📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সুলতান বায়েজিদের ইউরোপ অভিযান

📄 সুলতান বায়েজিদের ইউরোপ অভিযান


বায়েজিদ সার্বিয়ার শাসনক্ষমতায় সার্বিয়ার নিহত রাজা লাজারের পুত্র স্টিফেনকে বহাল রাখলেন। শর্ত হলো বার্ষিক জিজিয়া প্রদান করতে হবে এবং সুলতানের প্রয়োজনে যেকোনো মুহূর্তে সেনাবাহিনী নিয়ে তাকে সাহায্য করতে হবে। স্টিফেনের বোন উলিফারকে সুলতান বিয়ে করে প্রতিপক্ষের সাথে সম্পর্ক মজবুত করেন।
৭৯৪ হিজরিতে (১৩৯২ খ্রিষ্টাব্দে) সুলতান বায়েজিদ কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেন। বায়েজিদই প্রথম উসমানি সুলতান, যিনি কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেছেন। অবরোধ অব্যাহত রেখেই তিনি ওয়ালাচিয়ায় অভিযান পরিচালনা করেন। ওয়ালাচিয়ার রাজাকে বাধ্য করেন জিজিয়া দিয়ে উসমানি সুলতানের বশ্যতা স্বীকার করে নিতে।
মুরাদের হাতেই বুলগেরিয়ার অর্ধেকাংশ উসমানি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। রাজা সিসমানের মৃত্যুর পর বায়েজিদ বুলগেরিয়ার বাকি অর্ধাংশও সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। সে সময় সিসমানের পুত্র ইসলাম কবুল করলেন। বায়েজিদ তাকে সামসুন অঞ্চলের গভর্নর নিয়োগ দেন। এতে বুলগেরিয়া পূর্ণরূপে উসমানি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
উসমানিদের বিজয় মিছিল দেখে ইউরোপজুড়ে খ্রিষ্টান সম্রাটদের মধ্যে হইচই শুরু হয়ে গেল। হাঙ্গেরির রাজা পোপ ও অন্য সব খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের কাছে সাহায্য চাইল। পোপ উসমানিদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড যুদ্ধের ডাক দিলো। সে সময়ের প্রভাবশালী খ্রিষ্টান রাজারা সে ডাকে সাড়া দিতে লাগল। ডিউক অব বুরগুন্ডি (পূর্ব ফ্রান্সে অবস্থিত), অস্ট্রিয়া, বায়ান (দক্ষিণ জার্মান), সাধু জোহনের ঘোড়সওয়ার বাহিনীগুলো পোপের ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধযাত্রা করল।
অ্যাকর থেকে বের হয়ে সাইপ্রাস, তারপর রোডস হয়ে মাল্টায় গিয়ে উপস্থিত হলো। সম্মিলিত বাহিনী প্রথম আক্রমণ করল উত্তর বুলগেরিয়ার নিকোপলিস শহরে। ৭৯৮ হিজরিতে (১৩৯৬ খ্রিষ্টাব্দে) নিকোপলিস অবরোধ করা হলো। স্টিফেনের নেতৃত্বে উসমানি বাহিনী সেখানে পৌঁছে। সাথে উসমানি বাহিনীতে যোগ দেওয়া বহু খ্রিষ্টান সৈনিকও ছিল।
লড়াইয়ে ক্রুসেডার শক্তি চরমভাবে পরাজিত হয়। বহু নেতৃত্বস্থানীয় লোক বন্দি হয়। ডিউক অব বুরগুন্ডি বন্দি হয়। বিপুল মুক্তিপণ ও উসমানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না মর্মে ওয়াদা দিয়ে ডিউক মুক্তি পায়। তার ওয়াদা শুনে সুলতান বায়েজিদ তার বিখ্যাত উক্তিটি করেছিলেন, ‘তোমাকে অনুমতি দিলাম এই ওয়াদা না রক্ষা করলেও চলবে। তুমি পুনরায় আমার সাথে লড়াই করতে আসতে পারো। ইউরোপের সব খ্রিষ্টানের সাথে লড়াই করে বিজয় লাভ করার চেয়ে বেশি প্রিয় আমার আর কোনো কাজ নেই।’ ইউরোপীয় বাহিনীর মহাপরাজয়ের পর বাইজান্টাইন সম্রাট বাধ্য হয়ে দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে অবরোধ থেকে রক্ষা পায়। সেই সাথে কনস্টান্টিনোপলের মুসলিমদেরকে সেখানে মসজিদ নির্মাণের সুযোগ দেয়।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 তেমুর লঙের সাথে সংঘর্ষ এবং উসমানি সাম্রাজ্যের সাময়িক দুর্দশা

