📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সম্রাট বাবর

📄 সম্রাট বাবর


লোদি বংশের শেষ শাসক দ্বিতীয় ইবরাহিম লোদি দিল্লির শাসনে বসার পর অন্য মুসলিম শাসকরা তাকে পরাস্ত করতে গজনবির শাসক জহির উদ্দিন বাবরের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাদের আহ্বানে বাবর হিন্দুস্তানে আগমন করেন। ৯৩২ হিজরিতে (১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে) পানিপথের যুদ্ধে বাবর ইবরাহিম লোদিকে পরাজিত করেন। এরপর তিনি আগ্রাকে তার আবাসস্থল হিসেবে গ্রহণ করেন। কিছুদিন পর লোদি বংশের আমির-উমারা বিভিন্ন রাজপুতদের সাহায্য নিয়ে পুনরায় বাবরের মোকাবিলার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। রাজপুতরা মধ্যভারতের বড় শক্তি হিসেবে গণ্য হতো। লোদি ও রাজপুতরা বাবরের বিরুদ্ধে ঐক্য গড়ে তুলল। এই অবস্থায় বাবর কাফের শক্তি ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক দেন। ৯৩৩ হিজরিতে (১৫২৭ খ্রিষ্টাব্দে) খানওয়ার যুদ্ধে দুই শিবির মুখোমুখি হয়। এবারও বাবর বিজয় লাভ করেন। সিংহাসনে বসেই বাবর ধর্মীয় সহনশীলতার ঘোষণা দেন। এভাবে তিনি ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেন। ৯৩৭ হিজরিতে (১৫৩০ খ্রিষ্টাব্দে) বাবরের ইনতেকাল হয়। তার স্থলবর্তী হন পুত্র হুমায়ুন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 হুমায়ুন

📄 হুমায়ুন


হুমায়ুনের শাসনামলে মোঘল সাম্রাজ্য ভেঙে গিয়েছিল। অনেক রাজ্য স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এদিকে খ্রিষ্টানদের তৎপরতাও বৃদ্ধি পায়। পর্তুগিজরা ততদিনে হিন্দুস্তানের উপকূলে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৯১৪ হিজরি থেকেই তারা বাণিজ্যিক কুঠির নামে দুর্গ গড়ে তুলছিল। সে সময় গুজরাটের শাসক পর্তুগিজদের উপকূল থেকে তাড়াতে উসমানি খলিফা সুলাইমান কানুনির সহায়তা কামনা করেন। খলিফা তখন বিশাল নৌবহর পাঠিয়ে দেন এবং তারা পর্তুগিজদের চরমভাবে পরাজিত করে। এরপর ৯৪২ হিজরিতে গুজরাটের শাসক পর্তুগিজদের সাথে সন্ধিচুক্তি করেন এবং তাদেরকে দেও নামক জায়গায় কেল্লা নির্মাণ করার অনুমতি দেন। কিন্তু পর্তুগিজরা চুক্তি ভঙ্গ করে। তারা গুজরাটের শাসকের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং ৯৪৩ হিজরিতে দেও নগর দখল করে নেয়। সংবাদ পেয়ে খলিফা সুলাইমান পুনরায় নৌবহর পাঠিয়ে দেন। তারা দেও অবরোধ করে। কিন্তু গুজরাটের শাসক ধারণা করে, খলিফা গুজরাটকে তার অধীনস্থ প্রদেশে পরিণত করবেন। তাই তিনি নৌবহরকে সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকেন। ফলে উসমানি নৌবাহিনী গুজরাট ত্যাগ করে চলে যায়। এদিকে হুমায়ুন কাবুলসহ আফগানের অধিকাংশ অঞ্চল তার অধীনে আনতে সক্ষম হন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 মাহমুদ জালালুদ্দিন (সম্রাট আকবর)

📄 মাহমুদ জালালুদ্দিন (সম্রাট আকবর)


