📄 মুহাম্মাদ দাউদ
১৩৯৩ হিজরি (১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দ)। জহির শাহ তখন ইতালিতে। মুহাম্মাদ দাউদ কম্যুনিস্ট আন্দোলনকারী ও রুশ সরকারের সমন্বিত প্রচেষ্টায় একটি সামরিক বিপ্লব সংঘটিত করেন। দেশের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব নিয়ে নেন দাউদ। রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন আফগানিস্তানে। নিজে হন প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট। মসনদে বসেই দাউদ প্রথমে ইসলামি আন্দোলনসমূহের কণ্ঠরোধ করতে শুরু করেন।
কিছুদিন যেতেই দাউদ-রুশ সম্পর্কে চিড় ধরে। দাউদের ধারণা ছিল ক্ষমতায় যাওয়ামাত্রই দেশের একমাত্র হর্তাকর্তা হবেন তিনি। কিন্তু রুশদের পরিকল্পনা আরও গভীর। তারা দাউদের মাধ্যমে আফগানকে সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র বানানোর পথে একটি সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে মাত্র। সারা দেশে গুপ্তহত্যা বেড়ে যায়। গোলযোগ সৃষ্টি করে বার্তা দেওয়া হতে থাকে যে, আফগানিস্তান নিজের স্বাধীন ইচ্ছামতো চলবে না। দাউদ বুঝতে পারে, তার দিন ফুরিয়ে আসছে। তাই দ্রুত পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে কম্যুনিস্ট নেতাদের কারাবন্দি করতে আরম্ভ করেন। নুর মুহাম্মাদ তারাকি, হাফিজুল্লাহ আমিন, বাবরাক কারমাল এরা সবাই বন্দি হয়। কিন্তু আশঙ্কাজনক সবাইকে গ্রেপ্তার করার আগেই তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয়ে যায়। ১৩৯৮ হিজরিতে (১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে) কম্যুনিস্ট পার্টির এক নেতা মুহাম্মাদ গোলাপ ও দাউদের বিপ্লবের একসময়ের অন্যতম সহযোগী গুরুত্বপূর্ণ কম্যুনিস্ট নেতা আবদুল কাদিরের নেতৃত্বে বিপ্লব সংঘটিত হয়। এটি এপ্রিল বিপ্লব নামে পরিচিত। কারাগার থেকে কম্যুনিস্ট নেতাদের মুক্ত করা হয়। কম্যুনিস্ট পার্টির নেতা নুর মুহাম্মাদ তারাকিকে দেশের প্রেসিডেন্ট বানানো হয়।
📄 নুর মুহাম্মাদ তারাকি
নুর মুহাম্মাদ ক্ষমতায় আরোহণ করেই ভয়াবহ অরাজকতা শুরু করেন। রক্তপাত, জীবনহানি হয়ে ওঠে নিত্যদিনের ঘটনা। কম্যুনিজম কী জিনিস, তা হাড়ে হাড়ে টের পেতে শুরু করে জনগণ। একদিনে ১৫ হাজার লোক হত্যা করেন নুর। দাউদের সামনে তার ২৯ জন বংশধরকে হত্যা করা হয়। এরপর তাকে ও পরিবারের অন্য সদস্যদের হত্যা করা হয়। মুসলিম সমাজের নেতা ও জনসাধারণকে নির্বিচারে খুন করা হয়। কম্যুনিস্ট পার্টির হিজবে পারচাম ছিল নুর মুহাম্মাদের প্রতিদ্বন্দ্বী। এই পার্টির নেতাদের রাষ্ট্রদূত বানিয়ে বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। যেমন গুরুত্বপূর্ণ নেতা বাবরাক কারমালকে পাঠানো হয় চেকোস্লোভাকিয়ার রাষ্ট্রদূত হিসেবে।
দেশের বাহিরে অবস্থানরত এসব কম্যুনিস্ট নেতার পক্ষ থেকে ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছিল। হিজবে পারচামের নেতারা চাইত বৈশ্বিক সাম্যবাদের সাথে বৃহৎ ঐক্য। আফগানিস্তানে কামনা করত সরাসরি মস্কোর নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু ক্ষমতাসীন হিজবে খলক চাইত সাম্যবাদের আঞ্চলিক রূপায়ণ। নুর মুহাম্মাদ বিপদাশঙ্কা করে রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করেন। কিন্তু দেশে ফেরার পরিণতি আন্দাজ করে নেতারা কেউ আর দেশে ফিরে আসে না।
