড়েন তার বিজয় অভিযান সম্পূর্ণ করতে।

সার্বিয়ার চূড়ান্ত বিজয়

আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি, সবসময় সুলতানগণ সার্বিয়াকে পরাজিত করেও তা পুরোপুরি দখল না করে জিজিয়ার বিনিময়ে শাসকদের বহাল রাখতেন। কিন্তু তারা এর মর্যাদা রক্ষা করতে পারেনি। যখনই সুযোগ পেয়েছে তখনই উসমানিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। জিজিয়া দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। উসমানিরা আবার নতুন করে সেখানে অভিযান চালিয়েছে। এসব কারণে সুলতান ফাতিহ চাইলেন সার্বিয়াকে স্থায়ীভাবে উসমানি প্রদেশে পরিণত করতে। এই লক্ষ্যে অভিযান চালিয়ে ৮৫৮ হিজরিতে (১৪৫৪ খিষ্টাব্দে) তিনি সার্বিয়া দখল করে নিলেন। কিন্তু রাজধানী বেলগ্রেড জয় করা গেল না। কারণ, হাঙ্গেরির রাজা সে সময় যুদ্ধে যোগ দিয়ে বেলগ্রেড প্রতিরক্ষাকে মজবুত করে তোলে। যাইহোক, এই অভিযানে রাজধানী ছাড়া সমগ্র সার্বিয়া স্থায়ীভাবে উসমানি প্রদেশে পরিণত হয়। উসমানিরা হাস্সেরি রাজাকে আহত করতে সক্ষম হয়। এই আঘাতেই কিছুদিন পর তাঁর মৃত্যু ঘটে।

মুরা বিজয় (দক্ষিণ গ্রিস)

সুলতান ফাতিহ ৮৬৩ হিজরিতে (১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দে) মুরা জয় করেন। সেই সাথে গ্রিস উপকূলের বিখ্যাত এজিয়ান সাগরের অধিকাংশ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন।

ওয়াল্যাচিয়া বিজয় (বর্তমান রোমানিয়ার একাংশ)

কয়েকজন উসমানি বণিক ওয়াল্যাচিয়ায় বাণিজ্য করতে গিয়ে সেখানকার শাসকের নির্যাতনের শিকার হয়। সুলতান ফাতিহের কাছে সে সংবাদ পৌঁছলে তিনি ওয়াল্যাচিয়া অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। সুলতানের প্রস্তুতির খবর পেয়ে ওয়াল্যাচিয়ার রাজা বার্ষিক দশ হাজার দিরহাম জিজিয়ার বিনিময়ে সন্ধির প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু তার সব আচরণে বোঝা যাচ্ছিল, মূলত উসমানিদের সাথে লড়াইয়ের জন্য হাস্সেরির সাথে যোগাযোগ করতে সময় ক্ষেপণ করাই ছিল জিজিয়া প্রস্তাব দেওয়ার উদ্দেশ্য। সুলতান বিষয়টি নিশ্চিত হতে দুজন দূত প্রেরণ করেন। ওয়াল্যাচিয়ার রাজা সে দূতদের হত্যা করে ফেলে। শুধু এটুকুই না, উসমানিদের অধীনে থাকা বুলগেরিয়া রাজ্যে আক্রমণ করে। বুলগেরিয়ায় তারা লুটতরাজ ও গণহত্যা চালায়। ২৫ হাজার বন্দি সাথে নিয়ে নিজ দেশে ফিরে যায়। বন্দিদের কথা চিন্তা করে সুলতান একদল প্রতিনিধি প্রেরণ করেন। বন্দি ফিরিয়ে দিয়ে উসমানিদের অধীনতা মেনে নিতে আহ্বান জানান। রাজা এবারও চরম ধৃষ্টতা দেখায়। প্রতিনিধি দলকে নির্দেশ দেয় রাজার সম্মানে মাথার পাগড়ি খুলতে। কিন্তু তারা তাতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রাজা লোহার পিন দিয়ে পাগড়ি তাদের মাথার সাথে স্থায়ীভাবে লাগিয়ে দিতে নির্দেশ দেয়।

সবকিছু শুনে সুলতান দেড় লাখ সৈনিকের বহর নিয়ে ওয়াল্যাচিয়া অভিমুখে যাত্রা করেন। রাজা তখন ভীষণ পর্যন্ত হয়ে হাস্সেরিতে পালিয়ে যায়। যাওয়ার সময় ২৫ হাজার বন্দিকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ কেটে হত্যা করে। রাজধানী বুখারেস্টের চারপাশ মৃতদেহে পূর্ণ হয়ে যায়। এই অভিযানের মধ্যে দিয়ে রোমানিয়া উসমানি প্রদেশে পরিণত হয়।

