📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 নবম ক্রুসেড

📄 নবম ক্রুসেড


ত্রিপোলি অবরোধের সংবাদ জানতে পেরে ইউরোপের টনক নড়ে ওঠে। আল-কুদস, এডেসা, এন্টিয়ক সবই হাতছাড়া হয়ে গেছে। এখন যদি ত্রিপোলি ও আক্কারও পতন ঘটে, তাহলে ইসলামি প্রাচ্য থেকে ক্রুসেডারদের নামনিশানাই মুছে যাবে। তাতারদের সহায়তায় এবার ঘোষিত হয় নবম ক্রুসেড।
অষ্টম ক্রুসেডের মতো এবারও অভিযানে যোগ দেয় ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, সাইপ্রাস ও তাতার রাজ্য ইলখানাত। আবাগা খান অবশ্য এবার নিজে না এসে তার আস্থাভাজন সেনাপতি সামাগার (Samagar)-কে প্রেরণ করেন। পরিকল্পনা করা হয়, ইউরোপীয় ক্রুসেডাররা মামলুক সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্সকে যুদ্ধে ব্যস্ত রাখবে, এ ফাঁকে তাতার বাহিনী শামের বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে নেবে।
৬৭০ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে (১২৭১ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে) সামাগারের নেতৃত্বে ত্রিশ হাজার সৈন্যের বিশাল এক বাহিনী উত্তর দিক থেকে মামলুক রাষ্ট্রে পা রাখে। প্রথমেই তারা আলেপ্পোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, এরপর একে একে হামলা চালায় মাআররাতুন-নোমান ও আফামিয়া নগরীতে। সংবাদ পেয়ে সুলতান বাইবার্স অল্পকিছু সৈন্যকে ত্রিপোলিতে রেখে বাকিদের নিয়ে দ্রুত আফামিয়া অভিমুখে অগ্রসর হন। বাইবার্সের রওনা হওয়ার সংবাদ পেয়েই তাতার বাহিনী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাতে শুরু করে। বাইবার্স দ্রুত গতিতে তাদের ধাওয়া করে মামলুক রাজ্যের শেষ সীমা খাবুর নদী পর্যন্ত পৌঁছে যান। কিন্তু তার আগেই তাতাররা পালিয়ে ইলখানাত রাজ্যে চলে যায়!
সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স যখন তাতারদের তাড়া করে শামের উত্তর প্রান্তে পৌঁছে গেছেন, ওদিক থেকে ইউরোপীয় ক্রুসেডাররা তখন ফিলিস্তিন অঞ্চলে হামলা চালায়। মামলুক বাহিনী অন্যদিকে ব্যস্ত থাকায় ইংল্যান্ডের যুবরাজ অ্যাডওয়ার্ডের নেতৃত্বে ক্রুসেডার বাহিনী অনেকটা বিনা যুদ্ধে একে একে মন্টফোর্ট দুর্গ (Montfort Castle), নাজারেথ নগরী ও কাকুন দুর্গ দখল করে নেয়।
সংবাদ পেয়ে কালবিলম্ব না করে সুলতান বাইবার্স শামের দক্ষিণ প্রান্তে ছুটে আসেন। বত্রিশ হাজার সৈন্যবিশিষ্ট ক্রুসেডার বাহিনীর মোকাবিলা করতে তিনি মাত্র বিশ হাজার সৈন্য নিয়েই আক্কায় পৌঁছান। বাইবার্সের আগমনে অ্যাডওয়ার্ডের যুদ্ধস্পৃহা মুহূর্তেই উবে যায়। তিনি বাইবার্সের কাছে দূত প্রেরণ করে সন্ধিচুক্তির আবেদন জানান! ৬৭০ হিজরি সনের শাওয়াল মাসে (১২৭২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। 'কায়সারিয়ার চুক্তি' নামে খ্যাত দশ বছর দশ মাস দশ দিন মেয়াদি চুক্তিটির ধারাগুলো হলো-
* মন্টফোর্ট, নাজারেথ ও কাকুন দুর্গের অধিকার মুসলমানরা ফেরত পাবে।
* এসব এলাকার যেসব মুসলিম নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে, তাদের পরিবারকে নিহত প্রত্যেক ব্যক্তির বিপরীতে প্রতি বছর তিনশ ষাট দিরহাম প্রদান করতে হবে। এই ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে দুই ক্রুসেড রাজ্য বাইতুল মুকাদ্দাস ও ত্রিপোলি।
