📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ 📄 সুলতান মুরাদের আনাতোলিয়া অভিযান

📄 সুলতান মুরাদের আনাতোলিয়া অভিযান


নানা বিশৃঙ্খলার পরও সুলতান মুরাদ তার লক্ষ্য ভুলে যাননি। তিনি আনাতোলিয়ায় উসমানি সাম্রাজ্যের হারানো অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধার করতে উঠেপড়ে লাগলেন। তবে এগোলেন খুবই কৌশলে। তিনি প্রথমেই কিরমানের আমিরের সাথে সন্ধিচুক্তি করলেন।
এদিকে কাস্তামনুর আমির দেখলেন তিনি অচিরেই গ্যাঁড়াকলে পড়তে যাচ্ছেন। কারণ, সুলতানের ভাই মোস্তফাকে তিনি বিদ্রোহের সময় সমর্থন দিয়েছিলেন। তাই সুলতান মুরাদ প্রতিশোধের জন্য আসার আগেই তিনি রাজ্যের অর্ধেক সুলতানকে ছেড়ে দিলেন এবং আপন কন্যাকে সুলতানের সাথে বিয়ে দিলেন।
এরপর সুলতান মুরাদ আইদিন, মিনতাশা, সারখুন, হামিদ অঞ্চল ও কিরমিয়ান দখল করে নেন। কিরমিয়ানের শাসক মৃত্যুর সময় অসিয়ত করল যে, তার শাসনাঞ্চল যেন উসমানি সাম্রাজ্যে যুক্ত হয়ে যায়। কারণ, তার কোনো উত্তরসূরি ছিল না। ফলে এগুলো সব উসমানি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। এর মাধ্যমে আনাতোলিয়ার সমস্যার সমাধান হয়ে গেল এবং সুলতান ইউরোপে অভিযান চালনার পূর্ণ সুযোগ পেয়ে গেলেন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ 📄 ইউরোপে ইসলামের বিজয় অভিযান

📄 ইউরোপে ইসলামের বিজয় অভিযান


ইউরোপে সুলতান মুরাদের অধিকাংশ অভিযান ছিল হাঙ্গেরির রাজার বিরুদ্ধে। সেসব লড়াইয়ে কখনো মুসলিমদের বিজয় হতো, কখনো বা পরাজয় হতো।'

প্রথম যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর বিজয় হয়েছিল। সে যুদ্ধে হাঙ্গেরির রাজা দানিয়ুবের পূর্ব উপকূল উসমানিদের হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। ফলে তখন থেকে দানিয়ুব নদী দুই সাম্রাজ্যের সীমানা গণ্য হতে থাকে।

সার্বিয়ার রাজা জর্জ বার্নকপটিশ উসমানিদের অগ্রযাত্রায় ভীত হয়ে পড়ে। রাজা স্বেচ্ছায় সুলতানের হাতে কিছু অঞ্চল তুলে দেয়। সেই সাথে বাৎসরিক জিজিয়া প্রদান এবং হাঙ্গেরির সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শাসন টিকিয়ে রাখে। সুলতান সার্বিয়ান রাজকন্যা মারাকে বিয়ে করে নেন।

সুলতান মুরাদ ৮৩৩ হিজরিতে থেসালোনিকি থেকে ভেনিস পর্যন্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। ৮৩৬ হিজরিতে ওয়ালাচিয়ার শাসক সুলতানের অধীনতা স্বীকার করে। সুলতান মুরাদ আলবেনিয়া রাজ্য জয় করেন। পরাজিত হয়ে আলবেনিয়ার শাসক তার চার পুত্রকে সুলতানের হাতে বন্ধক রেখে নিজের শাসন ঠিক রাখে। ৮৩৪ হিজরিতে রাজা মারা গেলে সুলতান আলবেনিয়াকে উসমানি সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়ে আসেন।

সুলতান এবার কনস্টান্টিনোপল বিজয় করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক তখনই খ্রিষ্টান রাজ্যগুলো সন্ধি ভঙ্গ করতে শুরু করল। সার্বিয়ার রাজা জর্জ বার্নকপটিশ চুক্তি ভঙ্গ করে বিদ্রোহ করল। ফলে সুলতান তার বিরুদ্ধে অভিযান চালালেন এবং তাকে হত্যা করলেন। সেই সাথে সার্বিয়ার আরও কিছু অঞ্চল বিজয় করলেন। বৃহত্তর শহর বেলগ্রেড অবরোধ করে রাখলেন ছয় মাস। কিন্তু ছয় মাসেও তা জয় করতে পারলেন না। তখন তিনি রোমানিয়ার পূর্বাঞ্চলের ট্রান্সসিলভানিয়ায় সেনা প্রেরণ করলেন। সে সময় অঞ্চলটি হাঙ্গেরির অধীনে ছিল। এখানে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে উসমানি বাহিনী পরাজিত হলো। সেনাপতিসহ বিশ হাজার সৈন্য শাহাদাত বরণ করল। এর প্রতি-আক্রমণে সুলতান আশি হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী পাঠালেন। কিন্তু এই বাহিনীও পরাজিত হলো এবং এর সেনাপতি বন্দি হলেন। সময়টা ছিল ৮৪৫ হিজরি।

