📄 আনাতোলিয়ায় পররাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা
নতুন সুলতান গাজি মুরাদ তার পূর্বসূরিদের ধারা বজায় রেখে এশিয়া ও ইউরোপ দুই দিকেই অভিযান চালিয়ে যান। ইউরোপের চেয়ে এশিয়ায় সাম্রাজ্য বিস্তার করতেই উসমানিদের বেশি সতর্ক থাকতে হয়। কারণ, আনাতোলিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলেই মুসলিম শাসন জারি ছিল। তাই যুদ্ধ ও রক্তপাত এড়িয়ে কৌশলে সেসব রাজ্য জয় করাই ছিল তার লক্ষ্য। এর মধ্যে আত্মীয়তা করা ছিল একটা কার্যকরী কৌশল। বস্তুত সাম্রাজ্য বড় করার চেয়ে মুসলিম শক্তিকে এক পতাকার নিচে সমবেত করা এবং অনৈসলামি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করাই ছিল উসমানিদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সৈনিকদেরও চাহিদা ছিল না মুসলিমদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করার। এরকম স্থানে তাদের কোনোরকম ধরেবেঁধে নিয়ে যাওয়া হতো। পক্ষান্তরে ইউরোপে অভিযানের ক্ষেত্রে তারা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত।
মুরাদ ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই কিরমানের শাসক আলাউদ্দিন তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে উঠল। আনাতোলিয়ার স্বাধীন রাজ্যগুলোকে উসমানিদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ করার চেষ্টা শুরু করল আলাউদ্দিন। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে সুলতান মুরাদ নিজেই একটি শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে কিরমানের রাজধানী আঙ্কারায় উপস্থিত হলেন। বিপদ টের পেয়ে আলাউদ্দিন রাজধানী আঙ্কারা উসমানিদের হাতে ছেড়ে দিয়ে দ্রুত রাজ্যের বাকি অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ মজবুত করে। এদিকে সুলতান মুরাদ আলাউদ্দিনের সাথে বিবাদ মেটানোর লক্ষ্যে তার কন্যাকে বিয়ে করে নেন।
সুলতান মুরাদের সাথে কন্যার বিয়ে হওয়ার পরও আলাউদ্দিনের মনের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছিল। সুযোগ পেলেই উসমানিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিয়ে সময়ের অপেক্ষা করছিল। গোপনে আরও কিছু রাজ্যপতিকেও হাত করে নেয়। ৭৮৭ হিজরিতে (১৩৮৫ খ্রিষ্টাব্দে) কয়েকজন রাজা মিলে মুরাদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত অভিযান চালায়।
এমতাবস্থায় মুরাদ তাদের দমনে শক্ত বাহিনী পাঠান। মুরাদের বাহিনী বিজয় লাভ করে। বন্দি হন সুলতানের শ্বশুর আলাউদ্দিন। কিন্তু কন্যার মধ্যস্থতায় রক্ষা পান আলাউদ্দিন। বছরে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ কর ধার্য করে নিজের পদে পুনর্বহাল করা হয় আলাউদ্দিনকে।
কিরমিয়ান রাজ্যের সাথে ঘনিষ্ঠতা করতে মুরাদ কিরমিয়ানের আমিরের কন্যার সাথে স্বীয় পুত্র ইয়াজিদের বিয়ে দেন। ইয়াজিদের শ্বশুর উপহার হিসেবে কোতাহিয়া নগর স্বীয় কন্যার হাতে তুলে দেন। শহরটি উসমানি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। ৭৮২ হিজরি সনে (১৩৮০ খ্রিষ্টাব্দে) দুওয়াইলাতুল হামিদ নামের ছোট এক রাজ্যের শাসক সম্পূর্ণ রাজ্য উসমানিদের হাতে তুলে দিয়ে তাদের অধীনতা স্বীকার করে নেন।
📄 ইউরোপে অভিযান