* খ্রিষ্টানরা তীর্থযাত্রার জন্য আল-কুদসে আগমন করলে নির্দিষ্ট দর্শনার্থী মাশুল প্রদান করতে হবে।
* তীর্থযাত্রীরা ইসলামি ভূখণ্ডে ধর্মপ্রচার করতে পারবে না, ভূমি ক্রয় করতে পারবে না, ইসলামি ভূখণ্ডের কোনো খ্রিষ্টান নাগরিকের সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে না এবং তীর্থযাত্রার আগে-পরে মিলিয়ে অতিরিক্ত দুই দিনের বেশি অবস্থান করতে পারবে না।
উত্তরের এই অব্যাহত অভিযানব্যস্ততা সুলতান বাইবার্সকে মিশরের দক্ষিণাঞ্চলের বিষয়ে উদাসীন করতে পারেনি। ৬৭৪ হিজরি সনে তিনি নুবিয়া অঞ্চলে বাহিনী প্রেরণ করেন এবং সেখানকার অধিবাসীদের বশীভূত করে পুনরায় জিজিয়া প্রদানে বাধ্য করতে সক্ষম হন। ইতিপূর্বে তারা জিজিয়া প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
৬৭৬ হিজরি সনের ২৭ মুহাররম (১২৭৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ জুন) সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স ইন্তেকাল করেন। এরপর মিশরের ক্ষমতা নিয়ে সংঘাত শুরু হয় এবং বাইবার্সের দুই পুত্র আস-সাইদ নাসিরুদ্দিন বারাকা ও আল-আদিল বদরুদ্দিন সুলামিশ একের পর এক শাসনভার গ্রহণ করেন। কিন্তু তাদের একজনেরও শাসনামল দীর্ঘায়ত হয়নি। অবশেষে মিশরের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন আল-মালিকুল মানসুর সাইফুদ্দিন কালাউন আস-সালিহি। তিনি ৬৭৮ হিজরি সন হতে ৬৮৯ হিজরি সন (১২৭৯-১২৯০ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী একশ বছরেরও অধিক সময় মিশরের ক্ষমতার লাগাম কালাউন-পরিবারের হাতেই ছিল।
ক্ষমতা সুসংহত হওয়ার পর সুলতান কালাউন ক্রুসেডারদের সঙ্গে দশ বছর মেয়াদি শান্তিচুক্তি করেন। চুক্তির অন্যতম ধারা ছিল—এ সময় তিনি মিশরের পণ্যবাহী জাহাজকে শামের খ্রিষ্টান নিয়ন্ত্রিত বন্দরগুলোতে প্রবেশের অনুমতি দেবেন না এবং খ্রিষ্টানরা তাদের নগরীগুলোতে নতুন করে কোনো প্রতিরক্ষামূলক স্থাপনা নির্মাণ করতে পারবে না। চুক্তির এ ধারাগুলো দ্বারাই অনুমান করা যায় যে, সমকালীন ক্রুসেড শক্তি কতটা দুর্বল ও হীনবল হয়ে পড়েছিল।
ক্রুসেডারদের সঙ্গে সুলতান কালাউনের সমঝোতাচুক্তি মূলত তার প্রজ্ঞাপূর্ণ বিবেচনাবোধেরই নিদর্শন ছিল। কারণ, তাতাররা তখন নতুন করে মিশরে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 দ্রষ্টব্য : অমুসলিমদের ধর্মত্যাগে বাধ্য করা ইসলামে বৈধ নয়

📄 দ্রষ্টব্য : অমুসলিমদের ধর্মত্যাগে বাধ্য করা ইসলামে বৈধ নয়


হিমসের যুদ্ধের কিছুদিন পূর্বে সুলতান মানসুর কালাউন দামেশকে এই রাজকীয় বার্তা প্রেরণ করেন যে, ইতিপূর্বে যাদের নাম জিম্মি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে, তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করা হলো। যারা ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাবে, তাদেরকে শূলে চড়ানো হবে।
