📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সোভিয়েত আমলে ইসলাম বিরোধিতার নমুনা

📄 সোভিয়েত আমলে ইসলাম বিরোধিতার নমুনা


সোভিয়েত আমলে ইসলাম বিরোধিতার নমুনা

* সোভিয়েত আমলে মুসলিমদের যে নির্যাতন করা হয়েছে, সে তুলনায় অন্য ধর্মানুসারীদের তেমন কিছুই করা হয়নি। মূলত ধর্মহীন বলা হলেও সোভিয়েত আন্দোলনের নেতাদের কিছু ছিল ইহুদি আর কিছু খ্রিষ্টান। কোনো মুসলমান যতই আনুগত্য দেখিয়ে পার্টির কেন্দ্রে যাওয়ার চেষ্টা করত, তাদের সে সুযোগ দেওয়া হতো না। কম্যুনিজমের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যশীল হলেও কোনো মুসলিমকে বিশ্বাস করা হতো না; বরং মুসলিম বলে সামান্য সন্দেহবশত বহু মানুষকে পার্টি থেকে বহিষ্কার হতে হয় ও শান্তির মুখে পড়তে হয়।
* হজ পালন, জাকাত আদায়সহ অন্যান্য নেক আমল থেকেও মুসলিমদের বাধা দেওয়া হতো। মুসলিম নারীদের পর্দায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হতো। রমজানে রোজা বাধাগ্রস্ত করার জন্য কর্মঘণ্টা বাড়িয়ে দেওয়া হতো। মসজিদে নামাজ আদায় করলে ভীতি প্রদর্শন করা হতো।
* রাজনৈতিক সচেতনতামূলক সংগঠনের মাধ্যমে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো ছিল অন্যতম হাতিয়ার। সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত সবকটি অঞ্চলের ভাষায় এমন সব বইপত্র লেখা হতো, যেগুলোয় থাকত ইসলামবিদ্বেষী ও তার প্রতি ঠাট্টা, অপমানজনক কথাবার্তা। ইসলামকে পশ্চাৎপদ, অনগ্রসর ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে মুসলিমদের হীনম্মন্য করার চেষ্টা চলত।
* রুশ ভাষা শিক্ষা ছিল বাধ্যতামূলক। মাতৃভাষা লিখতে হতো ভিন্ন লিপিতে, যেন অল্পদিনেই তারা শেকড় হারিয়ে ফেলে।
* সহশিক্ষার প্রতি তোরজোর চলত, যার দ্বারা চরিত্র নষ্ট হয় এবং প্রবৃত্তির চাহিদা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে。

এতসব জুলুমের মুখে কেউ যদি প্রতিবাদী হয়ে উঠত, তাহলে তার বিরুদ্ধে চলত গুম, খুন। জানা যায়, সোভিয়েত নেতা স্টালিনের শাসনকালে প্রায় ১১ মিলিয়ন মুসলিমকে হত্যা করা হয়। বহু মুসলিম পরিবারকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার মিথ্যা অভিযোগে সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত করা হয়।
সোভিয়েত রাশিয়া নানারকম কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল। তার একটি ছিল মিথ্যা আদমশুমারি প্রকাশ। আদমশুমারির নামে মুসলিমদের সংখ্যা প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে অনেক কম প্রকাশ করা হতো। এর উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং পরিস্থিতি মেনে নিয়ে তারা যেন সোভিয়েত সরকারের অনুগত হয়ে চলে। সংখ্যা কম জানা থাকলে কেউ বিদ্রোহ বা অন্য ধরনের মুক্তি প্রচেষ্টা চালানোর সাহস পাবে না; এতে বরং তাদের ওপর কেবল অত্যাচারই বাড়বে। অথচ তখনকার মুসলমানদের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি ছিল। তখনও প্রায় ২০ মিলিয়নের বেশি মুসলিম বিভিন্ন অঞ্চলে বাস করত। আবার তাদের বংশবৃদ্ধি ও ছিল রুশ ও অন্যান্য ধর্মের লোকদের চেয়ে বেশি।
সর্বোপরি চেষ্টা চলত মুসলিমরা যেন কখনো ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে। ছোট ছোট এলাকায় তাদের দেশগুলো বিভক্ত করে দেওয়া হয়। জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্বমুখর চেতনা জাগিয়ে তোলার চেষ্টা চলত। তাদেরকে নানারকম সমস্যায় জর্জরিত করে রাখা হতো। তাদেরকে মিশ্রিত করে দেওয়া হয়েছিল রাশিয়ান সমাজের গভীরে। কোনোপ্রকারে জীবনধারণ করাই ছিল এক সংগ্রামের নাম। এ অবস্থায় স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করা হয়ে উঠেছিল দুঃস্বপ্নের মতো।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন ও তার ভাঙন

