📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 তুর্কি জাতির ইতিকথা

📄 তুর্কি জাতির ইতিকথা


তুর্কিদের আলোচনা উঠলে সাধারণত কল্পনায় ভেসে ওঠে আধুনিক তুরস্ক রাষ্ট্রের কথা, যা পূর্বে এশিয়া মাইনর নামে পরিচিত ছিল। যাই হোক, এটি কিন্তু ভুল ধারণা। এশিয়া মাইনর বা বর্তমান তুরস্ক তুর্কিজাতির আদি বাসস্থান নয়। তুর্কিদের আদি বাসস্থান মধ্য এশিয়ায় অবস্থিত, যা ঐতিহাসিকভাবে তুর্কিস্তান নামে পরিচিত।

প্রাচীন তুর্কিস্তান এখন ছড়িয়ে আছে মধ্য এশিয়ার তুর্কি রাজ্যগুলোর মধ্যে। অর্থাৎ কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান। নব্বই দশকের শেষদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে মুক্ত হওয়ার পর থেকে এই পাঁচটি এখন স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশ। তুর্কিস্তানের আরেকটি বৃহৎ অংশ রয়ে গেছে চীনের পরাধীন প্রদেশ হিসেবে। ঐতিহাসিকভাবে পূর্ব তুর্কিস্তান নামে পরিচিত উইঘুর মুসলিম জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল এই দেশ এখন চীনা ভাষায় শিনচিয়াং প্রদেশ নামে পরিচিত।

শিনচিয়াং অর্থ হলো নতুন রাজ্য। নামেই বোঝা যাচ্ছে, চীনারা এখানে দখলিস্বত্ব বা উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে। প্রাচীন তুর্কিস্তানের আরও একটি প্রদেশ বর্তমানে ইরান ও আফগানিস্তানের অংশ, যার ঐতিহাসিক নাম খোরাসান। খোরাসানের বৃহৎ দুটি অংশ রয়ে গেছে আফগানিস্তান ও ইরানে, আর কিছু অংশ তুর্কমেনিস্তানে।

এখানে এই প্রশ্ন আসে যে, তুর্কিদের একটা ধারা মধ্য এশিয়া থেকে পশ্চিম এশিয়ায় (এশিয়া মাইনর তথা আনাতোলিয়ার পার্বত্য অঞ্চলে) এলো কীভাবে?

তুর্কি জাতি মূলত মোঙ্গলীয় নৃগোষ্ঠীভুক্ত হলুদ চামড়ার মানুষ। (বলা হয় নুহ আ.-এর ছেলে ইয়াফিসের বংশধর এরা।) এশিয়ার সিংহভাগ অঞ্চলেই এদের বাস। যেমন: চীন, জাপান, মঙ্গোলিয়া, তাতারিস্তান, তুর্কিস্তান, মালয়েশিয়া ইত্যাদি।

শৌর্যবীর্য ও যুদ্ধবিদ্যায় বিশেষ পারদর্শী হিসেবে জগৎজোড়া তাদের খ্যাতি ছিল। তাদের জন্মস্থান ও বিচরণভূমির প্রভাব এতে কম নয়। উঁচু মালভূমি, পার্বত্য এলাকা ও শুষ্ক মরুভূমিতে তাদের বসবাস। এই অঞ্চলে ইসলামের আবির্ভাব পর্যন্ত তুর্কিরা ছিল মূর্তি ও তারকা পূজারি।

উমাইয়া শাসনামলে মধ্য এশিয়ার দেশগুলো বিজিত হয়। ইসলামের আগমনের সাথে সাথেই তুর্কিরা দলে দলে ইসলামে দীক্ষিত হতে থাকে। নিষ্ঠাবান মুজাহিদগণের আত্মত্যাগের ফলে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় খুব অল্প সময়ে মধ্য এশিয়ার তুর্কিজাতির একমাত্র ধর্ম হয়ে উঠল ইসলাম। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে যে মুসলিম সেনানায়কের নাম নিতে হয়, তিনি হলেন কুতাইবা বিন মুসলিম আল-বাহিলি।³¹ এরপর আসে মুহাল্লাব পরিবারের নাম³² যাদের নিয়োগ হয়েছিল হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলা এই তুর্কি জাতিকে কবুল করেছিলেন। পরবর্তীকালে তাদের দ্বারা ইসলামের অভাবনীয় খেদমত হয়।

