📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 হিন্দুস্তানের স্বাধীনতা ও দেশভাগ

📄 হিন্দুস্তানের স্বাধীনতা ও দেশভাগ


ইংরেজরা সর্বক্ষেত্রে মুসলিমদের ওপর হিন্দুদের প্রাধান্য দিত ঠিক, তবে এই শ্বেতসন্ত্রাসীদের নিকট মূলত ভিনজাতি প্রতিটি গোষ্ঠীর ওপরই রয়েছে অবহেলা। সফলতার নাগাল পেতে যে কাউকে সেতু বানানোর হীন উপায় অবলম্বনেও তাদের কুণ্ঠা নেই। ইংরেজরা যুদ্ধে লড়ার জন্য সেনাবাহিনীতে প্রচুর পরিমাণে হিন্দুস্তানি সদস্য অন্তর্ভুক্ত করে। কারণ, লড়াইয়ের ময়দানে নিজেদের গা বাঁচিয়ে অন্যদের সামনে পাঠিয়ে দেওয়াটা ছিল খুবই নিরাপদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন চরম আকার ধারণ করে, জাপানি বাহিনী মায়ানমার পর্যন্ত চলে আসে, তখন হিন্দুস্তান নিয়ে শঙ্কায় পড়ে যায় ইংরেজ সরকার। কারণ, জাপানি আক্রমণের সুযোগে হিন্দুস্তানিরা তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে উঠতে পারে। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্রিটিশ সরকার ঘোষণা দেয়, যুদ্ধ শেষ হলে হিন্দুস্তানকে স্বাধীনতা দেওয়া হবে। এই ভিত্তিতে হিন্দুস্তানিদেরকে যুদ্ধে আরও বেশি সক্রিয় করে তোলে ব্রিটেন।

এ সময় ভারতীয় বাহিনীকে বিপজ্জনক সব অভিযানে সামনে ঠেলে দিতে থাকে। যার উদাহরণ দেখা যায় আলামেইন ময়দানে। সে সময় মাইনফিল্ড পরিষ্কার করার জন্য পশু ব্যবহার করা হতো। আত্মহুতি দিয়ে নিরীহ প্রাণীগুলো ময়দানকে মাইনমুক্ত করত। এই যুদ্ধে একটি মাইনফিল্ড পরিষ্কার করার কাজে পর্যাপ্ত পশু ছিল না। ফলে আত্মহুতি দিতে এক দল ভারতীয় সৈনিককে মাইনফিল্ডে ছেড়ে দেওয়া হলে সব সৈনিক মারা পড়ে। এ ঘটনায় হিন্দু-মুসলিম সবার অন্তরেই ইংরেজদের প্রতি নতুন করে ক্ষোভ বৃদ্ধি পায়।

১৩৬৬ হিজরিতে (১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে) বিভক্ত হয়ে দুটি নতুন দেশের জন্মের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয় উপমহাদেশ। একটি দেশ হিন্দুদের, যার নাম ইন্ডিয়া। অন্যটি মুসলিমদের, যার নাম পাকিস্তান তথা পবিত্র ভূমি। হিন্দুস্তানের প্রতিটি স্বাধীন রাজ্যকে নতুন দুটি দেশের যেকোনো একটিতে যোগ দেওয়ার কিংবা চাইলে স্বাধীন থাকার সুযোগ দেওয়া হয়ে। এই বিভক্তি গান্ধী ও তার নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস নেতারা মেনে নিতে চায়নি। তারা চেয়েছিল অখণ্ড ভারত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মুসলিম লিগের চাওয়াই শেষ পর্যন্ত পূর্ণ হয়।

উত্তরপূর্ব ভারত তথা পূর্ব বাংলা ও আসামের কিছু অংশ এবং উত্তরপশ্চিম ভারতের কিছু অঞ্চল তথা পাঞ্জাব প্রদেশের বড় একটা অংশ, সিন্ধু প্রদেশ ও বেলুচিস্তান মিলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের পত্তন হয়। যার রাজধানী করা হয় করাচিকে। আর বাকি সমস্ত অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় ইন্ডিয়া, যার রাজধানী প্রথমে ছিল দিল্লি, পরে হয় নয়াদিল্লি।

পাকিস্তান ও ইন্ডিয়া উভয়েই পরিপূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করেছিল। তবে তারা কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত থেকে যায়। এই আন্তর্জাতিক সংগঠনটি হলো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের সাক্ষী। ইংল্যান্ড থেকে স্বাধীন হওয়া দেশগুলো এর অন্তর্ভুক্ত। ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা এবং পূর্বের শাসক ও শাসিতদের মাঝে কূটনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা এই সংগঠনের উদ্দেশ্য।

ইংরেজ কর্তৃক এই দেশভাগ মোটেও ন্যায়ভিত্তিক ছিল না। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা ও পাঞ্জাবের পুরো ভূখণ্ড পাকিস্তানে না দিয়ে হিন্দুদের জন্য প্রদেশ দুটোকে দুই ভাগ করে ফেলা হয়। তা ছাড়া কিছু স্বাধীন রাজ্য পাকিস্তানে যুক্ত হতে চেয়েছিল। যেমন গুজরাটের জুনাগাধ রাজ্যের মুসলিম শাসক চেয়েছিলেন পাকিস্তানে যোগ দিতে। তেমনই হায়দারাবাদের মুসলিম শাসকও পাকিস্তানে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভারত উভয় রাজ্যের দাবি প্রত্যাখ্যান করে সৈন্য প্রেরণ করে রাজ্যগুলো দখল করে নেয়। নেপাল ও ভুটান ব্রিটিশ শাসন থেকেও মুক্ত ছিল। তাই দেশ দুটির বৌদ্ধ অধিবাসীরা স্বাধীনতা বজায় রাখে। তারপর ১৩৯৫ হিজরিতে (১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে) সিকিম ভারতে যুক্ত হয়।

ইংরেজরা সর্বক্ষেত্রে মুসলিমদের ওপর হিন্দুদের প্রাধান্য দিত ঠিক, তবে এই শ্বেতসন্ত্রাসীদের নিকট মূলত ভিনজাতি প্রতিটি গোষ্ঠীর ওপরই রয়েছে অবহেলা। সফলতার নাগাল পেতে যে কাউকে সেতু বানানোর হীন উপায় অবলম্বনেও তাদের কুণ্ঠা নেই। ইংরেজরা যুদ্ধে লড়ার জন্য সেনাবাহিনীতে প্রচুর পরিমাণে হিন্দুস্তানি সদস্য অন্তর্ভুক্ত করে। কারণ, লড়াইয়ের ময়দানে নিজেদের গা বাঁচিয়ে অন্যদের সামনে পাঠিয়ে দেওয়াটা ছিল খুবই নিরাপদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন চরম আকার ধারণ করে, জাপানি বাহিনী মায়ানমার পর্যন্ত চলে আসে, তখন হিন্দুস্তান নিয়ে শঙ্কায় পড়ে যায় ইংরেজ সরকার। কারণ, জাপানি আক্রমণের সুযোগে হিন্দুস্তানিরা তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে উঠতে পারে। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্রিটিশ সরকার ঘোষণা দেয়, যুদ্ধ শেষ হলে হিন্দুস্তানকে স্বাধীনতা দেওয়া হবে। এই ভিত্তিতে হিন্দুস্তানিদেরকে যুদ্ধে আরও বেশি সক্রিয় করে তোলে ব্রিটেন।