আকবরের আমলেই মোঘল সাম্রাজ্য সবচেয়ে বিস্তৃতি লাভ করে। আকবর হিন্দুস্তানের অধিকাংশ অঞ্চল ও আফগানিস্তানে রাজত্ব বিস্তার করেন। ৯৮৬ হিজরিতে তিনি এক নতুন মতাদর্শ ধারণ করেন। যার উদ্দেশ্য ছিল হিন্দুস্তানে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা। সেই মতাদর্শ হচ্ছে, ইসলাম, সনাতন, বৌদ্ধ, জরথুস্ত্রবাদসহ বিভিন্ন ধর্মের সমন্বয়ে নতুন এক ধর্মের প্রবর্তন। তিনি গরু জবাই নিষিদ্ধ করেন। মুসলিম নারী-পুরুষের সাথে মুশরিক নারী-পুরুষদের বিয়ে বৈধ করেন। ফতেহপুর নগরকে তার নতুন ধর্মপ্রচারের কেন্দ্র করা হয়।

তার সময়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করে শিখ নামক বিচিত্র চিন্তাধারার নতুন এক ধর্মগোষ্ঠী। গুরু নানক নামের একজনকে তার প্রতিষ্ঠাতা ধরা হয়। তার অনুসারীদের দাবিমতে, তিনি মক্কায় গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি হজ সম্পন্ন করেন, কুরআন তিলাওয়াতে লিপ্ত থাকেন। এরপর জানেন যে, তিনিই হচ্ছেন প্রভু। সম্রাট আকবর তাকে ভূমি দান করেন। যে জায়গায় অমৃতসর নগরটি গড়ে ওঠে। ভারতে এখন (রচনা গ্রন্থবদ্ধকালে) শিখদের সংখ্যা দশ মিলিয়ন ছাড়িয়েছে। তাদের কেন্দ্র পাঞ্জাব।

আকবরের পরের শাসকগণ হলেন জাহাঙ্গীর ও শাহজাহান। তারা দুজনেই বেশ শক্তিশালী শাসক ছিলেন। তারা প্রায় পুরো ভারতবর্ষ শাসন করেছিলেন। জাহাঙ্গীরের শাসনামলে বাংলা মোঘলদের হাতে আসে। এখানে তাদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা শহর প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা এখন বাংলাদেশের রাজধানী। সম্রাট শাহজাহানের সময় ভারতবর্ষে ইউরোপিয়ানদের ব্যাপক আগমন ঘটে। বাহ্যিকভাবে তারা বাণিজ্যের কাজ করত। তবে আড়ালে তারা শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে এবং ধর্মান্তরের কাজ চালাতে থাকে। (২৩) মোঘল সম্রাটরা তাদের বিরুদ্ধে শক্ত কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেননি। এ সময় ডাচ, ওলন্দাজ, পর্তুগিজ, আর্মেনিয়ান, ইংরেজ ও ফরাসিরা ভারতবর্ষে আগমন করে। ১৪৯৮ সালে ভাস্কো দা গামা কর্তৃক উত্তমাশা অন্তরীপ আবিষ্কারের ফলে উপমহাদেশে ইউরোপিয়ানদের আগমন সহজ হয়ে যায়। সম্রাট আকবরের সময় থেকে ইউরোপিয়ানরা ভারতবর্ষের নানাস্থানে বাণিজ্যিক কুঠি স্থাপন করতে থাকে। ১৫৭৯ সালে পর্তুগিজরা বাংলার সাতগাঁ নামক স্থানে বাণিজ্যিক কুঠি স্থাপন করে। তারা সেখানে অস্ত্রশস্ত্র জমা করে এবং আশপাশের এলাকায় হামলা করে। সম্রাট শাহজাহান এ সংবাদ জেনে তাদেরকে দমন করার জন্য একটি বাহিনী পাঠান। এই বাহিনী ১৬৩২ সালে পর্তুগিজদের পরাজিত করে। তাদের প্রায় ১০ হাজার লোক নিহত হয়। (২৪) ১৬৩৬ সালে মোঘল বাহিনী বিজাপুর ও গোলকুন্ডা দখল করে। এভাবে দক্ষিণ ভারতেও মোঘল শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়。

