📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 শিয়াদের পুনরুত্থান

📄 শিয়াদের পুনরুত্থান


৭০৩ হিজরি সনে গাজান মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তাতারদের শাসনভার গ্রহণ করেন তার ভাই খোদাবান্দা (মুহাম্মাদ) বিন আরগুন। জনগণ তাকে 'আল-মালিক গিয়াসুদ্দিন' উপাধি প্রদান করে এবং ইরাক, খোরাসানসহ তাতারি রাষ্ট্র ইলখানাতের অধিভুক্ত বিভিন্ন অঞ্চলের মিম্বরে তার নামে খুতবা পাঠ শুরু হয়।
শাকহাবের যুদ্ধে তিক্ত পরাজয় বরণের পর তাতাররা পরে আর কখনো শাম বা মিশরের ইসলামি ভূখণ্ডে হামলা চালানোর দুঃসাহস দেখায়নি।
তাতার শাসক খোদাবান্দা প্রথমদিকে সুন্নি মতাদর্শী ছিলেন। কিন্তু পরে তিনি শিয়া মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে শিয়া ধর্মমত গ্রহণ করেন এবং নিজ রাষ্ট্রে বিভিন্ন শিয়ারীতি চালু করেন। এ সময় তিনি বিভিন্ন শিয়া আলিমের সাহচর্য গ্রহণ করেন; যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হালাকু খানের উজির খাজা নাসিরুদ্দিন তুসির শিষ্য জামালুদ্দিন বিন মুতাহহার আল-হিল্লি। শিয়া রাফিজিরা খোদাবান্দার সহায়তায় ইসলামি বিশ্বের আনাচেকানাচে শিয়া মতবাদ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছিল। এমনকি মক্কার শিয়া প্রশাসক খামিছা মক্কাবাসীদের বিরুদ্ধে তাকে সহায়তা করার জন্য চলে আসে। কিন্তু খামিছার স্বপ্ন পূরণের আগেই ৭১২ হিজরি সনে খোদাবান্দা মৃত্যুবরণ করেন।
খোদাবান্দার মৃত্যুতে শিয়াদের পরিকল্পনা মাঠে মারা যায় এবং খামিছা ভগ্ন হৃদয়ে মক্কায় ফিরে যায়। দালকানদি নামক জনৈক রাফিজি নেতা হিজাযে শিয়া মতবাদের প্রচার-প্রসারের জন্য খামিছাকে প্রচুর অর্থ প্রদান করেছিল। সে-ও খামিছার সঙ্গে মক্কার পথ ধরে। পথিমধ্যে আরব সর্দার মুহাম্মাদ বিন ঈসা তাদের দুজনের পথরোধ করেন এবং তাদেরকে পরাজিত করে সকল সম্পদ করায়ত্ত করে নেন। এ সংবাদ জানতে পেরে মুসলিম জনসাধারণ অত্যন্ত আনন্দিত হয়। সুলতান আন-নাসির মুহাম্মাদ আরব সর্দার মুহাম্মাদ বিন ঈসার এই কীর্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে নিজের আস্থাভাজন করে নেন।
খোদাবান্দার মৃত্যুর পর তাতারদের শাসনভার গ্রহণ করেন তার পুত্র আবু সাইদ। তিনি তার পিতার মতাদর্শ পরিহার করে সুন্নি মতাদর্শ গ্রহণ করেন। ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ. তার সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন—
তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠতম তাতার নেতা, সুশাসক এবং সুন্নাহর প্রতি অধিকতর অবিচল। তিনি তার শাসনামলে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর অনুসারীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন এবং শিয়া রাফিজিদের হীনবল করেছেন।
আবু সাইদ ৭৩৬ হিজরি সনে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়েই তাতারদের শক্তি ও প্রভাব কার্যত নিঃশেষ হয়ে যায় এবং তারা পারস্পরিক বিবাদবিসংবাদে জড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন এশিয়া মহাদেশের ত্রাস ও হুমকি হয়ে বিচরণ করা তাতাররা এরপর নিজেদের রাজত্বে কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং সেই ভীতিকর প্রভাব পুনরুদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তী সময়ে তৈমুর লংয়ের আমলে আবারও তাতাররা এশিয়া অঞ্চলের ত্রাস হিসেবে আবির্ভূত হয়।