এ সময় ভারতীয় বাহিনীকে বিপজ্জনক সব অভিযানে সামনে ঠেলে দিতে থাকে। যার উদাহরণ দেখা যায় আলামেইন ময়দানে। সে সময় মাইনফিল্ড পরিষ্কার করার জন্য পশু ব্যবহার করা হতো। আত্মহুতি দিয়ে নিরীহ প্রাণীগুলো ময়দানকে মাইনমুক্ত করত। এই যুদ্ধে একটি মাইনফিল্ড পরিষ্কার করার কাজে পর্যাপ্ত পশু ছিল না। ফলে আত্মহুতি দিতে এক দল ভারতীয় সৈনিককে মাইনফিল্ডে ছেড়ে দেওয়া হলে সব সৈনিক মারা পড়ে। এ ঘটনায় হিন্দু-মুসলিম সবার অন্তরেই ইংরেজদের প্রতি নতুন করে ক্ষোভ বৃদ্ধি পায়।

১৩৬৬ হিজরিতে (১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে) বিভক্ত হয়ে দুটি নতুন দেশের জন্মের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয় উপমহাদেশ। একটি দেশ হিন্দুদের, যার নাম ইন্ডিয়া। অন্যটি মুসলিমদের, যার নাম পাকিস্তান তথা পবিত্র ভূমি। হিন্দুস্তানের প্রতিটি স্বাধীন রাজ্যকে নতুন দুটি দেশের যেকোনো একটিতে যোগ দেওয়ার কিংবা চাইলে স্বাধীন থাকার সুযোগ দেওয়া হয়ে। এই বিভক্তি গান্ধী ও তার নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস নেতারা মেনে নিতে চায়নি। তারা চেয়েছিল অখণ্ড ভারত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মুসলিম লিগের চাওয়াই শেষ পর্যন্ত পূর্ণ হয়।

উত্তরপূর্ব ভারত তথা পূর্ব বাংলা ও আসামের কিছু অংশ এবং উত্তরপশ্চিম ভারতের কিছু অঞ্চল তথা পাঞ্জাব প্রদেশের বড় একটা অংশ, সিন্ধু প্রদেশ ও বেলুচিস্তান মিলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের পত্তন হয়। যার রাজধানী করা হয় করাচিকে। আর বাকি সমস্ত অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় ইন্ডিয়া, যার রাজধানী প্রথমে ছিল দিল্লি, পরে হয় নয়াদিল্লি।

পাকিস্তান ও ইন্ডিয়া উভয়েই পরিপূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করেছিল। তবে তারা কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত থেকে যায়। এই আন্তর্জাতিক সংগঠনটি হলো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের সাক্ষী। ইংল্যান্ড থেকে স্বাধীন হওয়া দেশগুলো এর অন্তর্ভুক্ত। ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা এবং পূর্বের শাসক ও শাসিতদের মাঝে কূটনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা এই সংগঠনের উদ্দেশ্য।

ইংরেজ কর্তৃক এই দেশভাগ মোটেও ন্যায়ভিত্তিক ছিল না। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা ও পাঞ্জাবের পুরো ভূখণ্ড পাকিস্তানে না দিয়ে হিন্দুদের জন্য প্রদেশ দুটোকে দুই ভাগ করে ফেলা হয়। তা ছাড়া কিছু স্বাধীন রাজ্য পাকিস্তানে যুক্ত হতে চেয়েছিল। যেমন গুজরাটের জুনাগাধ রাজ্যের মুসলিম শাসক চেয়েছিলেন পাকিস্তানে যোগ দিতে। তেমনই হায়দারাবাদের মুসলিম শাসকও পাকিস্তানে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভারত উভয় রাজ্যের দাবি প্রত্যাখ্যান করে সৈন্য প্রেরণ করে রাজ্যগুলো দখল করে নেয়। নেপাল ও ভুটান ব্রিটিশ শাসন থেকেও মুক্ত ছিল। তাই দেশ দুটির বৌদ্ধ অধিবাসীরা স্বাধীনতা বজায় রাখে। তারপর ১৩৯৫ হিজরিতে (১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে) সিকিম ভারতে যুক্ত হয়।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 কাশ্মীর সংকট

📄 কাশ্মীর সংকট


শ্রীলঙ্কা ১৩৬৭ হিজরিতে ভারত থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। আর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ ১০৭০ হিজরিতে শ্রীলঙ্কা থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। দেশভাগের সময় হিন্দুস্তানেজুড়ে ভয়াবহ দাঙ্গা-হাঙ্গামা দেখা দেয়। নানা জায়গায় মুসলিমরা হিন্দুদের হাতে নির্যাতিত হয়। বহু মুসলিম হিজরত করে নতুন মুসলিম দেশে পাড়ি জমায়। যাওয়ার পথে ট্রেনেও তারা হিন্দুদের আক্রোশের মুখে পড়ে। ট্রেনগুলো আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ভৌগোলিক অবস্থান অসাধারণ। সুউচ্চ পাহাড়ি ভূমি কাশ্মীরকে দিয়েছে অনন্য স্বাতন্ত্র্য। সৌন্দর্যের পাশাপাশি দুর্গম ও অজেয় এক দুর্গ যেন এ ভূমি। বহুদিন পর্যন্ত মুসলিম সেনাবাহিনী কাশ্মীর জয় করতে পারেনি। হিজরি অষ্টম শতকে শামসুদ্দিন শাহ মির্জা নামে এক ব্যক্তি খোরাসান থেকে কাশ্মীর আগমন করেন। তিনি এসে আশ্রয় গ্রহণ করেন মূর্তিপূজারি রাজার দরবারে। তার যোগ্যতা মুগ্ধ হয়ে রাজা তাকে কাছে টেনে নেন। তিনি রাজা ও রাজপুত্রের পক্ষ থেকে বিশাল জায়গির লাভ করেন। সেখানে ছোট পরিসরে শুরু হয় শাহ মির্জার রাজত্ব।

পূর্বে হিন্দু রাজার মৃত্যুর পর রাজ্যের ভার গ্রহণ করেন তাঁর স্ত্রী। এদিকে শাহ মির্জা রানিকে বিয়ে করে নেন। রানি ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু কোনো কারণে তিনি শাহ মির্জাকে ত্যাগ করতে চাইলে মির্জা তাঁকে কারাবন্দি করেন এবং নিজেকে কাশ্মীরের শাসক ঘোষণা করেন। তাঁর রাজবংশ দুই শতাব্দীরও বেশি সময় (৭৪৮-৯৩০ হিজরি) কাশ্মীর শাসন করে। এই বংশের শেষ সময়ে মুঘল সম্রাট আকবর কাশ্মীরের দিকে অগ্রসর হন। বেশ সময় ধরে কাশ্মীর শাসিত হয় মুঘল বংশের হাতে। মুঘল আমলে কাশ্মীরে ইসলাম বিস্তৃতি লাভ করে। একসময় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলিম হয়ে যায়।

১১৬৮ হিজরিতে মোঘলদের পতন ঘটলে ক্ষমতায় আসে আফগান দুররানিরা। ১২০৪ হিজরি (১৮১৯ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত তারা কাশ্মীর শাসন করে। এ সময় আরও দ্রুত ইসলামের প্রসার ঘটে। তারপর ইংরেজদের সহায়তায় শিখরা ১২০৪ হিজরিতে কাশ্মীর দখল করে নেয়। শিখরা এসেই শুরু করে মুসলিমদের ওপর দমন-পীড়ন। আগুন দিয়ে ধ্বংস করতে থাকে মসজিদ। অনেক মসজিদকে আস্তাবলে পরিণত করা হয়।

