📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইরান

📄 দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইরান


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে শাহ রেজা পাহলভি নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু ইউরোপ ও জার্মানদের যুদ্ধ এমন ঘোরতর অবস্থা ধারণ করে যে কারও নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ থাকল না। অগত্যা শাহ রেজা জার্মানির পক্ষ নিলেন। বিশেষত যুদ্ধের শুরু পর্যায়ে ইরান ছিল জার্মানির যুদ্ধে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরবরাহের একমাত্র উৎস। ইরানের জার্মানির প্রতি গৃহীত ভূমিকার কারণ সম্ভবত ছিল এই যে, সে সময় জার্মানির সাথে রাশিয়ারও মৈত্রী ছিল। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই জার্মান-রুশ মিত্রতা ভেস্তে গেল। জার্মান বাহিনী রাশিয়ায় আক্রমণ করা শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে ইরানের শাহ আবার তার নিরপেক্ষতা ঘোষণা করেন।

প্রকাশ্যে নিরপেক্ষতার কথা বললেও শাহ মূলত জার্মানের পক্ষেই কাজ করতে থাকেন। এ সময়ে ইরানে প্রচুর পরিমাণে জার্মান কর্মকর্তা ও গোয়েন্দাদের আনাগোনা ছিল। এতে বিশ্বযুদ্ধীয় মিত্রপক্ষ ইরানকে আহ্বান জানায় জার্মান কর্মকর্তাদের ইরান থেকে বহিষ্কার করতে। শাহের ধারণা ছিল এই যুদ্ধে জার্মানিরই জয় হবে। আর জার্মানি জিতে গেলে রাশিয়ার হাত থেকে ককেশাস অঞ্চল লাভ করবে ইরান। কিন্তু যুদ্ধে আচানক জার্মানদের পরাজয় হলো। ফলে শাহ রেজা জার্মান কর্মকর্তাদের ইরান থেকে বহিষ্কারে সম্মত হন। কিন্তু মিত্রপক্ষ জার্মান কর্মকর্তাদের তাদের হাতে তুলে দিতে শাহকে বাধ্য করে।

তারা ইরান আক্রমণের জন্য কোনো একটি ইস্যু খুঁজছিল। ১৩৬০ হিজরিতে (১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে) হঠাৎ করেই মিত্রবাহিনী ইরানে প্রবেশ করে। রুশ বাহিনী আজারবাইজানে এসে তাবরিজ পর্যন্ত দখল করে নেয়। ইংরেজরা ভারত ও ইরাক থেকে এসে কিরমানশাহ প্রদেশ দখল করে নেয়। একই সময় ইংরেজ নৌবাহিনী দখল করে নেয় ইরানের মুহাম্মারা নৌবন্দর। ফলত ইরান রুশ-ইংরেজদের সাথে সন্ধি করতে বাধ্য হয়। সন্ধি অনুযায়ী ইরান অধিকৃত অঞ্চলে রুশ-ইংরেজদের উপস্থিতি মেনে নেবে আর জার্মান নেতৃত্বাধীন অক্ষশক্তির সকল কূটনীতিককে নিজ দেশ থেকে বহিষ্কার করবে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। ইংরেজ-রুশ মিত্রশক্তি রেজা শাহকে পুত্র মুহাম্মাদ শাহের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য করে। তারপর তাকে নির্বাসিত করে মাদাগাস্কারের নিকটবর্তী ভারত মহাসাগরের ছোট একটি দ্বীপরাষ্ট্র মরিশাসে। অবশেষে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে স্থানান্তরিত হন। এখানেই তার মৃত্যু ঘটে।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 মুহাম্মাদ রেজা পাহলভি

📄 মুহাম্মাদ রেজা পাহলভি


১৩৬০ হিজরিতে (১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে) ক্ষমতার মসনদে বসেন মুহাম্মাদ রেজা পাহলভি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন তুঙ্গে। মুহাম্মাদ রেজা ইংরেজ-রুশ মিত্রপক্ষের আনুগত্য বজায় রাখেন। এ ছাড়া তার ভিন্ন কোনো উপায়ও ছিল না। কারণ, দেশের অনেকাংশ তখন মিত্রবাহিনীর অধীনে। মুহাম্মাদ রেজা পাহলভি ছিলেন আয়েশপ্রিয় শাসক। তিনি গোয়েন্দা পুলিশ বিভাগ গড়ে তোলেন। শাসনের শেষদিকে তার সদস্য সংখ্যা ছিল ৫০ হাজার। রুশ-ইংরেজ বাহিনীর সাথে তার চুক্তি হয় যে, বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার ৬ মাস পর ইরানের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া হবে এবং মিত্রবাহিনী ইরান ত্যাগ করবে। ১৩৬২ হিজরিতে (১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে) শাহ মিত্রবাহিনীকে খুশি করতে তাদের সাথে কাঁধ মিলিয়ে অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

