📄 খানিয়াতে খোকান্দ (ফারগানা)
১১২২ হিজরিতে (১৬০০ খ্রিস্টাব্দে) ফারগানা রাজ্য স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ভারতে মোঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের উত্তরসূরিদের একটি ধারা এই রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করে। ১২৯৫ হিজরিতে (১৮০০ খ্রিস্টাব্দে) ফারগানার শাসক আলম খান তাসখন্দকে স্বীয় অঞ্চলের অধীনে আনতে সক্ষম হন। বুখারা ও ফারগানার মাঝে বেশ কয়েকবার যুদ্ধ হয়। ১২৬৬-১২৬৫ হিজরির (১৮৪৯-১৮৫০ খ্রিস্টাব্দের) দিকে বুখারার সেনারা ফারগানা দখল করে নেয়। কিন্তু এই দখলদারি স্থায়ী হয়নি। এরপর ১২৮৩ হিজরিতে (১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে) রুশদের হাতে পতনের আগ পর্যন্ত এটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে টিকে থাকে।
📄 তুর্কিস্তানে রুশ আগ্রাসন
মধ্য এশিয়ায় রুশ আগ্রাসনের শিকার হয় প্রায় সমগ্র তুর্কিস্তান। পূর্ব তুর্কিস্তানে টানা দখলদারির কারণে এই অংশ রুশদের হাতছাড়া হয়। আর আফগানিস্তানে ব্রিটিশ দখলদারির কারণে এখানেও রুশদের বিরত থাকতে হয়। নয়তো মধ্য এশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত প্রায় পুরো অঞ্চলটাই পাচার হয়ে যেত রুশ ভালুকের পেটে।
উত্তর মোঘল সাম্রাজ্যের আলোচনাকালে রাশিয়ান তাতারদের সাথে রুশ সরকারের আচরণ কেমন ছিল, তা উল্লেখ করা হয়েছে। তুর্কিস্তান দখল করেও সেই একই আচরণ করা হয় এ অঞ্চলের মুসলিমদের সাথে। তবে সেই আগ্রাসন তুলনামূলক কম ছিল। কারণ, একে তো খুব কম সময়েই বিশাল অঞ্চল তাদের দখলে চলে আসে। তা ছাড়া, রাশিয়ান রাজধানী মস্কো থেকে তুর্কিস্তানের ভৌগোলিক দূরত্ব ছিল অনেক বেশি। অন্যদিকে তাতারদের বসবাস ছিল রাশিয়ার প্রাণ ভল্গা নদীর উপকূলে এবং ককেশাস পর্বতমালার উত্তরে। এজন্য রুশ নির্যাতনের মাত্রা তাদের ওপর ছিল অন্যদের তুলনায় সীমাহীন।
দুঃখজনক ব্যাপার হলো, তুর্কি, তাতার, ককেশাসিয়ানসহ রাশিয়ান মুসলিমরা নিজেদের করণীয় সম্পর্কে ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। কেউ চেয়েছে পূর্ণ স্বাধীনতা, আবার কেউ চেয়েছে স্বায়ত্তশাসন। কারও চাওয়া ছিল সমাজতন্ত্র, কারও চাওয়া সাম্যবাদ। প্রত্যেকেই ছিল ভিন্ন ভিন্ন পথের অনুসারী। অন্যদিকে ক্ষমতায় পৌঁছার জন্য বিভিন্ন সময় রুশ নেতারা মুসলমানদের দেখাতো হাজারো স্বপ্ন। আকাশ কুসুম স্বপ্নে বিভোর মুসলিম নেতারা তাদের মিথ্যা আশ্বাসেই আশ্বস্ত বোধ করত। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে আশ্বাস দানকারীরা মুসলিমদের শুধু নির্যাতনের নিত্যনতুন প্রকারভেদই দেখিয়েছে।