৭৬২ হিজরিতে (১৩৬১ খ্রিষ্টাব্দে) উসমানি বাহিনী ইউরোপে এডির্নে নগর জয় করে। এই শহরটি কনস্টান্টিনোপল থেকে কিছুটা উত্তরে। গুরুত্বপূর্ণ শহরটি দখল করেই সুলতান মুরাদ রাজধানী সেখানে স্থানান্তর করেন, যেন ইউরোপে অভিযান পরিচালনা সহজ হয়। তার এই পদক্ষেপ ছিল কনস্টান্টিনোপল জয়ের প্রথম কার্যকরী ধাপ। ৮৫৭ হিজরিতে সুলতান ফাতিহ কনস্টান্টিনোপল বিজয় করা পর্যন্ত আদ্রিয়ানোপল উসমানি সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে বহাল থাকে।
খুব অল্প সময়ে ইউরোপের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহর জয় হয়। যেমন : ফিলিপা (বর্তমান দক্ষিণ বুলগেরিয়া), কালজামিনা, ওয়ারদার। এর ফলে কার্যত চারদিক থেকেই কনস্টান্টিনোপল উসমানিদের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে পড়ে।
উসমানিদের এই অগ্রগতিতে পার্শ্ববর্তী ইউরোপীয় রাজ্যগুলো শঙ্কিত হয়ে ওঠে। সবাই পোপকে চিঠি লিখে ব্যবস্থা নিতে আবেদন জানাতে শুরু করে। বাইজান্টাইন সম্রাট নিজে পোপের কাছে উপস্থিত হয়ে মাথা নত করে সম্মান জানান। পোপের হাতে পায়ে চুমু খেয়ে তার সমর্থন কামনা করেন। অথচ পোপ হলো ক্যাথলিক মতাবলম্বী আর কনস্টান্টাইন সম্রাট ছিল অর্থোডক্স। এর আগ পর্যন্ত উভয় দলের মধ্যে প্রচণ্ড মতবিরোধ ও শত্রুতা ছিল। কিন্তু ইসলামের বিরুদ্ধে তারা সে শত্রুতা ভুলে গিয়ে এক হয়ে গেল। সম্রাটের আহ্বানে পোপ সাড়া দিলো। ইউরোপের সকল রাজাকে চিঠি লিখে নতুন ক্রুসেডের ডাক দিলো। ইউরোপে ছড়িয়ে পড়া উসমানিদের শায়েস্তা করার জন্য সবাইকে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানাল।
এদিকে সার্বিয়ার রাজা পঞ্চম উরুকের ধৈর্য হলো না পোপের পদক্ষেপ পর্যন্ত অপেক্ষা করার। পার্শ্ববর্তী বসনিয়া, দক্ষিণ রোমানিয়ার রাজকীয় বাহিনী ও হাঙ্গেরির কিছু বিদ্রোহী ঘোড়সওয়ারের সহায়তায় নিজেই উসমানিদের হাত থেকে এডির্নে শহর মুক্ত করতে ছুটে এলো। সুলতান মুরাদ তখন আনাতোলিয়ায় কোনো এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। সেটাকে সুযোগ মনে করে সার্বিয়ানরা (ইউরোপীয় অংশে) উসমানিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু এখানেও উসমানিরা শক্তিতে বেশ সবল ছিল। তারা দ্রুত সে আক্রমণ প্রতিহত করে। এডির্নে শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া মারতিজা নদীর কিনারে ইউরোপীয় বাহিনীকে বিধ্বস্ত করে উসমানিরা। জীবিত সৈনিকেরা পালিয়ে জীবন রক্ষা করে। উসমানিদের শক্তিমত্তা দেখে অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের উপকূল অঞ্চল ডালমেসিয়ায় (প্রাচীন রাজ্য; যা বর্তমানের ক্রোয়েশিয়া, মন্টেনিগ্রো ও আলবেনিয়ার বিভিন্ন অংশজুড়ে বিস্তৃত) অবস্থিত রাজুজা রাজ্যের আমিররা ভীত হয়ে পড়ে। তারা উসমানিদের সাথে সন্ধি করে নেওয়াকেই নিরাপদ মনে করে। বাৎসরিক ৫০০ তদাঞ্চলীয় স্বর্ণমুদ্রা জিজিয়া প্রদানের ভিত্তিতে সন্ধি চুক্তি স্থাপিত হয়।
এরপর সার্বিয়ার আরেক রাজা ল্যাজার বিলিন বুলগেরিয়ার রাজা সিসমানের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে উসমানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। কিন্তু এবারও তারা উসমানিদের হাতে পর্যুদস্ত হলো। ফলে বশ্যতা স্বীকার করে বাৎসরিক জিজিয়া দেওয়ার চুক্তিতে আবদ্ধ হলো। এ সময় সুলতান বুলগেরিয়ার রাজকন্যাকে বিয়ে করে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও মজবুত করে নিলেন।
