📄 মিং বংশের শাসন (৭৭০-১০৫২ হি./১৩৬৯-১৬৪২ খ্রি.)
চীনে মোগল শাসনের পতন ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে মির। ৭৭০ হিজরিতে তোঘান তৈমুরের আমলে বেইজিং দখলের মাধ্যমে চুড়ান্তভাবে মোগলরা চীনের কেন্দ্র থেকে বিতাড়িত হয়। তারা খেঁয়ে কুল্লাইয়ের বংশধরা আশ্রয় নেয় কারাকোরাম ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে। এদের হাতে পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলে কয়েকটি রাজ্য গড়ে ওঠে। এসব রাজ্যের শাসক নির্ধারণে মিররাই মূল ভূমিকা পালন করত। ঝুঁকে ঝুঁকে চলা এসব রাজ্যের ইতি ঘটিয়ে চুড়ান্ত চীনা দখলদারি প্রতিষ্ঠা হয় ১০৪০ হিজরিতে। পূর্ব তুর্কিস্তানে নিজেদের দুর্বলতা ও অনৈক্যের খেসারত দেয় মোগলরা। বিচ্ছিন্ন হয়ে গড়ে ওঠে কাশগড়, আকসুর মতো স্বতন্ত্র রাজ্য। গড়ে ওঠা এসব রাজ্য পরিচালনা করত চাগাতাইয়ের কিছু বংশধর। দুর্বলতাবশত তারা মির রাজবংশের অধীনতা মেনে নিয়ে শাসনকার্য চালাত। একপর্যায়ে মিররা মঙ্গোলিয়া, পূর্ব তুর্কিস্তান ও কানসুর পূর্ণ দখল নিয়ে নেয়। তবে মির শাসনামলেও মুসলিমরা পূর্বের মতো মর্যাদা লাভ করত। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তাদের গণ্য করা হতো।
📄 মাঞ্চু বংশের শাসন (১০৫৪-১৩২৯ হি./১৬৪৪-১৯১১ খ্রি.)
পূর্বে চীনা শাসকরা মুসলিমদের সাথে সভ্যতা বজায় রেখে দেশ পরিচালনা করত। এ পর্যন্ত প্রায় পুরোটা সময়জুড়েই বিভিন্ন সাম্রাজ্যকালে মুসলিমদের সম্মানের অবস্থানে তেমন হেরফের হয়নি। তাদের জন্য নির্ধারিত থাকত সম্মানজনক সব পদ। মুসলিমরা নিজেদের সুউচ্চ ইসলামি মূল্যবোধ ও আখলাকের মাধ্যমে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর হৃদয় কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু মাঞ্চুদের রাজত্ব শুরু হতেই অবস্থা বদলে যেতে লাগল। মুসলিমদের অবস্থান ও কর্তৃত্ব তাদের রাজত্বের জন্য তারা হুমকি মনে করল। রাষ্ট্রীয় পদে মুসলিমদের উচ্চ অবস্থান, মূল্যায়ন, যোগ্যতা ও ক্ষমতার তুলনায় চীনা কর্মকর্তাদের পিছিয়ে থাকার কারণে তাদের মনে হিংসাত্মক অভিসন্ধি জেগে উঠল। মুসলমান হটানো হয়ে উঠল সেসব কর্মকর্তার অন্যতম লক্ষ্য। এসব চীনা রাজ কর্মচারী মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের আগুন ছড়াতে শুরু করল। এই আগুন আরও তেতে ওঠার কারণ হলো, দুই মুসলমান সেনাপতি শেষ মিং রাজা ইয়াংগান ওয়াংকে সমর্থন করে এবং তার পক্ষে অস্ত্র ধারণ করে। হারানো সাম্রাজ্য ফিরে পাওয়ার আশায় ১০৫৮ হিজরিতে (১৬৪৮ খ্রিষ্টাব্দে) এই দুজনের সহযোগিতায় কাংসু রাজ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করে মিংয়ের শেষ বংশধর। কিন্তু মাঞ্চুরা এই বিদ্রোহ কঠোর হাতে দমন করে। প্রায় ৫ হাজার মুসলিমকে হত্যা করে মাঞ্চুবাহিনী। এরপর থেকেই মাঞ্চুরা মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করতে উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। মুসলিমরা কয়েকবার প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলে। কিন্তু সেসব ব্যর্থ হওয়ার জন্য তাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধই যথেষ্ট ছিল। শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যের পরিবর্তে চীনা মুসলিমরা ছিল শত দলে বিভক্ত। সামান্য বিষয় ও সাধারণ ফিকহি মাসআলাও তাদের ঐক্যে ফাটল ধরাতে যথেষ্ট ছিল। তখন গৃহবিবাদ মেটানোর নাম করে মাঞ্চুদের রাজা সৈন্য পাঠিয়ে মুসলিমদের শায়েস্তা করার সহজ সুযোগ হাতছাড়া করত না। অগণিত মুসলমান শহিদ হয়ে যেত, তবু তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিরোধ করতে পারত না।
এজন্য অনেক বিদ্রোহ সংগ্রাম করেও মুসলমানরা সাফল্য ঘরে তুলতে পারেনি। বিচ্ছিন্ন ও ছড়ানো ছিটানো বিদ্রোহ দমন করতে মাঞ্চুদের তেমন বেগ পেতে হয়নি। নিহত হয় প্রচুর পরিমাণ মুসলিম। তবে তাদের এই দমননীতির একপর্যায়ে তারা কিছুটা সহনশীল মনোভাবে ফিরে আসে। পরবর্তী শাসকগোষ্ঠীও একই নীতি অবলম্বন করে। যার লক্ষণ হিসেবে ১৩২১ হিজরিতে (১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে) বেইজিং জামে মসজিদের ইমাম ইলিয়াস আবদুর রহমানকে ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়। এই প্রতিষ্ঠানে আরবি ভাষা শিক্ষা দেওয়া হতো। এ সময় উসমানি খলিফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদ চীনা মুসলিমদের সাথে নতুন করে সংযোগ স্থাপন করেন। তিনি বেইজিংয়ে প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেন। তারা সেখানে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করলে সেখানে প্রচুর সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। কিন্তু এই উদ্যোগকে চীনা সরকার নিজের জন্য হুমকি মনে করে। তারা ধারণা করে, এটি হচ্ছে ইসলামি জাগরণের সূচনা। তখন প্রতিনিধি দলকে ইস্তাম্বুল ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
📄 গণতান্ত্রিক চীন (১৩২৯-১৩৬৯ হি./১৯১১-১৯৫০ খ্রি.)
গণতান্ত্রিক চীনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও মুসলমানদের বেশ ভূমিকা ছিল। কারণ, এর মাধ্যমে তারা মাঞ্চুদের শাসন থেকে মুক্তি পাবে বলে ধারণা করে। গণতান্ত্রিক সরকার মুসলিমদেরকে চীনের মূল কাঠামোর অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। চীনের অধিবাসীদের ৫টি জাতিতে বিভক্ত করা হয়। যথা: ১. চীনা ২. মাঞ্চু ৩. মোঙ্গল ৪. মুসলিম (হুই বংশীয়) ও ৫. তিব্বতি।
তৎকালীন নতুন চীনা পতাকায় ৫টি রং ছিল। লাল, নীল, হলুদ, সাদা ও কালো। সাদা রং হলো মুসলমানদের প্রতীক। চীনের মূল ভূখণ্ডে মুসলমানদের আন্দোলন সংগ্রাম থেমে যায়। পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে ফিরে আসে। অনেক ইসলামি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। মুসলমানদের শিক্ষাদীক্ষা, সেবা-সাহায্যসহ বিশ্বের অন্যান্য মুসলিমদের সাথে যোগাযোগ স্থাপনেও এসব প্রতিষ্ঠান বেশ ভূমিকা রেখেছিল। তবে চীনের দখলকৃত পূর্ব তুর্কিস্তানের পরিস্থিতি তখনও সম্পূর্ণ ভিন্নরকম।
📄 পূর্ব তুর্কিস্তানে মুসলমানদের টিকে থাকার সংগ্রাম
