📄 বাতু খান
এই পরিচ্ছেদে আমরা চেঙ্গিস খানের বড় ছেলে জোচি খানকে প্রদেয় রাশিয়া, বুলগেরিয়া ও ককেশাস অঞ্চলের ইতিহাস আলোচনা করব। ওই তিন দেশ ছাড়াও পূর্ব ইউরোপ ও পশ্চিম সাইবেরিয়াও তার শাসনের এবং আমাদের আলোচনার অন্তর্ভুক্ত। উপরোল্লেখিত অঞ্চলগুলোকে জোচি খানের পরিবারটি শাসন করত। একে উত্তর মোঙ্গল সম্প্রদায় অথবা গোল্ডেন হোর্ড বলা হয়। চেঙ্গিস খান তার মৃত্যুর পর মোঙ্গলদের প্রধান খান তথা বাদশাহর পদ জোচি খানকে দেওয়ার অসিয়ত করে যায়। কিন্তু চেঙ্গিস খানের আগেই জোচি খানের মৃত্যু হওয়ায় ওই পদের জন্য তার ভাই ওগেদাইকে নির্বাচিত করা হয়। এভাবে জোচি খানের বংশ থেকে প্রধান খানের পদটি হারিয়ে যায়। তা সত্ত্বেও মোঙ্গলদের কাছে জোচি খানের পরিবারের বিশেষ কদর ছিল। মোঙ্গলদের যুদ্ধে প্রাপ্ত গনিমতের এক-তৃতীয়াংশ তারা পেত। যা খান-এ আজমের কাছে প্রেরিত সম্পদের সমপরিমাণ ছিল।
বাতু খান
📄 বাতু খানের রাজ্য বিস্তার
বাতু খান তার পিতা জোচি খানের মৃত্যুর পর শাসক হয়। তবে তার চাচা ওগেদাইয়ের প্রতি ছিল তার মনে চরম হিংসা। সে মনে করত, ওগেদাই খান জোর করেই জোচি খানের বংশ থেকে প্রধান খানের পদ ছিনিয়ে নিয়েছে।
বাতু খানের রাজ্য বিস্তার
প্রধান খান ওগেদাই ৩০ হাজার সৈন্যের একদলকে বাতু খানের নেতৃত্বে প্রস্তুত করেন। এই দলে তিনজন উপসেনাপতি ছিল—ওগেদাইয়ের ছেলে গুযুক, তুলুইয়ের ছেলে মাংকো এবং চাগতাইয়ের ছেলে বাইদার। আর প্রধান সেনাপতি ছিল বাতু খান। ৩৩ হাজার সৈন্যের এই দলটি বুলগেরিয়ার শাসককে পরাজিত করে। যা এখনকার রাশিয়ার কাজান শহর ও তার আশপাশের কিছু অংশ। এই অঞ্চলের অধিবাসীরা বলকান অঞ্চলে পালিয়ে যায় এবং ওই অঞ্চলকেই বসবাসের জন্য বেছে নেয়। তাদের আশ্রয় নেওয়া এলাকায় বর্তমান নতুন বুলগেরিয়া। বুলগেরিয়ার অধিবাসীরা ইতিপূর্বে মোঙ্গলদের সাথে বিদ্রোহ করেছিল। সে কারণেই মূলত তাদের এই অভিযান। যখন তারা বুলগেরিয়ায় আধিপত্য পেয়ে গেল তাদের অগ্রসত্তা প্রসারিত হতে থাকল পূর্ব ইউরোপ পর্যন্ত। তারপর তারা খাজার সাম্রাজ্য পেরিয়ে এগোতে থাকল রাশিয়া পর্যন্ত। সে সময়ের রাশিয়ার সর্ববৃহৎ শহর ছিল কিয়েভ নগরী, যা বর্তমানে ইউক্রেনের রাজধানী। তারা এটি বিধ্বস্ত করে মস্কোতে প্রবেশ করে এবং এই শহরটি জ্বালিয়ে ছারখার করে দেয়। অতঃপর দুই ভাগে ভাগ হয়ে একদল বাতুর নেতৃত্বে হাঙ্গেরির অঞ্চলগুলো জয় করতে চলে যায় এবং অবশেষে জয় করে ওই দেশের সৈন্যদের কচুকাটা করে কিচ্ছা খতম করে দেয়। আর দ্বিতীয় দলটি বাইদারের নেতৃত্বে জার্মানির দিকে যায়। তবে এরা পরাস্ত হয়। পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে বাইদার মারা যায়। আর এই পরাজয় থেকেই মোঙ্গলদের ইউরোপে বিজয় অভিযান থেমে যায়।
