📄 দ্বিতীয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ (১৩৮৫ হিজরি/১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দ)
অবশেষে ১৩৬৮ হিজরিতে জাতিসংঘ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাতে বাধ্য হয়। জাতিসংঘ থেকে বলা হয়, বিদেশি সৈনিকরা কাশ্মীর ত্যাগ করবে। তারপর সেখানে এক গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। গণভোটেই নির্ধারিত হবে কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ। প্রকাশ্যভাবে ইন্ডিয়া এই যুদ্ধবিরতির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে। কিন্তু অধিকৃত অংশে তাদের সেনা উপস্থিতি অব্যাহত থাকে। এরপর ১৩৭৭ হিজরিতে সমস্ত রাখঢাক ছুঁড়ে ফেলে প্রকাশ্যেই কাশ্মীরকে ইন্ডিয়ার অংশ বলে ঘোষণা করা হয়। অধিকৃত অঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে বাহির থেকে হিন্দুদের কাশ্মীরে পাঠানো হয়। আর মুসলিমদের ওপর অত্যাচার-জুলুম যেন পুলিশদের তিন বেলা খাবারের মতোই রুটিনমাফিক কাজ হয়ে দাঁড়ায়।
শুধু শারীরিক ও আর্থিক নিপীড়নই নয়; বরং কাশ্মীরি মুসলিমদের স্বাধীনতার স্বাদ ভুলিয়ে দিতে ও চিন্তাগতভাবে দুর্বল করে দিতে তারা নানা উপকরণ ব্যবহার করে। গোয়েন্দা সংস্থার লোকদেরকে স্পেন, রাশিয়াতে প্রেরণ করা হয়। তারা স্পেনিশ ও তাতার মুসলিমদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছিল সে বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করে আসে।
মুসলমানদের দ্বীন ও সংস্কৃতি ধ্বংস করার ভারতীয় ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে মুসলমানরা ঝাঁপিয়ে পড়ে কঠিন সংগ্রামে। জিহাদের ধ্বনি উচ্চারিত হয় দিকে দিকে। ইত্তিহাদে ইসলামি নামে মুজাহিদদের একটি ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম গড়ে ওঠে। রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে 'তাহরিরে জম্মু-কাশ্মীর' নামে নতুন সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে।
ঠিক সে সময় পাকিস্তানেও অনেক রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জামাআতে ইসলামি। তারা পাকিস্তানজুড়ে শরিয়া প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা হলেন আবুল আলা মওদুদি।
নবগঠিত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন মুহাম্মাদ আলি জিন্নাহ। তার সময়েই প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কিছুদিন পর জিন্নাহর ইনতেকাল হয়। তার উত্তরসূরি হন খাজা নাজিমুদ্দিন। তারপর ক্ষমতায় বসেন গোলাম মুহাম্মাদ। তারপর আসেন সেকান্দার মির্জা। তার সময়ে পাকিস্তান থেকে ডোমিনিয়নব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়। ১৩৭৮ হিজরিতে (১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে) ক্ষমতায় আসেন আইয়ুব খান। তিনি ছিলেন একজন সামরিক শাসক। সেনাবাহিনীর ওপর ভর করে দীর্ঘদিন দেশ শাসন করেন।
কিছুদিন পর কাশ্মীর ইস্যুতে আবারও ভারত-পাকিস্তানের মাঝে যুদ্ধ বাধে। যুদ্ধের শিখা পশ্চিম পাকিস্তানেই বেশি ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, পূর্ব সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করলে চীনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার হুমকি ছিল। পূর্ব থেকেই চীন-ভারত সীমান্ত এলাকায় উভয় দেশের দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। ১৩৬২ হিজরির এক লড়াইয়ে ভারত চীনের কাছে পরাজিত হয়। তারই জের ধরে