📄 হিমসের যুদ্ধ
৬৮০ হিজরি সনের রজব মাসে (১২৮১ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে) হিমসের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। প্রচণ্ডতা ও ভয়াবহতার দিক দিয়ে হিমসের যুদ্ধকে তুলনা করা যেতে পারে আইনে জালুতের যুদ্ধের সঙ্গে।
এ সময় আবাগা খান আরও একবার শাম অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালান। এবার তিনি তার ভাই (হালাকু খানের আরেক পুত্র) মিঙ্গু তিমুর (Mengu Timur)-এর নেতৃত্বে বিশাল এক বাহিনী শাম অভিমুখে প্রেরণ করেন। বাহিনীটিতে আশি হাজার তাতার সৈন্যের পাশাপাশি জর্জিয়ান ও আর্মেনীয় সৈন্য মিলে এক লক্ষাধিক সৈন্য ছিল। তাতারদের শামে আক্রমণের সংকল্পের কথা জানতে পেরে সুলতান কালাউন ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিম শাসক-প্রশাসকদের কাছে বার্তা প্রেরণ করে তাদেরকে তাতারবিরোধী অভিযানে যোগ দেওয়ার এবং সামরিক সহায়তার আহ্বান জানান। প্রশাসকগণ আপন আপন বাহিনী নিয়ে সুলতানের অবস্থানস্থল দামেশকে সমবেত হয়। প্রতিটি অঞ্চল থেকে দলে দলে লোকজন আগমন করে। তুর্কমেন, বেদুইন ও অন্যান্যরাও বাহিনীতে যোগদান করে। সবমিলিয়ে মুসলিম বাহিনীর সদস্যসংখ্যা তাতারদের অর্ধেকের কাছাকাছি পৌঁছায়। সকলে আল্লাহর কাছে কাকুতিমিনতি করে সাহায্য কামনা করতে থাকে।
রজব মাসের চৌদ্দ তারিখ সূর্যোদয়ের সময় হিমসের উপকণ্ঠে উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয়। যুদ্ধ শুরু হলে প্রথমদিকে জয়ের পাল্লা তাতারদের দিকে হেলে পড়ে। এ সময় কিছু মুসলিম যোদ্ধা রণক্ষেত্র হতে পালিয়ে যায়। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর মূল অংশে অবস্থানরত সুলতান কালাউন সামান্য হতোদ্যম বা নিরাশ না হয়ে তার অল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়ে অটল-অবিচল থেকে লড়াই চালিয়ে যান। সুলতানকে অবিচল দেখতে পেয়ে অনেক সেনাপতি ও যোদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসে। কথায় বলে—রাজ্য চলে রাজার চালে!
এরপর মুসলিম বাহিনীর প্রবল আক্রমণে তাতাররা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। প্রচুর তাতার সৈন্য নিহত হয়; বাকিরা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পলায়নের পথ ধরে। সুলতান কালাউন পলায়নপর তাতারদের পশ্চাদ্ধাবন করার জন্য মুসলিম বাহিনীর সৈন্যদের প্রেরণ করেন।
৬৮০ হিজরি সনেই হালাকু-পুত্র আবাগা খান মৃত্যুবরণ করেন। তাতারদের হিমসের যুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত তার ছিল না; বরং তার ভাইয়ের সিদ্ধান্তে হয়েছিল। কিন্তু উপযুক্ত সুযোগের প্রতীক্ষায় আবাগা খানও তাতার-বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করেছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে স্বজাতির পরাজয় অবলোকন করে আবাগা খান অত্যন্ত ভেঙে পড়েন এবং এর কিছুদিন পরই মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তাতারদের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তার ভাই