শাহজাহানের পর তার পুত্র আওরঙ্গজেব আলমগীর মোঘলদের মসনদে বসেন। তিনি প্রায় ৫০ বছর শাসন করেন। তিনি ক্ষমতায় বসে ব্যাপক সংস্কার এনেছিলেন। তিনি মদপান, জুয়াখেলা ও নওরোজ উৎসব পালন নিষিদ্ধ করেন। মুহতাসিব নামে এক ধরনের কর্মচারী নিয়োগ দেন, যাদের কাজ ছিল জনগণের নৈতিক চরিত্রের দিকে লক্ষ করা। জনসাধারণের সুবিধার জন্য তিনি প্রায় আশি প্রকার কর মাফ করে দেন। (২৫) সাম্রাজ্য বিস্তারের দিকেও তিনি মনোযোগী ছিলেন। বিহারের শাসনকর্তা দাউদ খান ১৬৬১ সালে পালামৌ জয় করেন। এ সময় মুসলিমবিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের শাসকদের সাথে আলমগীরের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। পারস্য, বসরা, মক্কা, বুখারা, আবিসিনিয়া ইত্যাদি এলাকা থেকে মুসলিম শাসকদের দূতরা ভারতে এসেছিলেন। সমকালীন ঐতিহাসিক ও পর্যটকদের(২৬) বিবরণে এই দূতদের সম্পর্কে জানা যায়। আলমগীর ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ছিলেন। সর্বশক্তি দিয়ে ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে চলতেন। তিনি ফতোয়ায়ে আলমগিরি সংকলন করান।

তার শাসনামলেই মধ্য এশিয়া, খাওয়ারেজম, বিজয়পুর এসব এলাকা মোঘল সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। হিন্দু ঐতিহাসিকদের অনেকে তার চরিত্রের ওপর নানা কালিমা লেপন করার চেষ্টা চালিয়েছে। তার দিকে অভিযোগের তির ছুড়েছে। বস্তুনিষ্ঠ গবেষকরা এসব অভিযোগের জবাব দিয়েছেন। (২৭) আলমগীর ছিলেন সর্বশেষ শক্তিশালী মোঘল শাসক। ১৬০৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর পর থেকে মোঘলদের পতনের যুগ শুরু হয়। আলমগীরের বংশধররা নিজেদের মধ্যে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।

আলমগীরের পর ক্ষমতায় আরোহণ করেন তার পুত্র কুতুবুদ্দিন মুহাম্মাদ মুআজ্জম বাহাদুর। তিনি শিয়া মতবাদ গ্রহণ করেন। তার সময়ে রাজ্যে দুর্বলতা প্রবেশ করে। শিখ ও মারাঠা সম্প্রদায় শক্তি সঞ্চয় শুরু করে। তারপর বিভিন্ন দুর্বল শাসকের ধারা অব্যাহত থাকে। এ সময় হিন্দুস্তানের বিভিন্ন প্রদেশ স্বাধীন হতে শুরু করে। পাঞ্জাবে শিখরা এবং গুজরাটে মারাঠারা স্বাধীনতা ঘোষণা করে। দাক্ষিণাত্যের রাজারাও স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এদিকে ইংরেজদের ভারত দখলের পায়তারা চলতে থাকে। একপর্যায়ে ইংরেজের হাতে মোঘলদের পতন হয়। শেষ মোঘল সুলতান বাহাদুর শাহকে ১২৭৩ হিজরিতে (১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে) দেশ থেকে বিতাড়িত করার মাধ্যমে ইংরেজ শাসন পোক্ত হয়。

টিকা:
২৩. উপমহাদেশে ইউরোপিয়ানদের মিশনারি তৎপরতা সম্পর্কে জানতে দেখুন, ফিরিঙ্গিয়ো কা জাল, ইমদাদ সাবরি। -সম্পাদক
২৪. বাদশাহ নামা: ৬৮, আবদুল হামিদ লাহোরি। -সম্পাদক
২৫. হিস্ট্রি অব আওরঙ্গজেব: ৩/১১৫, স্যার যদুনাথ সরকার। -সম্পাদক
২৬. বার্নিয়ে, মানুচি প্রমুখ। -সম্পাদক
২৭. আল্লামা শিবলি নোমানি এ বিষয়ে একটি বই লিখেছেন, যার নাম আওরঙ্গজেব আলমগির পর এক নজর। -সম্পাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00