এরপর নুর মুহাম্মাদ মস্কো গিয়ে রাশিয়ার সাথে সামরিক সাহায্যের চুক্তি করেন। চুক্তি অনুযায়ী বর্তমান সাম্যবাদপন্থি শাসনব্যবস্থা রক্ষা এবং বিদ্রোহ দমন করার জন্য রুশ বাহিনী যেকোনো সময় আফগানে প্রবেশ করতে পারবে।
এ সময়ই ১৩৯৯ হিজরিতে (১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে 'আল-হিজবুল ইসলামি' আন্দোলন। হেরাত সেনানিবাসে এক অভ্যুত্থান ঘটে। সেনারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তৎক্ষণাৎ রাশিয়া আফগানিস্তানে তার প্রথম সৈন্যদল পাঠায়। ১৩৯৯ হিজরির রমজানে আফগান আক্রমণ করে রুশ সেনারা। এ সময় প্রেসিডেন্ট নুর মুহাম্মাদ ও প্রধানমন্ত্রী হাফিজুল্লাহ আমিনের মাঝে মতবিরোধ দেখা দেয়। রাশিয়া নুর মুহাম্মাদকে আহ্বান করে হিজবে পারচামের নেতা বাবরাক কারমালের সহায়তা গ্রহণ করতে। কিন্তু নুর মুহাম্মাদ আপত্তি জানায় এই বলে যে, প্রধানমন্ত্রী তাতে সম্মত নন। রাশিয়া পরিকল্পনা করে প্রেসিডেন্টের সহায়তায় প্রধানমন্ত্রী হাফিজুল্লাহ আমিনকে হত্যা করা হবে, কিন্তু পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। আমিন দেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। অতঃপর নুর মুহাম্মাদকে গ্রেফতার করে নিজেকে আফগানের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন।
📄 হাফিজুল্লাহ আমিন
হাফিজুল্লাহ আমিন দেশের পরিস্থিতি শান্ত করার প্রচেষ্টা চালান। প্রতিবেশী দেশের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু আমিন ঠিক রাশিয়ার চাহিদামতো নেতা ছিলেন না। রাশিয়ার চাহিদা হলো আংশিক নয়; বরং সর্বতোভাবেই রাশিয়াকে মান্য করবে এমন একজন মেরুদণ্ডহীন নেতা। তাই তারা দেশে আগের চেয়ে বেশি গোলযোগ সৃষ্টি করতে লাগল। আফগানে অবস্থানকারী রুশবাহিনী ও আফগানবাহিনী বেশ কয়েকবার মুখোমুখি লড়াইয়ে জড়াল। এমতাবস্থায় রুশরা সমর্থন দিলো চেকোস্লোভাকিয়ায় অবস্থানরত হিজবে পারচামের নেতা রুশ অনুগত বাবরাক কারমালকে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী মুহাম্মাদ আসলামকে রুশরা পক্ষে টানে। এই মন্ত্রী ১৪০০ হিজরিতে (১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে) প্রেসিডেন্ট ভবনে আক্রমণ চালিয়ে হাফিজুল্লাহ আমিনকে গ্রেফতার করেন। একদিন পরই তাকে হত্যাও করে ফেলেন। বাবরাক কারমালকে আফগান প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা হয়, যিনি তখনও দেশের বাইরে।
📄 বাবরাক কারমাল
বাবরাক যখন কাবুলে পৌঁছেন, ততক্ষণে সারা দেশে রুশবাহিনীর সয়লাব হয়ে গেছে। কাবুল তখন রুশদের নিয়ন্ত্রণে। অন্যান্য অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নিতে দ্রুত সেনা পাঠানো হচ্ছিল। জাতিসংঘ নিন্দা জানায় এবং রুশদের আফগান ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান করে। ইসলামাবাদে মুসলিম দেশসমূহের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে অভিযোগ তোলা হয় যে, রাশিয়া আন্তর্জাতিক আইন চূড়ান্ত পর্যায়ে লঙ্ঘন করেছে। কিন্তু এ সকল প্রস্তাব বা আহ্বানের কোনো প্রায়োগিক দিক এবং রাশিয়ার ওপর তার কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া ছিল না। জাতিসংঘ তো হলো বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষাকারী এক সংগঠন, যার মাধ্যমে তারা বিশ্বকে শাসন করে। ১৪০০ হিজরিতে, মাত্র এক বছরে রুশবাহিনীর হাতে শাহাদাত বরণ করে প্রায় দশ লাখ আফগান।