এখন আমরা সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি যে, তুর্কিদের একটি ধারা কীভাবে মধ্য এশিয়া থেকে আনাতোলিয়ায় চলে গেল। এর উত্তর হলো, আব্বাসীয় শাসনামলে তুর্কিদের প্রভাব-প্রতিপত্তি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছিল। সে সময় আনাতোলিয়া ছিল খিলাফত ও রোমান বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের মধ্যবর্তী এলাকা। এ অঞ্চল ছিল উভয় পক্ষের সীমানা। ফলে জায়গাটা ছিল যুদ্ধ কবলিত। এজন্য আব্বাসীয় খলিফারা খোরাসান থেকে আসা সৈনিকদেরকে আনাতোলিয়ায় স্থায়ী ঘাঁটি করে দিয়েছিলেন। খলিফা মাহদি ফারগানা (বর্তমান কিরগিজস্তানের একটি শহর) ও বলখ (বর্তমান আফগানিস্তানের একটি প্রদেশ) থেকে তুর্কিদের এনে তাদের থিতু করেছিলেন আনাতোলিয়ার সীমান্ত এলাকাগুলোতে। যেমন: তারতুস, আজিন্না, মারআশ, খারশানা ইত্যাদি। এসব অঞ্চল মুসলিম ও রোমানদের মধ্যবর্তী পাহাড়ি সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত। খলিফা মামুন ও মুতাসিমের সময় আনাতোলিয়ায় তুর্কিদের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।

খলিফা মুতাওয়াক্কিলের সময় তুর্কিরা হয়ে ওঠে খলিফার সেনাবাহিনীর মূল চালিকাশক্তি। আনাতোলীয় সীমান্ত অঞ্চলে কার্যত তুর্কিদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তুর্কি শাসকরা খলিফার প্রতি অনুগত ছিল। তবে কখনো আবার আনুগত্য প্রকাশ করত হালাবের (আলেপ্পো) শাসক হামাদানিদের। কখনো মিশরের তুলুনিদের। তবে নানা বিভক্তি সত্ত্বেও আনাতোলীয় সীমান্তে রোমানদের সাথে মুসলিমদের লড়াই সবসময় অব্যাহত ছিল। এসব যুদ্ধে কখনো মুসলিমদের জয় হতো, আবার কখনো পরাজয়ও হতো।

আব্বাসীয় শাসনের দুর্বল সময়ে সেলজুক তুর্কিদের উত্থান ঘটে। সেলজুকরা রোমান বাইজান্টাইন সম্রাটদের স্বস্তি কেড়ে নিয়েছিল। সেলজুকরা অনবরত যুদ্ধ চালিয়ে যায় রোমানদের বিরুদ্ধে। তাদের সবচেয়ে সফল শাসক হলেন আলপ আরসালান³³। ৪৬৩ হিজরির এক মহাসমরে রোমানদের বিরুদ্ধে তিনি মহাবিজয় অর্জন করেছিলেন।

এই যুদ্ধের পর আনাতোলিয়ায় সেলজুক তুর্কিদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। সেলজুক আমিরদের অনেকগুলো ইমারা বা প্রশাসনিক প্রদেশ গড়ে ওঠে। আনাতোলিয়াজুড়ে ক্রমপ্রসারমান সেলজুকরা ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য স্মরণীয় কিছু অবদান রেখে গিয়েছিল। যার অন্যতম হলো রোমানদের কাছে হাতছাড়া হওয়া অনেক অঞ্চলে পুনরায় মুসলিমদের বিজয় লাভ। আনাতোলিয়ার বিস্তৃত ভূমির অধিকাংশই ইসলামি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। সেলজুক সালতানাতের সর্বাধিক বিস্তৃতি হয় আরসালানপুত্র মালিক শাহের হাতে। এই অঞ্চলে আর অল্প কয়েকটি খ্রিষ্টান রাজ্য ছিল। উসমানিদের হাতে এগুলো চূড়ান্তরূপে পদানত হয়।

দুঃখের বিষয় হলো, কতিপয় দুর্বলচিত্তের সেলজুক শাসক সর্বগ্রাসী মোঙ্গল আক্রমণের মুখে চরমভাবে ভেঙে পড়ে। রণাঙ্গনে পরাজয় নয়, ভীত হয়ে এরা মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে তৎপরতায় মোঙ্গলদের সহযোগীতে পরিণত হয়।