শিখদের বিরুদ্ধে কাশ্মীরি জনতার মাঝে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। অবস্থা বেগতিক দেখে ইংরেজরা ১২৬২ হিজরিতে (১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দে) শিখদের হাত থেকে কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তারপর ডোগরা রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোলাপ সিংহের কাছে একশ বছরের জন্য ৭৫ লাখ রুপির বিনিময়ে কাশ্মীরকে বিক্রি করে দেয়। শিখদের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক রাজধানী অমৃতসরে এই চুক্তি সম্পাদিত হয়। ডোগরা রাজবংশ ক্ষমতায় এসে মুসলিমদের ওপর নতুন করে অত্যাচার শুরু করে। চাপিয়ে দেওয়া হয় দুঃসহ করের বোঝা। মুসলিম ভূমিসমূহ বাজেয়াপ্ত করা শুরু হয়। কাশ্মীরি মুসলিমরা নিজ দেশে পরবাসী হয়ে পড়ে। গরু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়। গরু জবাইয়ের শাস্তি নির্ধারণ করা হয় মৃত্যুদণ্ড। পরে তা কমিয়ে দশ বছর কারাদণ্ডের বিধান করা হয়।

নানামুখী নির্যাতন থেকে রেহাই পেতে বহু কাশ্মীরি লোক পাঞ্জাবে হিজরত করে। এদিকে ইংরেজ সরকার শাসক পরিবারের এসব নিপীড়নমূলক কাজে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছিল। কালক্রমে কাশ্মীরের বিভিন্ন ইসলামি আন্দোলন হিন্দু শাসক ও ইসলামবিদ্বেষী ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। এরমধ্যেই ১৩৬৬ হিজরিতে (১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে) চলে আসে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা ও দেশভাগের মুহূর্ত। মুক্তির এই মোক্ষম সময়ে কাশ্মীরের মুসলিম জনগোষ্ঠী পাকিস্তানকেই স্বদেশ হিসেবে গ্রহণ করতে চায়। কিন্তু বাধ সাধে হিন্দু শাসক। রাজা কাশ্মীরি ও বহিরাগত হিন্দুদের দিয়ে কাশ্মীরের পাকিস্তানে যোগ দেওয়া ঠেকাতে সচেষ্ট হয়। হিন্দু আন্দোলনকারীরা মুসলিমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। একটি দাঙ্গা সৃষ্টি করে পরিস্থিতি ঘোলা করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। এই দাঙ্গায় ১ লক্ষ ৩৭ হাজার মুসলিম নিহত হয়। ফলে কাশ্মীরের সাধারণ মুসলমান বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। কাশ্মীরি রাজা বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠিন পুলিশি অভিযান চালায়। বহু লোককে জেলে ঢোকানো হয়। এই প্রেক্ষিতে নানাদিক থেকে মুজাহিদ বাহিনী কাশ্মীরের মুক্তি সংগ্রামে তাদের ভাইদের পাশে এসে দাঁড়ায়। মহারাজা হরি সিং ভারতে পালিয়ে যায়। কাশ্মীরের কিছু অংশ মুজাহিদদের মেহনতে আজাদ হয়। ৮০% মুসলিম থাকা সত্ত্বেও কাশ্মীরের মূল ভূখণ্ড ভারতের সীমানায় থেকে যায়। কাশ্মীর ইস্যুতে দেশভাগের সাধারণ নিয়মটি মানা হলো না। মূলনীতি ছিল মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল পাকিস্তানে আর হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল ভারতে যোগ দেবে।

জাতিসংঘ এ সময় কাশ্মীরে গণভোট করার ব্যাপারে ভারত ও পাকিস্তানকে রাজি করায়। কিন্তু দেখা গেল, এই উদ্যোগ ভারতের সেনাবাহিনীকে কাশ্মীরে প্রবেশ করানোর একটা অসিলা মাত্র। ভারত সরকার মহারাজাকে সহায়তা করতে বিশাল বাহিনী পাঠিয়ে দেয়। তারা ঘোষণা করে, যারা পাকিস্তানে হিজরত করতে ইচ্ছুক তাদের সহায়তা দেওয়া হবে। মুহাজিরদের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় জমা হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু যখন অনেক মানুষ মুহাজির শিবিরে একত্রিত হলো তখন তাদের ওপর চালানো হয় নৃশংস হামলা। এ ঘটনায় প্রায় ৫ লক্ষ মুসলমান শাহাদাত বরণ করে। আর সমপরিমাণ মানুষ পাকিস্তানে হিজরত করতে সক্ষম হয়।

হিন্দু সেনাবাহিনী বহু মুসলিম নারীকে নির্যাতন করে। খুন, ধর্ষণ, এমনকি নৃশংসভাবে নারীদের স্তন কেটে ফেলার মতো অমানুষিক নিপীড়ন চলে পরিবারের সামনেই। কয়েক লক্ষ মুসলিমকে হত্যা করা হয়। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, অচিরেই যুদ্ধ বেধে যায় মুজাহিদ এবং হিন্দু ভারতীয় বাহিনীর মাঝে। এটি ছিল ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত ভারত-পাকিস্তানের প্রথম যুদ্ধ। যুদ্ধের মাধ্যমে মুজাহিদরা কাশ্মীরের উল্লেখযোগ্য এলাকা স্বাধীন করতে সক্ষম হয়। এই অংশ আজও আজাদ কাশ্মীর নামে পাকিস্তানের সাথে রয়েছে। মুজাহিদরা হিন্দু বাহিনীর অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়। লড়াই মারাত্মক আকার ধারণ করে। এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনী ও মুজাহিদরা কাশ্মীরি স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদের সহায়তা দিয়েছিল।

বিশাল বাহিনী নিয়েও ভারত আজাদ কাশ্মীরে প্রবেশ করতে পারল না। মুজাহিদরা তাদের ঠেকিয়ে রাখে শক্ত অবস্থান নিয়ে। অস্ত্রশস্ত্রে ভারতীয়দের চেয়ে অনেক দুর্বল হলেও মূলত মুজাহিদিনের ঈমানি জোরের কারণে কাশ্মীরে ভারতের আগ্রাসন বাধাগ্রস্ত হয়। এই দীর্ঘ সময়ে জাতিসংঘ ছিল কাশ্মীরের ব্যাপারে নীরব। তারা ধারণা করেছিল, ভারত এই সময়ের মধ্যে কাশ্মীর আয়ত্তে নিয়ে নেবে। আর সবকিছু হচ্ছিল জাতিসংঘের হর্তাকর্তা, বলা ভালো জাতিসংঘের ছদ্মবেশে পুরো বিশ্বের হর্তাকর্তা খ্রিষ্টান দেশগুলোর নীরব সম্মতিতে।