চীন পাকিস্তানকে সমর্থন জানিয়েছিল। এই যুদ্ধে পাকিস্তানি যোদ্ধারা দারুণ সাহসের প্রদর্শনী করে। যুদ্ধে পাকিস্তান যখন জয়ের দ্বারপ্রান্তে তখনই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ থেকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হলো। তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার অধীন উজবেকিস্তানে এই পরিষদের 'তাসখন্দ বৈঠক'টি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিদ্ধান্ত হয়, শান্তিপূর্ণভাবে কাশ্মীর সমস্যার সমাধানের জন্য কাশ্মীর যুদ্ধের আগের অবস্থানে ফিরে যাবে। প্রত্যেকেই সকল যুদ্ধবন্দি ফিরিয়ে দেবে। এভাবে কৌশলি হস্তক্ষেপে পাকিস্তান ও কাশ্মীরের মুসলিমদের হাতের মুঠো থেকে বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারত ও খ্রিষ্টানবিশ্ব পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ঐক্য ভাঙার প্রচেষ্টা চালাতে থাকে—যাতে মুসলমানরা বিভক্ত পড়ে এবং তাদের শক্তি ও প্রতিপত্তি দুর্বল হয়ে যায়। এদিকে পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) রাজনৈতিক অঙ্গনে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের আবির্ভাব ঘটে। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা দাবি করেন। অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টো। পূর্ব পাকিস্তানে একের পর এক বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। অবশেষে ১৯৬৯ সাল মোতাবেক ১৩৮৯ হিজরি সনে (গণঅভ্যুত্থানের মুখে) প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন। তারপর ক্ষমতায় আসেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। তিনি ছিলেন শিয়া মতাবলম্বী।
তার দমননীতির কারণে দেশে অস্থিরতা ও নৈরাজ্য আরও বেড়ে যায়। এই উত্তাল সময়ে ভারত শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের এই আন্দোলনের সমর্থনে দাঁড়িয়ে যায় এবং হিন্দুদেরকে তার সমর্থন ও সাহায্যে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানায়। আমেরিকাও শেখ মুজিবকে সমর্থন করে—আবার একইসঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলি ভুট্টোর আন্দোলনকেও সমর্থন করে। শিয়া ও কাদিয়ানিরা ভুট্টোর সাহায্যে এগিয়ে আসে। পাকিস্তানকে দুই ভাগে বিভক্ত করতে এভাবে দানা বেঁধে ওঠে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত।
১৯৭১ সালে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন মুলতবি করাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে ওঠে। অস্থিরতা ও গোলযোগ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। সেই সঙ্গে ব্যাপক অবনতি ঘটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির। এমন সময় গ্রেফতার করা হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে। ফলে পূর্বপাকিস্তানজুড়ে বয়ে যায় তীব্র বিক্ষোভ ও আন্দোলনের জোয়ার। অবস্থা বেগতিক দেখে প্রায় নয় মিলিয়ন মানুষ পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয়—যাদের বেশির ভাগই হিন্দু। ভারতও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। বিদ্রোহীরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। বিশেষত ইহুদি গোষ্ঠী। তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করে, তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাহায্য করবে।
