📄 ইসমাইল সাফাভি
সাফাভি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ইসমাইল সাফাভি। পিতার নাম হায়দার, দাদা জুনাইদ। এই বংশের পূর্বপুরুষ সফিউদ্দিন আরদাবিলির (আরদাবিল আজারবাইজানের একটি শহর) নামানুসারে সাফাভি সাম্রাজ্যের নামকরণ হয় (সফি থেকে সাফাভি)। ইসমাইল সাফাভি কিছু তুর্কমেন সৈনিক সংগ্রহ করে ৯০৭ হিজরিতে (১৪০৪ খ্রিষ্টাব্দে) আক-কিলুনি বংশের রাজত্ব দখল করে ইরাক ও আজারবাইজানের অধিকাংশ এলাকাজুড়ে নতুন সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন। তাবরিজ ছিল এই সাম্রাজ্যের রাজধানী। তৈমুর বংশের অনুগত আমিররা ইসমাইলের আনুগত্য স্বীকার করে নেয়। ইসমাইল সাফাভি রাজত্বকালে শিয়া মতবাদ গ্রহণ করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিশাল রাজত্বের অধিকারী হয়ে ওঠেন। পূর্বে আফগানিস্তানের হেরাত ও আমু দরিয়া, দক্ষিণে আরব উপসাগর ও ওমান উপসাগর ছিল তার সীমানা।
শিয়ারা সংখ্যায় কম হলেও ত্রাণকর্তার মতো আবির্ভূত হওয়া ইসমাইলকে তারা সবাই সমর্থন দেয়। প্রতিটি যুদ্ধেই শিয়া সৈনিক ছিল তার প্রধান হাতিয়ার। একপর্যায়ে ৯২০ হিজরির এক যুদ্ধে চালদিরান রণাঙ্গনে উসমানিদের সাথে ইসমাইল পরাজিত হন। এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে দিয়ারেবকর, তাবরিজ অঞ্চল উসমানিদের হাতে চলে যায়। এ ছাড়া, পূর্বাঞ্চলে উজবেকদের সাথেও ইসমাইলের লড়াই ছিল অব্যাহত। শুরুর দিকে তিনি তাদের বিরুদ্ধে জয় লাভ করেন। তবে পরবর্তী সময়ে উজবেকরা জয় লাভ করে পরাজিত অঞ্চলসমূহ উদ্ধার করে নেয়। তারা ইসমাইলকে শিয়াবাদ ছেড়ে প্রকৃত ইসলাম ও আহলুস সুন্নাহর পথে ফিরে আসতে আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু ইসমাইল এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে শিয়া মতবাদ আঁকড়ে থাকেন। তার সাথে দিল্লির শাসক বাবরের বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল। কিন্তু তার শিয়া মতবাদের কারণে এই সম্পর্ক স্থায়ী হয়নি।
সুন্নি মুসলিমদের প্রতি প্রচণ্ড পরিমাণে বিদ্বেষী ছিলেন ইসমাইল সাফাভি। সুন্নিদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য পর্তুগিজ ও ক্রুসেডারদের সাথেও তার মিত্রতা গড়ে উঠেছিল। বিশেষত সুন্নিদের তৎকালীন বৃহৎ সাম্রাজ্য উসমানিদের মোকাবিলা ছিল এ ক্ষেত্রে তার লক্ষ্য।
৯৩০ হিজরিতে ইসমাইল মৃত্যুবরণ করেন। তার সিংহাসন লাভ করেন পুত্র তাহমাস্প। ইসমাইল রাজত্বকালে শাহ উপাধি ধারণ করেন। তার পরবর্তী সম্রাটদের কালেও এই রীতি অব্যাহত থাকে।
📄 তাহমাস্প
অল্প বয়সেই রাজত্ব লাভ করেন তাহমাস্প। শুরুর দিকে রাজত্ব চলছিল কার্যত শিয়া নেতৃবৃন্দের হাতে। পুরোপুরি স্বনির্ভর হওয়ার পর তাহমাস্প নিজের দায়িত্ব সামলাতে শুরু করেন। উজবেকদের সাথে যুদ্ধে জয় পান তাহমাস্প। এদিকে বাগদাদের আমির উসমানি সুলতানের আনুগত্যের ঘোষণা দেয়। বাগদাদে কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনতে তাহমাস্প সেদিকে রওনা হন। কিন্তু তার আগেই উসমানিরা ইরাকে প্রবেশ করে বাগদাদে অধিকার প্রতিষ্ঠা করে এবং ইরাক হতে সাফাভিদের বিতাড়িত করে। ঠিক সে সময় উজবেকরা পূর্ব দিক থেকে সাফাভি সাম্রাজ্যে আক্রমণ চালায় এবং খোরাসানের রাজধানী মাশহাদ দখল করে নেয়। দ্বিমুখী আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে তাহমাস্প উসমানিদের সাথে সন্ধি করতে বাধ্য হয়। এর মাধ্যমে পূর্ব পশ্চিম দুই প্রান্তেই পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। ৯৮৪ হিজরিতে (১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে) তাহমাস্প মৃত্যুবরণ করেন। তারপর তার পুত্র ইসমাইল সিংহাসনে আরোহণ করেন।