সেলজুকদের রাজ্য তাতারদের হাতে দখল হয়। সেলজুক আমিররা আত্মসমর্পণ করে এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে সম্মত হয়। এরপর ৬৫৯ হিজরিতে তাতাররা যখন আইনে জালুত রণাঙ্গনে পরাজিত হলো তখন এরা শাম ত্যাগ করতে বাধ্য হলো। রুকনুদ্দিন বাইবার্স সেলজুকদের ওপর প্রতিশোধ নিলেন। ৬৭৫ হিজরিতে সেলজুক ও তাদের তাতার মিত্রদের সাথে বুসতানের যুদ্ধে মুখোমুখি হয়ে তাদের পরাজিত করেন। সেলজুক রাজধানী কায়সারিয়াও দখল করে নেন। তাতারদের শক্তিক্ষয়ের সাথে সাথে রোমান সেলজুকদের রাজ্যও বিলুপ্ত হয়ে যায়। আনাতোলীয় পার্বত্য অঞ্চলে বেশ কয়েকটি স্বাধীন ইমারা প্রতিষ্ঠিত হয়। যেমন : আইদিনের রাজবংশ, তারিকাহ বংশ, আরতিনা বংশ, কিরমিয়ান বংশ, হামিদ বংশ, আশরাফ কারা ইসার বংশ, সারুখান বংশ, মিনতাশা বংশ, জানবাদার (ইসফান্দিয়ার) বংশ, বারওয়ানাহ বংশ, সাহিব আতার বংশ, কাজমান বংশ, রমজান বংশ, জুলকাদির বংশ ইত্যাদি।

আনাতোলিয়ার মুসলিমদের জন্য অপেক্ষা করছিল স্পেন বা তাতারি হামলার শিকার মুসলিম দেশগুলোর ভাগ্য। অনৈক্য, বিভক্তি, নিজেদের মধ্যে মারামারি আর ক্ষমতার লিপ্সায় অমুসলিম শাসকদের সাথে হাত মেলানো একটা জাতির পরিণতি তো এটাই হবে। কারণ, আল্লাহ তাআলা তো বিশেষভাবে বলে দিয়েছেন-
'তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা বিভেদ করে এবং সুস্পষ্ট প্রমাণ সামনে থাকার পরও মতভেদ করে। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।' [সুরা আলে ইমরান: ১০৫]

কিন্তু আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় আনাতোলিয়াতে উসমানি শাসন প্রতিষ্ঠা হলো। তারা ছোট-বড় সকল রাজ্যকে ঐক্যবদ্ধ করে বিভেদ দমন করতে সক্ষম হয়েছিল।

টিকা:
৩১. কুতাইবা বিন মুসলিম ৪৯-৯৬ হিজরি/৬৬৯-৭১৫ খ্রিষ্টাব্দ। প্রথম হিজরি শতাব্দীতে এশিয়া মাইনর অঞ্চলে তার হাত ধরেই ইসলামি বিজয় যাত্রা শুরু হয়। -সম্পাদক
৩২. আল-মুহাল্লাব। পুরো নাম: আল-মুহাল্লাব বিন আবু সুফরা। ৭৮ হিজরি মোতাবেক ৬৯৭ খ্রিষ্টাব্দে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তাকে খোরাসানের গভর্নর পদে নিয়োগ করেছিলেন। বৃহত্তর মাওয়ারাউন নাহার তথা ট্রান্সঅক্সিয়ানা অঞ্চলে তার নেতৃত্বে ইসলামি বিজয় যাত্রা লাভ করেছিল ব্যাপক বিস্তৃতি। -সম্পাদক
৩৩. আলপ আরসালান। ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। সেলজুক সাম্রাজ্যের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ সুলতান। ১০২৯ খ্রিষ্টাব্দে সেলজুক পরিবারে তার জন্ম। ১০৭২ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল। -সম্পাদক

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 উসমানি সাম্রাজ্যের উত্থান ও বেড়ে ওঠা