একপর্যায়ে বাংলাদেশে স্বাধীন পতাকা ওড়ে। নতুন দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু ১৯৭৫ সালে এসে শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ক্ষমতায় আসেন খন্দকার মুশতাক আহমদ। কিন্তু এরপর টানা গোলযোগ চলতে থাকে। তারপর ক্ষমতায় আসেন খালেদ মোশাররফ। তারপর প্রেসিডেন্ট হন জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালে একটি সামরিক ক্যুতে তিনিও নিহত হন। তারপর প্রেসিডেন্ট হন আব্দুস সাত্তার। এরপর ক্ষমতায় আসেন সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। এরশাদ পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বরাবরই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছেন খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা।
অন্যদিকে ইয়াহিয়া খানের পর পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসেন জুলফিকার আলি ভুট্টো। একপর্যায়ে পাকিস্তানে রাজনৈতিক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। জুলফিকার আলি ভুট্টোর পদত্যাগের দাবিতে বিশাল আন্দোলন শুরু হয়। অবশেষে ১৯৭৭ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন মুহাম্মদ জিয়াউল হক। ১৯৭৮ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জামাতে ইসলামীর সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এই সংগঠনের আমির ছিলেন জিয়াউল হকের মামা। তিনি জামাতে ইসলামীর অনেক নেতাকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন। তবুও সামরিক শাসন জারি করার কারণে জামাতে ইসলামি জিয়াউল হকের বিরোধিতা করে। ১৯৭৯ সালে জনৈক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে খুনের অভিযোগে জুলফিকার আলি ভুট্টোকে ফাঁসি দেওয়া হয়। জিয়াউল হক আমেরিকার সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী ছিলেন। রুশবিরোধী জিহাদে তিনি আফগান মুজাহিদদের সাহায্য করেন। আফগান শরণার্থীদের জন্য তিনি সীমান্ত খুলে দেন। আফগানিদের তিনি অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেন। অস্ত্র যোগানদাতাদের তালিকায় আমেরিকা ছিল সবার আগে। তবে তা মুসলমানদের প্রতি ভালোবাসার কারণে নয়; বরং প্রতিপক্ষ রাশিয়াকে দমানোর লক্ষ্যে এবং উভয় দেশের মাঝে চলমান শীতল যুদ্ধের কারণে। শেষ দিনগুলোতে জিয়াউল হক শরিয়া শাসন জারির ঘোষণা দিয়েছিলেন। ১৯৮৮ সালে একটি বোমার বিস্ফোরণে তিনি প্রাণ হারান। কারা বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল তা আজও পর্যন্ত জানা যায়নি। তারপর গোলাম ইসহাক খান ক্ষমতায় আসেন এবং মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেন।
অবশেষে ১৩৬৮ হিজরিতে জাতিসংঘ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাতে বাধ্য হয়। জাতিসংঘ থেকে বলা হয়, বিদেশি সৈনিকরা কাশ্মীর ত্যাগ করবে। তারপর সেখানে এক গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। গণভোটেই নির্ধারিত হবে কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ। প্রকাশ্যভাবে ইন্ডিয়া এই যুদ্ধবিরতির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে। কিন্তু অধিকৃত অংশে তাদের সেনা উপস্থিতি অব্যাহত থাকে। এরপর ১৩৭৭ হিজরিতে সমস্ত রাখঢাক ছুঁড়ে ফেলে প্রকাশ্যেই কাশ্মীরকে ইন্ডিয়ার অংশ বলে ঘোষণা করা হয়। অধিকৃত অঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে বাহির থেকে হিন্দুদের কাশ্মীরে পাঠানো হয়। আর মুসলিমদের ওপর অত্যাচার-জুলুম যেন পুলিশদের তিন বেলা খাবারের মতোই রুটিনমাফিক কাজ হয়ে দাঁড়ায়।
