📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ঘুরি শাসন

📄 ঘুরি শাসন


গজনবিদের পতন হয়েছিল ঘুরিদের হাতে। ঘুরিদের অবস্থান ছিল গজনি ও হেরাতের মাঝামাঝি পার্বত্য এলাকায়। ১০১০ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান মাহমুদ ঘুরি রাজ্য দখল করলে ঘুরিরা তার আনুগত্য স্বীকার করে নেয়। সুলতান মাহমুদের মৃত্যুর পর গজনি সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে ঘুরিরা আবার শক্তি সঞ্চয় করে। ১১৭০ খ্রিষ্টাব্দে গিয়াসুদ্দিন ঘুরি গজনিরাজ্য নিজের দখলে নিয়ে আসেন। তার ভাই শিহাবুদ্দিন ঘুরি গজনি প্রদেশের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। তিনিই ভারতের ইতিহাসে মুহাম্মদ ঘুরি নামে বিশেষভাবে পরিচিত। মুহাম্মদ ঘুরি খুবই উৎসাহী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী শাসক ছিলেন। গজনির শাসনকর্তা নিযুক্ত হওয়ার পর তিনি নজর দেন হিন্দুস্তানের দিকে। সেখানে সামরিক বিজয়লাভ করা তার ধ্যানজ্ঞান হয়ে ওঠে। মুহাম্মদ ঘুরির ভারত আক্রমণের সময় ভারতের রাজনৈতিক শক্তি নানাভাগে বিভক্ত ছিল। বিহার ও বাংলা অঞ্চল ছিল বৌদ্ধ, পাল ও সেন বংশের অধীনে। দিল্লি ও আজমির শাসন করত চৌহান বংশের শাসকরা। আজমিরের শাসনকর্তা ছিলেন পৃথ্বীরাজ। ১১৯০ সালে মুহাম্মদ ঘুরি তার বাহিনী নিয়ে আজমিরের দিকে এগিয়ে আসেন। তাকে মোকাবিলা করার জন্য পৃথ্বীরাজ ও অন্য রাজারা এগিয়ে আসেন। থানেশ্বরের কাছে দুই বাহিনীর মাঝে তীব্র যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে মুহাম্মদ ঘুরি পরাজিত হন। ইতিহাসে এটি তরাইনের ১৯ প্রথম যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই পয়াজয়ে মুহাম্মদ ঘুরি বিচলিত হলেন না। ১১৯২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আবারও তার বাহিনী নিয়ে এগিয়ে এলেন আজমিরের দিকে। এ সময় তার সেনাসংখ্যা ছিল এক লক্ষ ২০ হাজার। এই যুদ্ধে পৃথ্বীরাজ পরাজিত ও নিহত হন। এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে শক্তির একটা পরিবর্তন ঘটে। এর আগেও মাহমুদ গজনবি এখানে আক্রমণ করেছিলেন, স্থানীয় রাজাদের পরাজিত করেছিলেন, কিন্তু তিনি এখানে নিজের শাসন প্রতিষ্ঠিত করেননি। কিন্তু মুহাম্মদ ঘুরি নিজের বিশ্বস্ত সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবেককে ভারতবর্ষের বিজিত বিভিন্ন এলাকার শাসক নিযুক্ত করে নিজে আফগানিস্তানে ফিরে যান। এভাবে কুতুবুদ্দিন আইবেকের হাত ধরে ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের সূচনা ঘটে。

টিকা:
১৯. যুদ্ধক্ষেত্রটি ছিল থানেশ্বর থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে তরাইন নামক গ্রামে। -সম্পাদক

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ভারতবর্ষে মামলুক শাসন

📄 ভারতবর্ষে মামলুক শাসন


মুহাম্মদ ঘুরি আফগানিস্তান ফিরে যাওয়ার আগে কুতুবুদ্দিন আইবেককে উত্তর ভারতের দায়িত্বে নিযুক্ত করেছিলেন। কুতুবুদ্দিন আইবেক একজন যোগ্য সেনাপতি ও প্রশাসক ছিলেন। ১১৯৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দিল্লি, গোয়ালিয়র, কানুজ ইত্যাদি এলাকা জয় করেন। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে তার একজন সেনাপতি ইখতিয়ারুদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি উত্তর-পূর্ব ভারতে শক্তি বিস্তারের দিকে দৃষ্টি দেন। ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নদীয়া অঞ্চল আক্রমণ করলে তার হাতে সেন শাসনের অবসান ঘটে। বাংলা ও বিহারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয় তুর্কি শাসন। ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মদ ঘুরি আততায়ীর হাতে নিহত হন। এরপর কুতুবুদ্দিন আইবেক নিজেকে স্বাধীন শাসক হিসেবে ঘোষণা দেন এবং সুলতান উপাধি নিয়ে দিল্লি সিংহাসনে আরোহণ করেন। ১২১০ খ্রিষ্টাব্দে কুতুবুদ্দিন আইবেক মারা যান। দিল্লির কুতুব মিনার ও কুওয়াতুল ইসলাম মসজিদ নির্মাণ তার অমর কীর্তি। কুতুবুদ্দিন একজন জনদরদি শাসক ছিলেন, প্রজাদের শান্তি সমৃদ্ধি সাধনে তিনি চেষ্টা করতেন। <sup>(২০)</sup> কুতুবুদ্দিনের পরের শাসকদের মধ্যে শামসুদ্দিন ইলতুতমিশ বেশ বিখ্যাত। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন কুতুবুদ্দিনের ক্রীতদাস। পরে নিজের যোগ্যতার মাধ্যমে তিনি কুতুবুদ্দিনের একান্ত আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। এমনকি কুতুবুদ্দিন তার কাছে নিজের মেয়ে বিয়ে দেন। ১২২৮ খ্রিষ্টাব্দে ইলতুতমিশ মুলতান ও সিন্ধু জয় করেন। ১২২৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বাগদাদের আব্বাসি খলিফা মুসতানসির বিল্লাহর সাথে পত্র যোগাযোগ করেন। খলিফা সন্তুষ্ট হয়ে তাকে সুলতান-ই-আজম উপাধি দেন। এই উপাধি পাওয়ার কারণে ভারতবর্ষে তার সম্মান বেড়ে যায়। আব্বাসি খলিফার এই উপাধি ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনকে একপ্রকার নৈতিক ভিত্তি দিয়েছিল। ইলতুতমিশের শাসনামলে ভারতবর্ষে সর্ব প্রথম আরবি মুদ্রার প্রবর্তন হয়।