📄 খানিয়াতে আসতারাখান (আস্ট্রাকান/আলহাজজ তারখান)
আলহাজ শারকাস খান ৭৬২ হিজরিতে সারাই রাজ্য থেকে আস্ট্রাক্যান রাজ্যের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং রাজধানী সারাইয়ে হামলা করে সেখানে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। কিন্তু কয়েক মাস পরই তাকে সেখানকার দখল ছেড়ে আসতে হয়। মোঙ্গলদের উত্তর সাম্রাজ্যে তৈমুর লংয়ের আক্রমণ করার পর সারাই এলাকায় কুয়াইরজাক খানকে দায়িত্বশীল মনোনীত করা হয়। ৮০২ হিজরিতে (১৩৯৯ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি মৃত্যুবরণ করলে তৈমুর কুতলুগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারপর বুরাক খান দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার সময়েই মুহাম্মাদ ওগলান সারাই অঞ্চল দখল করেন।
আস্ট্রাক্যান আহমাদ খানের শাসনামলে ক্রিমিয়া রাজ্যের অধীনস্থ হয়। অতঃপর হুসাইন খান তাকে স্বাধীন রাজ্য বলে ঘোষণা করেন। তারপর ৯৩০ হিজরিতে (১৫২৩ খ্রিষ্টাব্দে) মুহাম্মাদ কুরাইয়ের শাসনামলে পুনরায় তা ক্রিমিয়ার অধীনে চলে আসে।
আস্ট্রাক্যান ক্রিমিয়ার আবদুল কারিম বিন আহমাদ খানের দখলে থাকে। তারপর তার ভাতিজা আকুবেগ বিন কাসিম, তারপর ৯৪১ হিজরি সনে (১৫৩৪ খ্রিষ্টাব্দে) আবদুর রহমান খানের দখলে। তারপর নোগাই গোষ্ঠী হামলা করে আস্ট্রাক্যান দখল করে নেয়। দরবেশ আলি খানকে সেখানকার দায়িত্ব প্রদান করা হয়। ৯৪৮ হিজরিতে (১৫৪১ খ্রিষ্টাব্দে) হায়দার খান বিন আহমাদ খানকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তারপর আহমাদ খানের নাতি আক কাদাক খানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর ইয়ামগুরজি এ অঞ্চলের দায়িত্ব লাভ করেন। একপর্যায়ে সাহিব কুরাই খান ৯৫৮ হিজরিতে (১৫৫১ খ্রিষ্টাব্দে) অঞ্চলটি দখল করেন এবং দরবেশ আলি খানকে দায়িত্বে ফিরিয়ে আনেন। তারপর ইয়ামগুরজি পুনরায় আস্ট্রাক্যান রাজ্য দখল করতে সক্ষম হন এবং ক্রিমিয়ার শাসক ও নোগাইদের আমিরের সাথে উসমানি খিলাফতের সমর্থনে একমত হন।
অন্যদিকে রাশিয়ান শাসক ইভান রাহিব আস্ট্রাক্যান দখলের ইচ্ছা করেন। নোগাইদের আমির মির্জা ইউসুফ এ বিষয়ে তার সাথে একাত্মতা পোষণ করেন। রাশিয়ান শাসক ইয়ামগুরজির প্রতি আস্ট্রাক্যানের সাথে যুদ্ধে জড়ানোর হুমকি দেন। তিনি ইয়ামগুরজির নিকট দরবেশ আলি খানকে পুনরায় আস্ট্রাক্যানের ক্ষমতায় আনতে দাবি জানান। কিন্তু ইয়ামগুরজি এতে সম্মত না হওয়ায় ৯৬২ হিজরিতে (১৫৫৫ খ্রিষ্টাব্দে) মির্জা ইসমাইলের নেতৃত্বে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় এবং এর মাধ্যমে ইভান এ অঞ্চল দখল করে নিতে সক্ষম হন। দরবেশ আলি খানকে