📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 হালাকু খানের বংশধর গাজানের ইসলাম গ্রহণ

📄 হালাকু খানের বংশধর গাজানের ইসলাম গ্রহণ


হিমসের যুদ্ধে পরাজয়ের পর তাতারদের অন্তর্বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। তারা যাকেই শাসক পদে বসাত, কিছুদিন পরই তাকে বরখাস্ত ও হত্যা করত। অবশেষে ৬৯৪ হিজরি সনে তাতার রাষ্ট্র ইলখানাতের শাসনভার গ্রহণ করেন হালাকু খানের প্রপৌত্র গাজান বিন আরগুন বিন আবাগা খান বিন হালাকু খান। গাজান সেনাপতি তুযুন-এর হাতে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেন। গাজান ইসলাম গ্রহণ করার পর তার অনুসরণে তাতার জনগোষ্ঠীর প্রায় এক লক্ষ লোক ইসলাম গ্রহণ করে। গাজানের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার দিনটি ছিল এক ঐতিহাসিক দিন। তিনি সেদিন জনসাধারণের মাঝে স্বর্ণ-রুপা ছিটিয়ে দেন এবং নিজের নাম রাখেন 'মাহমুদ'। এরপর তিনি জুমার নামাজে উপস্থিত হন। মাহমুদ গাজান বহু গির্জা ধ্বংস করেন এবং খ্রিষ্টানদের ওপর জিজিয়া আরোপ করেন। তিনি বাগদাদ ও অন্যান্য অঞ্চলে বিভিন্ন অবিচারমূলক প্রথা বাতিল করেন। তার শাসনামলেই তাতারদের মাঝে ইসলামি শিক্ষার প্রসার শুরু হয়।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 গাজানের শাম দখলের প্রচেষ্টা

📄 গাজানের শাম দখলের প্রচেষ্টা


এরপর গাজান তার রাজ্য মিশর ও শাম অঞ্চলেও বিস্তৃত করার মনস্থ করেন এবং শামের মুসলমানদের বিরুদ্ধে একাধিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। কোনো কোনো লড়াই সাধারণ খণ্ড-যুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকলেও কোনো কোনোটি ছিল চরম রক্তক্ষয়ী। এসব যুদ্ধের কারণে শামের মুসলমানদের চরম ক্ষতি পোহাতে হয়।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 তাতারি দুর্যোগ মোকাবিলায় ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর অবিস্মরণীয় ভূমিকা

📄 তাতারি দুর্যোগ মোকাবিলায় ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর অবিস্মরণীয় ভূমিকা