ইলতুতমিশ একজন যোগ্য প্রশাসক ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত নেককার। ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারনি তার রাজত্বকালকে অভিহিত করেছেন সমৃদ্ধ ও গৌরবময় বলে। (২১)

ইলতুতমিশের পরবর্তী শাসকদের মধ্যে সুলতান গিয়াসুদ্দিন বলবনের নাম উল্লেখযোগ্য। তার শাসনামলে ১২৭৯ খ্রিষ্টাব্দে মোঙ্গলরা ভারত আক্রমণ করেছিল। কিন্তু সুলতান গিয়াসুদ্দিনের দুই পুত্র তাতারবাহিনীকে পরাজিত করে। ভারতবর্ষ নিরাপদ হয় তাতারদের হাত থেকে। মামলুক শাসকদের মধ্যে সর্বশেষ শাসক ছিলেন সুলতান কায়কোবাদ। ১২৯০ সালে তাকে হত্যা করে সুলতান জালালুদ্দিন ফিরোজ খলজি ক্ষমতায় বসেন এবং খলজি শাসনের সূচনা করেন。

টিকা:
২০. তাজুল মাআসির-২৮, হাসান নিজামি।-সম্পাদক
২১. তারিখে ফিরোজ শাহি: ৮৮, জিয়াউদ্দিন বারনি। -সম্পাদক

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 তুঘলক শাসন

📄 তুঘলক শাসন


সিন্ধুর আমির গিয়াসুদ্দিন তুঘলক বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তার সাম্রাজ্য ৭২০ হিজরি থেকে প্রায় একশ বছর দিল্লি শাসন করেছিল। তার মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসে পুত্র জুনা ওরফে মুহাম্মাদ তুঘলক। তার উপাধি ছিল আবুল মুজাহিদ। নামাজের ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। নামাজ ত্যাগকারীকে মৃত্যুদণ্ড দিতেন। তার হাতে কেরালা জয় হয়। চীন অভিমুখেও তিনি সেনা প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু হিমালয়ের বৈরী পরিবেশে সৈন্যরা ধ্বংসের মুখে পড়ে।

তার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় বসেন তার চাচাতো ভাই ফিরোজ শাহ তুঘলক। তিনি ছিলেন একজন বুজুর্গ শাসক। তিনি অনেক মসজিদ-মাদরাসা ও চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বহু কেল্লা নির্মাণ করেন। তার মৃত্যুর পর দেশে বিশৃঙ্খলা সীমা ছাড়িয়ে যায়। আমিরদের মাঝে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এরপর বেশ কয়েকজন শাসক ক্ষমতায় আসেন।

কিন্তু তুঘলকদের সময় ফুরিয়ে আসছিল। ৮০১ হিজরিতে (১৩৯৮ খ্রিষ্টাব্দে) তৈমুর লং দিল্লি আক্রমণ করেন। তবে দিল্লি শাসন করার ইচ্ছা তৈমুরের আদৌ ছিল কি না তাতে সন্দেহ আছে। যতদূর বোঝা যায়, ভারতের মুসলিম রাজাদের ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত করে দুর্বল করে দেওয়াই ছিল তৈমুরের ভারত আক্রমণের প্রকৃত উদ্দেশ্য। তাই অল্প সময় পরেই তৈমুর ভারত ত্যাগ করেন। তার প্রস্থানের পর তুঘলক বংশের শেষ সুলতান মাহমুদ শাহ পুনরায় দিল্লির সিংহাসন দখল করেন। মাহমুদের মৃত্যু হয় ৮১৫ হিজরিতে (১৪১৩ খ্রিষ্টাব্দে)।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 খলিজব (সৈয়দ) বংশের শাসন

📄 খলিজব (সৈয়দ) বংশের শাসন


খিজির ছিলেন তৈমুরের লোক। তৈমুরের প্রস্থানের পর তিনি দিল্লিতেই রয়ে যান। মাহমুদ শাহের মৃত্যুর পর খিজির তার রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। তার বংশ ৮৫৫ হি. পর্যন্ত দিল্লি শাসন করে। এই বংশের শেষ সুলতান আলাউদ্দিনের শাসনকালে জনৈক বাহলুল লোদী নামক ব্যক্তি বিদ্রোহ করে ক্ষমতা দখল করে নেন। তিনিই লোদী বংশের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম শাসক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00