📄 ওগেদাই পরিবার থেকে খানে-আজম পদের ইতি
গুয়ুক খানের মৃত্যুকে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন বাতু খান। তিনি সাম্রাজ্যের রাজধানী কারাকোরামে একটি শক্তিশালী বাহিনী পাঠিয়ে তুলুইপুত্র মাংকো খানকে প্রধান খান নির্বাচিত করেন। এর মাধ্যমে খানে আজমের পদ ওগেদাই বংশ থেকে অপসারিত হয়ে তুলুই বংশে জায়গা করে নেয়। ওগেদাইয়ের উত্তরসূরিরা বিষয়টি মোটেও সহজভাবে নেয়নি। তখন ওগেদাইদের কর্ণধার ছিল গুযুকের ভাই কাশিন।
মাংকো খান খানে-আজম হওয়ার পর পূর্ব তুর্কিস্তানের বিদ্রোহ দমন করতে তার ভাই কুবলাই খানকে নিয়ে রওনা হন। তার অনুপস্থিতিতে রাজধানীর দায়িত্ব অর্পণ করে যান আরেক ভাই আরতাক বুকার কাছে। কিন্তু রাজধানী কারাকোরামে ফিরে আসার আগেই মাংকো খানের মৃত্যু হয়। এ সময় জোচির পুত্র বারকে খান ও ওগেদাইয়ের পৌত্র কেদু উভয়ে আরতাক বুকাকে খানে-আজম হতে উদ্বুদ্ধ করে। এদিকে কুবলাই খানও ছিলেন সমান প্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে আরতাক ও কুবলাইয়ের মাঝে লড়াই বেধে যায়। অবস্থাদৃষ্টে তাদের আরেক ভাই হালাকু খান পশ্চিম সীমান্তের রণাঙ্গন ছেড়ে গৃহবিবাদ মেটাতে চলে আসেন। হালাকু খান কুবলাই খানকে সমর্থন করেন এবং তাকে খানে-আজম বানাতে সক্ষম হন। এতে বিবাদ শেষ হয়। অতঃপর কাশিনপুত্র কেদুকেও পরাস্ত করেন হালাকু।
কুবলাই খান তার শাসনকেন্দ্র কারাকোরাম থেকে বেইজিংয়ে স্থানান্তর করেন। বেইজিং হয় মোঙ্গল সাম্রাজ্যের নতুন রাজধানী। এর ফলে ওগেদাই বংশের অধীনস্থ এলাকা দুই ভাগ হয়ে যায়।
এক.
মঙ্গোলিয়া ও পূর্ব তুর্কিস্তান। এই অঞ্চলের রাজধানী কারাকোরাম। এখানে ওগেদাইদের শাসন বহাল থাকে। পরবর্তীকালে এ অঞ্চলের শাসনে চাগতাই পরিবার প্রবেশ করে।
দুই.
বিশাল চীনা অঞ্চল। এই অঞ্চলের রাজধানী বেইজিং। এখানকার শাসক তুলুইপুত্র কুবলাই খান।
পৃথকভাবে উভয় অঞ্চলের অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত পুরো বিবরণ পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে।
📄 কুবলাই পরিবারের শাসন (৬৭৫-৭৬৯ হি./১২৭৬-১৩৬৮ খ্রি.)
