📄 শাইবানি শাসন
একটি মোঙ্গল গোত্র। চেঙ্গিস খানের বড় পুত্র জোচি খানের এক সন্তান শুভানের বংশধর। উত্তর মোঙ্গল সাম্রাজ্যের অধিপতি বাতু খান তার ভাই শুভানকে উরাল পর্বতমালার পূর্বাঞ্চল ও সাইবেরিয়ার বিস্তৃত অঞ্চল শাসনের দায়িত্ব দেন। তবে শুভান স্বাধীন শাসক ছিলেন না; বরং উত্তর মোঙ্গল সাম্রাজ্যের রাজধানী সারাইয়ের অনুগত ছিলেন। দশম হিজরি শতকে মাওয়ারাউন নাহারে তৈমুর বংশের শেষ সুলতান মাহমুদের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে গৃহযুদ্ধের আগুন জ্বলছিল। যে আগুন তৈমুরীয় সাম্রাজ্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছিল। সে সময় শুবানের বংশধর মুহাম্মাদ শাইবানি নামক ব্যক্তি তৈমুরীয় সাম্রাজ্যের গৃহযুদ্ধকে সুযোগ বিবেচনা করে সাইবেরিয়া থেকে বেরিয়ে পড়েন। তিনি যে বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তার অনেক সদস্য উজবেক জাতির হওয়ায় এটি উজবেক বাহিনী হিসেবে পরিচিতি পায়। তিনি এসে তৈমুরীয়দের ক্ষমতাদ্বন্দ্বের ইতি ঘটিয়ে সমরকন্দ দখল করেন। মুহাম্মাদের সাথে সে সময় সাইবেরিয়া থেকে অনেক গোষ্ঠী তুর্কিস্তান আগমন করে। যারা তখনও রাশিয়ায় রয়ে যায়, তারা তিওমেনের (একটি রাশিয়ান অঞ্চল) বাদশাহ হিসেবে পরিচিতি পায়। মুহাম্মাদ শাইবানি ৯০৬ হিজরিতে (১৫০০ খ্রিষ্টাব্দে) মাওয়ারাউন নাহারে তার শাসনকার্য সূচনা করেন। সমরকন্দ জয় করে সেটাকে নতুন সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে নির্ধারণ করেন। সে সময় সমরকন্দের • পরাজিত শাসক হিন্দুস্তানি শাসক জহিরুদ্দিন বাবরের সহায়তা কামনা করেন। বাবরও ছিলেন তৈমুরের উত্তরসূরি। বাবর সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন এবং মুহাম্মাদ শাইবানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। বাবরকে সহায়তা করে সাফাভিরা। ততদিনে ইলখানিয়া সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে সাফাভিরা পারস্যে সিংহাসন স্থাপন করেছে। কিন্তু এরপরও শাইবানিকে পরাজিত করা সম্ভব হয়নি। বাবরের প্রতিরোধ সত্ত্বেও মুহাম্মাদ শাইবানি সমগ্র মাওয়ারাউন নাহারে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। ৯১৬ হিজরির (১৫১০ খ্রিষ্টাব্দের) এক যুদ্ধে মুহাম্মাদ শাইবানি নিহত হন। তারপর ১০০৭ হিজরি (১৫৯৮ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত প্রায় এক শতাব্দী ধরে শাইবানি বংশের বিভিন্ন নেতা এই অঞ্চল শাসন করে। শেষদিকে এসে শাইবানি শাসকরা দুর্বল হয়ে পড়ে। ৯৯১ হিজরিতে (১৫৮৩ খ্রিষ্টাব্দে) দ্বিতীয় আবদুল্লাহ ক্ষমতায় আরোহণ করার পর তার পুত্র আবদুল মুমিন সাফাভিদের সহায়তায় পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। আবদুল্লাহ তার পুত্রের কাছে পরাজয় বরণ করেন। রাজ্যের সিংহভাগ হাতছাড়া হয়। ১০০৬ হিজরিতে (১৫৯৭ খ্রিষ্টাব্দে) আবদুল্লাহ মৃত্যুবরণ করেন। এক বছর যেতে না যেতেই ১০০৭ হিজরিতে (১৫৯৮ খ্রিষ্টাব্দে) তার পুত্র আবদুল মুমিন নিহত হন। এরপর দেশ থেকে শাইবানি (তথা উজবেক) প্রতিপত্তি ধুলোয় মিশে যায়। ক্ষমতায় আসে তাদেরই স্বজাতি নতুন এক গোত্র, যারা জানিয়িন নামে প্রসিদ্ধ।