সুলতান আন-নাসির মুহাম্মাদ বিন কালাউনের শাসনামলে মামলুক রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমৃদ্ধি ঘটে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পেছনে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি যে পদক্ষেপটি কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছিল, তা হলো—তিনি মিশর অতিক্রমকারী প্রতিটি বাণিজ্যকাফেলার ওপর পণ্যমূল্যের দশ শতাংশ কর আরোপ করেছিলেন। সে সময় ইউরোপ ও ভারতবর্ষের পারস্পরিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক বেশ গতিশীল ছিল এবং ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কাফেলাগুলোকে ভারতবর্ষে নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছতে হলে মিশর অতিক্রম করতে হতো।
সুলতান আন-নাসির মুহাম্মাদ মামলুক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ উন্নতির প্রতিও যথেষ্ট মনোযোগ দিয়েছিলেন। তিনি পরিমাপ ও ওজনব্যবস্থা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন, মদপান নিষিদ্ধ করেন এবং শিষ্টাচার ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন। তার শাসনামলে ইসলামি স্থাপত্য ও নির্মাণশিল্প উৎকর্ষের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করে। এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ হলো, বিশ্বের বিভিন্ন জাদুঘরে বিদ্যমান অধিকাংশ প্রাচীন ও দর্শকনন্দিত ইসলামি নিদর্শন এ সময়েরই অবদান।
সুলতান মুহাম্মাদ নীলনদ ও সালাহুদ্দিন দুর্গের মাঝে পানি সরবরাহের কৃত্রিম খাল (কানাত) প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়াও তিনি নীলনদ হতে আলেকজান্দ্রিয়া পর্যন্ত খাল খনন করেন। সুলতান মুহাম্মাদ নীলনদের তীরঘেঁষে দীর্ঘ সড়ক নির্মাণ করেন, যা বন্যার সময় সেতুর কাজে দিত।
সুলতান আন-নাসির মুহাম্মাদ শীর্ণকায়, পঙ্গু ও এক-চক্ষুহীন ছিলেন। কিন্তু এতসব শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন শত্রুর বিরুদ্ধে প্রচন্ড প্রতাপশালী যোদ্ধা এবং দায়িত্বপালন ও সিদ্ধান্তগ্রহণে ইস্পাত-কঠিন।
সুলতান আন-নাসির মুহাম্মাদ বিন কালাউন ৭৪১ হিজরি সনে (১৩৪১ খ্রিষ্টাব্দে) ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর সময় তিনি মামলুক রাষ্ট্রের দায়িত্বভার গ্রহণ করার মতো যোগ্য কোনো উত্তরাধিকারী রেখে যাননি। তার মৃত্যুর পর তার পুত্রগণ রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী একচল্লিশ বছরে একের পর এক তার আট পুত্র শাসনদায়িত্ব পালন করেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন হাসান বিন আন-নাসির মুহাম্মাদ। তিনি ৭৪৮ হিজরি সন হতে ৭৫২ হিজরি সন (১৩৪৭-১৩৫১ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত মামলুক রাষ্ট্র শাসন করেন। সুলতান হাসান বিন মুহাম্মাদই সেই সুবিশাল মাদরাসা-মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণ করেন, যা বিশালতা ও নির্মাণকুশলতায় সমকালীন বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী আসন লাভ করেছিল। সালাহুদ্দিন দুর্গের কাছেই অবস্থিত এই কমপ্লেক্সটি বর্তমানে সুলতান হাসান মসজিদ নামে প্রসিদ্ধ।
পরবর্তী সময়ে সার্কাসি মামলুকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাহরি মামলুক রাষ্ট্রের পতন ঘটে।

টিকাঃ
১০৩. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১৪/১৪৮।
১০৪. কানাত ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন-মাকতাবাতুল হাসান থেকে প্রকাশিত সবুজ পৃথিবী ও মুসলমানদের অবদান।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 বাহরি মামলুক রাষ্ট্রের সুলতানগণের তালিকা

📄 বাহরি মামলুক রাষ্ট্রের সুলতানগণের তালিকা


আল-মুইয ইযযুদ্দিন ১. আইবেক তুর্কমানি (নিহত) : ৬৪৮-৬৫৫ হি. (১২৫০-১২৫৭ খ্রি.)