কুবলাই খান খানে-আজম পদ লাভ করে রাজধানী স্থানান্তর করেন বেইজিংয়ে। তখন পর্যন্ত কেবল চীনের উত্তরাঞ্চলই ছিল মোঙ্গলদের শাসনাধীন। কুবলাই এসে ৬৭৯ হিজরির (১২৮০ খ্রিষ্টাব্দের) দিকে দক্ষিণ চীনকেও সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। কুবলাইয়ের হাতে এক বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপিত হয়। ৭৭1 হিজরি পর্যন্ত চীনা সাম্রাজ্য কুবলাইদের দখলে ছিল। সাম্রাজ্যের শেষ পুরুষ হলেন তোগান তৈমুর। এই বংশের শাসকরা ছিল বেশ ফুর্তিবাজ ও বিলাসী।
চীনে ইসলাম আগমন করে মহান সাহাবি ও তৃতীয় খলিফা উসমান রা.-এর শাসনকালে। মুসলিম ব্যবসায়ী ও দাঈদের মাধ্যমে এ অঞ্চলে ইসলামের প্রবেশ ঘটে। উমাইয়া শাসনামলে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে চীনে দাঈদের আগমন বৃদ্ধি পায়। সে সময় আনুমানিক ১৬টি দাওয়াতি কাফেলা চীনে এসেছিল ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে। আব্বাসি আমলে আসে আনুমানিক ১২টি দল। তবে চীনে ইসলাম প্রচার-প্রসারের মূল সময়টা ছিল কুবলাই বংশের মোঙ্গলীয় শাসনামল। এ পরিবারের শাসকগণ ইসলাম গ্রহণকারী মোঙ্গলদের ওপর বেশ ভরসা করত। তাই অনেক সময় মুসলিম অঞ্চল থেকে সৈনিক ও বড় কর্মকর্তা চীনে আগমন করেছিল কুবলাইদের প্রয়োজনে। তুর্কিস্তান ও মাওয়ারাউন নাহারের বিপুল মুসলিম সৈন্য চীনে আগমন করে। কোনো সময়ে ১২টি প্রদেশে সৃষ্ট চীনা সাম্রাজ্যের ৪টি প্রদেশেরই প্রশাসক ছিল মুসলিমরা। মোঙ্গল সাম্রাজ্যে মুসলিম প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাঝে প্রসিদ্ধ একজন হলেন শামসুদ্দিন উমর। তিনি সাধারণ একজন সেনা অফিসার হিসেবে যোগদান করে পর্যায়ক্রমে থাইউয়েন শহরের সামরিক শাসক, বিনয়াং শহরের প্রশাসক, বেইজিংয়ের বিচারপতি ও পরবর্তীকালে তার শাসক, সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক উপদেষ্টা, একপর্যায়ে সিচুয়ান, ইউনান প্রদেশের শাসকে পরিণত হন। তিনি বিপুল পরিমাণ মসজিদ-মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। সম্ভবত চীনে টিকে থাকা অধিকাংশ প্রাচীন মসজিদ মোগল আমলেরই তৈরি। চীনে সে সময় মুসলমানদের বেশ কদর ছিল। জাগতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সভ্যতা-সাংস্কৃতিক সকল ক্ষেত্রেই তাদের ছিল অনন্য ভূমিকা। ব্যক্তিত্ব ও বৈশিষ্ট্যগুলোর ফলে সর্বাবস্থায়ই তারা উচ্চ সব পদে অধিষ্ঠিত।
📄 মিং বংশের শাসন (৭৭০-১০৫২ হি./১৩৬৯-১৬৪২ খ্রি.)
চীনে মোগল শাসনের পতন ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে মির। ৭৭০ হিজরিতে তোঘান তৈমুরের আমলে বেইজিং দখলের মাধ্যমে চুড়ান্তভাবে মোগলরা চীনের কেন্দ্র থেকে বিতাড়িত হয়। তারা খেঁয়ে কুল্লাইয়ের বংশধরা আশ্রয় নেয় কারাকোরাম ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে। এদের হাতে পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলে কয়েকটি রাজ্য গড়ে ওঠে। এসব রাজ্যের শাসক নির্ধারণে মিররাই মূল ভূমিকা পালন করত। ঝুঁকে ঝুঁকে চলা এসব রাজ্যের ইতি ঘটিয়ে চুড়ান্ত চীনা দখলদারি প্রতিষ্ঠা হয় ১০৪০ হিজরিতে। পূর্ব তুর্কিস্তানে নিজেদের দুর্বলতা ও অনৈক্যের খেসারত দেয় মোগলরা। বিচ্ছিন্ন হয়ে গড়ে ওঠে কাশগড়, আকসুর মতো স্বতন্ত্র রাজ্য। গড়ে ওঠা এসব রাজ্য পরিচালনা করত চাগাতাইয়ের কিছু বংশধর। দুর্বলতাবশত তারা মির রাজবংশের অধীনতা মেনে নিয়ে শাসনকার্য চালাত। একপর্যায়ে মিররা মঙ্গোলিয়া, পূর্ব তুর্কিস্তান ও কানসুর পূর্ণ দখল নিয়ে নেয়। তবে মির শাসনামলেও মুসলিমরা পূর্বের মতো মর্যাদা লাভ করত। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তাদের গণ্য করা হতো।
📄 মাঞ্চু বংশের শাসন (১০৫৪-১৩২৯ হি./১৬৪৪-১৯১১ খ্রি.)
