📄 খানিয়াতে বুখারা
মাঙ্গিত গোষ্ঠী বুখারা শাসন করে। এই গোষ্ঠীর আবদুর রহিম নামক ব্যক্তি জানিয়িনদের সময়ে বুখারার শাসকপদ লাভ করেন। এরপর তার বংশের মির মাসুম শাহ বিয়ে করেন জানিয়া বংশের শেষ সুলতান আবুল গাজির কন্যাকে। এরপর ১২০০ হিজরিতে (১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দে) বুখারার শাসনক্ষমতা তার অধিকারে আসে। মির মাসুম আফগান অঞ্চলে জানিয়িনদের হারানো অঞ্চলসমূহ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। চতুর্দশ হিজরি শতাব্দীর প্রারম্ভকালে বুখারা রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। ১২৮২-১২৮৯ হিজরি (১৮৬৫-১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত সময়ের মাঝে রুশরা বারবার বুখারায় অভিযান চালায়। ১৩২৮ হিজরিতে (১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে) বুখারায় সাইয়িদ মিরের শাসনকালে রুশ বাহিনী তাতে আগ্রাসন চালায়। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। রুশ বাহিনী যুদ্ধে ব্যস্ত হয়ে গেলে বুখারায় তাদের সৈন্যবল কমে যায়। সে সুযোগে সাইয়িদ মির বুখারা রাজ্য স্বাধীন করতে সক্ষম হন। কিন্তু কম্যুনিস্ট বিপ্লবের পর ১৩৩৮ হিজরিতে (১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে) বুখারার পতন হয়। ইসলামের প্রাচীনতম শহরটিতে কম্যুনিস্ট লাল পতাকা উড্ডীন হয়।
📄 খানিয়াতে খোয়ারিজম
ইতিপূর্বে গত হয়েছে, খোয়ারিজম ছিল উত্তর মোঙ্গল সাম্রাজ্য তথা গোল্ডেন হোর্ডের অনুগত একটি প্রদেশ। তৈমুর লং এটি জয় করেন। তার মৃত্যুর পর সাম্রাজ্য ভেঙে গেলে খোয়ারিজমে শাইবানিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ৯২১ হিজরি (১৫১৫ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে সেখানে শাইবানিদের শাসন চলে। একাধিকবার বুখারার শাসকদের সাথে তাদের লড়াই হয়। ১২১৯ হিজরি (১৮০৪ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত এখানে তাদের শাসন টিকে ছিল। মাঝে ১১৫৩ হিজরিতে (১৭৪০ খ্রিষ্টাব্দে) নাদির খানের হাতে রাজ্যের পতন হয়। তবে কিছুদিন পরই আবার রাজত্ব ফিরে পায় তারা। তখন থেকে ১২১৯ হিজরি (১৮০৪ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত টানা শাসন করে। এরপর দীর্ঘদিন নানা প্রশাসকের হাতে দেশের শাসনভার ছিল। ১২৯০ হিজরিতে (১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে) তৎকালীন আমির মুহম্মদ সাঈদ আহমাদ খান রুশদের আনুগত্য ঘোষণা করেন। কিন্তু তাদের দাবি অনুযায়ী তখনও তারা স্বাধীন ছিল। যাই হোক, ১৩৩৩ হিজরিতে (১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে) সোভিয়েত বিপ্লবের সময় রুশ কর্তৃত্ব সাময়িক ভাটা পড়ে। কিন্তু এক বছরের মাথায়ই ১৩৩৪ হিজরিতে (১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে) কমিউনিস্টরা খোয়ারিজম দখল করে নেয়।
📄 খানিয়াতে খোকান্দ (ফারগানা)
১১২২ হিজরিতে (১৬০০ খ্রিস্টাব্দে) ফারগানা রাজ্য স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ভারতে মোঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের উত্তরসূরিদের একটি ধারা এই রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করে। ১২৯৫ হিজরিতে (১৮০০ খ্রিস্টাব্দে) ফারগানার শাসক আলম খান তাসখন্দকে স্বীয় অঞ্চলের অধীনে আনতে সক্ষম হন। বুখারা ও ফারগানার মাঝে বেশ কয়েকবার যুদ্ধ হয়। ১২৬৬-১২৬৫ হিজরির (১৮৪৯-১৮৫০ খ্রিস্টাব্দের) দিকে বুখারার সেনারা ফারগানা দখল করে নেয়। কিন্তু এই দখলদারি স্থায়ী হয়নি। এরপর ১২৮৩ হিজরিতে (১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে) রুশদের হাতে পতনের আগ পর্যন্ত এটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে টিকে থাকে।