আল-মানসুর নুরুদ্দিন আলি ২. বিন ইযযুদ্দিন আইবেক : ৬৫৫-৬৫৭ হি. (১২৫৭-১২৫৯ খ্রি.) (অপসারিত)
আল-মুযাফফার সাইফুদ্দিন ৩. কুতুজ (নিহত) : ৬৫৭-৬৫৮ হি. (১২৫৯-১২৬০ খ্রি.)
আয-যাহির রুকনুদ্দিন ৪. বাইবার্স বুনদুকদারি (নিহত) : ৬৫৯-৬৭৬ হি. (১২৬০-১২৭৭ খ্রি.)
আস-সাইদ নাসিরুদ্দিন ৫. বারাকা বিন রুকনুদ্দিন : ৬৭৬-৬৭৮ হি. (১২৭৭-১২৭৯ খ্রি.) বাইবার্স (অপসারিত)
আল-আদিল বদরুদ্দিন ৬. সুলামিশ বিন রুকনুদ্দিন : ৬৭৮-৬৭৮ হি. (১২৭৯-১২৭৯ খ্রি.) বাইবার্স (অপসারিত)
আল-মানসুর সাইফুদ্দিন ৭. কালাউন (স্বাভাবিক মৃত্যু) : ৬৭৮-৬৮৯ হি. (১২৭৯-১২৯০ খ্রি.)
আল-আশরাফ সালাহুদ্দিন ৮. খলিল বিন সাইফুদ্দিন : ৬৮৯-৬৯৩ হি. (১২৯০-১২৯৩ খ্রি.) কালাউন (নিহত)
আন-নাসির মুহাম্মাদ বিন ৯. সাইফুদ্দিন কালাউন : ৬৯৩-৬৯৪ হি. (১২৯৩-১২৯৪ খ্রি.) (ক) (অপসারিত)
আল-আদিল যায়নুদ্দিন ১০. কুতবুগা (অপসারিত) : ৬৯৪-৬৯৬ হি. (১২৯৪-১২৯৬ খ্রি.)
আল-মানসুর হুসামুদ্দিন ১১. লাজিন (নিহত) : ৬৯৬-৬৯৮ হি. (১২৯৬-১২৯৮ খ্রি.)
০৯. আন-নাসির মুহাম্মাদ বিন (খ) সাইফুদ্দিন কালাউন (অপসারিত) : ৬৯৮-৭০৮ হি. (১২৯৮-১৩০৮ খ্রি.)
১২. আল-মুযাফফার রুকনুদ্দিন (২য়) বাইবার্স (অপসারিত) : ৭০৮-৭০৯ হি. (১৩০৮-১৩০৯ খ্রি.)