📄 উসমানি সাম্রাজ্যের উত্থান ও বেড়ে ওঠা


পূর্ব দিক থেকে তাতারদের মুহুর্মুহু আক্রমণ হচ্ছিল। সে সময় বহু পরিবার দলবেঁধে জন্মভূমি ত্যাগ করে আরও পশ্চিমে হিজরত করে যাচ্ছিল। কারণ, তাতাররা ছিল হিংস্র হায়নার মতো। তারা যেখানে প্রবেশ করে, সেখানে বর্বরতার পূর্ণ বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। এই মুহাজির কাফেলার মধ্যে ছিল তুর্কমেন তুর্কি কাই উপজাতির একটি গোত্রের প্রায় দুইশ পরিবার। তাদের নেতার নাম সুলাইমান শাহ। তাদের জন্মভূমি তুর্কমেনিস্তানের ঐতিহাসিক মার্ভ নগরের সন্নিকটে। কাফেলা পশ্চিম দিকে চলতে চলতে তুরস্কের পূর্বাঞ্চলের ভ্যান ল্যাকের³⁴ নিকটে পৌঁছে যায়। একসময় তাতারদের ত্রাস কিছুটা কমে এলে সুলাইমান জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে করে। কিন্তু নিয়তি ছিল অন্যকিছু। তাই যাত্রাপথে ফোরাত নদী পার হতে গিয়ে ডুবে মারা যায় সুলাইমান। তার চার পুত্র গন্তব্য নিয়ে মতভেদে জড়িয়ে পড়ে। দুই পুত্র সারু ইয়াতি ও তুগুর পিতার ইচ্ছা অনুযায়ী জন্মভূমিতে ফিরে যেতে চাইল। আর আর্তুগ্রুল ও দানদান উত্তরে যেতে চাইল। আনাতোলিয়ায় ঘুরে বেড়ানো কাফেলার নেতৃত্ব রইল আর্তুগ্রুলের হাতে। সে সেলজুক আমির আলাউদ্দিনের কাছে সাহায্য চেয়ে পুত্র সাওজিকে পাঠাল। তিনি তখন কিরমানের শাসক। তার রাজধানী কোনিয়াতে।³⁵ উদ্দেশ্য হলো তার কাছে রাজ্যের কোথাও কাফেলার বসবাসের জন্য কিছু জমি চেয়ে নেওয়া। কিন্তু পুত্র সাওজি পথেই মারা গেল। এমন সময়ই আর্তুগ্রুল দেখতে পেল দুটো বাহিনী লড়াইয়ে লিপ্ত, যার একটি মুসলিম। মুসলিম বাহিনীটি পরাজয়ের মুখে ছিল। আর্তুগ্রুল তৎক্ষণাৎ তাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে গেল। তার জীবনপণ সংগ্রামে পরাজয়োন্মুখ মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করল। কাকতালীয়ভাবে এই যোদ্ধারা ছিল আলাউদ্দিন সেলজুকির বাহিনী। তিনি আর্তুগ্রুলের সাহসিকতা ও নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে বাইজান্টাইন সীমান্তে তাকে পরগনা দান করেন। এর অন্যতম উদ্দেশ্য আর্তুগ্রুল যেন নিয়মিত ক্রুসেডারদের হামলার জবাব দেয় এবং নিজেও অভিযান চালাতে থাকে। এসব অভিযানে বিজিত অঞ্চলগুলো আর্তুগ্রুলের জায়গিরের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেত।
আর্তুগ্রুলের পুত্র উসমান। সেখানকার এক নেককার বান্দার সাথে উসমানের বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। প্রায়ই সে তার কাছে যেত, তার সাথে নানা বিষয়ে আলাপ করত। এর মধ্যে একবার উসমান দরবেশ লোকটির কন্যাকে দেখে পছন্দ করে সে তাকে বিয়ে করতে চাইল। কিন্তু মেয়ের বাবা সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন। এতে উসমান অত্যন্ত ব্যথিত হলো। একদিন সে এক আশ্চর্যজনক স্বপ্ন দেখল। ঘুম ভাঙতেই সে ছুটে গেল দরবেশ লোকটির কাছে। তাকে স্বপ্নের কথা খুলে বলল। স্বপ্ন শুনে নেককার লোকটি উসমানের সাথে তার কন্যাকে বিয়ে দিতে রাজি হয়ে গেলেন। সে মূলত স্বপ্ন দেখেছিল, আকাশের চাঁদ নেককার লোকটির বুক থেকে বের হয়ে আকাশে পূর্ণিমার মতো উজ্জ্বলরূপে স্থাপিত হলো।