শ্রীলঙ্কা ১৩৬৭ হিজরিতে ভারত থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। আর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ ১০৭০ হিজরিতে শ্রীলঙ্কা থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। দেশভাগের সময় হিন্দুস্তানেজুড়ে ভয়াবহ দাঙ্গা-হাঙ্গামা দেখা দেয়। নানা জায়গায় মুসলিমরা হিন্দুদের হাতে নির্যাতিত হয়। বহু মুসলিম হিজরত করে নতুন মুসলিম দেশে পাড়ি জমায়। যাওয়ার পথে ট্রেনেও তারা হিন্দুদের আক্রোশের মুখে পড়ে। ট্রেনগুলো আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ভৌগোলিক অবস্থান অসাধারণ। সুউচ্চ পাহাড়ি ভূমি কাশ্মীরকে দিয়েছে অনন্য স্বাতন্ত্র্য। সৌন্দর্যের পাশাপাশি দুর্গম ও অজেয় এক দুর্গ যেন এ ভূমি। বহুদিন পর্যন্ত মুসলিম সেনাবাহিনী কাশ্মীর জয় করতে পারেনি। হিজরি অষ্টম শতকে শামসুদ্দিন শাহ মির্জা নামে এক ব্যক্তি খোরাসান থেকে কাশ্মীর আগমন করেন। তিনি এসে আশ্রয় গ্রহণ করেন মূর্তিপূজারি রাজার দরবারে। তার যোগ্যতা মুগ্ধ হয়ে রাজা তাকে কাছে টেনে নেন। তিনি রাজা ও রাজপুত্রের পক্ষ থেকে বিশাল জায়গির লাভ করেন। সেখানে ছোট পরিসরে শুরু হয় শাহ মির্জার রাজত্ব।

পূর্বে হিন্দু রাজার মৃত্যুর পর রাজ্যের ভার গ্রহণ করেন তাঁর স্ত্রী। এদিকে শাহ মির্জা রানিকে বিয়ে করে নেন। রানি ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু কোনো কারণে তিনি শাহ মির্জাকে ত্যাগ করতে চাইলে মির্জা তাঁকে কারাবন্দি করেন এবং নিজেকে কাশ্মীরের শাসক ঘোষণা করেন। তাঁর রাজবংশ দুই শতাব্দীরও বেশি সময় (৭৪৮-৯৩০ হিজরি) কাশ্মীর শাসন করে। এই বংশের শেষ সময়ে মুঘল সম্রাট আকবর কাশ্মীরের দিকে অগ্রসর হন। বেশ সময় ধরে কাশ্মীর শাসিত হয় মুঘল বংশের হাতে। মুঘল আমলে কাশ্মীরে ইসলাম বিস্তৃতি লাভ করে। একসময় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলিম হয়ে যায়।

১১৬৮ হিজরিতে মোঘলদের পতন ঘটলে ক্ষমতায় আসে আফগান দুররানিরা। ১২০৪ হিজরি (১৮১৯ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত তারা কাশ্মীর শাসন করে। এ সময় আরও দ্রুত ইসলামের প্রসার ঘটে। তারপর ইংরেজদের সহায়তায় শিখরা ১২০৪ হিজরিতে কাশ্মীর দখল করে নেয়। শিখরা এসেই শুরু করে মুসলিমদের ওপর দমন-পীড়ন। আগুন দিয়ে ধ্বংস করতে থাকে মসজিদ। অনেক মসজিদকে আস্তাবলে পরিণত করা হয়।

শিখদের বিরুদ্ধে কাশ্মীরি জনতার মাঝে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। অবস্থা বেগতিক দেখে ইংরেজরা ১২৬২ হিজরিতে (১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দে) শিখদের হাত থেকে কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তারপর ডোগরা রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোলাপ সিংহের কাছে একশ বছরের জন্য ৭৫ লাখ রুপির বিনিময়ে কাশ্মীরকে বিক্রি করে দেয়। শিখদের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক রাজধানী অমৃতসরে এই চুক্তি সম্পাদিত হয়। ডোগরা রাজবংশ ক্ষমতায় এসে মুসলিমদের ওপর নতুন করে অত্যাচার শুরু করে। চাপিয়ে দেওয়া হয় দুঃসহ করের বোঝা। মুসলিম ভূমিসমূহ বাজেয়াপ্ত করা শুরু হয়। কাশ্মীরি মুসলিমরা নিজ দেশে পরবাসী হয়ে পড়ে। গরু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়। গরু জবাইয়ের শাস্তি নির্ধারণ করা হয় মৃত্যুদণ্ড। পরে তা কমিয়ে দশ বছর কারাদণ্ডের বিধান করা হয়।

নানামুখী নির্যাতন থেকে রেহাই পেতে বহু কাশ্মীরি লোক পাঞ্জাবে হিজরত করে। এদিকে ইংরেজ সরকার শাসক পরিবারের এসব নিপীড়নমূলক কাজে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছিল। কালক্রমে কাশ্মীরের বিভিন্ন ইসলামি আন্দোলন হিন্দু শাসক ও ইসলামবিদ্বেষী ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। এরমধ্যেই ১৩৬৬ হিজরিতে (১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে) চলে আসে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা ও দেশভাগের মুহূর্ত। মুক্তির এই মোক্ষম সময়ে কাশ্মীরের মুসলিম জনগোষ্ঠী পাকিস্তানকেই স্বদেশ হিসেবে গ্রহণ করতে চায়। কিন্তু বাধ সাধে হিন্দু শাসক। রাজা কাশ্মীরি ও বহিরাগত হিন্দুদের দিয়ে কাশ্মীরের পাকিস্তানে যোগ দেওয়া ঠেকাতে সচেষ্ট হয়। হিন্দু আন্দোলনকারীরা মুসলিমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। একটি দাঙ্গা সৃষ্টি করে পরিস্থিতি ঘোলা করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। এই দাঙ্গায় ১ লক্ষ ৩৭ হাজার মুসলিম নিহত হয়। ফলে কাশ্মীরের সাধারণ মুসলমান বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। কাশ্মীরি রাজা বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠিন পুলিশি অভিযান চালায়। বহু লোককে জেলে ঢোকানো হয়। এই প্রেক্ষিতে নানাদিক থেকে মুজাহিদ বাহিনী কাশ্মীরের মুক্তি সংগ্রামে তাদের ভাইদের পাশে এসে দাঁড়ায়। মহারাজা হরি সিং ভারতে পালিয়ে যায়। কাশ্মীরের কিছু অংশ মুজাহিদদের মেহনতে আজাদ হয়। ৮০% মুসলিম থাকা সত্ত্বেও কাশ্মীরের মূল ভূখণ্ড ভারতের সীমানায় থেকে যায়। কাশ্মীর ইস্যুতে দেশভাগের সাধারণ নিয়মটি মানা হলো না। মূলনীতি ছিল মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল পাকিস্তানে আর হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল ভারতে যোগ দেবে।

জাতিসংঘ এ সময় কাশ্মীরে গণভোট করার ব্যাপারে ভারত ও পাকিস্তানকে রাজি করায়। কিন্তু দেখা গেল, এই উদ্যোগ ভারতের সেনাবাহিনীকে কাশ্মীরে প্রবেশ করানোর একটা অসিলা মাত্র। ভারত সরকার মহারাজাকে সহায়তা করতে বিশাল বাহিনী পাঠিয়ে দেয়। তারা ঘোষণা করে, যারা পাকিস্তানে হিজরত করতে ইচ্ছুক তাদের সহায়তা দেওয়া হবে। মুহাজিরদের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় জমা হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু যখন অনেক মানুষ মুহাজির শিবিরে একত্রিত হলো তখন তাদের ওপর চালানো হয় নৃশংস হামলা। এ ঘটনায় প্রায় ৫ লক্ষ মুসলমান শাহাদাত বরণ করে। আর সমপরিমাণ মানুষ পাকিস্তানে হিজরত করতে সক্ষম হয়।