আহমাদ তেকুদির বিন হালাকু। দায়িত্ব গ্রহণ করার পরই তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মামলুক সুলতান কালাউনের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরিতে সচেষ্ট হন। বিরোধী তাতাররা এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে তাকে অপসারণ ও হত্যার চেষ্টা চালায়। ৬৮৩ হিজরি সনে (১২৮৪ খ্রিষ্টাব্দে) তাতাররা আহমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং তাকে হত্যা করে। তাতারি ইলখানাত রাজ্যের নেতৃত্বের আসনে এবার অভিষিক্ত হন আবাগা খানের পুত্র আরগুন।
তাতারদের দিক থেকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পর সুলতান কালাউন এবার ক্রুসেডারদের প্রতি মনোযোগী হন। প্রথমেই তিনি লাতাকিয়া অবরোধ করার পর জয় করে নেন। এরপর ত্রিপোলির খ্রিষ্টানরা মুসলিম বণিক কাফেলার ওপর হামলা চালিয়ে চুক্তিভঙ্গ করলে তিনি ত্রিপোলিতে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। সুলতান কালাউন ৬৮৮ হিজরি সনের মুহাররম মাসে (১২৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে) মিশর থেকে শামের উদ্দেশে রওনা হন। পথে এক সপ্তাহ দামেশকে অবস্থান করে তিনি তার বাহিনীকে বিন্যস্ত করেন। এরপর তিনি ত্রিপোলি অভিমুখে রওনা হন এবং রবিউল আউয়াল মাসের শুরুতে ত্রিপোলি অবরোধ করেন। মামলুক বাহিনীর কামান ও মিনজানিক হতে নিক্ষিপ্ত পাথরের আঘাতে ত্রিপোলির নিরাপত্তাব্যবস্থা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। রবিউস সানি মাসের চার তারিখে (১২৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ এপ্রিল) সুলতানের নির্দেশে মামলুক বাহিনী চূড়ান্ত হামলা চালিয়ে ত্রিপোলিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ৫০৩ হিজরি সনের জিলহজ মাসে ক্রুসেডাররা ত্রিপোলি দখল করে নিয়েছিল। দীর্ঘ একশ পঁচাশি বছর পর সুলতান কালাউন ত্রিপোলি পুনরুদ্ধার করেন।
ত্রিপোলির পতনের পর শাম অঞ্চলে ক্রুসেডারদের দখলে অবশিষ্ট থাকে কেবল সুর, আক্কা ও বৈরুত নগরী। খ্রিষ্টানদের অন্যতম সুরক্ষিত নগরী আক্কাও ক্রুসেডারদের সঙ্গে কৃত দশ বছর মেয়াদি শান্তিচুক্তির আওতায় ছিল। কিন্তু ৬৮৯ হিজরি সনে আক্কায় কয়েকজন মুসলিম ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হলে সুলতান কালাউন হত্যাকারীদেরকে তার হাতে সমর্পণের দাবি জানান। আক্কার ক্রুসেডার কর্তৃপক্ষ এতে অস্বীকৃতি জানালে সুলতান কালাউন আক্কায় অভিযান পরিচালনার মনস্থ করেন। কিন্তু আক্কায় অভিযান পরিচালনার পূর্বেই ৬৮৯ হিজরি সনের জিলকদ মাসে (১২৯০ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে) তিনি ইন্তেকাল করেন।
সুলতান কালাউনের শাসনামলে রাজ্যজুড়ে ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তার অন্যতম কীর্তি সুলতান আল-মানসুর কালাউন কমপ্লেক্স। কায়রোতে দুই প্রাসাদের মাঝে একটি বড় হাসপাতাল, মসজিদ, মাদরাসা ও স্মারক-গম্বুজ নিয়ে কমপ্লেক্সটি গঠিত হয়েছে। হাসপাতালটি ছিল তৎকালীন মিশরের সর্ববৃহৎ চিকিৎসাকেন্দ্র। সুলতান এই কমপ্লেক্সের জন্য প্রচুর সম্পদ ওয়াকফ করে গিয়েছিলেন এবং ওয়াকফের মধ্যে বিভিন্ন কল্যাণমূলক শর্ত সংযুক্ত করেছিলেন। ইন্তেকালের পর সুলতান কালাউনকে উক্ত কমপ্লেক্সের স্মারক-গম্বুজের নিচে সমাহিত করা হয়।