এই মুসলমানরা অতীত থেকে শিক্ষা নিতে যেন ব্যর্থ হয়েছিল। তিক্ত অভিজ্ঞতার পরও বারবার কেউ সরকারবিরোধী স্লোগান তুললেই তার পেছনে ছুটত। অথচ পরখ করে দেখত না এসব আন্দোলন সঠিক ইসলামি পন্থায় পরিচালিত কি না। মুক্তির জন্য অনেকে দ্বীনি বিষয়ে শিথিলতা অবলম্বন করতে দ্বিধাবোধ করত না। এজন্য দেখা গেছে, যাদের প্রতি অগাধ বিশ্বাস নিয়ে তারা দ্বীনকে অমান্য করেছিল, ক্ষমতা পেয়েই এরা তাদের ভুলে যায়। উল্টো নিজেরাই হয়ে ওঠে নির্যাতক। এ ছাড়া রুশ মুসলিমদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল অজ্ঞতা, তাদের মধ্যে বিরাজ করছিল ইসলামি জ্ঞানের ভয়াবহ শূন্যতা। এ ক্ষেত্রে রাশিয়ান কুট প্রচেষ্টাগুলো সফলতার মুখ দেখেছিল। সরকারের তরফ থেকে অনবরত ইসলামের বিকৃত রূপ প্রচার করা হতো। পত্রপত্রিকা, রেডিও, মিডিয়া, নাটক-সিনেমা, সভা-সমাবেশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইসলামের কটাক্ষ, নিন্দা, সমালোচনা ব্যাপকহারে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের মগজধোলাই চলতে থাকে। সামরিক আগ্রাসনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনও ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
বহুমুখী আগ্রাসনের মুখেও মুসলিমদের প্রতিরোধ-সংগ্রাম অব্যাহত ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১৩২২ হিজরি সনে রুশ সরকারের বিরুদ্ধে উজবেকদের বিদ্রোহ ও জিহাদ ঘোষণা। কিন্তু এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ১৩৩৬ হিজরিতে (১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে) কম্যুনিস্ট বিপ্লবের পর উজবেকরা আবার স্বাধীনতা ঘোষণা করে। খোকজু শহরকে রাজধানী করে তুর্কিস্তানে স্বাধীন সরকার গঠন করা হয়। কিন্তু রুশ সৈন্যরা তাদের নির্মমভাবে প্রতিহত করে। স্বাধীনতার স্বপ্ন মাটিতে মিশিয়ে দিতে নির্যাতনের স্টিম রোলার চালায়।
📄 তুর্কিস্তানের রাজনৈতিক বিভক্তি
সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল অনেক স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্রের সমষ্টি। তুর্কিস্তানি মুসলিমদের ঐক্য ভেঙে দিতে ও নিজেদের দখলদারি পোক্ত করতে সোভিয়েত সরকার এখানে পাঁচটি প্রজাতন্ত্র গঠন করে। এসব প্রজাতন্ত্রের সীমানার মধ্যেও আবার কিছু অঞ্চলকে প্রদেশ হিসেবে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করার সুযোগ করে দেয়। যথা:
📄 কাজাখস্তান প্রজাতন্ত্র
এটি প্রাচীন মাওয়ারাউন নাহার তথা ট্রান্সঅক্সিয়ানার অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং তুর্কিস্তানের অংশ। এটি তথাকার বৃহত্তম অঞ্চল। এর আয়তন প্রায় ২৭ লক্ষ বর্গকিলোমিটার। তৎকালীন রাজধানী ছিল আলমাটি। এই প্রজাতন্ত্রে খ্রিষ্টান জাতিগোষ্ঠীর পাল্লা ভারী করতে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে বিপুল পরিমাণ মানুষকে এখানে অভিবাসী করা হয়। সেই প্রচেষ্টার ফল হিসেবে একসময় মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫৪ ভাগ মানুষ খ্রিষ্টানে গিয়ে পৌঁছে। এটি ছিল রাশিয়ার বুকে একমাত্র মুসলিম প্রজাতন্ত্র, যেখানে পারমাণবিক পরীক্ষাগার ছিল।