হিন্দু সেনাবাহিনী বহু মুসলিম নারীকে নির্যাতন করে। খুন, ধর্ষণ, এমনকি নৃশংসভাবে নারীদের স্তন কেটে ফেলার মতো অমানুষিক নিপীড়ন চলে পরিবারের সামনেই। কয়েক লক্ষ মুসলিমকে হত্যা করা হয়। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, অচিরেই যুদ্ধ বেধে যায় মুজাহিদ এবং হিন্দু ভারতীয় বাহিনীর মাঝে। এটি ছিল ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত ভারত-পাকিস্তানের প্রথম যুদ্ধ। যুদ্ধের মাধ্যমে মুজাহিদরা কাশ্মীরের উল্লেখযোগ্য এলাকা স্বাধীন করতে সক্ষম হয়। এই অংশ আজও আজাদ কাশ্মীর নামে পাকিস্তানের সাথে রয়েছে। মুজাহিদরা হিন্দু বাহিনীর অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়। লড়াই মারাত্মক আকার ধারণ করে। এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনী ও মুজাহিদরা কাশ্মীরি স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদের সহায়তা দিয়েছিল।

বিশাল বাহিনী নিয়েও ভারত আজাদ কাশ্মীরে প্রবেশ করতে পারল না। মুজাহিদরা তাদের ঠেকিয়ে রাখে শক্ত অবস্থান নিয়ে। অস্ত্রশস্ত্রে ভারতীয়দের চেয়ে অনেক দুর্বল হলেও মূলত মুজাহিদিনের ঈমানি জোরের কারণে কাশ্মীরে ভারতের আগ্রাসন বাধাগ্রস্ত হয়। এই দীর্ঘ সময়ে জাতিসংঘ ছিল কাশ্মীরের ব্যাপারে নীরব। তারা ধারণা করেছিল, ভারত এই সময়ের মধ্যে কাশ্মীর আয়ত্তে নিয়ে নেবে। আর সবকিছু হচ্ছিল জাতিসংঘের হর্তাকর্তা, বলা ভালো জাতিসংঘের ছদ্মবেশে পুরো বিশ্বের হর্তাকর্তা খ্রিষ্টান দেশগুলোর নীরব সম্মতিতে।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 দ্বিতীয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ (১৩৮৫ হিজরি/১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দ)

📄 দ্বিতীয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ (১৩৮৫ হিজরি/১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দ)


অবশেষে ১৩৬৮ হিজরিতে জাতিসংঘ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাতে বাধ্য হয়। জাতিসংঘ থেকে বলা হয়, বিদেশি সৈনিকরা কাশ্মীর ত্যাগ করবে। তারপর সেখানে এক গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। গণভোটেই নির্ধারিত হবে কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ। প্রকাশ্যভাবে ইন্ডিয়া এই যুদ্ধবিরতির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে। কিন্তু অধিকৃত অংশে তাদের সেনা উপস্থিতি অব্যাহত থাকে। এরপর ১৩৭৭ হিজরিতে সমস্ত রাখঢাক ছুঁড়ে ফেলে প্রকাশ্যেই কাশ্মীরকে ইন্ডিয়ার অংশ বলে ঘোষণা করা হয়। অধিকৃত অঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে বাহির থেকে হিন্দুদের কাশ্মীরে পাঠানো হয়। আর মুসলিমদের ওপর অত্যাচার-জুলুম যেন পুলিশদের তিন বেলা খাবারের মতোই রুটিনমাফিক কাজ হয়ে দাঁড়ায়।

শুধু শারীরিক ও আর্থিক নিপীড়নই নয়; বরং কাশ্মীরি মুসলিমদের স্বাধীনতার স্বাদ ভুলিয়ে দিতে ও চিন্তাগতভাবে দুর্বল করে দিতে তারা নানা উপকরণ ব্যবহার করে। গোয়েন্দা সংস্থার লোকদেরকে স্পেন, রাশিয়াতে প্রেরণ করা হয়। তারা স্পেনিশ ও তাতার মুসলিমদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছিল সে বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করে আসে।

মুসলমানদের দ্বীন ও সংস্কৃতি ধ্বংস করার ভারতীয় ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে মুসলমানরা ঝাঁপিয়ে পড়ে কঠিন সংগ্রামে। জিহাদের ধ্বনি উচ্চারিত হয় দিকে দিকে। ইত্তিহাদে ইসলামি নামে মুজাহিদদের একটি ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম গড়ে ওঠে। রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে 'তাহরিরে জম্মু-কাশ্মীর' নামে নতুন সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে।

ঠিক সে সময় পাকিস্তানেও অনেক রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জামাআতে ইসলামি। তারা পাকিস্তানজুড়ে শরিয়া প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা হলেন আবুল আলা মওদুদি।

নবগঠিত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন মুহাম্মাদ আলি জিন্নাহ। তার সময়েই প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কিছুদিন পর জিন্নাহর ইনতেকাল হয়। তার উত্তরসূরি হন খাজা নাজিমুদ্দিন। তারপর ক্ষমতায় বসেন গোলাম মুহাম্মাদ। তারপর আসেন সেকান্দার মির্জা। তার সময়ে পাকিস্তান থেকে ডোমিনিয়নব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়। ১৩৭৮ হিজরিতে (১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে) ক্ষমতায় আসেন আইয়ুব খান। তিনি ছিলেন একজন সামরিক শাসক। সেনাবাহিনীর ওপর ভর করে দীর্ঘদিন দেশ শাসন করেন।

কিছুদিন পর কাশ্মীর ইস্যুতে আবারও ভারত-পাকিস্তানের মাঝে যুদ্ধ বাধে। যুদ্ধের শিখা পশ্চিম পাকিস্তানেই বেশি ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, পূর্ব সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করলে চীনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার হুমকি ছিল। পূর্ব থেকেই চীন-ভারত সীমান্ত এলাকায় উভয় দেশের দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। ১৩৬২ হিজরির এক লড়াইয়ে ভারত চীনের কাছে পরাজিত হয়। তারই জের ধরে চীন পাকিস্তানকে সমর্থন জানিয়েছিল। এই যুদ্ধে পাকিস্তানি যোদ্ধারা দারুণ সাহসের প্রদর্শনী করে। যুদ্ধে পাকিস্তান যখন জয়ের দ্বারপ্রান্তে তখনই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ থেকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হলো। তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার অধীন উজবেকিস্তানে এই পরিষদের 'তাসখন্দ বৈঠক'টি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিদ্ধান্ত হয়, শান্তিপূর্ণভাবে কাশ্মীর সমস্যার সমাধানের জন্য কাশ্মীর যুদ্ধের আগের অবস্থানে ফিরে যাবে। প্রত্যেকেই সকল যুদ্ধবন্দি ফিরিয়ে দেবে। এভাবে কৌশলি হস্তক্ষেপে পাকিস্তান ও কাশ্মীরের মুসলিমদের হাতের মুঠো থেকে বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারত ও খ্রিষ্টানবিশ্ব পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ঐক্য ভাঙার প্রচেষ্টা চালাতে থাকে—যাতে মুসলমানরা বিভক্ত পড়ে এবং তাদের শক্তি ও প্রতিপত্তি দুর্বল হয়ে যায়। এদিকে পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) রাজনৈতিক অঙ্গনে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের আবির্ভাব ঘটে। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা দাবি করেন। অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টো। পূর্ব পাকিস্তানে একের পর এক বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। অবশেষে ১৯৬৯ সাল মোতাবেক ১৩৮৯ হিজরি সনে (গণঅভ্যুত্থানের মুখে) প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন। তারপর ক্ষমতায় আসেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। তিনি ছিলেন শিয়া মতাবলম্বী।