সুলতান কালাউনের ইন্তেকালের পর তার পুত্র আল-আশরাফ সালাহুদ্দিন খলিল তার স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি ৬৮৯ হিজরি সন হতে ৬৯৩ হিজরি সন (১২৯০-১২৯৩ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। সুলতান আল-আশরাফ খলিল ছিলেন দুঃসাহসী বীর যোদ্ধা। তার পিতা সুলতান কালাউন ক্রুসেডারদের অধিকৃত সবচেয়ে সুরক্ষিত নগরী আক্কা বিজয়ের জন্য যে বাহিনী প্রস্তুত করছিলেন, তিনি তা পূর্ণ প্রস্তুত করেন। সংবাদ পেয়ে ক্রুসেডাররা তাকে প্রতিরোধ করার জন্য অবশিষ্ট যোদ্ধাদের সমবেত করে। কিন্তু নিজেদের স্বভাবরীতির দাবিতেই যেন তারা পরস্পর বিভেদে জড়িয়ে পড়ে। ৬৯০ হিজরি সনের জুমাদাল উলা মাসে (১২৯১ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) আল-আশরাফের নেতৃত্বাধীন মামলুক বাহিনী প্রচণ্ড যুদ্ধের পর আক্কা জয় করে এবং নগরীটির প্রতিরক্ষা-দুর্গ ধ্বংস করে। এ যুদ্ধে খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের বহু সৈন্য নিহত হয়। ইতিপূর্বে সুলতান বাইবার্স ও সুলতান কালাউন চেষ্টা করেও যে আক্কা নগরী জয় করতে পারেননি, অবশেষে আল্লাহ তাআলা আল-আশরাফের হাতে সেই বিজয় দান করেন।
আক্কার পতনের পর সুর, সিডন ও বৈরুতসহ একে একে শামের অবশিষ্ট খ্রিষ্টান নগরীগুলোরও পতন ঘটে এবং শামে খ্রিষ্টরাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে। বেঁচে থাকা অবশিষ্ট ক্রুসেডাররা শাম থেকে পালিয়ে শামের সন্নিকটে নতুন দুটি খ্রিষ্টরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। একটি হলো আর্মেনিয়া, অপরটি দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাস। ফলে শামের অভ্যন্তর অঞ্চল আপাতত বিপদমুক্ত হলেও বাইরের এই দুটি রাষ্ট্রের কোনো একটি থেকে বিপদ আগমনের আশঙ্কা বাকি থেকে যায়।
📄 হালাকু খানের বংশধর গাজানের ইসলাম গ্রহণ
হিমসের যুদ্ধে পরাজয়ের পর তাতারদের অন্তর্বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। তারা যাকেই শাসক পদে বসাত, কিছুদিন পরই তাকে বরখাস্ত ও হত্যা করত। অবশেষে ৬৯৪ হিজরি সনে তাতার রাষ্ট্র ইলখানাতের শাসনভার গ্রহণ করেন হালাকু খানের প্রপৌত্র গাজান বিন আরগুন বিন আবাগা খান বিন হালাকু খান। গাজান সেনাপতি তুযুন-এর হাতে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেন। গাজান ইসলাম গ্রহণ করার পর তার অনুসরণে তাতার জনগোষ্ঠীর প্রায় এক লক্ষ লোক ইসলাম গ্রহণ করে। গাজানের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার দিনটি ছিল এক ঐতিহাসিক দিন। তিনি সেদিন জনসাধারণের মাঝে স্বর্ণ-রুপা ছিটিয়ে দেন এবং নিজের নাম রাখেন 'মাহমুদ'। এরপর তিনি জুমার নামাজে উপস্থিত হন। মাহমুদ গাজান বহু গির্জা ধ্বংস করেন এবং খ্রিষ্টানদের ওপর জিজিয়া আরোপ করেন। তিনি বাগদাদ ও অন্যান্য অঞ্চলে বিভিন্ন অবিচারমূলক প্রথা বাতিল করেন। তার শাসনামলেই তাতারদের মাঝে ইসলামি শিক্ষার প্রসার শুরু হয়।