📄 তুর্কিস্তানে রুশ আগ্রাসন
মধ্য এশিয়ায় রুশ আগ্রাসনের শিকার হয় প্রায় সমগ্র তুর্কিস্তান। পূর্ব তুর্কিস্তানে টানা দখলদারির কারণে এই অংশ রুশদের হাতছাড়া হয়। আর আফগানিস্তানে ব্রিটিশ দখলদারির কারণে এখানেও রুশদের বিরত থাকতে হয়। নয়তো মধ্য এশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত প্রায় পুরো অঞ্চলটাই পাচার হয়ে যেত রুশ ভালুকের পেটে।
উত্তর মোঘল সাম্রাজ্যের আলোচনাকালে রাশিয়ান তাতারদের সাথে রুশ সরকারের আচরণ কেমন ছিল, তা উল্লেখ করা হয়েছে। তুর্কিস্তান দখল করেও সেই একই আচরণ করা হয় এ অঞ্চলের মুসলিমদের সাথে। তবে সেই আগ্রাসন তুলনামূলক কম ছিল। কারণ, একে তো খুব কম সময়েই বিশাল অঞ্চল তাদের দখলে চলে আসে। তা ছাড়া, রাশিয়ান রাজধানী মস্কো থেকে তুর্কিস্তানের ভৌগোলিক দূরত্ব ছিল অনেক বেশি। অন্যদিকে তাতারদের বসবাস ছিল রাশিয়ার প্রাণ ভল্গা নদীর উপকূলে এবং ককেশাস পর্বতমালার উত্তরে। এজন্য রুশ নির্যাতনের মাত্রা তাদের ওপর ছিল অন্যদের তুলনায় সীমাহীন।
দুঃখজনক ব্যাপার হলো, তুর্কি, তাতার, ককেশাসিয়ানসহ রাশিয়ান মুসলিমরা নিজেদের করণীয় সম্পর্কে ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। কেউ চেয়েছে পূর্ণ স্বাধীনতা, আবার কেউ চেয়েছে স্বায়ত্তশাসন। কারও চাওয়া ছিল সমাজতন্ত্র, কারও চাওয়া সাম্যবাদ। প্রত্যেকেই ছিল ভিন্ন ভিন্ন পথের অনুসারী। অন্যদিকে ক্ষমতায় পৌঁছার জন্য বিভিন্ন সময় রুশ নেতারা মুসলমানদের দেখাতো হাজারো স্বপ্ন। আকাশ কুসুম স্বপ্নে বিভোর মুসলিম নেতারা তাদের মিথ্যা আশ্বাসেই আশ্বস্ত বোধ করত। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে আশ্বাস দানকারীরা মুসলিমদের শুধু নির্যাতনের নিত্যনতুন প্রকারভেদই দেখিয়েছে।
এই মুসলমানরা অতীত থেকে শিক্ষা নিতে যেন ব্যর্থ হয়েছিল। তিক্ত অভিজ্ঞতার পরও বারবার কেউ সরকারবিরোধী স্লোগান তুললেই তার পেছনে ছুটত। অথচ পরখ করে দেখত না এসব আন্দোলন সঠিক ইসলামি পন্থায় পরিচালিত কি না। মুক্তির জন্য অনেকে দ্বীনি বিষয়ে শিথিলতা অবলম্বন করতে দ্বিধাবোধ করত না। এজন্য দেখা গেছে, যাদের প্রতি অগাধ বিশ্বাস নিয়ে তারা দ্বীনকে অমান্য করেছিল, ক্ষমতা পেয়েই এরা তাদের ভুলে যায়। উল্টো নিজেরাই হয়ে ওঠে নির্যাতক। এ ছাড়া রুশ মুসলিমদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল অজ্ঞতা, তাদের মধ্যে বিরাজ করছিল ইসলামি জ্ঞানের ভয়াবহ শূন্যতা। এ ক্ষেত্রে রাশিয়ান কুট প্রচেষ্টাগুলো সফলতার মুখ দেখেছিল। সরকারের তরফ থেকে অনবরত ইসলামের বিকৃত রূপ প্রচার করা হতো। পত্রপত্রিকা, রেডিও, মিডিয়া, নাটক-সিনেমা, সভা-সমাবেশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইসলামের কটাক্ষ, নিন্দা, সমালোচনা ব্যাপকহারে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের মগজধোলাই চলতে থাকে। সামরিক আগ্রাসনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনও ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
বহুমুখী আগ্রাসনের মুখেও মুসলিমদের প্রতিরোধ-সংগ্রাম অব্যাহত ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১৩২২ হিজরি সনে রুশ সরকারের বিরুদ্ধে উজবেকদের বিদ্রোহ ও জিহাদ ঘোষণা। কিন্তু এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ১৩৩৬ হিজরিতে (১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে) কম্যুনিস্ট বিপ্লবের পর উজবেকরা আবার স্বাধীনতা ঘোষণা করে। খোকজু শহরকে রাজধানী করে তুর্কিস্তানে স্বাধীন সরকার গঠন করা হয়। কিন্তু রুশ সৈন্যরা তাদের নির্মমভাবে প্রতিহত করে। স্বাধীনতার স্বপ্ন মাটিতে মিশিয়ে দিতে নির্যাতনের স্টিম রোলার চালায়।