বসনিয়া বিজয় এবং দলে দলে বসনিয়ান নাগরিকের ইসলাম গ্রহণ

বসনিয়ার শাসক উসমানিদের প্রস্তাব অনুযায়ী জিজিয়া দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তাই সুলতান অভিযান চালিয়ে ৮৬৬ হিজরিতে (১৪৬২ খ্রিষ্টাব্দে) বসনিয়া দখল করে নেন। হাঙ্গেরির রাজা মেট্রিয়াস বসনিয়াকে উসমানিদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য একবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। বসনিয়া বিজিত হয়ে উসমানি সাম্রাজ্যভুক্ত হওয়ার সাথে সাথেই তারা দলে দলে মুসলমান হতে শুরু করে। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরাও ইসলাম গ্রহণ করে। ত্রিশ হাজার বসনিয়ান যুবক উসমানি সেনাবাহিনীতে যোগদান করে।

ইস্কান্দার বেগের পুনরায় বিদ্রোহের চেষ্টা

ইউরোপজুড়ে উসমানিদের বিজয়াভিযানের পর, বিশেষত কনস্টান্টিনোপল পতনের পর খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় গুরু পোপ ক্রুসেডের ডাক দেয়। কিন্তু বাস্তবায়নের আগেই পোপের মৃত্যু হয়ে যায়। ফলে ক্রুসেডও স্তিমিত হয়ে যায়। এদিকে পোপের উৎসাহে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয় আলবেনিয়ার রাজা ইসকানদার (মুরাদের হাত থেকে পালিয়ে আসা রাজপুত্র)। ক্রুসেড থেমে গেলেও তার আগ্রহে ভাটা পড়ল না। সে আর ক্রুসেডের অপেক্ষা না করে একাই উসমানিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল। বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হয়। দুই পক্ষই সমানে সমান যুদ্ধ করে। ৮৭১ হিজরিতে (১৪৬৭ খ্রিষ্টাব্দে) ইসকানদার মারা যায়। তার মৃত্যুর পর আলবেনিয়া সুলতান ফাতিহের অধীনে চলে আসে।

ক্রিমিয়া অঞ্চলে আধিপত্য ও মোলদাভিয়া অভিযানে ব্যর্থতা

সুলতান ফাতিহ ৮৭৮ হিজরিতে (১৪৭৩ খ্রিষ্টাব্দে) মোলদাভিয়ার শাসক চতুর্থ স্টিফেনকে বশ্যতা স্বীকার করে জিজিয়া দিতে আহ্বান জানান। সে তা অস্বীকার করলে উসমানি বাহিনী আক্রমণ করে তার ওপর জয়লাভ করে। কিন্তু সমস্ত অঞ্চল উসমানিরা জয় করতে সক্ষম হয়নি। এ সময় সুলতান ক্রিমিয়া উপদ্বীপে অভিযান চালিয়ে তথাকার ঘোড়সওয়ার দিয়ে মোলদাভিয়া জয়ের চিন্তা করেন। ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখলকারী জেনোভার সৈনিকদের তাড়িয়ে দেয় উসমানি বাহিনী। ক্রিমিয়া উপদ্বীপের মুসলিম তাতারদের সাথে বাৎসরিক খারাজ প্রদানের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

ক্রিমিয়া উপদ্বীপ থেকে উসমানি নৌবাহিনী দানিয়ুব নদীর মোহনায় যাত্রা করে মোলদাভিয়া পৌঁছে। সেখানকার সৈন্যরা রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে বনের মধ্যে প্রবেশ করে। উদ্দেশ্য ছিল সুলতানের বাহিনী পিছু নিয়ে বনে প্রবেশ করলে সেখানে তাদের সুবিধামতো হত্যা করা। এই কৌশলে তারা সফল হয়েছিল। ৮৮১ হিজরির (১৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে) এই যুদ্ধে সুলতানের বাহিনী পর্যুদস্ত হয়। এই সাহসিকতার জন্য স্টিফেনের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপজুড়ে। পোপ তাকে খ্রিষ্টজগতের সাহসী পুরুষ ও খ্রিষ্টধর্মের পৃষ্ঠপোষক উপাধি দেয়।

