📄 ইলহাম খান
তিনি শাসন করেন ১০ বছর। তার ভাই মুহাম্মাদ আমিন তার সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। তাই সে মস্কো গিয়ে সাহায্য কামনা করে। রুশরা তাকে সাহায্য করে। সাহায্য পেয়ে ৮৯৩ হিজরির (১৪৮৮ খ্রিষ্টাব্দের) দিকে সে কাজানের উপর হামলা করে। একসময় কাজান তার দখলে চলে আসে। ইলহাম খানকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে তাতে সে আসন গাড়ে। আর তার ভাই রুশদের হাতে বন্দি হয়।
📄 মুহাম্মাদ আমিন খান
কাজানের অধিবাসীরা মুহাম্মাদ আমিনের ওপর রুষ্ট হলে ককেশাসের মামুক খান শাইবানির সাথে যোগাযোগ করে, তাকে মুহাম্মাদ আমিনের পর শাহ হিসেবে পাওয়ার জন্য। ৯০২ হিজরিতে (১৪৯৬ খ্রিষ্টাব্দে) মামুক কাজানে প্রবেশ করতে চেষ্টা করে। মুহাম্মাদ আমিন রাজা তৃতীয় ইভানের নিকট সাহায্য চায়। রাজা তৃতীয় ইভান তাকে সাহায্য করলে মামুকের কাজান প্রবেশ অভিযান ব্যর্থ হয়। কিন্তু মামুক বারবার চেষ্টা করতে থাকে। অবশেষে সে কাজানে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। আর মুহাম্মাদ আমিন তার পরিবার নিয়ে পালিয়ে যায় মস্কোতে। কিন্তু মামুকও কাজানিদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। ফলে তার এক যুদ্ধে বের হওয়াকে সুযোগ মনে করে কাজানিরা শহরের সব দরজা বন্ধ করে দেয়। তারা রাজা তৃতীয় ইভানের সাথে পত্র যোগাযোগ করে মুহাম্মাদ আমিনের ভাই আবদুল লতিফকে তাদের শাসক হিসেবে চায়। রাজা ইভান এতে একমত পোষণ করে। এরপর আবদুল লতিফ সিংহাসনে বসে। কিন্তু মুহাম্মাদ আমিন ৯০৮ হিজরিতে (১৫০২ খ্রিষ্টাব্দে) আবার কাজান অধিকার করতে সক্ষম হয় এবং আবদুল লতিফকে বন্দি করে রাশিয়া পাঠিয়ে দেয়। এ সময় মুহাম্মাদ আমিনের স্ত্রী, যে ইতিপূর্বে ইলহাম খানের স্ত্রী ছিল মুহাম্মাদ আমিনকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলতে চেষ্টা করে। এজন্য কাজান ও উরাল তীরবর্তী শহরগুলোর এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মুহাম্মাদ আমিন রাশিয়ার দিকে বের হয়। এভাবেই মুহাম্মাদ আমিনের সময় কাজান ও রুশ বাহিনীর মধ্যে বহু যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ওই সময় মুহাম্মাদ আমিনের ভাই আবদুল লতিফকে ক্রিমিয়ার বাদশাহ মাঙ্কলি খানের মধ্যস্থতায় মুক্ত করে দেওয়া হয়। আবদুল লতিফ পুনরায় কাজানে ফিরে আসে। মুহাম্মাদ আমিন তাকে শুধু নিরাপত্তাই দেয়নি; বরং তাকে সেখানে তার পরবর্তী শাসক হিসেবেও নিযুক্ত করে। কিন্তু ৯২৫ হিজরিতে (১৫১৯ খ্রিষ্টাব্দে) আমিনের মৃত্যুর আগেই সে পরলোকগত হয়। ওই সময় আর কোনো ভাবী শাসক ছিল না, ফলে রাশিয়া শাইখ আলি খানকে কাজানের গভর্নর নিযুক্ত করে।
📄 সাহিব কুরাই
মুহাম্মাদ কুরাই খান তার ভাই সাহিব কুরাই খানকে ক্রিমিয়ার কাজান শহরের দায়িত্বশীল নির্বাচিত করার জন্য মস্কোকে প্রস্তাব দেয়। কিন্তু মুসলমানদের ঐক্যের ভয়ে মস্কো তা প্রত্যাখ্যান করে। মুহাম্মাদ কুরাইয়ের সাথে কাজানের অধিবাসীরা একাত্মতা প্রকাশ করে। তাদের সহযোগিতায় শাইখ আলিকে অপসারণ করে সাহিব কুরাই খানকে কাজানের দায়িত্বশীল মনোনীত করা হয়। ফলে কাজান ও ক্রিমিয়া রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ পরিচালনায় একমত হয়ে যায়। শাইখ আলির নেতৃত্বে মস্কো তার বাহিনীকে কাজানের অধিবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রেরণ করে। ৯৩০-৯৩১ হিজরি সনে (১৫২৫-১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে) এ বাহিনী কাজানের অধিবাসীদের ওপর নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালায়। এ সময় সাহিব কুরাই খান অত্র অঞ্চলের দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য উসমানি খলিফা সুলাইমান কানুনিকে আবেদন করেন। খলিফা রাজি হন এবং মস্কোবাসীকে এ সংবাদ জানানোর জন্য দূত প্রেরণ করেন। কিন্তু রুশরা তা প্রত্যাখ্যান করে।
📄 সাফা কুরাই
রুশ বাহিনী দ্রুত তাদের বাহিনীকে কাজান প্রেরণ করে; যখন সাহিব কুরাই উসমানি খলিফার সহযোগিতা কামনায় খলিফার নিকট গমন করছিলেন। তখন দায়িত্বশীল হিসেবে তার ভাতিজা সাফা কুরাইকে তার দায়িত্বে রেখে যান। রুশ বাহিনী কাজান দখল করার আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু কাজান অধিবাসীদের শক্ত প্রতিরোধে তারা পরাজিত হয়। তবে কাজানের অধিবাসীরা যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে যায়। ফলে রুশ বাহিনীর কাছে তারা আবেদন জানায় যে, তারা তাদের অনুসারী হয়ে থাকবে। ফলে ৯৩৯ হিজরি সনে জান আলিকে দায়িত্বশীল হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। সাফা কুরাই বাধ্য হয়ে দায়িত্ব ছেড়ে নিজ এলাকা অভিমুখে রওনা হন। ক্রিমিয়া সর্বদা রুশদের ওপর হামলা করত, যেন কাজানের ওপর থেকে বিপদ কিছুটা কমে যায়।
কিছুদিন পরেই মস্কোর গভর্নর ওয়াসিলি ইনতেকাল করে। তার ছেলে ইভান রাহিব তখন দায়িত্ব গ্রহণ করে। মুসলমানদের ওপর বিভিন্ন জুলুম অত্যাচারের কারণে তাকে 'রাহিব' (ভয়ানক) নামক উপাধিতে স্মরণ করা হয়। ৯৪২ হিজরি সনে (১৫৩৫ খ্রিষ্টাব্দে) কাজানের দায়িত্বশীলরা জান আলিকে হত্যা করে ফেলে এবং সাফা কুরাইকে পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণের জন্য আবেদন জানায়। সে ফিরে এসে দায়িত্ব গ্রহণ করে। পরবর্তী বছর রুশদের সাথে সে যুদ্ধ করে। ৯৫৬ হিজরি সনে (১৫৪৯ খ্রিষ্টাব্দে) সাফা কুরাই ইনতেকাল করে। কাজান এলাকা তখন শাসকশূন্য হয়ে পড়ে।
রুশ বাহিনীর সাথে বেশকিছু সংঘাতের পর শাইখ আলিকে পুনরায় দায়িত্বে নিয়ে আসার ওপর সন্ধি হয়। এজন্য ক্রিমিয়ার অনেক আমিরকে কাজান থেকে বহিষ্কার করা হয়। এদের মাঝে সাহিব কুরাইয়ের পুত্র বুলাক কুরাইও ছিল।
কিছুদিন পর ইভান রাহিব কাজান সমস্যার চূড়ান্ত সমাধানে মনোযোগী হয়। এ ক্ষেত্রে লিথুয়ানিয়াবাসী এবং আস্ট্রাক্যান রাজ্যের সাথে সুসম্পর্ককে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে। ক্রিমিয়া কর্তৃক কাজানের প্রতি সাহায্য, খলিফা সুলাইমান কানুনি কর্তৃক নোগাই শাসকের প্রতি রাশিয়ানদের প্রতিহত করার দূত প্রেরণ এবং নোগাই শাসকের কাজান পৌঁছে যাওয়া, কোনোটিই ইভানের ইচ্ছার সামনে বাধা হতে পারেনি। সকলের তৎপরতায় শাইখ আলিকে অপসারণ করে মুহাম্মাদ খানকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছিল। কিন্তু ইভান রাহিব স্বার্থপর বিশ্বাসঘাতক শাইখ আলির সাথে কাজান অভিমুখে বের হয় এবং সেখানকার অধিবাসীদের সাথে তুমুল লড়াইয়ের পর ৯৫৯ হিজরিতে (১৫৫২ খ্রিষ্টাব্দে) সেখানে প্রবেশ করে। এভাবে রাশিয়া অঞ্চলটি গ্রাস করে নেয় এবং তার অভিবাসীদের ওপর নিকৃষ্ট নির্যাতনের সূত্রপাত হয়, যা পরে আলোচিত হবে।