বীর সেনাপতি কুতাইবা বিন মুসলিম এই অঞ্চল জয় করেন। ৯৬ হিজরিতে (৭১৫ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি ইসলামি সেনাদল নিয়ে আঞ্চলিক বৃহত্তম শহর কাশগরে প্রবেশ করেন। তারপর দীর্ঘকাল এই অঞ্চলে ইসলামি শাসন টিকে ছিল। এখানকার অধিকাংশ অধিবাসী ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে। তারপর তারাই দাওয়াতের মাধ্যমে অন্যান্য চীনা জাতির মাঝে ইসলাম ছড়িয়ে দিতে তৎপর থাকে। একসময় মোঙ্গলরা এখানে জয়ী হয়ে সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। তারপর তাদের দুর্বলতার দরুন এ অঞ্চলে ভাঙনের সৃষ্টি হয়। বিচ্ছিন্নতার সুযোগে সাম্রাজ্য বিস্তার করে বসে মাঞ্চুরা। ১১৪৯-১১৯৯ হিজরি (১৭৩৬-১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত সময়ের মাঝে বিস্তৃত অঞ্চল মাঞ্চুদের পদানত হয়। তারা এর নামকরণ করে শিনচিয়াং অর্থাৎ 'নতুন অঞ্চল'। (বস্তুত, এই নামই দখলদারির প্রমাণ বহন করে।)
পূর্ব তুর্কিস্তান ও কাংসুতে একের পর এক বিদ্রোহ ঘটতে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিদ্রোহ সংঘটিত হয় ইয়াকুব বেগের নেতৃত্বে ১২৭১ হিজরিতে (১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে)। বিদ্রোহ করে সফল হয় ইয়াকুব বেগের বিপ্লবী সেনারা। চীন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে গণতান্ত্রিক পূর্ব তুর্কিস্তান। তবে এই স্বাধীনতা টিকে ছিল মাত্র ১৩ বছর। ঠিক সে সময় কাংসুতে বিপ্লবীরা চীনের মোকাবিলা করছিল। নিজেদের বিপ্লবের স্থায়িত্বের জন্যই তুর্কিস্তানিদের ওপর কর্তব্য ছিল কাংসুদের সহায়তা করা। কিন্তু তারা এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেনি। ফলে চীনারা কাংসুদের বিপ্লব দমন করতে সক্ষম হয়। এরপর তারা পূর্ণ মনোযোগ ফেরায় পূর্ব তুর্কিস্তানের দিকে। ১২৯১ হিজরিতে (১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দে) পূর্ব তুর্কিস্তানের পতন হয়। হত্যা করা হয় ইয়াকুব বেগকে।
চীনে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার পর সরকারের কিছু পদক্ষেপ তুর্কিস্তানি অধিবাসীদের উত্তেজিত করে তোলে। তার মধ্যে একটি হলো, চীনের প্রতি নতজানু মাসউদ বেগকে গভর্নর বানানো। মাসউদ ছিল মারাত্মক জালেম শাসক। বিরোধীদের হত্যা করা ছিল তার স্বভাবজাত বিষয়। একপর্যায়ে সমাজে তার জুলুমের মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে চীন সরকারের কাছে এই নিপীড়কের ব্যাপারে অভিযোগ জানায়। সরকার তাকে কঠোরতা কমিয়ে আনতে উপদেশ দেয়। সেও উপদেশের সামনে বিনয়ী ভাব দেখায়। কিন্তু আড়ালে এই নির্যাতন-নিপীড়ন অব্যাহতই থাকে। অবস্থা যেই সেই রয়ে যায়। এ অবস্থায় বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। উন্মত্ত জনতা সরকার নিযুক্ত কমিশনারকে হত্যা করে। জনগণ তৈমুর নামের একজনকে এ বিদ্রোহের নেতা নির্বাচিত করে। বিদ্রোহ দমন করতে চীনও সৈন্য প্রেরণ করে। চীনা বাহিনীর প্রধান রক্তপাতহীন বিদ্রোহ দমনের চেষ্টা করে। শান্তিচুক্তি হয় এবং সবার জন্য ঘোষণা করা হয় সাধারণ ক্ষমা। তবে বিপ্লবী নেতা তৈমুরকে নির্বাসিত করা হয় দেশ থেকে। এভাবে পরিস্থিতি শান্ত হয়।