তার দমননীতির কারণে দেশে অস্থিরতা ও নৈরাজ্য আরও বেড়ে যায়। এই উত্তাল সময়ে ভারত শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের এই আন্দোলনের সমর্থনে দাঁড়িয়ে যায় এবং হিন্দুদেরকে তার সমর্থন ও সাহায্যে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানায়। আমেরিকাও শেখ মুজিবকে সমর্থন করে—আবার একইসঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলি ভুট্টোর আন্দোলনকেও সমর্থন করে। শিয়া ও কাদিয়ানিরা ভুট্টোর সাহায্যে এগিয়ে আসে। পাকিস্তানকে দুই ভাগে বিভক্ত করতে এভাবে দানা বেঁধে ওঠে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত।

১৯৭১ সালে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন মুলতবি করাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে ওঠে। অস্থিরতা ও গোলযোগ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। সেই সঙ্গে ব্যাপক অবনতি ঘটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির। এমন সময় গ্রেফতার করা হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে। ফলে পূর্বপাকিস্তানজুড়ে বয়ে যায় তীব্র বিক্ষোভ ও আন্দোলনের জোয়ার। অবস্থা বেগতিক দেখে প্রায় নয় মিলিয়ন মানুষ পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয়—যাদের বেশির ভাগই হিন্দু। ভারতও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। বিদ্রোহীরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। বিশেষত ইহুদি গোষ্ঠী। তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করে, তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাহায্য করবে।

একপর্যায়ে বাংলাদেশে স্বাধীন পতাকা ওড়ে। নতুন দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু ১৯৭৫ সালে এসে শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ক্ষমতায় আসেন খন্দকার মুশতাক আহমদ। কিন্তু এরপর টানা গোলযোগ চলতে থাকে। তারপর ক্ষমতায় আসেন খালেদ মোশাররফ। তারপর প্রেসিডেন্ট হন জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালে একটি সামরিক ক্যুতে তিনিও নিহত হন। তারপর প্রেসিডেন্ট হন আব্দুস সাত্তার। এরপর ক্ষমতায় আসেন সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। এরশাদ পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বরাবরই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছেন খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা।

অন্যদিকে ইয়াহিয়া খানের পর পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসেন জুলফিকার আলি ভুট্টো। একপর্যায়ে পাকিস্তানে রাজনৈতিক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। জুলফিকার আলি ভুট্টোর পদত্যাগের দাবিতে বিশাল আন্দোলন শুরু হয়। অবশেষে ১৯৭৭ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন মুহাম্মদ জিয়াউল হক। ১৯৭৮ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জামাতে ইসলামীর সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এই সংগঠনের আমির ছিলেন জিয়াউল হকের মামা। তিনি জামাতে ইসলামীর অনেক নেতাকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন। তবুও সামরিক শাসন জারি করার কারণে জামাতে ইসলামি জিয়াউল হকের বিরোধিতা করে। ১৯৭৯ সালে জনৈক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে খুনের অভিযোগে জুলফিকার আলি ভুট্টোকে ফাঁসি দেওয়া হয়। জিয়াউল হক আমেরিকার সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী ছিলেন। রুশবিরোধী জিহাদে তিনি আফগান মুজাহিদদের সাহায্য করেন। আফগান শরণার্থীদের জন্য তিনি সীমান্ত খুলে দেন। আফগানিদের তিনি অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেন। অস্ত্র যোগানদাতাদের তালিকায় আমেরিকা ছিল সবার আগে। তবে তা মুসলমানদের প্রতি ভালোবাসার কারণে নয়; বরং প্রতিপক্ষ রাশিয়াকে দমানোর লক্ষ্যে এবং উভয় দেশের মাঝে চলমান শীতল যুদ্ধের কারণে। শেষ দিনগুলোতে জিয়াউল হক শরিয়া শাসন জারির ঘোষণা দিয়েছিলেন। ১৯৮৮ সালে একটি বোমার বিস্ফোরণে তিনি প্রাণ হারান। কারা বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল তা আজও পর্যন্ত জানা যায়নি। তারপর গোলাম ইসহাক খান ক্ষমতায় আসেন এবং মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেন।

অবশেষে ১৩৬৮ হিজরিতে জাতিসংঘ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাতে বাধ্য হয়। জাতিসংঘ থেকে বলা হয়, বিদেশি সৈনিকরা কাশ্মীর ত্যাগ করবে। তারপর সেখানে এক গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। গণভোটেই নির্ধারিত হবে কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ। প্রকাশ্যভাবে ইন্ডিয়া এই যুদ্ধবিরতির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে। কিন্তু অধিকৃত অংশে তাদের সেনা উপস্থিতি অব্যাহত থাকে। এরপর ১৩৭৭ হিজরিতে সমস্ত রাখঢাক ছুঁড়ে ফেলে প্রকাশ্যেই কাশ্মীরকে ইন্ডিয়ার অংশ বলে ঘোষণা করা হয়। অধিকৃত অঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে বাহির থেকে হিন্দুদের কাশ্মীরে পাঠানো হয়। আর মুসলিমদের ওপর অত্যাচার-জুলুম যেন পুলিশদের তিন বেলা খাবারের মতোই রুটিনমাফিক কাজ হয়ে দাঁড়ায়।

শুধু শারীরিক ও আর্থিক নিপীড়নই নয়; বরং কাশ্মীরি মুসলিমদের স্বাধীনতার স্বাদ ভুলিয়ে দিতে ও চিন্তাগতভাবে দুর্বল করে দিতে তারা নানা উপকরণ ব্যবহার করে। গোয়েন্দা সংস্থার লোকদেরকে স্পেন, রাশিয়াতে প্রেরণ করা হয়। তারা স্পেনিশ ও তাতার মুসলিমদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছিল সে বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করে আসে।

মুসলমানদের দ্বীন ও সংস্কৃতি ধ্বংস করার ভারতীয় ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে মুসলমানরা ঝাঁপিয়ে পড়ে কঠিন সংগ্রামে। জিহাদের ধ্বনি উচ্চারিত হয় দিকে দিকে। ইত্তিহাদে ইসলামি নামে মুজাহিদদের একটি ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম গড়ে ওঠে। রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে 'তাহরিরে জম্মু-কাশ্মীর' নামে নতুন সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে।

ঠিক সে সময় পাকিস্তানেও অনেক রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জামাআতে ইসলামি। তারা পাকিস্তানজুড়ে শরিয়া প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা হলেন আবুল আলা মওদুদি।

নবগঠিত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন মুহাম্মাদ আলি জিন্নাহ। তার সময়েই প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কিছুদিন পর জিন্নাহর ইনতেকাল হয়। তার উত্তরসূরি হন খাজা নাজিমুদ্দিন। তারপর ক্ষমতায় বসেন গোলাম মুহাম্মাদ। তারপর আসেন সেকান্দার মির্জা। তার সময়ে পাকিস্তান থেকে ডোমিনিয়নব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়। ১৩৭৮ হিজরিতে (১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে) ক্ষমতায় আসেন আইয়ুব খান। তিনি ছিলেন একজন সামরিক শাসক। সেনাবাহিনীর ওপর ভর করে দীর্ঘদিন দেশ শাসন করেন।