📄 গাজানের শাম দখলের প্রচেষ্টা
এরপর গাজান তার রাজ্য মিশর ও শাম অঞ্চলেও বিস্তৃত করার মনস্থ করেন এবং শামের মুসলমানদের বিরুদ্ধে একাধিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। কোনো কোনো লড়াই সাধারণ খণ্ড-যুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকলেও কোনো কোনোটি ছিল চরম রক্তক্ষয়ী। এসব যুদ্ধের কারণে শামের মুসলমানদের চরম ক্ষতি পোহাতে হয়।
📄 তাতারি দুর্যোগ মোকাবিলায় ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর অবিস্মরণীয় ভূমিকা
এ সময় মুসলিম জনমনে এই প্রশ্ন উদয় হয় যে, এসব তাতাররা তো মুসলমান। তারা মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধাচরণও করেনি। বরং তারা তো কখনো মুসলিম শাসকের বশ্যতাই স্বীকার করেনি যে, পরে বিরুদ্ধাচরণের প্রশ্ন আসবে। সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা কীকরে বৈধ হতে পারে? তখন ইবনে তাইমিয়া রহ. ফতোয়া প্রদান করেন যে, 'তারা হজরত আলি রাযি. ও মুয়াবিয়া রাযি.-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাকারী খারিজি সম্প্রদায়ের হুকুমভুক্ত। খারিজিরা মনে করত যে, তারা আলি রাযি. ও মুয়াবিয়া রাযি.-এর তুলনায় শাসন ক্ষমতার অধিক হকদার। তদ্রূপ এই তাতাররাও মনে করে যে, অন্যান্য মুসলমানের চেয়ে তারা হক প্রতিষ্ঠার অধিক হকদার। তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অন্যায়-অবিচারে লিপ্ত থাকার অভিযোগ উত্থাপন করছে। অথচ তারা নিজেরা এর চেয়েও শত গুণ কঠিন অন্যায়ে লিপ্ত আছে।'
ইবনে তাইমিয়া রহ. মুসলমানদেরকে তাতারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করার জন্য আরও বলেন, 'তোমরা যদি আমাকে মাথায় কুরআন নিয়েও তাতারদের পক্ষে দণ্ডায়মান দেখতে পাও, তবুও আমাকে হত্যা করবে।'
ইবনে তাইমিয়া রহ. একদিকে যেমন শাম ও মিশরের মুসলিম জনসাধারণকে অটল-অবিচল থাকতে উদ্বুদ্ধ করছিলেন এবং শাসক-প্রশাসকদেরকে দৃঢ়তার সঙ্গে লড়াই করতে উৎসাহিত করছিলেন, অপরদিকে তিনি তাতারদের কাছে গিয়ে তাদের কাছ থেকে মুসলমানদের জন্য নিরাপত্তার ঘোষণা লাভের চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
৬৯৯ হিজরি সনের ৩ রবিউস সানি (১২৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর) ইবনে তাইমিয়া উলামায়ে কেরাম ও গণমান্য ব্যক্তিদের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে তাতার শাসক গাজানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং অত্যন্ত জোরালো ভাষায় দৃঢ়তার সঙ্গে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন। তার এই বক্তব্য মুসলমানদের স্বার্থরক্ষায় ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।