📄 সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন ও তার ভাঙন


সোভিয়েত আমলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো বেশ জটিল আকার ধারণ করে। তিন স্তরে বিভক্ত শাসনাঞ্চল নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠিত হয়। প্রথম স্তরে ছিল ১৫টি প্রজাতন্ত্র। এগুলো মিলেই সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠিত হয়।
সবগুলো প্রজাতন্ত্র একটি কেন্দ্র তথা মস্কো থেকে শাসন করা হতো। এই ১৫টি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে ছিল মুসলিমপ্রধান তুর্কি প্রজাতন্ত্রগুলো ও আজারবাইজান প্রজাতন্ত্র। দ্বিতীয় স্তরে উপরিউক্ত ১৫টি প্রজাতন্ত্রের অধীনে আরও কিছু স্বায়ত্তশাসিত অঙ্গরাজ্য ছিল। কিন্তু এগুলোর স্বায়ত্তশাসন কেবল নামেই; কার্যত সেগুলো পরাধীনই ছিল। জনমনে খেয়ালি তৃপ্তি জাগাতে এগুলোর শুরুতে স্বায়ত্তশাসনের নাম জুড়ে দেওয়া হয়। তৃতীয় স্তরে ছিল পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলগুলো। এগুলোতেও কার্যত কোনো স্বাধীন স্বায়ত্তশাসন ছিল না।
মোঙ্গলদের উত্তর সাম্রাজ্য তথা গোল্ডেন হোর্ডের অধিকাংশ এলাকা ও ককেশাস অঞ্চল সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্গত ছিল। স্বশাসিত অঞ্চল শিরোনামে সবকিছুই ছিল মূলত রাশিয়ার অধীনে। আর ক্রিমিয়া রাজ্য ছিল সোভিয়েত ইউক্রেনের অধীনে।
১৪১১ হিজরিতে (১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে) সোভিয়েতের পতনের পর মূল কাঠামো সৃষ্টিকারী মুসলিম প্রজাতন্ত্রগুলো রাশিয়া থেকে স্বাধীনতা লাভ করে, যথা: আজারবাইজান, কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান। কিন্তু স্বশাসিত রাজ্য ও অঞ্চলগুলো স্বাধীনতা লাভ করতে পারেনি। এগুলো রাশিয়া কিংবা ইউক্রেনের অন্তর্গত রয়ে যায়।
রাশিয়ার মধ্যে হারিয়ে যাওয়া মুসলিম স্বশাসিত অঞ্চল ও প্রদেশগুলোর মানচিত্র-

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 মুসলিমদের প্রতিরোধ

📄 মুসলিমদের প্রতিরোধ


ধর্মান্তর কিংবা নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে এত যে জুলুম অত্যাচার চলল, এরপরও কিন্তু মুসলিম উম্মাহ এই অঞ্চল থেকে হারিয়ে যায়নি। সবকিছু সহ্য করে আঁকড়ে ধরে রেখেছিল প্রাণের চেয়েও প্রিয় ঈমান। উত্থানকালে তারা যেমন প্রচণ্ড প্রতাপে সবকিছু জয় করেছিল, পতনকালেও প্রচণ্ড ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছিল। তাতার মুসলিমদের ওপর রুশ অত্যাচারের মাত্রা সবকিছুকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কারণ, তাদের অবস্থান ছিল মস্কো থেকে কাছে। কিন্তু এতকিছুর পরও মুসলিমরা দুঃখ-দুর্দশা ভুলে রাশিয়ান বিধর্মীদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে। তাদের দাওয়াতে তখনও বহু পৌত্তলিক গোষ্ঠী ইসলামের শীতল ছায়ায় প্রবেশ করে।
কোনোভাবে যদি নির্যাতন একটু শিথিল হতো, সে সময়টাকে তারা গ্রহণ করত গনিমত হিসেবে। যেমন, সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় ক্যাথরিনের সময়ে মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সে সময় বহু মানুষ তাদের গোপন ইসলামি পরিচয় প্রকাশ করে এবং চারদিকে ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে দিতে থাকে। কিন্তু ক্যাথরিনের শাসন পতনের পরই এমন সব জার ক্ষমতায় আসতে থাকে, যারা ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ দেখিয়ে পূর্বের জারদেরও ছাড়িয়ে যায়। ফলে অত্যাচারের মুখে মুসলিমরা আবার তাদের ইসলামি পরিচয় গোপন করতে বাধ্য হয়।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 স্বাধীনতা সংগ্রাম