📄 তেমুর লঙের সাথে সংঘর্ষ এবং উসমানি সাম্রাজ্যের সাময়িক দুর্দশা


এতক্ষণ যা শুনলাম সব যেন মধুর এক স্বপ্ন। ইউরোপের বুকে ইসলামের বিজয় অভিযান দুরন্ত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, এ যেন স্বপ্নের চেয়েও সুন্দর বাস্তবতা। কিন্তু এ পর্যায়ে আমাদের আচানক জেগে উঠতে হবে স্বপ্নভঙ্গের হতাশা নিয়ে। হঠাৎ এক ঝড় এসে যেন কিছু সময়ের জন্য লন্ডভন্ড করে দিয়ে গেল সাজানো বাগান।
এই প্রলয়ংকারী ঝড়ের নাম তৈমুর লং। পূর্ব দিক থেকে তীব্র ঝড়ের গতিতে এসে একে একে মুসলিম সাম্রাজ্যগুলো পদানত করে যাচ্ছিল এই যুদ্ধদানব। তৈমুর লং ছিল নামধারী মুসলিম। ইসলামের বিন্দুমাত্র চেতনাও যার ছিল না। ইসলামের দুশমনরা তাকে বারবার ব্যবহার করেছিল। মুসলিম হওয়ার পরও তার মাধ্যমে ইসলামের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছিল। তার কর্মকাণ্ডের ওপর ইসলামের কোনো ছাপ ছিল না।
তৈমুর লং বাগদাদ আক্রমণ করল। হালাকু খার পর দ্বিতীয়বার বাগদাদ ধ্বংস করল তৈমুর। বাগদাদের গভর্নর প্রাণ নিয়ে পালিয়ে সুলতান বায়েজিদের আশ্রয় গ্রহণ করলেন। তৈমুর বায়েজিদের কাছে তাকে ফিরিয়ে দিতে বলল। কিন্তু বায়েজিদ তাতে অস্বীকৃতি জানালেন। ফলে যা হওয়ার তাই হলো। যুদ্ধদানব তৈমুর লং ঝাঁপিয়ে পড়ল উসমানি সাম্রাজ্যের ওপর। সিভাস নগরী দখল করল। সিভাসের গভর্নর বায়েজিদপুত্র আর্তুগ্রুলকে হত্যা করা হলো। পদানত করতে করতে সাম্রাজ্যের কেন্দ্রের দিকে যেতে লাগল তৈমুর। তাকে থামাতে চূড়ান্ত লড়াইয়ে অবতীর্ণ হলেন সুলতান বায়েজিদ। সুলতানের ছিল দেড় লক্ষ সৈনিকের বিশাল বহর। আর তৈমুরের বাহিনীর সদস্য সংখ্যা আশি হাজার। এ ঘটনা ৮০৪ হিজরির।
উভয় বাহিনী আঙ্কারায় মুখোমুখি হলো। সূর্যোদয়ের আগেই তুমুল সংঘর্ষ বেধে গেল। চলতে থাকল সূর্যাস্তের পরও। উসমানি বাহিনী অপেক্ষাকৃত বড় ছিল। কিন্তু যুদ্ধের মাঝপথে আইদিন, মিনতাশা, কিরমিয়ান, সারখুনের আঞ্চলিক (খ্রিষ্টান) বাহিনী বিশ্বাসঘাতকতা করে তৈমুরের বাহিনীতে যোগদান করে। এরপর সুলতান আর টিকে থাকতে পারলেন না। পরাজিত হলো উসমানি রাজকীয় বাহিনী। সুলতান নিজে এবং তার পুত্র মুসা তৈমুরীয়দের হাতে বন্দি হয়ে পড়েন। আরেক পুত্র মোস্তফা আত্মগোপনে চলে গেল। বিভিন্ন প্রদেশে পালিয়ে গেল বাকি তিন পুত্র সুলাইমান, ইসা ও মুহাম্মাদ। সুলতান বায়েজিদ অন্তত তিনবার বন্দিদশা থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই তাকে ব্যর্থ হতে হয়। এর ফলে তিনি অনেক বেশি মুষড়ে পড়লেন। বন্দিজীবনের এই অপমান তার সহ্য হলো না। ৮০৫ হিজরিতে সুলতান বায়েজিদ ইনতেকাল করলেন।
তৈমুর সমগ্র আনাতোলিয়া বিজয় করল। আর তার প্রস্থানের পরই পুরো অঞ্চল আবার উসমানিদের বিজয়ের পূর্বের মুহূর্তের মতো ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত হয়ে গেল।
উসমানি সাম্রাজ্যের এই দুঃসময়টা সবচেয়ে বেশি উপভোগ করছিল ইউরোপীয় রাজ্যগুলো। উসমানিদের ভগ্নদশার সুযোগে স্বাধীনতা ঘোষণা করল বুলগেরিয়া, সার্বিয়া, আফলাক। ফলে দেখতে দেখতেই উসমানি সাম্রাজ্য সংকুচিত হয়ে গেল।
এদিকে পালিয়ে আসা তিন ভাইয়ের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সাম্রাজ্যের যা বাকি ছিল, তা আরও টুকরো টুকরো হয়ে গেল। এডির্নেকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় অংশ দখল করল সুলাইমান। ভাইদের বিরুদ্ধে শক্তি সঞ্চয় করতে সে চুক্তি করল বাইজান্টাইন সম্রাট দ্বিতীয় ইমানুয়েলের সাথে। সম্রাটের সাথে সন্ধির অংশ হিসেবে থেসালোনিকি (৪০) শহর ও কৃষ্ণসাগরের উপকূলবর্তী কিছু অঞ্চল তার হাতে তুলে দিলো। পাশাপাশি সম্রাটের এক নিকটাত্মীয়র সাথে বিবাহ বন্ধনেও আবদ্ধ হলো।
আরেক পুত্র ইসা পিতার মৃত্যুর সাথে সাথেই প্রাক্তন রাজধানী বুরসায় গিয়ে নিজেকে সাম্রাজ্যের অধিপতি ঘোষণা করল।
আরেক ভাই মুহাম্মাদ কিছুদিন আনাতোলিয়ায় আত্মগোপনে ছিল। তারপর তাতারদের দৌরাত্ম্য কমে এলে মুহাম্মাদ বেরিয়ে আসে। সৈন্যসামন্ত জোগাড় করে অবশিষ্ট তাতারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। অনেক অঞ্চল পুনর্দখল করে নেয়। পিতার সাথে বন্দি হওয়া ভাই মুসাকে মুক্ত করে। তারপর মুসাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে অন্য ভাইদের বিরুদ্ধে লড়ে সাম্রাজ্য নিজের করে নিতে।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ভ্রাতৃঘাতী লড়াইয়ে মুহাম্মাদের বিজয় ও সিংহাসন লাভ

