📄 গণতান্ত্রিক চীন (১৩২৯-১৩৬৯ হি./১৯১১-১৯৫০ খ্রি.)
গণতান্ত্রিক চীনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও মুসলমানদের বেশ ভূমিকা ছিল। কারণ, এর মাধ্যমে তারা মাঞ্চুদের শাসন থেকে মুক্তি পাবে বলে ধারণা করে। গণতান্ত্রিক সরকার মুসলিমদেরকে চীনের মূল কাঠামোর অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। চীনের অধিবাসীদের ৫টি জাতিতে বিভক্ত করা হয়। যথা: ১. চীনা ২. মাঞ্চু ৩. মোঙ্গল ৪. মুসলিম (হুই বংশীয়) ও ৫. তিব্বতি।
তৎকালীন নতুন চীনা পতাকায় ৫টি রং ছিল। লাল, নীল, হলুদ, সাদা ও কালো। সাদা রং হলো মুসলমানদের প্রতীক। চীনের মূল ভূখণ্ডে মুসলমানদের আন্দোলন সংগ্রাম থেমে যায়। পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে ফিরে আসে। অনেক ইসলামি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। মুসলমানদের শিক্ষাদীক্ষা, সেবা-সাহায্যসহ বিশ্বের অন্যান্য মুসলিমদের সাথে যোগাযোগ স্থাপনেও এসব প্রতিষ্ঠান বেশ ভূমিকা রেখেছিল। তবে চীনের দখলকৃত পূর্ব তুর্কিস্তানের পরিস্থিতি তখনও সম্পূর্ণ ভিন্নরকম।
📄 পূর্ব তুর্কিস্তানে মুসলমানদের টিকে থাকার সংগ্রাম
বীর সেনাপতি কুতাইবা বিন মুসলিম এই অঞ্চল জয় করেন। ৯৬ হিজরিতে (৭১৫ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি ইসলামি সেনাদল নিয়ে আঞ্চলিক বৃহত্তম শহর কাশগরে প্রবেশ করেন। তারপর দীর্ঘকাল এই অঞ্চলে ইসলামি শাসন টিকে ছিল। এখানকার অধিকাংশ অধিবাসী ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে। তারপর তারাই দাওয়াতের মাধ্যমে অন্যান্য চীনা জাতির মাঝে ইসলাম ছড়িয়ে দিতে তৎপর থাকে। একসময় মোঙ্গলরা এখানে জয়ী হয়ে সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। তারপর তাদের দুর্বলতার দরুন এ অঞ্চলে ভাঙনের সৃষ্টি হয়। বিচ্ছিন্নতার সুযোগে সাম্রাজ্য বিস্তার করে বসে মাঞ্চুরা। ১১৪৯-১১৯৯ হিজরি (১৭৩৬-১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত সময়ের মাঝে বিস্তৃত অঞ্চল মাঞ্চুদের পদানত হয়। তারা এর নামকরণ করে শিনচিয়াং অর্থাৎ 'নতুন অঞ্চল'। (বস্তুত, এই নামই দখলদারির প্রমাণ বহন করে।)
পূর্ব তুর্কিস্তান ও কাংসুতে একের পর এক বিদ্রোহ ঘটতে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিদ্রোহ সংঘটিত হয় ইয়াকুব বেগের নেতৃত্বে ১২৭১ হিজরিতে (১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে)। বিদ্রোহ করে সফল হয় ইয়াকুব বেগের বিপ্লবী সেনারা। চীন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে গণতান্ত্রিক পূর্ব তুর্কিস্তান। তবে এই স্বাধীনতা টিকে ছিল মাত্র ১৩ বছর। ঠিক সে সময় কাংসুতে বিপ্লবীরা চীনের মোকাবিলা করছিল। নিজেদের বিপ্লবের স্থায়িত্বের জন্যই তুর্কিস্তানিদের ওপর কর্তব্য ছিল কাংসুদের সহায়তা করা। কিন্তু তারা এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেনি। ফলে চীনারা কাংসুদের বিপ্লব দমন করতে সক্ষম হয়। এরপর তারা পূর্ণ মনোযোগ ফেরায় পূর্ব তুর্কিস্তানের দিকে। ১২৯১ হিজরিতে (১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দে) পূর্ব তুর্কিস্তানের পতন হয়। হত্যা করা হয় ইয়াকুব বেগকে।
চীনে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার পর সরকারের কিছু পদক্ষেপ তুর্কিস্তানি অধিবাসীদের উত্তেজিত করে তোলে। তার মধ্যে একটি হলো, চীনের প্রতি নতজানু মাসউদ বেগকে গভর্নর বানানো। মাসউদ ছিল মারাত্মক জালেম শাসক। বিরোধীদের হত্যা করা ছিল তার স্বভাবজাত বিষয়। একপর্যায়ে সমাজে তার জুলুমের মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে চীন সরকারের কাছে এই নিপীড়কের ব্যাপারে অভিযোগ জানায়। সরকার তাকে কঠোরতা কমিয়ে আনতে উপদেশ দেয়। সেও উপদেশের সামনে বিনয়ী ভাব দেখায়। কিন্তু আড়ালে এই নির্যাতন-নিপীড়ন অব্যাহতই থাকে। অবস্থা যেই সেই রয়ে যায়। এ অবস্থায় বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। উন্মত্ত জনতা সরকার নিযুক্ত কমিশনারকে হত্যা করে। জনগণ তৈমুর নামের একজনকে এ বিদ্রোহের নেতা নির্বাচিত করে। বিদ্রোহ দমন করতে চীনও সৈন্য প্রেরণ করে। চীনা বাহিনীর প্রধান রক্তপাতহীন বিদ্রোহ দমনের চেষ্টা করে। শান্তিচুক্তি হয় এবং সবার জন্য ঘোষণা করা হয় সাধারণ ক্ষমা। তবে বিপ্লবী নেতা তৈমুরকে নির্বাসিত করা হয় দেশ থেকে। এভাবে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