সুলতানের নির্দেশ জারি হওয়ার পর কেউ ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে তাকে গলায় রশি ঝুলিয়ে শূলে চড়াতে নিয়ে যাওয়া হতো। ফলে তারা বাধ্য হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। তারা বলত—শাসক ইসলাম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়ায় আমরা ঈমান এনেছি।
এরইমধ্যে হিমসের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এরপর সে বছরেরই (৬৮০ হিজরি সনের) শাওয়াল মাসে জোরপূর্বক ইসলামগ্রহণকারী জিম্মিদের বিষয়ে একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে বেশ কয়েকজন মুফতি লিখে জানান যে, জিম্মিদেরকে জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা হয়েছে; সুতরাং তাদের নিজ ধর্মে প্রত্যাবর্তনের অধিকার আছে। কাজি জামালুদ্দিন বিন আবু ইয়াকুব মালিকির কাছেও জিম্মিদের জোরপূর্বক ইসলামগ্রহণের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। তখন তাদেরকে নিজ ধর্মে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ প্রদান করা হয়।
এরপর তাদের অধিকাংশই নিজ ধর্মে ফিরে যায় এবং পূর্বের ন্যায় তাদের ওপর জিজিয়া আরোপ করা হয়।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 হিমসের যুদ্ধ

📄 হিমসের যুদ্ধ


৬৮০ হিজরি সনের রজব মাসে (১২৮১ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে) হিমসের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। প্রচণ্ডতা ও ভয়াবহতার দিক দিয়ে হিমসের যুদ্ধকে তুলনা করা যেতে পারে আইনে জালুতের যুদ্ধের সঙ্গে।
এ সময় আবাগা খান আরও একবার শাম অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালান। এবার তিনি তার ভাই (হালাকু খানের আরেক পুত্র) মিঙ্গু তিমুর (Mengu Timur)-এর নেতৃত্বে বিশাল এক বাহিনী শাম অভিমুখে প্রেরণ করেন। বাহিনীটিতে আশি হাজার তাতার সৈন্যের পাশাপাশি জর্জিয়ান ও আর্মেনীয় সৈন্য মিলে এক লক্ষাধিক সৈন্য ছিল। তাতারদের শামে আক্রমণের সংকল্পের কথা জানতে পেরে সুলতান কালাউন ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিম শাসক-প্রশাসকদের কাছে বার্তা প্রেরণ করে তাদেরকে তাতারবিরোধী অভিযানে যোগ দেওয়ার এবং সামরিক সহায়তার আহ্বান জানান। প্রশাসকগণ আপন আপন বাহিনী নিয়ে সুলতানের অবস্থানস্থল দামেশকে সমবেত হয়। প্রতিটি অঞ্চল থেকে দলে দলে লোকজন আগমন করে। তুর্কমেন, বেদুইন ও অন্যান্যরাও বাহিনীতে যোগদান করে। সবমিলিয়ে মুসলিম বাহিনীর সদস্যসংখ্যা তাতারদের অর্ধেকের কাছাকাছি পৌঁছায়। সকলে আল্লাহর কাছে কাকুতিমিনতি করে সাহায্য কামনা করতে থাকে।
রজব মাসের চৌদ্দ তারিখ সূর্যোদয়ের সময় হিমসের উপকণ্ঠে উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয়। যুদ্ধ শুরু হলে প্রথমদিকে জয়ের পাল্লা তাতারদের দিকে হেলে পড়ে। এ সময় কিছু মুসলিম যোদ্ধা রণক্ষেত্র হতে পালিয়ে যায়। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর মূল অংশে অবস্থানরত সুলতান কালাউন সামান্য হতোদ্যম বা নিরাশ না হয়ে তার অল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়ে অটল-অবিচল থেকে লড়াই চালিয়ে যান। সুলতানকে অবিচল দেখতে পেয়ে অনেক সেনাপতি ও যোদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসে। কথায় বলে—রাজ্য চলে রাজার চালে!