শুধু শারীরিক ও আর্থিক নিপীড়নই নয়; বরং কাশ্মীরি মুসলিমদের স্বাধীনতার স্বাদ ভুলিয়ে দিতে ও চিন্তাগতভাবে দুর্বল করে দিতে তারা নানা উপকরণ ব্যবহার করে। গোয়েন্দা সংস্থার লোকদেরকে স্পেন, রাশিয়াতে প্রেরণ করা হয়। তারা স্পেনিশ ও তাতার মুসলিমদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছিল সে বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করে আসে।
মুসলমানদের দ্বীন ও সংস্কৃতি ধ্বংস করার ভারতীয় ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে মুসলমানরা ঝাঁপিয়ে পড়ে কঠিন সংগ্রামে। জিহাদের ধ্বনি উচ্চারিত হয় দিকে দিকে। ইত্তিহাদে ইসলামি নামে মুজাহিদদের একটি ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম গড়ে ওঠে। রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে 'তাহরিরে জম্মু-কাশ্মীর' নামে নতুন সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে।
ঠিক সে সময় পাকিস্তানেও অনেক রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জামাআতে ইসলামি। তারা পাকিস্তানজুড়ে শরিয়া প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা হলেন আবুল আলা মওদুদি।
নবগঠিত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন মুহাম্মাদ আলি জিন্নাহ। তার সময়েই প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কিছুদিন পর জিন্নাহর ইনতেকাল হয়। তার উত্তরসূরি হন খাজা নাজিমুদ্দিন। তারপর ক্ষমতায় বসেন গোলাম মুহাম্মাদ। তারপর আসেন সেকান্দার মির্জা। তার সময়ে পাকিস্তান থেকে ডোমিনিয়নব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়। ১৩৭৮ হিজরিতে (১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে) ক্ষমতায় আসেন আইয়ুব খান। তিনি ছিলেন একজন সামরিক শাসক। সেনাবাহিনীর ওপর ভর করে দীর্ঘদিন দেশ শাসন করেন।
কিছুদিন পর কাশ্মীর ইস্যুতে আবারও ভারত-পাকিস্তানের মাঝে যুদ্ধ বাধে। যুদ্ধের শিখা পশ্চিম পাকিস্তানেই বেশি ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, পূর্ব সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করলে চীনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার হুমকি ছিল। পূর্ব থেকেই চীন-ভারত সীমান্ত এলাকায় উভয় দেশের দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। ১৩৬২ হিজরির এক লড়াইয়ে ভারত চীনের কাছে পরাজিত হয়। তারই জের ধরে চীন পাকিস্তানকে সমর্থন জানিয়েছিল। এই যুদ্ধে পাকিস্তানি যোদ্ধারা দারুণ সাহসের প্রদর্শনী করে। যুদ্ধে পাকিস্তান যখন জয়ের দ্বারপ্রান্তে তখনই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ থেকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হলো। তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার অধীন উজবেকিস্তানে এই পরিষদের 'তাসখন্দ বৈঠক'টি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিদ্ধান্ত হয়, শান্তিপূর্ণভাবে কাশ্মীর সমস্যার সমাধানের জন্য কাশ্মীর যুদ্ধের আগের অবস্থানে ফিরে যাবে। প্রত্যেকেই সকল যুদ্ধবন্দি ফিরিয়ে দেবে। এভাবে কৌশলি হস্তক্ষেপে পাকিস্তান ও কাশ্মীরের মুসলিমদের হাতের মুঠো থেকে বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারত ও খ্রিষ্টানবিশ্ব পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ঐক্য ভাঙার প্রচেষ্টা চালাতে থাকে—যাতে মুসলমানরা বিভক্ত পড়ে এবং তাদের শক্তি ও প্রতিপত্তি দুর্বল হয়ে যায়। এদিকে পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) রাজনৈতিক অঙ্গনে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের আবির্ভাব ঘটে। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা দাবি করেন। অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টো। পূর্ব পাকিস্তানে একের পর এক বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। অবশেষে ১৯৬৯ সাল মোতাবেক ১৩৮৯ হিজরি সনে (গণঅভ্যুত্থানের মুখে) প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন। তারপর ক্ষমতায় আসেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। তিনি ছিলেন শিয়া মতাবলম্বী।
তার দমননীতির কারণে দেশে অস্থিরতা ও নৈরাজ্য আরও বেড়ে যায়। এই উত্তাল সময়ে ভারত শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের এই আন্দোলনের সমর্থনে দাঁড়িয়ে যায় এবং হিন্দুদেরকে তার সমর্থন ও সাহায্যে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানায়। আমেরিকাও শেখ মুজিবকে সমর্থন করে—আবার একইসঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলি ভুট্টোর আন্দোলনকেও সমর্থন করে। শিয়া ও কাদিয়ানিরা ভুট্টোর সাহায্যে এগিয়ে আসে। পাকিস্তানকে দুই ভাগে বিভক্ত করতে এভাবে দানা বেঁধে ওঠে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত।
১৯৭১ সালে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন মুলতবি করাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে ওঠে। অস্থিরতা ও গোলযোগ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। সেই সঙ্গে ব্যাপক অবনতি ঘটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির। এমন সময় গ্রেফতার করা হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে। ফলে পূর্বপাকিস্তানজুড়ে বয়ে যায় তীব্র বিক্ষোভ ও আন্দোলনের জোয়ার। অবস্থা বেগতিক দেখে প্রায় নয় মিলিয়ন মানুষ পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয়—যাদের বেশির ভাগই হিন্দু। ভারতও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। বিদ্রোহীরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। বিশেষত ইহুদি গোষ্ঠী। তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করে, তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাহায্য করবে।
একপর্যায়ে বাংলাদেশে স্বাধীন পতাকা ওড়ে। নতুন দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু ১৯৭৫ সালে এসে শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ক্ষমতায় আসেন খন্দকার মুশতাক আহমদ। কিন্তু এরপর টানা গোলযোগ চলতে থাকে। তারপর ক্ষমতায় আসেন খালেদ মোশাররফ। তারপর প্রেসিডেন্ট হন জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালে একটি সামরিক ক্যুতে তিনিও নিহত হন। তারপর প্রেসিডেন্ট হন আব্দুস সাত্তার। এরপর ক্ষমতায় আসেন সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। এরশাদ পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বরাবরই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছেন খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা।