📄 ভ্রাতৃঘাতী লড়াইয়ে মুহাম্মাদের বিজয় ও সিংহাসন লাভ


কয়েকটি লড়াইয়ের পর ইসা পরাস্ত হয় মুহাম্মাদের হাতে। ইসাকে হত্যা করা হয়। তারপর মুসার নেতৃত্বে মুহাম্মাদ একটি বাহিনী পাঠান আরেক ভাই সুলাইমানকে শায়েস্তা করতে। মুসা প্রথমে হামলা করতে এসে ভীত হয়ে পিছিয়ে যায়। সাহস সঞ্চয় করে দ্বিতীয়বার সুলাইমানের বাহিনীকে আক্রমণ করে। এবার সে ঠিকই সফল হয়। ৮১৩ হিজরিতে (১৪১০ খ্রিষ্টাব্দে) এডির্নের নগর দুয়ারে নিহত হয় সুলাইমান।
তারপর মুসা সার্বিয়া রাজ্যমুখী হয় উসমানিদের দুঃসময়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করা সার্বিয়ানদের উচিত শিক্ষা দিতে। পাশাপাশি হাঙ্গেরির বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করে বিজয় লাভ করে। এরা সব কাজে সার্বিয়ানদের সমর্থন দিয়ে যেত।
মুসা চেয়েছিল সাম্রাজ্যের ইউরোপীয় অংশে স্বতন্ত্র রাজত্ব কায়েম করতে। তাই মুসা কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করল। অবস্থা বেগতিক দেখে বাইজান্টাইন সম্রাট মুহাম্মাদের সাহায্য প্রার্থনা করল। আহ্বান শুনে মুহাম্মাদ দ্রুত সাড়া দিলেন এবং ইউরোপে এসে বাইজান্টাইন সম্রাট ও সার্বিয়ান রাজার সাথে চুক্তি করলেন আপন ভাইয়ের বিরুদ্ধে। চুক্তিবদ্ধ শক্তির কাছে মুসা পরাজিত হলো। মুসাকে হত্যা করা হলো এবং সাম্রাজ্যের একক অধিপতি হয়ে উঠলেন মুহাম্মাদ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00