এ সময় ইরানে প্রভাব বিস্তারের দিকে মনোযাগ দেয় আমেরিকা। মার্কিন গোয়েন্দারা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ইরানে অবস্থিত জার্মান গোপন ঘাঁটিগুলো নিশ্চিহ্ন করে দেয়। ১৩৬২ হিজরিতেই (১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে) ইরানের রাজধানী তেহরানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট স্টালিন ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল। সেই মিটিংয়ে ইরানের স্বাধীনতা ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়। এদিকে রুশ ও ব্রিটিশ সরকার ইরানকে অবদমিত রাখতে কূটনীতি বহাল রাখে। এ উদ্দেশ্যে তারা ইরানে কাজার বংশের শাসন ফিরিয়ে আনার হুমকি দেয়। এ অবস্থায় মুহাম্মাদ রেজা আমেরিকার সাহায্য প্রার্থনা করে। তখন আমেরিকা বিবৃতিতে জানায়, ইরানে নতুন কোনো বিশৃঙ্খলা বা ভাঙন সৃষ্টির প্রচেষ্টা মার্কিনরা সহ্য করবে না।

ইরান সব সময়ই বহুজাতিক দেশ। এখানে পারসিক ছাড়াও আরব, তুর্কি, কুর্দিসহ নানা জাতি বাস করে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় সর্বত্র পারসিকদের প্রভাব অত্যন্ত বেশি ছিল। অবহেলিত সংখ্যালঘুদের মধ্যে এ নিয়ে ছিল পুরোনো ক্ষোভ। এ সময় তাদের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। সুযোগসন্ধানী ইংরেজ ও রুশ সরকার এসব বিদ্রোহে ইন্ধন জোগায়। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য, যেভাবেই হোক এবং যার মাধ্যমেই হোক মুসলিম দেশগুলোতে বিশৃঙ্খলা-বিচ্ছিন্নতা জিইয়ে রাখা এবং জাতীয়তাবাদের বিষাক্ত চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া।

এই বিদ্রোহের মধ্য থেকেই ১৩৬৫ হিজরিতে (১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে) স্বাধীনতা ঘোষণা করে আজারবাইজান ও কুর্দিস্তান। ইরান সরকার এই বিদ্রোহীদের মাঝে সম্পর্ক নষ্টের প্রচেষ্টা চালায়। এরপর ইরানি বাহিনী প্রবল শক্তিতে বিদ্রোহীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আজারবাইজান তৎক্ষণাৎ ইরানের কাছে আত্মসমর্পণ করে। কুর্দিরা প্রতিরোধ চালিয়ে যায়। কিন্তু ইরানি আক্রমণের মুখে ভেঙে যায় সে প্রতিরোধ। ১৫০০ কুর্দি হত্যা করে বিদ্রোহ দমন করে ইরানি সেনাবাহিনী। স্বাধীনতাকামী নেতাদের প্রদান করা হয় মৃত্যুদণ্ড।

ইরানজুড়ে ইংরেজ প্রভাব তখনও বেশ জোরালো। এজন্য বিদ্রোহে ইংরেজদের ইন্ধনের ব্যাপারে জেনেও শাহ মুহাম্মাদ তাদের প্রতি সৌজন্য বজায় রেখে চলতেন। এমনকি ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতা দেখা দিলেও এই সৌজন্যের হেরফের হতো না। এজন্য ফিলিস্তিন প্রশ্নে ইরানের অবস্থান ছিল বেশ হতাশাজনক। যখন ফিলিস্তিনের বুকে মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া ইসরাইলের নামে দখলদারি ঘোষণা করা হয়, তখন সমগ্র মুসলিম উম্মাহ প্রতিবাদে জ্বলে উঠলেও নীরব ছিল ইরান ও তুরস্ক। তুরস্কেও তখন ইংরেজ প্রভাব বেশ ভালোভাবে শেকড় গেড়ে বসেছিল।

বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে আমেরিকা ইরানের সামরিক বাহিনীকে উন্নত করার সিদ্ধান্ত নিলো। এতে তাদের যে সমস্ত লক্ষ্য অর্জিত হবে তা হলো, ইরানের প্রতিবেশী সোভিয়েত রাশিয়াকে হুমকির মধ্যে রাখা যাবে। ইরানের অধিকাংশ নাগরিক শিয়া হওয়ায় অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের সাথে তাদের দূরত্বের ফলে ইরানকে এই অঞ্চলে টাইমবোমের মতো ফিট করে রাখা যাবে। আমেরিকার অবৈধ সন্তান ইসরাইলের জন্য ইরান হুমকির কারণ হবে না। ইরানের প্রতিবেশী ইংরেজ প্রভাবিত ইরাকে প্রবেশের জন্য তাকে ব্যবহার করা যাবে। এজন্য দেখা গেছে, ইরাকের বিদ্রোহী কুর্দিদের ইরান সমর্থন করত। কিন্তু ১৩৯৫ হিজরিতে (১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে) তেল রফতানিকারী রাষ্ট্রগুলোর সংগঠন ওপেকের এক সম্মেলনে দুই দেশের প্রতিনিধি আলজেরিয়ার বৈঠকে বসে ঐকমত্য পোষণ করে যে, ইরান আর ইরাকের কুর্দি বিদ্রোহীদের সমর্থন দেবে না। বিনিময়ে ইরানকে শাতিল আরবের বিতর্কিত অঞ্চল বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00