অন্যদিকে ইয়াহিয়া খানের পর পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসেন জুলফিকার আলি ভুট্টো। একপর্যায়ে পাকিস্তানে রাজনৈতিক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। জুলফিকার আলি ভুট্টোর পদত্যাগের দাবিতে বিশাল আন্দোলন শুরু হয়। অবশেষে ১৯৭৭ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন মুহাম্মদ জিয়াউল হক। ১৯৭৮ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জামাতে ইসলামীর সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এই সংগঠনের আমির ছিলেন জিয়াউল হকের মামা। তিনি জামাতে ইসলামীর অনেক নেতাকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন। তবুও সামরিক শাসন জারি করার কারণে জামাতে ইসলামি জিয়াউল হকের বিরোধিতা করে। ১৯৭৯ সালে জনৈক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে খুনের অভিযোগে জুলফিকার আলি ভুট্টোকে ফাঁসি দেওয়া হয়। জিয়াউল হক আমেরিকার সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী ছিলেন। রুশবিরোধী জিহাদে তিনি আফগান মুজাহিদদের সাহায্য করেন। আফগান শরণার্থীদের জন্য তিনি সীমান্ত খুলে দেন। আফগানিদের তিনি অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেন। অস্ত্র যোগানদাতাদের তালিকায় আমেরিকা ছিল সবার আগে। তবে তা মুসলমানদের প্রতি ভালোবাসার কারণে নয়; বরং প্রতিপক্ষ রাশিয়াকে দমানোর লক্ষ্যে এবং উভয় দেশের মাঝে চলমান শীতল যুদ্ধের কারণে। শেষ দিনগুলোতে জিয়াউল হক শরিয়া শাসন জারির ঘোষণা দিয়েছিলেন। ১৯৮৮ সালে একটি বোমার বিস্ফোরণে তিনি প্রাণ হারান। কারা বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল তা আজও পর্যন্ত জানা যায়নি। তারপর গোলাম ইসহাক খান ক্ষমতায় আসেন এবং মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেন।
📄 ভারতীয় মুসলিমদের বর্তমান অবস্থা
ভারতের বর্তমান মুসলিম জনসংখ্যা নয় কোটির বেশি (রচনাকালীন জরিপ)। এই বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত মার খাচ্ছে হিন্দুদের হাতে। নানারকম অত্যাচার ও অপমানের জীবনই যেন তাদের নিয়তি। প্রায়ই বিভিন্ন প্রদেশে মসজিদ ভেঙে ফেলা হচ্ছে।
প্রশ্ন জাগে, উত্তর আফ্রিকা কিংবা প্রাচীন রোম-পারস্য অঞ্চলে যেভাবে দ্রুত ইসলামের বিস্তার ঘটেছিল, ভারত উপমহাদেশে সেরকম হয়নি কেন? অথচ শতাব্দীর পর শতাব্দী সমগ্র ভারত শাসন করেছে মুসলিম শাসকগণ। এর তত্ত্ব তালাশ করতে গেলে বেশকিছু ব্যাপার পাওয়া যায়। যেমন:
ভারত শাসনকারী মুসলিম গোষ্ঠীগুলোর অধিকাংশ ছিল ইসলাম গ্রহণে তুলনামূলক নবীন। দেখা যায়, মাত্র কয়েক প্রজন্ম আগে তাদের পূর্বপুরুষ ইসলাম কবুল করেছিল। ইসলামের পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানের সাথে তাদের দৃঢ় সম্পর্ক ছিল না। সঠিক দ্বীনি পরিবেশে তারা লালিত হয়নি। এসব কারণে তাদের দ্বীনি চেতনাবোধ ছিল তুলনামূলক কম। রাজ্যশাসন আর সাম্রাজ্য বিস্তারেই ছিল তাদের মূল মনোযোগ। পাশাপাশি তারা সবাই ছিল অনারব বিভিন্ন তুর্কি বা আফগান গোত্র থেকে আগত। আরবি ভাষার সাথে সম্পর্কহীন হওয়ায় দ্বীনি ইলম ও অনেক প্রয়োজনীয় বিষয় থেকেও তারা ছিল একপ্রকার বিচ্ছিন্ন।
কিছু কিছু শাসক ছিল, যারা জনগণের মনোরঞ্জনের জন্য সব ধর্মকেই প্রশ্রয় দিত। সর্বোচ্চ মাত্রার স্বাধীনতা ভোগ করতে পারত সব ধর্মের অনুসারীরা। ইসলামি রাষ্ট্রে অনুমোদিত হতে পারে না এমন অনেক বিধর্মী প্রথাও তারা নিষিদ্ধ করেনি। যেমন হিন্দু ধর্মের অমানবিক সতীদাহ প্রথা। অনেক হারাম বিষয়কেই অনুমোদন দিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার করা হতো। যেমন মুশরিক নারীকে বিয়ে করা। এমনকি মুসলিম নারীকেও মুশরিক পুরুষের বিয়ে করার সুযোগ দেওয়া হতো। আবার অনেক বৈধ হালাল বিষয়কে নিষিদ্ধ করা হতো বিধর্মীদের খুশি করতে। যেমন গরু জবাই। কারণ, হিন্দুরা গরুকে দেবতা মনে করে। আর কোনো শাসক তো সব ছাড়িয়ে, হিন্দু মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মীয় বিশ্বাস সংমিশ্রণ করে নতুন ধর্ম তৈরিতেও পিছপা হয়নি। শাসকদের ধারণা ছিল, এসব করে তারা নিজের শাসনকে সুসংহত করতে পারবে। এজন্য সবাইকে খুশি করতে যা দরকার সবই করত। এসব কারণে উপমহাদেশে অনেক নতুন ধর্ম চালু হয়। শিখ ধর্ম তার অন্যতম।