ভেনিসের লড়াই

সুলতান ফাতিহ ৮৮২ হিজরিতে (১৪৭৭ খ্রিষ্টাব্দে) ভেনিসে অভিযান চালান। এই অভিযানে তিনি জয় করেন ক্রোয়েশিয়া ও তৎকালীন ডালমেসিয়া নামের রাজ্য (মন্টেনিগ্রো, আলবেনিয়ার কিছু ও ক্রোয়েশিয়ার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত)। এরপর স্কোদার শহরটিও জয় করে নেন। এতে ৮৮৭ হিজরিতে (১৪৮২ খ্রিষ্টাব্দে) ভেনিস সুলতানের সাথে সন্ধি করতে বাধ্য হয়।

ট্রান্সসিলভানিয়া (প্রাচীন পশ্চিম রোমানিয়া) রাজ্যের পরাজয়

উসমানি বাহিনী হাঙ্গেরির অধীনস্থ ট্রান্সসিলভানিয়ার দিকে অভিযান চালায়। সে অভিযানে উসমানি বাহিনী ভীষণভাবে পর্যুদস্ত হয়। অনেক সৈন্য নিহত হয়। হাঙ্গেরির রাজা উসমানি সৈনিকদের সাথে পাশবিক আচরণ করে। সমস্ত বন্দিকে হত্যা করা হয় এবং মুসলিম সৈনিকদের লাশের ওপর নিজ বাহিনীর খাবারের পাত্র পরিবেশন করে।

ইতালি জয়ের প্রচেষ্টা

সুলতান সবসময়ই ইতালি জয় করে রোম ও ভ্যাটিকানে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করার চিন্তা করতেন। কনস্টান্টিনোপল জয়ের কারণে এই চিন্তা তার মধ্যে অনেক বেশি কাজ করত। কারণ, হাদিসে কনস্টান্টিনোপল জয়ের পর রোম বিজয়ের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। তাই তিনি কসম করে বলতেন রোমের পিটার্স গির্জা তথা ভ্যাটিকানে অচিরেই তিনি দুর্গ স্থাপন করবেন।

ইতালি অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে তিনি দ্বীপরাষ্ট্র রোডস অভিযানের পরিকল্পনা করেন। রোডস ছিল সেন্ট ইউহান্নার শাসিত এলাকা। উসমানি নৌবাহিনী রোডস জয় করতে ব্যর্থ হয়ে ৮৮৫ হিজরিতে (১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দে) তাদের সঙ্গে সন্ধি করে নেয়। রোডস ত্যাগ করে সুলতান ফাতিহ ইতালির দিকে রোখ করেন। ইতালির উপকূলীয় অঞ্চলে নেমে ৮৮৫ হিজরিতেই (১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দে) অটারেন্ট শহর দখল করে নেন।

পরের বছর চূড়ান্ত বিজয়ের লক্ষ্যে একটি বৃহৎ আক্রমণ চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন। কিন্তু এ বছরই তার ইনতেকাল হয়ে যায়। তার ইনতেকালের পর উসমানি বাহিনী ইতালি অভিযানের ইচ্ছা ত্যাগ করে। পরবর্তী সুলতান অর্থাৎ দ্বিতীয় বায়েজিদ অত্যন্ত শান্তিপ্রিয় হিসেবে পরিচিত। তিনি অটারেন্ট থেকেও সব সৈন্য প্রত্যাহার করে নেন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 আনাতোলিয়াতে সুলতান ফাতিহের কার্যক্রম

📄 আনাতোলিয়াতে সুলতান ফাতিহের কার্যক্রম


সুলতান ফাতিহের সব বিজয় ছিল ইউরোপে। এশিয়ার মুসলিম শাসিত অঞ্চলগুলোর দিকে তিনি তেমন নজর দেননি। এখানে তার উল্লেখযোগ্য অভিযান ছিল হাতেগোনা। তিনি আনাতোলিয়ার সর্বশেষ খ্রিষ্টান রাজ্য ট্রাবজোন জয় করে নেন। এই রাজ্য জয়ের মাধ্যমে সমগ্র আনাতোলিয়া ক্রুসেডারদের থেকে মুক্তিলাভ করে। কিরমান রাজ্যকেও চূড়ান্তভাবে উসমানি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেন সুলতান ফাতিহ।
৮৭৪ হিজরিতে (১৪৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) তৈমুর লংয়ের উত্তরসূরিদের একটি বাহিনী পূর্ব আনাতোলিয়ায় আওজুন রাজ্য আক্রমণ করে। সুলতান তার বাহিনী প্রেরণ করে তাদের দমন করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00