কিছুদিন পর কাশ্মীর ইস্যুতে আবারও ভারত-পাকিস্তানের মাঝে যুদ্ধ বাধে। যুদ্ধের শিখা পশ্চিম পাকিস্তানেই বেশি ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, পূর্ব সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করলে চীনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার হুমকি ছিল। পূর্ব থেকেই চীন-ভারত সীমান্ত এলাকায় উভয় দেশের দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। ১৩৬২ হিজরির এক লড়াইয়ে ভারত চীনের কাছে পরাজিত হয়। তারই জের ধরে চীন পাকিস্তানকে সমর্থন জানিয়েছিল। এই যুদ্ধে পাকিস্তানি যোদ্ধারা দারুণ সাহসের প্রদর্শনী করে। যুদ্ধে পাকিস্তান যখন জয়ের দ্বারপ্রান্তে তখনই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ থেকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হলো। তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার অধীন উজবেকিস্তানে এই পরিষদের 'তাসখন্দ বৈঠক'টি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিদ্ধান্ত হয়, শান্তিপূর্ণভাবে কাশ্মীর সমস্যার সমাধানের জন্য কাশ্মীর যুদ্ধের আগের অবস্থানে ফিরে যাবে। প্রত্যেকেই সকল যুদ্ধবন্দি ফিরিয়ে দেবে। এভাবে কৌশলি হস্তক্ষেপে পাকিস্তান ও কাশ্মীরের মুসলিমদের হাতের মুঠো থেকে বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারত ও খ্রিষ্টানবিশ্ব পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ঐক্য ভাঙার প্রচেষ্টা চালাতে থাকে—যাতে মুসলমানরা বিভক্ত পড়ে এবং তাদের শক্তি ও প্রতিপত্তি দুর্বল হয়ে যায়। এদিকে পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) রাজনৈতিক অঙ্গনে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের আবির্ভাব ঘটে। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা দাবি করেন। অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টো। পূর্ব পাকিস্তানে একের পর এক বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। অবশেষে ১৯৬৯ সাল মোতাবেক ১৩৮৯ হিজরি সনে (গণঅভ্যুত্থানের মুখে) প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন। তারপর ক্ষমতায় আসেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। তিনি ছিলেন শিয়া মতাবলম্বী।

তার দমননীতির কারণে দেশে অস্থিরতা ও নৈরাজ্য আরও বেড়ে যায়। এই উত্তাল সময়ে ভারত শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের এই আন্দোলনের সমর্থনে দাঁড়িয়ে যায় এবং হিন্দুদেরকে তার সমর্থন ও সাহায্যে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানায়। আমেরিকাও শেখ মুজিবকে সমর্থন করে—আবার একইসঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলি ভুট্টোর আন্দোলনকেও সমর্থন করে। শিয়া ও কাদিয়ানিরা ভুট্টোর সাহায্যে এগিয়ে আসে। পাকিস্তানকে দুই ভাগে বিভক্ত করতে এভাবে দানা বেঁধে ওঠে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত।

১৯৭১ সালে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন মুলতবি করাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে ওঠে। অস্থিরতা ও গোলযোগ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। সেই সঙ্গে ব্যাপক অবনতি ঘটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির। এমন সময় গ্রেফতার করা হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে। ফলে পূর্বপাকিস্তানজুড়ে বয়ে যায় তীব্র বিক্ষোভ ও আন্দোলনের জোয়ার। অবস্থা বেগতিক দেখে প্রায় নয় মিলিয়ন মানুষ পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয়—যাদের বেশির ভাগই হিন্দু। ভারতও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। বিদ্রোহীরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। বিশেষত ইহুদি গোষ্ঠী। তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করে, তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাহায্য করবে।

একপর্যায়ে বাংলাদেশে স্বাধীন পতাকা ওড়ে। নতুন দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু ১৯৭৫ সালে এসে শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ক্ষমতায় আসেন খন্দকার মুশতাক আহমদ। কিন্তু এরপর টানা গোলযোগ চলতে থাকে। তারপর ক্ষমতায় আসেন খালেদ মোশাররফ। তারপর প্রেসিডেন্ট হন জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালে একটি সামরিক ক্যুতে তিনিও নিহত হন। তারপর প্রেসিডেন্ট হন আব্দুস সাত্তার। এরপর ক্ষমতায় আসেন সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। এরশাদ পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বরাবরই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছেন খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা।

অন্যদিকে ইয়াহিয়া খানের পর পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসেন জুলফিকার আলি ভুট্টো। একপর্যায়ে পাকিস্তানে রাজনৈতিক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। জুলফিকার আলি ভুট্টোর পদত্যাগের দাবিতে বিশাল আন্দোলন শুরু হয়। অবশেষে ১৯৭৭ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন মুহাম্মদ জিয়াউল হক। ১৯৭৮ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জামাতে ইসলামীর সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এই সংগঠনের আমির ছিলেন জিয়াউল হকের মামা। তিনি জামাতে ইসলামীর অনেক নেতাকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন। তবুও সামরিক শাসন জারি করার কারণে জামাতে ইসলামি জিয়াউল হকের বিরোধিতা করে। ১৯৭৯ সালে জনৈক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে খুনের অভিযোগে জুলফিকার আলি ভুট্টোকে ফাঁসি দেওয়া হয়। জিয়াউল হক আমেরিকার সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী ছিলেন। রুশবিরোধী জিহাদে তিনি আফগান মুজাহিদদের সাহায্য করেন। আফগান শরণার্থীদের জন্য তিনি সীমান্ত খুলে দেন। আফগানিদের তিনি অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেন। অস্ত্র যোগানদাতাদের তালিকায় আমেরিকা ছিল সবার আগে। তবে তা মুসলমানদের প্রতি ভালোবাসার কারণে নয়; বরং প্রতিপক্ষ রাশিয়াকে দমানোর লক্ষ্যে এবং উভয় দেশের মাঝে চলমান শীতল যুদ্ধের কারণে। শেষ দিনগুলোতে জিয়াউল হক শরিয়া শাসন জারির ঘোষণা দিয়েছিলেন। ১৯৮৮ সালে একটি বোমার বিস্ফোরণে তিনি প্রাণ হারান। কারা বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল তা আজও পর্যন্ত জানা যায়নি। তারপর গোলাম ইসহাক খান ক্ষমতায় আসেন এবং মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ভারতীয় মুসলিমদের বর্তমান অবস্থা

📄 ভারতীয় মুসলিমদের বর্তমান অবস্থা


ভারতের বর্তমান মুসলিম জনসংখ্যা নয় কোটির বেশি (রচনাকালীন জরিপ)। এই বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত মার খাচ্ছে হিন্দুদের হাতে। নানারকম অত্যাচার ও অপমানের জীবনই যেন তাদের নিয়তি। প্রায়ই বিভিন্ন প্রদেশে মসজিদ ভেঙে ফেলা হচ্ছে।

প্রশ্ন জাগে, উত্তর আফ্রিকা কিংবা প্রাচীন রোম-পারস্য অঞ্চলে যেভাবে দ্রুত ইসলামের বিস্তার ঘটেছিল, ভারত উপমহাদেশে সেরকম হয়নি কেন? অথচ শতাব্দীর পর শতাব্দী সমগ্র ভারত শাসন করেছে মুসলিম শাসকগণ। এর তত্ত্ব তালাশ করতে গেলে বেশকিছু ব্যাপার পাওয়া যায়। যেমন:

