📄 ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সুলতান বাইবার্স
মামলুক রাষ্ট্রকে একইসঙ্গে তিন-তিনটি প্রবল শক্তিধর প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করতে হয়েছিল। একদিকে ছিল ধেয়ে আসা তাতারিদের হুমকি, আরেকদিকে ছিল ক্রুসেডারদের অব্যাহত রাজ্যবিস্তৃতির প্রচেষ্টা। আর তৃতীয় শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল শিয়া বাতিনি গোষ্ঠী।
তাতারদের দমন করার পাশাপাশি সুলতান আয-যাহির রুকনুদ্দিন বাইবার্স সমকালীন খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের অন্তরেও প্রবল ভীতি সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এ কারণে খ্রিষ্টান শাসকদের অনেকে তার সঙ্গে সন্ধি করেছিল।
তাতারদের সঙ্গে সম্মুখ সমরে লড়াই করে তাদেরকে প্রতিরোধ করার সুযোগ থাকলেও খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। কারণ, খ্রিষ্টানরা শামের যেসব এলাকা দখল করে নিয়েছিল, সব জায়গায়ই তারা নগরীর চারপাশে দুর্ভেদ্য দুর্গ ও নগরপ্রাচীর নির্মাণ করেছিল এবং দুর্গ প্রতিরক্ষার জন্য নাইট টেম্পলার ও নাইট হসপিটালার সংগঠনের কর্মীদের নিয়োজিত রেখেছিল। তাই ক্রুসেডারদের দমন করতে সম্মুখ সমরে লড়াইয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল কঠোর অবরোধ আরোপের মাধ্যমে তাদেরকে দুর্বল করে তোলা। শাম অঞ্চলে তখনও তিনটি ক্রুসেড রাজ্য টিকে ছিল—বাইতুল মুকাদ্দাস, ত্রিপোলি ও এন্টিয়ক।
সুলতান বাইবার্স ৬৬১ হিজরি সনে (১২৬৩ খ্রিষ্টাব্দে) শামের ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ লড়াই শুরু করেন। প্রথমেই তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যভুক্ত নাজারেথ (Nazareth) অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করেন এবং নগরীটি জয় করে নেন। এরপর তিনি রাজ্যটির রাজধানী আক্কা অভিমুখে অগ্রসর হন। আক্কার উপকণ্ঠে সংঘটিত প্রচণ্ড এক যুদ্ধে বাইবার্স বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ৩য় কনরাড (Conrad III)-কে পরাজিত করেন। পরাজিত কনরাড পালিয়ে আক্কার দুর্গে আশ্রয় নেন। সুলতান বাইবার্স কিছু সৈন্যকে আক্কা অবরোধে নিয়োজিত রেখে নিজে আরসুফ অভিমুখে রওনা হন। টানা চল্লিশ দিন অবরোধ করে রাখার পর আরসুফের ক্রুসেডার সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করে।
পরের বছর সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের আরেক দুর্ভেদ্য দুর্গ আতলিত (Athlith) অবরোধ করেন এবং যুদ্ধের মাধ্যমে জয় করে নেন। আতলিত বিজয়ের পর তিনি হাইফা অবরোধ করেন। সুলতানের নির্দেশে মুসলিম সৈন্যরা নগরপ্রাচীর লক্ষ্য করে বিরামহীন পাথর ও গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। একপর্যায়ে নগরপ্রাচীর ভেঙে পড়লে মুসলিম বাহিনী হাইফায় প্রবেশ করে নগরীটি দখল করে নেয়।
৬৬৩ হিজরি সনে (১২৬৫ খ্রিষ্টাব্দে) বাইবার্সের নেতৃত্বে মামলুক বাহিনী কায়সারিয়া অবরোধ করে। নাইট হসপিটালারদের সঙ্গে নিয়ে ক্রুসেডার বাহিনী চল্লিশ দিন পর্যন্ত অবিচল থাকলেও একপর্যায়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। কায়সারিয়া জয়ের পর বাইবার্স তার অন্যতম সেনাপতি কালাউন ও আল-মানসুর আলিকে পাঠান আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত কিলিকিয়া অঞ্চল জয়ের জন্য আর নিজে রওনা হন সাফাদ (Safad) নগরী জয়ের লক্ষ্যে।