📄 স্বাধীনতা সংগ্রাম


এসব কারণে রুশদের প্রতি তাতার মুসলিমদের ঘৃণা চরম আকার ধারণ করে। এমনকি ইসলাম তাদের রক্তেমাংসে মিশে যায়। একসময় তাতার আর মুসলিম শব্দ যেন সমার্থক হয়ে পড়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তাতাররা রাশিয়ান সরকার পতনের জন্য সব ধরনের চেষ্টায় অংশগ্রহণ করে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রতিটি সংগ্রামী দলই তাতারদের আশাজনক প্রতিশ্রুতি দিত। কিন্তু ক্ষমতায় পৌঁছেই সেসব ভুলে যেত। কখনো আগের চেয়েও বেশি নির্যাতন চলত। তবে এরপরও মুসলিমরা সরলই রয়ে যায়। তারা রাজনৈতিক মিথ্যা আশ্বাসের শিকার হতেই থাকে একের পর এক। অতীতের ঘটনা থেকে তারা শিক্ষা নিতে পারেনি। গণতান্ত্রিক ফ্রন্টকে সহায়তা করা ছিল তাদের পূর্বের ভুলেরই পুনরাবৃত্তি; তারাও তাদের সাথে কথার বরখেলাপ করে। এরপর মুসলিমরা ঝুঁকল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী দলের দিকে। আবার সেই ওয়াদা ওয়াদা খেলার পুনরাবৃত্তিই ঘটল এবং নিষ্পেষিত হলো সরলপ্রাণ মুসলিমরা।
এরপর ১৩৩৬ হিজরি সনে (১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে) রাশিয়ায় এলো বলশেভিক বিপ্লব। এবারও তাদেরকে সুন্দর সুন্দর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বলা হলো, তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা দেওয়া হবে। জারদের সময়ে হওয়া অত্যাচার আর থাকবে না। অতএব, তারা যেন বলশেভিক বিপ্লবে সহায়তা করে। এবারও মুসলিমরা সরলভাবে বিশ্বাস করে নিলো বলশেভিকদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি। কিন্তু তারা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে পূর্বের মতো অত্যাচার ও পরাধীনতা দুটোই আরও ভালো করে চাপিয়ে দিলো। তাদের বিরুদ্ধে অঙ্কিত হলো ভয়ানক নিষ্পেষণের ছক।
আরও বিভিন্ন পন্থায় তাতাররা আন্দোলন, সংগ্রাম করে মুক্তির প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক দল গঠন করে তার ব্যানারে কর্মসূচি পালন করত। কিন্তু সোভিয়েতরা সেগুলো নিশ্চিহ্ন করে দেয়। আর যা কিছু বাকি ছিল, সেগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখল করে তারা নিজেরাই সব নিয়ন্ত্রণ করতে লাগল।
স্বাধীনতা সংগ্রাম

তাতার মুসলিমরা রাশিয়া থেকে স্বাধীনতার জন্য স্বশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নেয়। ১৩৩৬ হিজরিতে (১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে) রাশিয়ার বলশেভিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বেশকিছু সেনা ফ্রন্ট তৈরি করে। তাতারস্তান ও বাশকোরতোস্তান প্রদেশ নিয়ে 'আইডেল উরাল' নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করে। কিন্তু রুশ বাহিনী এসে গুঁড়িয়ে দেয় স্বপ্নের স্বাধীনতা।
অন্যদিকে এর আগেই ক্রিমিয়ার তাতাররা একটি বোর্ড গঠন করে স্বাধীন রাষ্ট্রের লক্ষ্যে চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু তাদের স্বাধীন রাষ্ট্রও তিন মাসের বেশি টিকেনি। রুশ শক্তি এখানেও তাতারদের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ক্রিমিয়ান তাতাররা আরেকবার চেষ্টা করে রাশিয়া থেকে মুক্ত হওয়ার। তারা জার্মান বাহিনীকে সহায়তা করে এবং জার্মানদের আক্রমণের সময় প্রতিরোধ না করে আত্মসমর্পণ করে। তাদের ধারণা ছিল জার্মানরা এর মর্যাদা রক্ষা করবে। কিন্তু তা হয়নি। হিটলারের বাহিনী আত্মসমর্পণকারী তাতার মুসলিমদের নির্দেশ দেয় দেড়শ কিলোমিটার পথ খালি পায়ে হেঁটে যেতে। এই কঠিন পথযাত্রায় মৃত্যুযাত্রী হয়ে যায় বহু মুসলিম। যারা এই অমানুষিক পদযাত্রা শেষ করতে পেরেছিল তাদেরকে রাখা হয় কারাগারে। বন্দিদের ক্ষুৎপিপাসায় মারার জন্য কারাগারে খাবার সরবরাহ বন্ধ ছিল। সে অসহনীয় পরিবেশে জীবনের মায়ায় জীবিতরা মৃতদের লাশ খেয়ে বাঁচার চেষ্টা করে। এরপরও যারা টিকে ছিল তাদেরকে কারাগার থেকে বের করে এনে গুলিতে ঝাঁঝরা করে হত্যা করা হলো। কিন্তু দুর্ভোগ আরও বাকি ছিল।
জার্মানদের পরাজয়ের পর রাশিয়া ক্রিমিয়ার তাতারদের থেকে আরও বড় প্রতিশোধ নিতে শুরু করে। জার্মানদের সহযোগিতার কারণে তাদেরকে তারা যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত করে এবং মসজিদ ধ্বংস করা ও জনসমক্ষে কুরআন পোড়ানোসহ নিরস্ত্র মানুষের ওপর অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
তারপর জীবিতদের নির্বাসিত করা হয় সাইবেরিয়ার দুঃসহ বরফাবৃত এলাকায়। সেখানে অনেক তাতার মুসলমান মারা যায়। যারা ছিল তারাও মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। এরপর ক্রিমিয়া উপদ্বীপে হাতে গোনা কিছু তাতার ছাড়া আর কোনো মুসলিম অবশিষ্ট রইল না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00