০৯. আন-নাসির মুহাম্মাদ বিন (গ) সাইফুদ্দিন কালাউন : ৭০৯-৭৪১ হি. (১৩০৯-১৩৪১ খ্রি.) (স্বাভাবিক মৃত্যু)
১৩. আল-মানসুর সাইফুদ্দিন আবু বকর বিন আন-নাসির : ৭৪১-৭৪২ হি. (১৩৪১-১৩৪১ খ্রি.) মুহাম্মাদ (অপসারিত)
১৪. আল-আশরাফ আলাউদ্দিন কুজুক বিন আন-নাসির : ৭৪২-৭৪২ হি. (১৩৪১-১৩৪১ খ্রি.) মুহাম্মাদ (অপসারিত)
১৫. আন-নাসির শিহাবুদ্দিন আহমাদ বিন আন-নাসির : ৭৪২-৭৪৩ হি. (১৩৪২-১৩৪২ খ্রি.) মুহাম্মাদ (অপসারিত)
১৬. আস-সালিহ ইমাদুদ্দিন ইসমাইল বিন আন-নাসির : ৭৪৩-৭৪৬ হি. (১৩৪২-১৩৪৫ খ্রি.) মুহাম্মাদ (স্বাভাবিক মৃত্যু)
১৭. আল-কামিল সাইফুদ্দিন শাবান বিন আন-নাসির : ৭৪৬-৭৪৭ হি. (১৩৪৫-১৩৪৬ খ্রি.) মুহাম্মাদ (নিহত)
১৮. আল-মুযাফফর যায়নুদ্দিন হাজ্জি বিন আন-নাসির : ৭৪৭-৭৪৮ হি. (১৩৪৬-১৩৪৭ খ্রি.) মুহাম্মাদ (নিহত)
১৯. আন-নাসির বদরুদ্দিন হাসান বিন আন-নাসির : ৭৪৮-৭৫২ হি. (১৩৪৭-১৩৫১ খ্রি.) (ক) মুহাম্মাদ (অপসারিত)
২০. আস-সালিহ সালাহুদ্দিন সালিহ বিন আন-নাসির : ৭৫২-৭৫৫ হি. (১৩৫১-১৩৫৪ খ্রি.) মুহাম্মাদ (অপসারিত)
১৯. আন-নাসির বদরুদ্দিন (খ) হাসান বিন আন-নাসির : ৭৫৫-৭৬২ হি. (১৩৫৪-১৩৬১ খ্রি.) মুহাম্মাদ (নিহত)
আল-মানসুর সালাহুদ্দিন মুহাম্মাদ বিন আল- ২১. : ৭৬২-৭৬৪ হি. (১৩৬১-১৩৬৩ খ্রি.) মুযাফফার যায়নুদ্দিন হাজ্জি (অপসারিত)
আল-আশরাফ যায়নুদ্দিন শাবান বিন আল-আমজাদ ২২. : ৭৬৪-৭৭৮ হি. (১৩৬৩-১৩৭৬ খ্রি.) হুসাইন বিন আন-নাসির মুহাম্মাদ (নিহত)
আল-মানসুর আলাউদ্দিন ২৩. আলি বিন আল-আশরাফ : ৭৭৮-৭৮৩ হি. (১৩৭৬-১৩৮১ খ্রি.) যায়নুদ্দিন (স্বাভাবিক মৃত্যু)
আস-সালিহ সালাহুদ্দিন ২৪. হাজ্জি বিন আল-আশরাফ : ৭৮৩-৭৮৪ হি. (১৩৮১-১৩৮২ খ্রি.) (ক) যায়নুদ্দিন (অপসারিত)
** ২৪ (খ) আয-যাহির সাইফুদ্দিন বারকুক (১০৫) : ৭৮৪-৭৯১ হি. (১৩৮২-১৩৮৯ খ্রি.)
আস-সালিহ সালাহুদ্দিন হাজ্জি বিন আল-আশরাফ : ৭৯১-৭৯২ হি. (১৩৮৯-১৩৯০ খ্রি.) যায়নুদ্দিন (অপসারিত)

টিকাঃ
১০৫. আয-যাহির সাইফুদ্দিন বারকুক বাহরি মামলুক ছিলেন না; তিনি ছিলেন সার্কাসি মামলুক এবং তার মাধ্যমেই বাহরি মামলুক রাষ্ট্রের সমাপ্তি ও সার্কাসি মামলুক রাষ্ট্রের সূচনা ঘটে। তবে মাঝে তিনি ৭৯১ হিজরি সনে অপসারিত ও বন্দি হন এবং শেষ বাহরি মামলুক সুলতান আস-সালিহ সালাহুদ্দিন হাজ্জি পুনরায় ক্ষমতা লাভ করেন। বছরখানেক পরই বারকুক সালাহুদ্দিন হাজ্জিকে পরাভূত করে পুনরায় ক্ষমতা হস্তগত করেন এবং বাহরি মামলুক রাষ্ট্রের চূড়ান্ত পতন ঘটান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00