পরপর উসমানিদের দুটি বৃহৎ পরাজয় হলে হাঙ্গেরি সম্রাট বেশ সুযোগ পেয়ে গেল। সে তার সর্বশক্তি নিয়ে উসমানিদের থেকে সার্বিয়া মুক্ত করতে এলো। তার সাথে ছিল জার্মানি, ফ্রান্স, ভেনিস, পোল্যান্ড, জেনোভা, সার্বিয়া, দক্ষিণ রোমানিয়ার সম্মিলিত বিশাল সাহায্যকারী বাহিনী। পরপর তিনটি যুদ্ধে সম্মিলিত বাহিনীর হাতে উসমানিরা পরাজিত হয়। এমতাবস্থায় সুলতান সন্ধিচুক্তি করতে বাধ্য হলেন। সন্ধির শর্ত হিসেবে দক্ষিণ রোমানিয়া ছেড়ে দিতে হলো হাঙ্গেরির কাছে। সার্বিয়ার অনেক এলাকাও ছেড়ে দিতে হলো। এসব ছেড়ে দেওয়ার শর্তে দশ বছরের যুদ্ধ বিরতির চুক্তি করলেন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ 📄 মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে নতুন ক্রুসেডীয় ঐক্য

📄 মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে নতুন ক্রুসেডীয় ঐক্য


পরপর তিন বৃহৎ পরাজয় ও টানা যুদ্ধে সুলতান যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। এর মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্র আলাউদ্দিনের ইনতেকালে তিনি আরও মুষড়ে পড়লেন। এজন্য চাইলেন বাকি জীবন কিছুটা নির্জনে থেকে কাটিয়ে দিতে। মাত্র চৌদ্দ বছরের বালকপুত্র মুহাম্মাদ (দ্বিতীয়)-এর হাতে ক্ষমতাভার ন্যস্ত করে তিনি চলে গেলেন রাজধানী থেকে অনেক দূরে পূর্ব আনাতোলিয়ার আইদিনে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাতে।

খ্রিষ্টান দুনিয়ার আধ্যাত্মিক পিতা পোপ দেখল উসমানি বাহিনীতে এখন টানা পরাজয়ের গ্লানি ভর করছে। আবার সুলতান পদত্যাগ করে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে অপ্রাপ্ত বয়স্ক পুত্রের কাছে, যে এখনো যুদ্ধের কিছুই তেমন বোঝে না। এই সুযোগে হয়তো মুসলমানদেরকে ইউরোপ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া যাবে। তাই সে হাঙ্গেরির রাজাকে সন্ধি ভঙ্গ করতে উদ্বুদ্ধ করল। সেই সাথে ইউরোপের সমস্ত খ্রিষ্টানকে আহ্বান জানালো এই যুদ্ধে অংশ নিতে।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ 📄 ভার্নার যুদ্ধ (৮৪৮ হি./১৪৪৪ খ্রি.)

📄 ভার্নার যুদ্ধ (৮৪৮ হি./১৪৪৪ খ্রি.)


ইউরোপের রাজ্যগুলো সমস্ত শক্তি একত্র করে বুলগেরিয়া আক্রমণ করল।

এই পরিস্থিতিতে সুলতান নির্জনতা ভঙ্গ করে পুনরায় রণাঙ্গনে উপস্থিত হলেন। এবার সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব নিজ হতে তুলে নিলেন। কৃষ্ণসাগরের উপকূলে ভার্না নগরে দুই পক্ষ মুখোমুখি হয়। তুমুল লড়াইয়ের পর ক্রুসেডীয় মিত্রশক্তি চরমভাবে পরাস্ত হলো। যুদ্ধে হাঙ্গেরির রাজা নিহত হলো। তখন সৈন্যদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলো। সুলতান চূড়ান্ত আঘাত হেনে তাদের ছিন্নভিন্ন করে দিলেন। পোপের প্রতিনিধি নিহত হলো। যুদ্ধের পর সুলতান মুরাদ পুনরায় ক্ষমতা হস্তান্তর করে নির্জনবাসে চলে গেলেন।

উসমানি বাহিনীর বিশেষ শাখা জেনিসারি সৈন্যরা কমবয়সী সুলতানকে হেয়জ্ঞান করতে লাগল। এদিকে বাইজান্টাইন সম্রাট সাম্রাজ্যকে তার সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দেয়। জানাকে কনস্টান্টিনোপল আর কনস্টান্টাইনকে গ্রিসের পূর্বাঞ্চলের শাসনভার দেয়। সুলতান জেনিসারিদের উচিত শিক্ষা দিতে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসেন এবং জেনিসারি বাহিনীকে গ্রিসে যুদ্ধে প্রেরণ করেন।

টিকা:
৪১. ভার্না: বুলগেরিয়ার কৃষ্ণসাগর উপকূলীয় বন্দর নগরী। -সম্পাদক

ফন্ট সাইজ
15px
17px