এরপর মুসলিম বাহিনীর প্রবল আক্রমণে তাতাররা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। প্রচুর তাতার সৈন্য নিহত হয়; বাকিরা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পলায়নের পথ ধরে। সুলতান কালাউন পলায়নপর তাতারদের পশ্চাদ্ধাবন করার জন্য মুসলিম বাহিনীর সৈন্যদের প্রেরণ করেন।
৬৮০ হিজরি সনেই হালাকু-পুত্র আবাগা খান মৃত্যুবরণ করেন। তাতারদের হিমসের যুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত তার ছিল না; বরং তার ভাইয়ের সিদ্ধান্তে হয়েছিল। কিন্তু উপযুক্ত সুযোগের প্রতীক্ষায় আবাগা খানও তাতার-বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করেছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে স্বজাতির পরাজয় অবলোকন করে আবাগা খান অত্যন্ত ভেঙে পড়েন এবং এর কিছুদিন পরই মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তাতারদের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তার ভাই আহমাদ তেকুদির বিন হালাকু। দায়িত্ব গ্রহণ করার পরই তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মামলুক সুলতান কালাউনের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরিতে সচেষ্ট হন। বিরোধী তাতাররা এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে তাকে অপসারণ ও হত্যার চেষ্টা চালায়। ৬৮৩ হিজরি সনে (১২৮৪ খ্রিষ্টাব্দে) তাতাররা আহমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং তাকে হত্যা করে। তাতারি ইলখানাত রাজ্যের নেতৃত্বের আসনে এবার অভিষিক্ত হন আবাগা খানের পুত্র আরগুন।
তাতারদের দিক থেকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পর সুলতান কালাউন এবার ক্রুসেডারদের প্রতি মনোযোগী হন। প্রথমেই তিনি লাতাকিয়া অবরোধ করার পর জয় করে নেন। এরপর ত্রিপোলির খ্রিষ্টানরা মুসলিম বণিক কাফেলার ওপর হামলা চালিয়ে চুক্তিভঙ্গ করলে তিনি ত্রিপোলিতে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। সুলতান কালাউন ৬৮৮ হিজরি সনের মুহাররম মাসে (১২৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে) মিশর থেকে শামের উদ্দেশে রওনা হন। পথে এক সপ্তাহ দামেশকে অবস্থান করে তিনি তার বাহিনীকে বিন্যস্ত করেন। এরপর তিনি ত্রিপোলি অভিমুখে রওনা হন এবং রবিউল আউয়াল মাসের শুরুতে ত্রিপোলি অবরোধ করেন। মামলুক বাহিনীর কামান ও মিনজানিক হতে নিক্ষিপ্ত পাথরের আঘাতে ত্রিপোলির নিরাপত্তাব্যবস্থা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। রবিউস সানি মাসের চার তারিখে (১২৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ এপ্রিল) সুলতানের নির্দেশে মামলুক বাহিনী চূড়ান্ত হামলা চালিয়ে ত্রিপোলিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ৫০৩ হিজরি সনের জিলহজ মাসে ক্রুসেডাররা ত্রিপোলি দখল করে নিয়েছিল। দীর্ঘ একশ পঁচাশি বছর পর সুলতান কালাউন ত্রিপোলি পুনরুদ্ধার করেন।
ত্রিপোলির পতনের পর শাম অঞ্চলে ক্রুসেডারদের দখলে অবশিষ্ট থাকে কেবল সুর, আক্কা ও বৈরুত নগরী। খ্রিষ্টানদের অন্যতম সুরক্ষিত নগরী আক্কাও ক্রুসেডারদের সঙ্গে কৃত দশ বছর মেয়াদি শান্তিচুক্তির আওতায় ছিল। কিন্তু ৬৮৯ হিজরি সনে আক্কায় কয়েকজন মুসলিম ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হলে সুলতান কালাউন হত্যাকারীদেরকে তার হাতে সমর্পণের দাবি জানান। আক্কার ক্রুসেডার কর্তৃপক্ষ এতে অস্বীকৃতি জানালে সুলতান কালাউন আক্কায় অভিযান পরিচালনার মনস্থ করেন। কিন্তু আক্কায় অভিযান পরিচালনার পূর্বেই ৬৮৯ হিজরি সনের জিলকদ মাসে (১২৯০ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে) তিনি ইন্তেকাল করেন।