📄 আব্বাস
তাহমাস্প ছিলেন ভীষণ কঠিন হৃদয়ের অধিকারী। কাউকে তিনি বিশ্বাস করতেন না; এমনকি নিজের সন্তানদেরও নয়। বিদ্রোহের আশঙ্কায় নিজ পুত্র ইসমাইলকে ২৫ বছর কারাবন্দি করে রাখেন। তার মৃত্যুর পর ইসমাইল মুক্তি পান। তখন ভাইদের মাঝে রাজত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। দুই ভাই মুহাম্মাদ ও আব্বাসকে পরাজিত করে ইসমাইল সিংহাসন দখল করেন। কিন্তু বসতে না বসতেই তাকে হত্যা করা হয়। ক্ষমতা চলে আসে অপর ভাই মুহাম্মাদ (খরাবাঙ্ক)-এর হাতে। তার দশ বছরের শাসন শেষে ৯৯৫ হিজরিতে (১৫৮৭ খ্রিষ্টাব্দে) সিংহাসনে বসেন আব্বাস।
আব্বাস
সাফাভি সাম্রাজ্যে ছড়িয়ে পড়া অরাজকতার সুযোগে উসমানিরা তাবরিজ, আর্মেনিয়া, জর্জিয়া, দাগিস্তান ইত্যাদি অঞ্চল দখল করে নেয়। শাহ আব্বাস ছিলেন খুবই চতুর শাসক। পূর্ব-পশ্চিমে একসাথে লড়াই চালিয়ে সাফাভিদের শক্তিক্ষয় হচ্ছিল বেশি। তাই শাহ আব্বাস ইস্পাহানে রাজধানী স্থানান্তর করে উসমানিদের সাথে সন্ধিপূর্বক আজারবাইজানসহ তাদের করায়ত্ত অঞ্চলের স্বীকৃতি দেন। এভাবে পশ্চিম দিক থেকে দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন পূর্বদিকে উজবেকদের ওপর এবং তাদের পরাজিত করে বিস্তৃত অঞ্চলে তার সাম্রাজ্য বিস্তার করেন।
উজবেকদের ঠান্ডা করে চুক্তির ঠিক পনেরো বছর পর উসমানিদের দিকে নজর দেন শাহ আব্বাস। সাফাভি সাম্রাজ্যের পুরোনো সীমানার যেসব অঞ্চল উসমানিদের দখলে চলে গেছে সেসব ফিরিয়ে নেওয়ার পালা এখন। আব্বাসকে সাহায্য করল ইংরেজরা। তারা যুদ্ধের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহ করল। সে সময় আনাতোলিয়ায় উসমানিদের মাঝে গৃহবিবাদ চলছিল। সব দিক থেকে উপযুক্ত সময়ে উসমানি সাম্রাজ্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন আব্বাস। তার থেকে নিকটবর্তী অঞ্চলগুলোর ওপর আক্রমণ চালাতে শুরু করেন। দখল করে নেন তাবরিজ, আর্মেনিয়া, আজারবাইজানের বিশাল অংশ ও কার্স। এরপর তিনি বাগদাদ অভিমুখী হন। কিন্তু বাগদাদে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হন। তখন তিনি ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেন। তৎকালীন বাগদাদের আমির জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার প্রতিই লক্ষ রাখত বেশি। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বাগদাদ কবজা করে নেন শাহ আব্বাস।
আব্বাসের সময় পর্তুগিজদের ক্ষমতার অন্তকাল চলছিল। ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ইংরেজরাও পর্তুগিজদের সহ্য করতে পারত না। এই সুবাদে আব্বাস ও ইংরেজ একাট্টা হয়ে ১০৩১ হিজরিতে (১৬২২ খ্রিষ্টাব্দে) হরমুজ প্রণালি থেকে পর্তুগিজদের বিতাড়িত করে। এর মাধ্যমে পর্তুগিজমুক্ত হয়ে যায় আরব উপসাগরীয় অঞ্চল।
শাহ আব্বাস শিয়া মতবাদে ভীষণ আকৃষ্ট ছিলেন। সুন্নি মুসলিমদের প্রতি ছিলেন প্রচণ্ড বিদ্বেষী। উসমানিদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য ইউরোপীয়দের সাথে মিত্রতা করার আকাঙ্ক্ষা ছিল তার সবসময়। আব্বাস ছিলেন অত্যন্ত রূঢ়। তার বড় ছেলেকে তিনি হত্যা করেন এবং তারই নির্দেশে চোখ উপড়ে ফেলা হয় আরও দুই ছেলের। আব্বাস মারা যান ১০৩৭ হিজরিতে (১৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে)। তার পরে ক্ষমতায় আরোহণ করেন তার নাতি সফিউদ্দিন।
📄 সফিউদ্দিন
সাফাভি সাম্রাজ্যের অধঃপতনের সময় ক্রমান্বয়ে শুরু হচ্ছিল। উসমানিদের সাথে যুদ্ধে পরাজয় বরণ করে সাফাভিরা। ইরাক ও বাগদাদ উসমানিদের করায়ত্ত হয়। ১০৪৯ হিজরিতে (১৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে) দুই সাম্রাজ্যের সীমানা নির্ধারণমূলক সন্ধিচুক্তি সম্পাদিত হয়।