📄 দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন আন্দোলন-সংগ্রাম
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান চীন আক্রমণ করে উত্তরাংশ কবজা করে নেয়। তুমুল আক্রমণ চালিয়ে ১৩৫২-১৩৫৭ হিজরির (১৯৩৩-১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের) মধ্যবর্তী সময়ে চীনের রাজধানী বেইজিং দখল করে রাখে। রাশিয়া জাপানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে চীনকে পূর্ণমাত্রায় সহযোগিতা করছিল। লড়াইয়ে নিজের পাল্লা ভারী করতে জাপান চীনের মুসলিমদের সাথে হাত মেলাতে আগ্রহী হয়। এজন্য দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, পত্রপত্রিকা প্রকাশ ইত্যাদিতে তারা কোনোপ্রকার বাধা দেয়নি। এই সুযোগে মুসলিমরা নিজেদেরকে সুসংগঠিত করে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, প্রকাশনা, একাডেমি ও পত্রিকা গড়ে ওঠে। চীনাদেরকে ইসলাম গ্রহণের স্বাধীনতা দেয় জাপান সরকার। মুসলিমদের তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদত হজ পালনে আগ্রহীদের জন্য যাতায়াতব্যবস্থা উন্নত করার চেষ্টা করে তারা।
এই অবস্থায় মুসলিমরা বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক ভাগ জাপানের পক্ষাবলম্বন করে। আরেক ভাগ চলে যায় রাশিয়াপন্থি কম্যুনিস্টদের পক্ষে। কম্যুনিস্টরা মুসলমানদের বিভিন্ন ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের পক্ষে ভিড়িয়ে নেয়। বিশ্বযুদ্ধে জাপান পরাজিত হয়। লাল বাহিনী জাপানিদের তাড়িয়ে চীনের প্রায় সর্বত্র নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। তাইওয়ান প্রদেশ তখনও এসব থেকে মুক্ত ছিল। সে অঞ্চলে শাসন প্রতিষ্ঠা করে চীনের পূর্ব শাসকগোষ্ঠী। এদিকে কম্যুনিস্টপন্থি রাশিয়া চীনে তার সম্প্রসারণবাদি নীতি ফলাতে শুরু করে। মুসলিমরা কাংসু প্রদেশে স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু লানচৌ যুদ্ধে কম্যুনিস্টদের কাছে তাদের পরাজয় ঘটে। সে যুদ্ধে মুসলিমদের সেনাপতি ছিলেন হুসাইন মাপুফাং। এরপর কম্যুনিস্ট বাহিনী পূর্ব তুর্কিস্তানে তাদের দখলদারি প্রতিষ্ঠা অব্যাহত রাখে। আলি খানের নেতৃত্বে ও রাশিয়ার সহযোগিতায় স্থানীয় মুসলিমরা প্রদেশের উত্তরাঞ্চলে স্বাধীন এলাকা প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু চীনা কম্যুনিস্ট বাহিনী সমগ্র প্রদেশে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। বিপ্লবের নেতারা আত্মগোপন করতে বাধ্য হয়।
📄 দ্রষ্টব্য
’তুর্কিস্তানের স্বাধীনচেতা জনগণ এখনো স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু চীনের কঠিন দমননীতির ফলে স্বাধীনতার স্বপ্ন যেন ডানাভাঙা কোনো পাখি। যেকোনো আন্দোলন সেখানে কঠোর উপায়ে দমন করা হয়। সেখানকার মুসলমানদের জীবন কীভাবে কাটে, সে সম্পর্কেও বিশ্বমিডিয়া প্রায় অন্ধকারে থাকে。
বর্তমানে পূর্ব তুর্কিস্তানসহ সমস্ত চীনা অঞ্চল চলমান শাসনের আওতাভুক্ত। কেবল পশ্চিমা সহায়তায় স্বাধীনতা ধরে রাখতে পেরেছে তাইওয়ান। অবশ্য রুশ সহায়তায় মঙ্গোলিয়াও বিশাল ভূখণ্ড নিয়ে চীন থেকে পৃথক রাষ্ট্র গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। তার রাজধানী উলানবাটোর, যার পূর্ব নাম ছিল কারাকোরাম। চীনের উত্তর পশ্চিম দিকে মুসলমানের সংখ্যা বেশি। পূর্ব দিকে ধীরে ধীরে মুসলমানের সংখ্যা কমে এসেছে। চীনে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ১০%। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ না করে মুসলিমদের কম সংখ্যক বুঝিয়ে হীনম্মন্যতা তৈরি করা সাম্রাজ্যবাদীদের পুরোনো কৌশল। তাই চীনও কখনো মুসলিমদের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ করে না। শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে সাম্রাজ্যবাদের আরেকটি কৌশল হলো ঐতিহাসিক নামগুলো মুছে ফেলা। এই প্রক্রিয়ায় বদলে ফেলা হয়েছে বহু প্রাচীন নাম। যেমন: উরমুজি, তিহো ইয়ারকন্দ, সুজি, কাশগর, শুফু প্রভৃতি।’