কালাউন ও আল-মানসুর আলির নেতৃত্বে মামলুক বাহিনীর একটি অংশ ৬৬৪ হিজরি সনের (১২৬৬ খ্রিষ্টাব্দের) মধ্যে আদানা ও তারসুস-সহ পুরো কিলিকিয়া রাজ্য জয় করে। এদিকে সুলতান বাইবার্স নিজে বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যভুক্ত সাফাদ নগরী অবরোধ করেন। দুই হাজার নাইট টেম্পলারের উপস্থিতি সত্ত্বেও ভীত ক্রুসেডাররা আত্মসমর্পণ করে সাফাদ নগরী বাইবার্সের হাতে তুলে দেয়। এরপর বাইবার্স একে একে আসকালান ও জাফা জয় করেন। এর ফলে শামের পুরো উপকূলীয় অঞ্চল মুসলমানদের অধিকারে চলে আসে আর ক্রুসেড রাজ্য বাইতুল মুকাদ্দাস সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে কেবল আক্কা নগরীতে।
বাইতুল মুকাদ্দাস ক্রুসেড রাজ্যের দফারফা করে সুলতান বাইবার্স ৬৬৬ হিজরি সনে (১২৬৮ খ্রিষ্টাব্দে) এন্টিয়ক অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করেন। দীর্ঘ অবরোধের পর ৬৬৬ হিজরি সনের ৪ রমজান (১২৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ মে) এন্টিয়কের সাধারণ জনগণ আত্মসমর্পণ করলে এন্টিয়কের পতন ঘটে। নগরীর নিরাপত্তায় নিয়োজিত দশ হাজার ক্রুসেডার সৈন্য আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানিয়ে দুর্গে আশ্রয় নিলে মামলুক বাহিনী আক্রমণ চালিয়ে ২০ মে তাদেরকেও পরাভূত করে।
টিকাঃ
১০১. প্রথম ক্রুসেড অভিযানের মাধ্যমে আল-কুদস নগরী খ্রিষ্টানদের দখলে চলে যাওয়ার পর নগরীটি অভিমুখে খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের আগমন বেড়ে গেলে পথে তাদের নিরাপত্তা প্রদানের লক্ষ্যে হুগো ডি পায়েন্স (Hugue de payens) নামক জনৈক ফরাসি যোদ্ধা নাইট টেম্পলার (Knights Templar) নামক সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। মসজিদুল আকসার যে অংশটিকে ইহুদিরা সুলায়মানি মন্দির (Solomon's Temple)-এর স্থান বলে দাবি করে থাকে, হুগো সে জায়গাটিকে তার সামরিক সংগঠনটির মূল কার্যালয় নির্বাচিত করেন। এ কারণেই সংস্থাটির সদস্যগণ দাউদের উপাসনালয়ের প্রতি সম্বন্ধিত হয়ে Knights Templar বা উপাসনালয়ের যোদ্ধা নামে পরিচিতি লাভ করে। মাত্র নয়জন সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা নাইট টেম্পলার প্রথমদিকে সাধারণ মানুষের দান-দক্ষিণার ওপর নির্ভর করে চলত। এরপর ১১২৯ খ্রিষ্টাব্দে তারা কাউন্সিল অব ট্রয়সের অনুমোদন লাভ করে। ১১৩৯ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন পোপ ২য় ইনোসেন্ট সংগঠনটিকে একটি আজ্ঞাপত্র প্রদান করেন এবং একমাত্র পোপের আইন ব্যতীত অন্য সকল আইনকানুন হতে সংগঠনটিকে মুক্ত ঘোষণা করেন। এরপর থেকেই সংগঠনটির ভাগ্য বদলে যায় এবং তারা খ্রিষ্টান সমাজ হতে প্রচুর সাহায্য-সহযোগিতা লাভ করতে থাকে। সর্বোৎকৃষ্ট অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ও সর্বোচ্চ মানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নাইট টেম্পলারের সদস্যরা অধিকাংশ ক্রুসেড যুদ্ধে অগ্রবর্তী বাহিনী হিসেবে লড়াই করত। খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীরা নাইট টেম্পলারের সদস্যদের কাছে নিজেদের সম্পদ গচ্ছিত রেখে একটি ঋণপত্র গ্রহণ করত এবং বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছে ঋণপত্রটি ফেরত দিয়ে নিজেদের সম্পদ বুঝে নিত। ঐতিহাসিকদের মতে এটিই ছিল বিশ্বে প্রথম হুন্ডি বা চেকের ব্যবহার। এভাবে দান ও চুক্তি লেনদেনের মাধ্যমে ধর্মীয়-সামরিক সংগঠন নাইট টেম্পলার বিশাল বহুজাতিক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানেও পরিণত হয়। সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি কর্তৃক আল-কুদস নগরী পুনরুদ্ধারের পর শামে খ্রিষ্টানরা যেমন ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তেমনই নাইট টেম্পলাররাও বারবার তাদের মূলকেন্দ্র পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় এবং সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে খ্রিষ্টান বিশ্বে তাদের জনপ্রিয়তায় ধস নামে।