সেখানকার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দরবেশ আলি খান রুশদের সাথে সন্ধি করেন যে, তিনি আস্ট্রাক্যানের জন্য কোনো ভাবী শাসক নিযুক্ত করে যাবেন না। অর্থাৎ, তার মৃত্যুর পর এ অঞ্চল রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। তবে দরবেশ আলি চেষ্টা করছিলেন ক্রিমিয়ার শাসক দৌলত কুরাইয়ের সাথে সন্ধি করে তার কোনো সন্তানকে আমির নির্বাচিত করে যেতে। রুশ বাহিনী এ বিষয়ে অবগত হলে ৯৬৫ হিজরিতে (১৫৫৮ খ্রিষ্টাব্দে) আস্ট্রাক্যানের ওপর হামলা করে তা দখল করে নেয় এবং তাতার মুসলমানদের ওপর নৃশংস নিপীড়ন চালায়।
📄 খানিয়াতে সাইবেরিয়া
বাতু বিন জোচি তার ভাই শাইবান আলিকে উরাল পর্বতমালার পূর্বাঞ্চলীয় গভর্নর নির্ধারণ করেন। তিন তখন সাইবেরিয়া নামক একটি শহর প্রতিষ্ঠা করেন।
এরপর উত্তর মোঙ্গল সাম্রাজ্যের রাজধানী সারাইয়ের অধীনে ৬৪০ হিজরিতে (১২৪২ খ্রিষ্টাব্দে) সাইবেরিয়া রাজ্য প্রতিষ্ঠা পায়। শাইবানি পরিবারের সদস্যরাই সেখানে ধারাবাহিক শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকে। কিন্তু তৈমুর লংয়ের শাসনক্ষমতার পর সারাই থেকে অন্য রাজ্যগুলোর মতো সাইবেরিয়াও স্বাধীন হয়ে যায়। কুতশুম খান ক্ষমতা গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত শাইবানি বংশধররা শাসনকার্য পরিচালনা করে। তিনি এসে রুশদের আনুগত্যমূলক তার পূর্বপুরুষদের কৃত চুক্তি ভঙ্গ করেন এবং রুশবিরোধী যুদ্ধে নোগাইদের সাথে হাত মেলান। কাজাখদের রুশবিরোধিতায় উদ্বুদ্ধ করে। ঠিক এ সময় ইয়ারমুক বিন তাইমা ধূমকেতুর মতো আত্মপ্রকাশ করে এবং কাজাখদের কিছু নরাধমকে নিজের মতাবলম্বী বানিয়ে নিতে সক্ষম হয়। তাতারের বিভিন্ন এলাকায় তারা হামলা শুরু করে। ১০০৩ হিজরিতে (১৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) তারা সাইবেরিয়ার একটি দুর্গ দখল করে নেয় এবং রুশদের কাছে তা বিক্রি করে দেয়। কুতশুম তখন বাশকোরতোস্তান (বাশকির) রাজ্যের দিকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন এবং নিবাস হিসেবে উফা শহরকে বেছে নেন।
মৃত্যু পর্যন্ত তিনি সেখানেই বসবাস করেন। তার পুত্রদ্বয় আলি খান ও আইশাম খান পিতার শাসনকৃত এলাকাসমূহ রাশিয়ানদের থেকে পুনরুদ্ধার করতে চেষ্টা করে। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে রুশ বাহিনী কাজান, আস্ট্রাক্যান, সাইবেরিয়া ইত্যাদি এলাকায় নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে উরাল পর্বতমালার পূর্বদিকে এগিয়ে যাওয়ার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখে। এরপর তারা নোগাইদের রাজ্যও নিজেদের দখলে নিয়ে নেয় এবং বনি শাইবান প্রতিষ্ঠিত সাইবেরিয়ান অধিকাংশ রাজ্যের দফারফা করে।