সুলতান কালাউনের শাসনামলে রাজ্যজুড়ে ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তার অন্যতম কীর্তি সুলতান আল-মানসুর কালাউন কমপ্লেক্স। কায়রোতে দুই প্রাসাদের মাঝে একটি বড় হাসপাতাল, মসজিদ, মাদরাসা ও স্মারক-গম্বুজ নিয়ে কমপ্লেক্সটি গঠিত হয়েছে। হাসপাতালটি ছিল তৎকালীন মিশরের সর্ববৃহৎ চিকিৎসাকেন্দ্র। সুলতান এই কমপ্লেক্সের জন্য প্রচুর সম্পদ ওয়াকফ করে গিয়েছিলেন এবং ওয়াকফের মধ্যে বিভিন্ন কল্যাণমূলক শর্ত সংযুক্ত করেছিলেন। ইন্তেকালের পর সুলতান কালাউনকে উক্ত কমপ্লেক্সের স্মারক-গম্বুজের নিচে সমাহিত করা হয়।
সুলতান কালাউনের ইন্তেকালের পর তার পুত্র আল-আশরাফ সালাহুদ্দিন খলিল তার স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি ৬৮৯ হিজরি সন হতে ৬৯৩ হিজরি সন (১২৯০-১২৯৩ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। সুলতান আল-আশরাফ খলিল ছিলেন দুঃসাহসী বীর যোদ্ধা। তার পিতা সুলতান কালাউন ক্রুসেডারদের অধিকৃত সবচেয়ে সুরক্ষিত নগরী আক্কা বিজয়ের জন্য যে বাহিনী প্রস্তুত করছিলেন, তিনি তা পূর্ণ প্রস্তুত করেন। সংবাদ পেয়ে ক্রুসেডাররা তাকে প্রতিরোধ করার জন্য অবশিষ্ট যোদ্ধাদের সমবেত করে। কিন্তু নিজেদের স্বভাবরীতির দাবিতেই যেন তারা পরস্পর বিভেদে জড়িয়ে পড়ে। ৬৯০ হিজরি সনের জুমাদাল উলা মাসে (১২৯১ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) আল-আশরাফের নেতৃত্বাধীন মামলুক বাহিনী প্রচণ্ড যুদ্ধের পর আক্কা জয় করে এবং নগরীটির প্রতিরক্ষা-দুর্গ ধ্বংস করে। এ যুদ্ধে খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের বহু সৈন্য নিহত হয়। ইতিপূর্বে সুলতান বাইবার্স ও সুলতান কালাউন চেষ্টা করেও যে আক্কা নগরী জয় করতে পারেননি, অবশেষে আল্লাহ তাআলা আল-আশরাফের হাতে সেই বিজয় দান করেন।
আক্কার পতনের পর সুর, সিডন ও বৈরুতসহ একে একে শামের অবশিষ্ট খ্রিষ্টান নগরীগুলোরও পতন ঘটে এবং শামে খ্রিষ্টরাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে। বেঁচে থাকা অবশিষ্ট ক্রুসেডাররা শাম থেকে পালিয়ে শামের সন্নিকটে নতুন দুটি খ্রিষ্টরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। একটি হলো আর্মেনিয়া, অপরটি দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাস। ফলে শামের অভ্যন্তর অঞ্চল আপাতত বিপদমুক্ত হলেও বাইরের এই দুটি রাষ্ট্রের কোনো একটি থেকে বিপদ আগমনের আশঙ্কা বাকি থেকে যায়।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 হালাকু খানের বংশধর গাজানের ইসলাম গ্রহণ

📄 হালাকু খানের বংশধর গাজানের ইসলাম গ্রহণ


হিমসের যুদ্ধে পরাজয়ের পর তাতারদের অন্তর্বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। তারা যাকেই শাসক পদে বসাত, কিছুদিন পরই তাকে বরখাস্ত ও হত্যা করত। অবশেষে ৬৯৪ হিজরি সনে তাতার রাষ্ট্র ইলখানাতের শাসনভার গ্রহণ করেন হালাকু খানের প্রপৌত্র গাজান বিন আরগুন বিন আবাগা খান বিন হালাকু খান। গাজান সেনাপতি তুযুন-এর হাতে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেন। গাজান ইসলাম গ্রহণ করার পর তার অনুসরণে তাতার জনগোষ্ঠীর প্রায় এক লক্ষ লোক ইসলাম গ্রহণ করে। গাজানের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার দিনটি ছিল এক ঐতিহাসিক দিন। তিনি সেদিন জনসাধারণের মাঝে স্বর্ণ-রুপা ছিটিয়ে দেন এবং নিজের নাম রাখেন 'মাহমুদ'। এরপর তিনি জুমার নামাজে উপস্থিত হন। মাহমুদ গাজান বহু গির্জা ধ্বংস করেন এবং খ্রিষ্টানদের ওপর জিজিয়া আরোপ করেন। তিনি বাগদাদ ও অন্যান্য অঞ্চলে বিভিন্ন অবিচারমূলক প্রথা বাতিল করেন। তার শাসনামলেই তাতারদের মাঝে ইসলামি শিক্ষার প্রসার শুরু হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00