একই বছরের ৮ রজব (১৩০O খ্রিষ্টাব্দের ৩০ মার্চ) শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া তাতার সেনাপতি বুলাই-এর তাঁবুতে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তার হাতে বন্দি ব্যক্তিদের মুক্তির বিষয়ে কথা বলেন। বন্দিদের মাঝে বেশ কিছু জিম্মি নাগরিকও ছিল। ইবনে তাইমিয়ার সুপারিশে সেনাপতি বুলাই সকল মুসলিম বন্দিকে মুক্তিদান করেন। কিন্তু ইবনে তাইমিয়া আপত্তি জানিয়ে বলেন, 'না, আমাদের জিম্মিদেরকেও মুক্তি দিতে হবে।' এরপর সেনাপতি বুলাই প্রচুর সংখ্যক বন্দিকে মুক্তি প্রদান করেন। ইবনে তাইমিয়া রহ. সেখানে তিনদিন অবস্থান করার পর ফিরে আসেন।
একবার তাতারদের একটি সৈন্যদল অভিযানে রওনা হয়ে দামেশকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তখন দামেশকের নাগরিকরা অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়ে। দামেশকের গভর্নর সকলের উদ্দেশে ঘোষণা করেন— 'সকলে নগরপ্রাচীর সামলাও। কেউ আপন ঘরে অবস্থান করলে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে।' তখন সকলে নগরীর প্রতিরক্ষার জন্য প্রাচীরের কাছে সমবেত হয়। ইবনে তাইমিয়া রহ. এ সময় প্রতি রাতে প্রাচীরের কাছে গিয়ে সকলকে জিহাদের আহ্বান জানাতেন এবং অটল-অবিচল থেকে শত্রুর মোকাবিলা করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন।
যুদ্ধ চলাকালে ইবনে তাইমিয়া রহ. তার কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে বিভিন্ন পানশালায় গিয়ে মদের বোতল ও পানপাত্র ভেঙে ফেলতেন এবং অন্যায়ের আড্ডাখানা এসব পানশালার মালিকদেরকে কঠোর ভাষায় শাসাতেন। তিনি বলতেন, 'এদের কারণেই আল্লাহ তাআলার সাহায্য ও বিজয় আগমনে বিলম্ব হচ্ছে।'
এরইমধ্যে শুরু হয় ৭০০ হিজরি সন। জনসাধারণ তখন তাতার-ভীতিতে প্রকম্পিত। কিন্তু ইবনে তাইমিয়া রহ. তাদের সাহস জোগাতে থাকেন এবং আল্লাহর নুসরত ও সাহায্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। মিশরের সুলতান আন-নাসির মুহাম্মাদ বিন কালাউন এ সময় দামেশকবাসীকে সহায়তাপ্রদান বন্ধ করে দিলে ইবনে তাইমিয়া রহ. মিশরে সফর করে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাকে বলেন, 'আপনি যদি শাম অঞ্চলের শাসক না-ও হতেন আর শামবাসী আপনার কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করত, তখনও তাদেরকে সাহায্য করা আপনার অবশ্য কর্তব্য ছিল। অথচ আপনি তো তাদের শাসক ও সুলতান, তারা আপনার প্রজা ও অধীনস্থ এবং তাদের বিষয়ে আপনি পরকালে আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞাসিত হবেন। তাহলে তাদের বিষয়ে আপনার কর্মনীতি কীরূপ হওয়া উচিত?'
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এভাবেই মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করতে সচেষ্ট ছিলেন। তিনি সকলকে সাহস ও শক্তি জোগাতেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে নুসরত ও বিজয়লাভের প্রতিশ্রুতি শোনাতেন। আট দিন মিশরে অবস্থানের পর তিনি দামেশকে ফিরে আসেন।
তাতার শাসক গাজান যখন জানতে পারেন যে, মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তার প্রতিরোধ করতে যাচ্ছে, তখন তিনি নিজ বাহিনীর দুর্বলতা ও সংখ্যাস্বল্পতার দিক বিবেচনা করে দেশে ফিরে যান।