এ সময় মুসলিম জনমনে এই প্রশ্ন উদয় হয় যে, এসব তাতাররা তো মুসলমান। তারা মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধাচরণও করেনি। বরং তারা তো কখনো মুসলিম শাসকের বশ্যতাই স্বীকার করেনি যে, পরে বিরুদ্ধাচরণের প্রশ্ন আসবে। সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা কীকরে বৈধ হতে পারে? তখন ইবনে তাইমিয়া রহ. ফতোয়া প্রদান করেন যে, 'তারা হজরত আলি রাযি. ও মুয়াবিয়া রাযি.-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাকারী খারিজি সম্প্রদায়ের হুকুমভুক্ত। খারিজিরা মনে করত যে, তারা আলি রাযি. ও মুয়াবিয়া রাযি.-এর তুলনায় শাসন ক্ষমতার অধিক হকদার। তদ্রূপ এই তাতাররাও মনে করে যে, অন্যান্য মুসলমানের চেয়ে তারা হক প্রতিষ্ঠার অধিক হকদার। তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অন্যায়-অবিচারে লিপ্ত থাকার অভিযোগ উত্থাপন করছে। অথচ তারা নিজেরা এর চেয়েও শত গুণ কঠিন অন্যায়ে লিপ্ত আছে।'
ইবনে তাইমিয়া রহ. মুসলমানদেরকে তাতারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করার জন্য আরও বলেন, 'তোমরা যদি আমাকে মাথায় কুরআন নিয়েও তাতারদের পক্ষে দণ্ডায়মান দেখতে পাও, তবুও আমাকে হত্যা করবে।'
ইবনে তাইমিয়া রহ. একদিকে যেমন শাম ও মিশরের মুসলিম জনসাধারণকে অটল-অবিচল থাকতে উদ্বুদ্ধ করছিলেন এবং শাসক-প্রশাসকদেরকে দৃঢ়তার সঙ্গে লড়াই করতে উৎসাহিত করছিলেন, অপরদিকে তিনি তাতারদের কাছে গিয়ে তাদের কাছ থেকে মুসলমানদের জন্য নিরাপত্তার ঘোষণা লাভের চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
৬৯৯ হিজরি সনের ৩ রবিউস সানি (১২৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর) ইবনে তাইমিয়া উলামায়ে কেরাম ও গণমান্য ব্যক্তিদের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে তাতার শাসক গাজানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং অত্যন্ত জোরালো ভাষায় দৃঢ়তার সঙ্গে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন। তার এই বক্তব্য মুসলমানদের স্বার্থরক্ষায় ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।
একই বছরের ৮ রজব (১৩০O খ্রিষ্টাব্দের ৩০ মার্চ) শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া তাতার সেনাপতি বুলাই-এর তাঁবুতে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তার হাতে বন্দি ব্যক্তিদের মুক্তির বিষয়ে কথা বলেন। বন্দিদের মাঝে বেশ কিছু জিম্মি নাগরিকও ছিল। ইবনে তাইমিয়ার সুপারিশে সেনাপতি বুলাই সকল মুসলিম বন্দিকে মুক্তিদান করেন। কিন্তু ইবনে তাইমিয়া আপত্তি জানিয়ে বলেন, 'না, আমাদের জিম্মিদেরকেও মুক্তি দিতে হবে।' এরপর সেনাপতি বুলাই প্রচুর সংখ্যক বন্দিকে মুক্তি প্রদান করেন। ইবনে তাইমিয়া রহ. সেখানে তিনদিন অবস্থান করার পর ফিরে আসেন।
একবার তাতারদের একটি সৈন্যদল অভিযানে রওনা হয়ে দামেশকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তখন দামেশকের নাগরিকরা অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়ে। দামেশকের গভর্নর সকলের উদ্দেশে ঘোষণা করেন— 'সকলে নগরপ্রাচীর সামলাও। কেউ আপন ঘরে অবস্থান করলে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে।' তখন সকলে নগরীর প্রতিরক্ষার জন্য প্রাচীরের কাছে সমবেত হয়। ইবনে তাইমিয়া রহ. এ সময় প্রতি রাতে প্রাচীরের কাছে গিয়ে সকলকে জিহাদের আহ্বান জানাতেন এবং অটল-অবিচল থেকে শত্রুর মোকাবিলা করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন।
যুদ্ধ চলাকালে ইবনে তাইমিয়া রহ. তার কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে বিভিন্ন পানশালায় গিয়ে মদের বোতল ও পানপাত্র ভেঙে ফেলতেন এবং অন্যায়ের আড্ডাখানা এসব পানশালার মালিকদেরকে কঠোর ভাষায় শাসাতেন। তিনি বলতেন, 'এদের কারণেই আল্লাহ তাআলার সাহায্য ও বিজয় আগমনে বিলম্ব হচ্ছে।'
এরইমধ্যে শুরু হয় ৭০০ হিজরি সন। জনসাধারণ তখন তাতার-ভীতিতে প্রকম্পিত। কিন্তু ইবনে তাইমিয়া রহ. তাদের সাহস জোগাতে থাকেন এবং আল্লাহর নুসরত ও সাহায্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। মিশরের সুলতান আন-নাসির মুহাম্মাদ বিন কালাউন এ সময় দামেশকবাসীকে সহায়তাপ্রদান বন্ধ করে দিলে ইবনে তাইমিয়া রহ. মিশরে সফর করে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাকে বলেন, 'আপনি যদি শাম অঞ্চলের শাসক না-ও হতেন আর শামবাসী আপনার কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করত, তখনও তাদেরকে সাহায্য করা আপনার অবশ্য কর্তব্য ছিল। অথচ আপনি তো তাদের শাসক ও সুলতান, তারা আপনার প্রজা ও অধীনস্থ এবং তাদের বিষয়ে আপনি পরকালে আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞাসিত হবেন। তাহলে তাদের বিষয়ে আপনার কর্মনীতি কীরূপ হওয়া উচিত?'
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এভাবেই মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করতে সচেষ্ট ছিলেন। তিনি সকলকে সাহস ও শক্তি জোগাতেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে নুসরত ও বিজয়লাভের প্রতিশ্রুতি শোনাতেন। আট দিন মিশরে অবস্থানের পর তিনি দামেশকে ফিরে আসেন।
তাতার শাসক গাজান যখন জানতে পারেন যে, মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তার প্রতিরোধ করতে যাচ্ছে, তখন তিনি নিজ বাহিনীর দুর্বলতা ও সংখ্যাস্বল্পতার দিক বিবেচনা করে দেশে ফিরে যান।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 শাকহাবের যুদ্ধ

📄 শাকহাবের যুদ্ধ


৭০২ হিজরি সনে শামবাসী জানতে পারে যে, তাতাররা এবার নিশ্চিত শাম অঞ্চলে অভিযান চালাতে যাচ্ছে। ফলে শামের অধিবাসীদের মাঝে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু যখন তারা জানতে পারে যে, স্বয়ং সুলতান আন-নাসির মুহাম্মাদ তার বাহিনী নিয়ে তাতারদের মোকাবিলায় শামে আগমন করছেন, তখন তারা নিশ্চিন্ত হয়।
৭০২ হিজরি সনের রমজান মাসে (১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে) দামেশকের দক্ষিণে শাকহাব প্রান্তরে সংঘটিত এ যুদ্ধে তাতাররা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। পরাজিত তাতার সৈন্যরা আশেপাশের পাহাড় ও টিলায় পালিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করলেও খুব অল্প সংখ্যকই রেহাই পেতে সক্ষম হয়।
যুদ্ধ চলাকালে ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত থেকে সৈন্যদের সারিতে-সারিতে গিয়ে তাদের মনোবল বৃদ্ধি করছিলেন। তিনি তাদের সামনে নিজে খাবার খেয়ে তাদেরকে বোঝাচ্ছিলেন যে, চলমান পরিস্থিতিতে তাদের জন্য রোজা না রাখা শ্রেয়তর।
সুলতান আন-নাসির মুহাম্মাদ বিন কালাউনও এই যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। যুদ্ধ চলাকালে তার ঘোড়া যেন ভীত হয়ে পালাতে না পারে, এজন্য তিনি তার ঘোড়াকে বেঁধে রেখেছিলেন। সমকালীন আব্বাসি খলিফা ২য় মুসতাকফি বিল্লাহ আবুর রবি সুলায়মানও এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00