ভারত শাসনকারী মুসলিম গোষ্ঠীগুলোর অধিকাংশ ছিল ইসলাম গ্রহণে তুলনামূলক নবীন। দেখা যায়, মাত্র কয়েক প্রজন্ম আগে তাদের পূর্বপুরুষ ইসলাম কবুল করেছিল। ইসলামের পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানের সাথে তাদের দৃঢ় সম্পর্ক ছিল না। সঠিক দ্বীনি পরিবেশে তারা লালিত হয়নি। এসব কারণে তাদের দ্বীনি চেতনাবোধ ছিল তুলনামূলক কম। রাজ্যশাসন আর সাম্রাজ্য বিস্তারেই ছিল তাদের মূল মনোযোগ। পাশাপাশি তারা সবাই ছিল অনারব বিভিন্ন তুর্কি বা আফগান গোত্র থেকে আগত। আরবি ভাষার সাথে সম্পর্কহীন হওয়ায় দ্বীনি ইলম ও অনেক প্রয়োজনীয় বিষয় থেকেও তারা ছিল একপ্রকার বিচ্ছিন্ন।

কিছু কিছু শাসক ছিল, যারা জনগণের মনোরঞ্জনের জন্য সব ধর্মকেই প্রশ্রয় দিত। সর্বোচ্চ মাত্রার স্বাধীনতা ভোগ করতে পারত সব ধর্মের অনুসারীরা। ইসলামি রাষ্ট্রে অনুমোদিত হতে পারে না এমন অনেক বিধর্মী প্রথাও তারা নিষিদ্ধ করেনি। যেমন হিন্দু ধর্মের অমানবিক সতীদাহ প্রথা। অনেক হারাম বিষয়কেই অনুমোদন দিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার করা হতো। যেমন মুশরিক নারীকে বিয়ে করা। এমনকি মুসলিম নারীকেও মুশরিক পুরুষের বিয়ে করার সুযোগ দেওয়া হতো। আবার অনেক বৈধ হালাল বিষয়কে নিষিদ্ধ করা হতো বিধর্মীদের খুশি করতে। যেমন গরু জবাই। কারণ, হিন্দুরা গরুকে দেবতা মনে করে। আর কোনো শাসক তো সব ছাড়িয়ে, হিন্দু মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মীয় বিশ্বাস সংমিশ্রণ করে নতুন ধর্ম তৈরিতেও পিছপা হয়নি। শাসকদের ধারণা ছিল, এসব করে তারা নিজের শাসনকে সুসংহত করতে পারবে। এজন্য সবাইকে খুশি করতে যা দরকার সবই করত। এসব কারণে উপমহাদেশে অনেক নতুন ধর্ম চালু হয়। শিখ ধর্ম তার অন্যতম।

ঔপনিবেশিক শক্তি সবসময় মুসলমানদের দমনে সক্রিয় থেকেছে। মুসলিমবিরোধিতায় হিন্দুদের সাথে তাল মিলিয়েছে। মুসলমানদের দুর্বল করতে সৃষ্টি করেছে কাদিয়ানি, আহমাদিসহ বিভিন্ন বাতিল ফেরকা। এসব ফিরকাকে আজও তারা বিশ্বজুড়ে কাজ করার মদদ জোগায়। মুসলিমদের পথভ্রষ্ট করতে, তাদের ঐক্য বরবাদ করতে এদের ব্যবহার করে।

ভারতের বর্তমান মুসলিম জনসংখ্যা নয় কোটির বেশি (রচনাকালীন জরিপ)। এই বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত মার খাচ্ছে হিন্দুদের হাতে। নানারকম অত্যাচার ও অপমানের জীবনই যেন তাদের নিয়তি। প্রায়ই বিভিন্ন প্রদেশে মসজিদ ভেঙে ফেলা হচ্ছে।

প্রশ্ন জাগে, উত্তর আফ্রিকা কিংবা প্রাচীন রোম-পারস্য অঞ্চলে যেভাবে দ্রুত ইসলামের বিস্তার ঘটেছিল, ভারত উপমহাদেশে সেরকম হয়নি কেন? অথচ শতাব্দীর পর শতাব্দী সমগ্র ভারত শাসন করেছে মুসলিম শাসকগণ। এর তত্ত্ব তালাশ করতে গেলে বেশকিছু ব্যাপার পাওয়া যায়। যেমন:

ভারত শাসনকারী মুসলিম গোষ্ঠীগুলোর অধিকাংশ ছিল ইসলাম গ্রহণে তুলনামূলক নবীন। দেখা যায়, মাত্র কয়েক প্রজন্ম আগে তাদের পূর্বপুরুষ ইসলাম কবুল করেছিল। ইসলামের পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানের সাথে তাদের দৃঢ় সম্পর্ক ছিল না। সঠিক দ্বীনি পরিবেশে তারা লালিত হয়নি। এসব কারণে তাদের দ্বীনি চেতনাবোধ ছিল তুলনামূলক কম। রাজ্যশাসন আর সাম্রাজ্য বিস্তারেই ছিল তাদের মূল মনোযোগ। পাশাপাশি তারা সবাই ছিল অনারব বিভিন্ন তুর্কি বা আফগান গোত্র থেকে আগত। আরবি ভাষার সাথে সম্পর্কহীন হওয়ায় দ্বীনি ইলম ও অনেক প্রয়োজনীয় বিষয় থেকেও তারা ছিল একপ্রকার বিচ্ছিন্ন।

কিছু কিছু শাসক ছিল, যারা জনগণের মনোরঞ্জনের জন্য সব ধর্মকেই প্রশ্রয় দিত। সর্বোচ্চ মাত্রার স্বাধীনতা ভোগ করতে পারত সব ধর্মের অনুসারীরা। ইসলামি রাষ্ট্রে অনুমোদিত হতে পারে না এমন অনেক বিধর্মী প্রথাও তারা নিষিদ্ধ করেনি। যেমন হিন্দু ধর্মের অমানবিক সতীদাহ প্রথা। অনেক হারাম বিষয়কেই অনুমোদন দিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার করা হতো। যেমন মুশরিক নারীকে বিয়ে করা। এমনকি মুসলিম নারীকেও মুশরিক পুরুষের বিয়ে করার সুযোগ দেওয়া হতো। আবার অনেক বৈধ হালাল বিষয়কে নিষিদ্ধ করা হতো বিধর্মীদের খুশি করতে। যেমন গরু জবাই। কারণ, হিন্দুরা গরুকে দেবতা মনে করে। আর কোনো শাসক তো সব ছাড়িয়ে, হিন্দু মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মীয় বিশ্বাস সংমিশ্রণ করে নতুন ধর্ম তৈরিতেও পিছপা হয়নি। শাসকদের ধারণা ছিল, এসব করে তারা নিজের শাসনকে সুসংহত করতে পারবে। এজন্য সবাইকে খুশি করতে যা দরকার সবই করত। এসব কারণে উপমহাদেশে অনেক নতুন ধর্ম চালু হয়। শিখ ধর্ম তার অন্যতম।

ঔপনিবেশিক শক্তি সবসময় মুসলমানদের দমনে সক্রিয় থেকেছে। মুসলিমবিরোধিতায় হিন্দুদের সাথে তাল মিলিয়েছে। মুসলমানদের দুর্বল করতে সৃষ্টি করেছে কাদিয়ানি, আহমাদিসহ বিভিন্ন বাতিল ফেরকা। এসব ফিরকাকে আজও তারা বিশ্বজুড়ে কাজ করার মদদ জোগায়। মুসলিমদের পথভ্রষ্ট করতে, তাদের ঐক্য বরবাদ করতে এদের ব্যবহার করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00