তারপর আকাশ থেকে নেমে উসমানের বুকে স্থাপিত হলো। তখন উসমানের ঔরস থেকে একটি গাছ বের হলো। সে গাছ দ্রুত বড় হয়ে চারপাশ ছেয়ে ফেলল। এমনকি তার ছায়া ককেশাস, বলকান, তুরুস, এটলাস প্রভৃতি অঞ্চল অতিক্রম করে ফেলল। সে গাছের শেকড় থেকে প্রবাহিত হলো দজলা, ফোরাত, নীল ও বলকানের তুনা নদী। গাছের পাতাগুলো ছিল তরবারির মতো। বাতাসে সেসব পাতা উড়ে উড়ে কনস্টান্টিনোপলের দিকে যাচ্ছিল। এই বিস্ময়কর স্বপ্নে ভালো ইঙ্গিত ছিল দেখে দরবেশ তার মেয়েকে উসমানের কাছে বিয়ে দিতে রাজি হলেন। তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা করলেন যে, উসমানের বংশধরগণ একদিন বিশ্ব শাসন করবে।

টিকা:
৩৪. ভ্যানল্যাক: তুরস্কের সবচেয়ে বড় লেক। আনাতোলিয়ার পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত। -সম্পাদক
৩৫. কোনিয়া: তুরস্কের আনাতোলিয়া সীমান্তের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় বৃহত্তম শহর। -সম্পাদক

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সুলতান গাজি উসমান প্রথম (৬৯৮-৭২৬ হি./১২৯৯-১৩২৬ খ্রি.)

📄 সুলতান গাজি উসমান প্রথম (৬৯৮-৭২৬ হি./১২৯৯-১৩২৬ খ্রি.)


উসমানি সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করে আর্তুগ্রুল ৬৮৭ হিজরিতে ইনতেকাল করেন। তার পুত্র উসমান দায়িত্ব গ্রহণ করেই আলাউদ্দিনের সমর্থন নিয়ে পরগানার সীমানা বৃদ্ধি করতে থাকেন। ৬৯৯ হিজরিতে মোঙ্গলরা আলাউদ্দিনের রাজ্য কিরমানে ভয়াবহ হামলা করে। আলাউদ্দিন পালিয়ে বাইজান্টাইন এলাকায় চলে যান। এ বছরই আলাউদ্দিন ইনতেকাল করেন। তার পুত্র গিয়াসুদ্দিন রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করে। কিন্তু মোঙ্গলরা গিয়াসুদ্দিনকে শহিদ করে দেয়। আর্তুগ্রুল ছিলেন আলাউদ্দিনের নিয়োগপ্রাপ্ত। কিন্তু তাদের রাজ্য দখল হয়ে যাওয়ার পর উসমান একজন স্বাধীন শাসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন। এখান থেকেই সূচনা উসমানি সাম্রাজ্যের।

উসমান তার অধীনস্থ অঞ্চলে একটি স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করলেন। রাজধানী নির্মাণ করলেন 'ইয়ানি শহর' বা নতুন নগরী নামের একটি শহরে। রাজ্যের পতাকা তৈরি করলেন। সেই পতাকা আজও তুরস্কের পতাকা হিসেবে টিকে আছে। রাজ্য গড়েই তিনি আনাতোলিয়ার সকল রোমান রাজাদেরকে ইসলামের দাওয়াত পাঠালেন। আর ইসলাম গ্রহণ না করলে তার বশ্যতা স্বীকার করে এবং জিজিয়া দিয়ে আনাতোলিয়ায় থাকতে হবে মর্মে বার্তা পাঠালেন। তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা হলে লড়াইয়ের মাধ্যমে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বার্তাও পাঠান। ছোট ছোট রাজ্যের রাজারা ভীত হয়ে মোঘলদের সাহায্য প্রার্থনা করল। এমন হতে পারে তা আগেই অনুমিত ছিল বিধায় উসমান প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। উসমানের পুত্র উরখানের নেতৃত্বে একটি বাহিনী মোঙ্গলদের মোকাবিলায় অবতীর্ণ হয়। মোঙ্গল বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে তিনি ফেরার পথে বুরসা³⁶ নগরী জয় করেন। সময়টা ছিল ৭১৭ হিজরি। বুরসা বিজয় করে সেখানে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করেন। তার অধিবাসীদের সাথে উরখান যে আচরণ করেন তাতে মুগ্ধ হয়ে তারা উসমানি বাহিনীকে ত্রিশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা উপহার দেন এবং তাদের শাসক আফরিনুস ইসলাম কবুল করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি উসমানি বাহিনীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্যে পরিণত হয়েছিলেন।