জিজিয়া প্রদানের সময় হওয়ার পর সার্বিয়া আর বুলগেরিয়া গড়িমসি শুরু করল। তখন তাদের উপযুক্ত শিক্ষা দিতে সুলতান সৈন্য প্রেরণ করলেন। উসমানি বাহিনী সার্বিয়ার (বর্তমানে যুগোস্লাভিয়ার দক্ষিণ অংশের) কয়েকটি শহর দখল করে নিলো। তিন বছর অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার পর ৭৮৪ হিজরিতে (১৩৮২ খ্রিষ্টাব্দে) উসমানিরা এই অঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর সফিয়া জয় করতে সক্ষম হয়। এ ছাড়াও প্রাচীন মেসিডোনিয়া বা বর্তমান গ্রিসের থেসালোনিকিও উসমানিদের করতলগত হয়।
এ সময় সুলতান মুরাদের এক পুত্র সাওজি ক্ষমতার লোভে পিতার সাথে বিদ্রোহ করে। তার সাথে মিলিত হয় বাইজান্টাইন সম্রাট ইউহান্না বালিযুজের আরেক পুত্র এন্ড্রুনিকোস। এ কারণে বাইজান্টাইন সম্রাট নিজের পুত্রকে সিংহাসনের ব্যাপারে ত্যাজ্য করে। সুলতান মুরাদ দুই সাম্রাজ্যের উভয় যুবরাজকে শায়েস্তা করতে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। যুদ্ধে বিদ্রোহী দুই যুবরাজ নিহত হয়।
📄 কসোভোর যুদ্ধ (৭৯১ হিজরি/১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দ)
উসমানিরা যখন আনাতোলিয়াতে আলাউদ্দিনের সাথে যুদ্ধে ব্যতিব্যস্ত ঠিক সে সময়টিকে সার্বিয়ার রাজা হামলা করার মোক্ষম সুযোগ মনে করল। এই সুযোগেই তারা উসমানিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দক্ষিণ সার্বিয়ার কিছু অঞ্চল তারা দখল করে নিলো। এ পরিস্থিতি বুলগেরিয়ার শাসক সিসমানকে উসমানিদের ওপর হামলা করতে প্রলুব্ধ করে। কিন্তু উসমানি বাহিনী তাকে সে সুযোগ না দিয়ে ঝটিকা আক্রমণ চালায়। সিসমান পালিয়ে বুলগেরিয়ার উত্তর অংশে নিকোপলিসে আশ্রয় নেয়। তারপর সমস্ত শক্তি জড়ো করে পুনরায় উসমানিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু এবারও ভীষণ পর্যুদস্ত হয়ে রাজা নিজেও বন্দি হয়ে পড়ল। সুলতান মুরাদ তাকে প্রাপ্যের চেয়েও অনেক বেশি মর্যাদা দিলেন। তাকে মুক্তি তো দিলেনই, সাথে তার রাজ্যের অর্ধেক ফিরিয়ে দিলেন। বাকি অংশ উসমানি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নিলেন।
সার্বিয়ার রাজা এসব জানতে পেরে তার বাহিনী নিয়ে পশ্চিমে চলে যেতে লাগল। পথেই উসমানিরা তাদের ধরে ফেলে। কসোভো ময়দানে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। (এই ঐতিহাসিক অঞ্চল বর্তমানে যুগোস্লাভিয়া থেকে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছে। এখানে অধিকাংশ অধিবাসী আলবেনিয়ান মুসলিম।) যুদ্ধ চলছিল সমানে সমান। এক পর্যায়ে সার্ব রাজার জামাতা দশহাজার সৈন্যসহ মুসলমানদের দলে চলে আসে। এতে সার্বদের পরাজয় হয়। সার্ব রাজা রণাঙ্গনে নিহত হয়। মুসলিম বন্দিদের সাথে সার্ব রাজা যে ভয়ানক আচরণ করেছিল সে সম্পর্কে মুসলিম সৈন্যরা যথেষ্ট অবগত ছিল। তাই রাজাকে পেয়ে সৈন্যরা হত্যা করতে একটুও দেরি করেনি।
📄 সুলতানের ইন্তেকাল
যুদ্ধের পর সুলতান মুরাদ নিহত সার্ব সৈন্যদের মাঝে ঘুরে দেখছিলেন। এক সার্ব সৈনিক নিহতদের সাথে পড়ে ছিল। সুলতানকে দেখতে পেয়ে লাশের স্তূপ থেকে উঠে সুলতানকে খঞ্জর দিয়ে আঘাত করে বসে। দেহরক্ষীরা তৎক্ষণাৎ ঘাতককে হত্যা করে ফেলে, কিন্তু সুলতান এই আঘাতেই ইন্তেকাল করেন।
কোথাও কোথাও পাওয়া যায় যুদ্ধের আগের রাতে সুলতান দোয়া করেছিলেন : ‘হে আল্লাহ, আপনার ইজ্জত ও জালালের কসম! আমি এইসব জিহাদ দ্বারা অস্থায়ী দুনিয়ার কোনো কিছুই কামনা করি না। আমি কামনা করি আপনার সন্তুষ্টি। হে আমার রব, আপনি আমাকে জিহাদের পথে পরিচালিত করে সম্মানিত করেছেন। হে আমার মালিক, এখন আমাকে শাহাদাতের মৃত্যু দিয়ে আরও সম্মানিত করুন।’