📄 জানিয়া বংশের শাসন
এই শাসকবর্গ শাইবানিদের সমগোত্রীয়। এদের আবাস ছিল আস্ট্রাক্যান রাজ্যে। রুশ দখলদারির পর সেখানকার অনেক আমির হিজরত করে বুখারায় আশ্রয় নেয়। উজবেক শাইবানিদের আমলে তারা পুষ্ট হয়। অবশেষে এই অঞ্চলের ক্ষমতা হস্তগত করতে সক্ষম হয়। ১২০০ হিজরি (১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত প্রায় দুইশ বছর তারা শাসনকার্য পরিচালনা করে।
তাদের দীর্ঘ শাসনকালে সমগ্র দেশ কয়েকটি রাজ্যে ভাগ হয়ে যায়। এর মধ্যে বুখারা, ফারগানা, সমরকন্দ, খোয়ারিজম ও তুর্কিস্তানের অন্যান্য রুশ দখলকৃত ভূমি উল্লেখযোগ্য। আমু দরিয়ার পূর্ব তীরে অবস্থিত বলখ, বাদাখশান প্রভৃতি অঞ্চল পরবর্তীকালে আফগানিস্তানের অংশ হিসেবে পরিগণিত হয়। প্রথমত আমরা রুশ অধিকৃত অঞ্চলগুলোর আলোচনা করব, তারপর আফগান সংক্রান্ত আলোচনায় প্রবেশ করব।
📄 রুশ অধিকৃত তুর্কি অঞ্চলসমূহ
পশ্চিম তুর্কিস্তানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাজ্য গড়ে উঠেছিল। যথা:
📄 খানিয়াতে বুখারা
মাঙ্গিত গোষ্ঠী বুখারা শাসন করে। এই গোষ্ঠীর আবদুর রহিম নামক ব্যক্তি জানিয়িনদের সময়ে বুখারার শাসকপদ লাভ করেন। এরপর তার বংশের মির মাসুম শাহ বিয়ে করেন জানিয়া বংশের শেষ সুলতান আবুল গাজির কন্যাকে। এরপর ১২০০ হিজরিতে (১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দে) বুখারার শাসনক্ষমতা তার অধিকারে আসে। মির মাসুম আফগান অঞ্চলে জানিয়িনদের হারানো অঞ্চলসমূহ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। চতুর্দশ হিজরি শতাব্দীর প্রারম্ভকালে বুখারা রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। ১২৮২-১২৮৯ হিজরি (১৮৬৫-১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত সময়ের মাঝে রুশরা বারবার বুখারায় অভিযান চালায়। ১৩২৮ হিজরিতে (১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে) বুখারায় সাইয়িদ মিরের শাসনকালে রুশ বাহিনী তাতে আগ্রাসন চালায়। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। রুশ বাহিনী যুদ্ধে ব্যস্ত হয়ে গেলে বুখারায় তাদের সৈন্যবল কমে যায়। সে সুযোগে সাইয়িদ মির বুখারা রাজ্য স্বাধীন করতে সক্ষম হন। কিন্তু কম্যুনিস্ট বিপ্লবের পর ১৩৩৮ হিজরিতে (১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে) বুখারার পতন হয়। ইসলামের প্রাচীনতম শহরটিতে কম্যুনিস্ট লাল পতাকা উড্ডীন হয়।