৭২৬ হিজরিতে পুত্র উরখানের হাতে শাসনভার অর্পণ করে উসমান শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। বুরসাতে তাকে দাফন করা হয়। এখানেই পরবর্তী উসমানি সুলতানদের দাফন করা হতো।

উসমান নিজেকে গাজি উসমান হিসেবে পরিচয় দিতেন। গাজি দ্বারা বোঝানো হতো মুজাহিদ। তিনি বোঝাতে চাইতেন যে, হয়তো গাজি নয়তো শহিদ, এটাই তো মুমিনের জীবন। জিহাদের প্রতি ভালোবাসার চিহ্ন তার এই উপাধি। তার অনুকরণে পরবর্তী অনেক উসমানি সুলতানই নিজেদের গাজি উপাধিতে ভূষিত করেন।

টিকা:
৩৬. বুরসা: তুরস্কের চতুর্থ ঘনবসতিপূর্ণ শহর এবং অন্যতম শিল্প নগরী। -সম্পাদক

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 উসমানিদের ইউরোপ যাত্রা

📄 উসমানিদের ইউরোপ যাত্রা


সে সময় বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য অতি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। উরখান দেখলেন কনস্টান্টিনোপলে আক্রমণ করার মোক্ষম সুযোগ তার সামনে। যেই ভাবা সেই কাজ। তবে তিনি গতানুগতিক আক্রমণের দিকে গেলেন না। ইতিপূর্বে যতবার মুসলিমরা কনস্টান্টিনোপল আক্রমণ করেছিল প্রত্যেকবার ছিল পূর্ব দিক থেকে। আর প্রতিবারই ব্যর্থতা নিয়ে ফিরে যেতে হয়েছিল। তাই উরখান সিদ্ধান্ত নিলেন প্রথমে নগরীর পশ্চিমের অঞ্চলগুলো দখলে নিয়ে নেবেন। শহরটিকে সব দিক থেকে ঘিরে ফেলে চূড়ান্ত আক্রমণ করাই ছিল তার পরিকল্পনা।

তখন পর্যন্ত উসমানিদের নৌবহর ছিল না। তাই প্রথম কাজ ছিল প্রতিপক্ষের নৌযানগুলো দখল করা। তাই উরখানের পুত্র সুলাইমান চল্লিশ জন বীর মুজাহিদের ছোট এক বাহিনী নিয়ে নগরীর পশ্চিম তীরের সকল নৌযান কবজা করে নিলেন। তারপর পূর্বে ফিরে এসে মূল বাহিনী নিয়ে পুনরায় পশ্চিমে অভিযান চালালেন। এভাবে সহজেই নগরের পশ্চিম পাশের বিস্তীর্ণ ভূমিতে এবং গ্যালিপলি(৩৮) উপদ্বীপে উসমানিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হলো। অশেষ সামরিক গুরুত্বের অধিকারী অনেক দুর্গবিশিষ্ট গ্যালিপলি উপদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারাটা ছিল বিরাট টার্নিং পয়েন্ট। কারণ, ভূমধ্যসাগর থেকে কনস্টান্টিনোপলে পৌঁছার একমাত্র নৌপথ দার্দানেলিস(৩৯) প্রণালি। উপদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই দার্দানেলিস প্রণালির ওপর উসমানি কতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

৭৬০ হিজরিতে উরখানের বড় পুত্র উসমানি বাহিনীর প্রধান সেনাপতি সুলাইমান ঘোড়া থেকে পড়ে ইন্তেকাল করেন। পরের বছর সুলতান উরখান ইন্তেকাল করেন। সাম্রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন তার দ্বিতীয় পুত্র মুরাদ।

টিকা:
৩৮. গ্যালিপলি: তুরস্কের পশ্চিমাঞ্চলে ইউরোপীয় অংশে অবস্থিত একটি উপদ্বীপ। এর পশ্চিমেই জিয়ান সাগর এবং পূর্বে দার্দানেলিস প্রণালি অবস্থিত। -সম্পাদক
৩৯. দার্দানেলিস: মারমারা এবং এজিয়ান সাগর এই প্রণালির মাঝ দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। -সম্পাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00