ঔপনিবেশিক শক্তি সবসময় মুসলমানদের দমনে সক্রিয় থেকেছে। মুসলিমবিরোধিতায় হিন্দুদের সাথে তাল মিলিয়েছে। মুসলমানদের দুর্বল করতে সৃষ্টি করেছে কাদিয়ানি, আহমাদিসহ বিভিন্ন বাতিল ফেরকা। এসব ফিরকাকে আজও তারা বিশ্বজুড়ে কাজ করার মদদ জোগায়। মুসলিমদের পথভ্রষ্ট করতে, তাদের ঐক্য বরবাদ করতে এদের ব্যবহার করে।
ভারতের বর্তমান মুসলিম জনসংখ্যা নয় কোটির বেশি (রচনাকালীন জরিপ)। এই বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত মার খাচ্ছে হিন্দুদের হাতে। নানারকম অত্যাচার ও অপমানের জীবনই যেন তাদের নিয়তি। প্রায়ই বিভিন্ন প্রদেশে মসজিদ ভেঙে ফেলা হচ্ছে।
প্রশ্ন জাগে, উত্তর আফ্রিকা কিংবা প্রাচীন রোম-পারস্য অঞ্চলে যেভাবে দ্রুত ইসলামের বিস্তার ঘটেছিল, ভারত উপমহাদেশে সেরকম হয়নি কেন? অথচ শতাব্দীর পর শতাব্দী সমগ্র ভারত শাসন করেছে মুসলিম শাসকগণ। এর তত্ত্ব তালাশ করতে গেলে বেশকিছু ব্যাপার পাওয়া যায়। যেমন:
ভারত শাসনকারী মুসলিম গোষ্ঠীগুলোর অধিকাংশ ছিল ইসলাম গ্রহণে তুলনামূলক নবীন। দেখা যায়, মাত্র কয়েক প্রজন্ম আগে তাদের পূর্বপুরুষ ইসলাম কবুল করেছিল। ইসলামের পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানের সাথে তাদের দৃঢ় সম্পর্ক ছিল না। সঠিক দ্বীনি পরিবেশে তারা লালিত হয়নি। এসব কারণে তাদের দ্বীনি চেতনাবোধ ছিল তুলনামূলক কম। রাজ্যশাসন আর সাম্রাজ্য বিস্তারেই ছিল তাদের মূল মনোযোগ। পাশাপাশি তারা সবাই ছিল অনারব বিভিন্ন তুর্কি বা আফগান গোত্র থেকে আগত। আরবি ভাষার সাথে সম্পর্কহীন হওয়ায় দ্বীনি ইলম ও অনেক প্রয়োজনীয় বিষয় থেকেও তারা ছিল একপ্রকার বিচ্ছিন্ন।
কিছু কিছু শাসক ছিল, যারা জনগণের মনোরঞ্জনের জন্য সব ধর্মকেই প্রশ্রয় দিত। সর্বোচ্চ মাত্রার স্বাধীনতা ভোগ করতে পারত সব ধর্মের অনুসারীরা। ইসলামি রাষ্ট্রে অনুমোদিত হতে পারে না এমন অনেক বিধর্মী প্রথাও তারা নিষিদ্ধ করেনি। যেমন হিন্দু ধর্মের অমানবিক সতীদাহ প্রথা। অনেক হারাম বিষয়কেই অনুমোদন দিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার করা হতো। যেমন মুশরিক নারীকে বিয়ে করা। এমনকি মুসলিম নারীকেও মুশরিক পুরুষের বিয়ে করার সুযোগ দেওয়া হতো। আবার অনেক বৈধ হালাল বিষয়কে নিষিদ্ধ করা হতো বিধর্মীদের খুশি করতে। যেমন গরু জবাই। কারণ, হিন্দুরা গরুকে দেবতা মনে করে। আর কোনো শাসক তো সব ছাড়িয়ে, হিন্দু মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মীয় বিশ্বাস সংমিশ্রণ করে নতুন ধর্ম তৈরিতেও পিছপা হয়নি। শাসকদের ধারণা ছিল, এসব করে তারা নিজের শাসনকে সুসংহত করতে পারবে। এজন্য সবাইকে খুশি করতে যা দরকার সবই করত। এসব কারণে উপমহাদেশে অনেক নতুন ধর্ম চালু হয়। শিখ ধর্ম তার অন্যতম।
ঔপনিবেশিক শক্তি সবসময় মুসলমানদের দমনে সক্রিয় থেকেছে। মুসলিমবিরোধিতায় হিন্দুদের সাথে তাল মিলিয়েছে। মুসলমানদের দুর্বল করতে সৃষ্টি করেছে কাদিয়ানি, আহমাদিসহ বিভিন্ন বাতিল ফেরকা। এসব ফিরকাকে আজও তারা বিশ্বজুড়ে কাজ করার মদদ জোগায়। মুসলিমদের পথভ্রষ্ট করতে, তাদের ঐক্য বরবাদ করতে এদের ব্যবহার করে।