পূর্বে চীনা শাসকরা মুসলিমদের সাথে সভ্যতা বজায় রেখে দেশ পরিচালনা করত। এ পর্যন্ত প্রায় পুরোটা সময়জুড়েই বিভিন্ন সাম্রাজ্যকালে মুসলিমদের সম্মানের অবস্থানে তেমন হেরফের হয়নি। তাদের জন্য নির্ধারিত থাকত সম্মানজনক সব পদ। মুসলিমরা নিজেদের সুউচ্চ ইসলামি মূল্যবোধ ও আখলাকের মাধ্যমে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর হৃদয় কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু মাঞ্চুদের রাজত্ব শুরু হতেই অবস্থা বদলে যেতে লাগল। মুসলিমদের অবস্থান ও কর্তৃত্ব তাদের রাজত্বের জন্য তারা হুমকি মনে করল। রাষ্ট্রীয় পদে মুসলিমদের উচ্চ অবস্থান, মূল্যায়ন, যোগ্যতা ও ক্ষমতার তুলনায় চীনা কর্মকর্তাদের পিছিয়ে থাকার কারণে তাদের মনে হিংসাত্মক অভিসন্ধি জেগে উঠল। মুসলমান হটানো হয়ে উঠল সেসব কর্মকর্তার অন্যতম লক্ষ্য। এসব চীনা রাজ কর্মচারী মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের আগুন ছড়াতে শুরু করল। এই আগুন আরও তেতে ওঠার কারণ হলো, দুই মুসলমান সেনাপতি শেষ মিং রাজা ইয়াংগান ওয়াংকে সমর্থন করে এবং তার পক্ষে অস্ত্র ধারণ করে। হারানো সাম্রাজ্য ফিরে পাওয়ার আশায় ১০৫৮ হিজরিতে (১৬৪৮ খ্রিষ্টাব্দে) এই দুজনের সহযোগিতায় কাংসু রাজ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করে মিংয়ের শেষ বংশধর। কিন্তু মাঞ্চুরা এই বিদ্রোহ কঠোর হাতে দমন করে। প্রায় ৫ হাজার মুসলিমকে হত্যা করে মাঞ্চুবাহিনী। এরপর থেকেই মাঞ্চুরা মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করতে উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। মুসলিমরা কয়েকবার প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলে। কিন্তু সেসব ব্যর্থ হওয়ার জন্য তাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধই যথেষ্ট ছিল। শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যের পরিবর্তে চীনা মুসলিমরা ছিল শত দলে বিভক্ত। সামান্য বিষয় ও সাধারণ ফিকহি মাসআলাও তাদের ঐক্যে ফাটল ধরাতে যথেষ্ট ছিল। তখন গৃহবিবাদ মেটানোর নাম করে মাঞ্চুদের রাজা সৈন্য পাঠিয়ে মুসলিমদের শায়েস্তা করার সহজ সুযোগ হাতছাড়া করত না। অগণিত মুসলমান শহিদ হয়ে যেত, তবু তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিরোধ করতে পারত না।
এজন্য অনেক বিদ্রোহ সংগ্রাম করেও মুসলমানরা সাফল্য ঘরে তুলতে পারেনি। বিচ্ছিন্ন ও ছড়ানো ছিটানো বিদ্রোহ দমন করতে মাঞ্চুদের তেমন বেগ পেতে হয়নি। নিহত হয় প্রচুর পরিমাণ মুসলিম। তবে তাদের এই দমননীতির একপর্যায়ে তারা কিছুটা সহনশীল মনোভাবে ফিরে আসে। পরবর্তী শাসকগোষ্ঠীও একই নীতি অবলম্বন করে। যার লক্ষণ হিসেবে ১৩২১ হিজরিতে (১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে) বেইজিং জামে মসজিদের ইমাম ইলিয়াস আবদুর রহমানকে ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়। এই প্রতিষ্ঠানে আরবি ভাষা শিক্ষা দেওয়া হতো। এ সময় উসমানি খলিফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদ চীনা মুসলিমদের সাথে নতুন করে সংযোগ স্থাপন করেন। তিনি বেইজিংয়ে প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেন। তারা সেখানে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করলে সেখানে প্রচুর সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। কিন্তু এই উদ্যোগকে চীনা সরকার নিজের জন্য হুমকি মনে করে। তারা ধারণা করে, এটি হচ্ছে ইসলামি জাগরণের সূচনা। তখন প্রতিনিধি দলকে ইস্তাম্বুল ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়।