অপরদিকে নাইট হসপিটালার (Knights Hospitaller) সংগঠনটি মূলত ক্রুসেড অভিযান শুরু হওয়ার বেশ কয়েক বছর পূর্বে ১০৭০ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আল-কুদস নগরীতে আগত দরিদ্র তীর্থযাত্রীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদানের লক্ষ্যে ইউরোপীয় কিছু খ্রিষ্টান বণিকের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি দাতব্যসংস্থা হিসেবে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সংগঠনটির কার্যালয় ছিল বাইতুল মুকাদ্দাসের আল-কিয়ামা গির্জা (The Church of the Holy Sepulchre)-এর পাশে। সংস্থার সদস্য ও কর্মীদের Hospitallers (চিকিৎসাসেবাকর্মী) বলে অভিহিত করা হতো। নাইট হসপিটালার সংস্থার সদস্যরা সরাসরি রোমের পোপের নির্দেশনা মেনে চলত বলে কর্মক্ষেত্রে ব্যাপক স্বাধীনতা ভোগ করত। ক্রুসেডারদের আল-কুদস দখলকালে তারা বিভিন্ন তথ্য দিয়ে তাদেরকে সহায়তা করেছিল। ক্রুসেডাররাও তাদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে প্রচুর উপঢৌকন দিয়ে তাদেরকে খুশি রাখত। আল-কুদসসহ ফিলিস্তিনের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি পুরো ইউরোপজুড়ে সংস্থাটির প্রচুর দাতা ছিল। ফলে দিনে দিনে সংস্থাটি অঢেল বিত্ত-বৈভব ও ভূসম্পত্তির মালিক হয়ে যায়।
ক্রুসেড রাজ্য বাইতুল মুকাদ্দাসের তৃতীয় শাসক ২য় বল্ডউইন (শাসনকাল : ১১১৮-১১৩১ খ্রিষ্টাব্দ) তার শাসনামলের শুরুতে হসপিটালার সংস্থাটিকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার উদ্যোগ নেন। এর ফলে সংস্থাটির প্রভাব-প্রতিপত্তি অনেক বেড়ে যায় এবং সংস্থার সদস্যরা প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত সামরিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও ভূমিকা রাখতে শুরু করে।
খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীর শুরুর অংশে বিভিন্ন যুদ্ধে ক্রুসেডাররা নাইট টেম্পলার ও নাইট হসপিটালারের সদস্যদের ওপর যথেষ্ট নির্ভর করত। সংগঠনদুটি কোনো খ্রিষ্টান শাসকের আনুগত্যের পরিবর্তে সরাসরি পোপের আনুগত্য করত এবং কেবল পোপের অনুমোদন থাকলে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করত। সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবির আল-কুদস পুনরুদ্ধারের পর অন্যান্য খ্রিষ্টান সংগঠনের ন্যায় নাইট হসপিটালারের জনপ্রিয়তায়ও ভাটা শুরু হয়। চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুর দিকে তৎকালীন পোপের প্ররোচনায় ফরাসি রাজা উভয় সংগঠনের বেশকিছু নেতাকে হত্যা করেন। ফলে ধীরে ধীরে সংগঠনদুটি বিলুপ্ত হয়ে যায়।
📄 অষ্টম ক্রুসেড
এন্টিয়কের পতন যেন ছিল ইসলামি প্রাচ্যে ক্রুসেডারদের চূড়ান্ত পতনধ্বনি। দুই ক্রুসেড রাজ্য এডেসা ও এন্টিয়ক ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অবশিষ্ট দুই রাজ্য বাইতুল মুকাদ্দাস ও ত্রিপোলিও টিকে আছে কোনোরকমে। স্বভাবতই এতে ইউরোপ প্রবলভাবে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। তৎকালীন পোপ ৪র্থ ক্লেমন্ত (Pope Clement IV) তাই নতুন করে ক্রুসেড যুদ্ধের ডাক দেন।
পোপের আহ্বানে ইউরোপজুড়ে প্রস্তুতি শুরু হয়। এবারের অভিযানে অংশ নিতে সম্মতি জানান-
* ইংল্যান্ডের যুবরাজ অ্যাডওয়ার্ড।
* সাইপ্রাসের রাজা ৩য় হিউ (Hugh III of Cyprus)।
* ফ্রান্সের রাজা ৯ম লুই (সপ্তম ক্রুসেডের সর্বাধিনায়ক)।
অষ্টম ক্রুসেডে খ্রিষ্টান ক্রুসেডাররা সঙ্গী হিসেবে পায় তাতার রাজ্য ইলখানাতের শাসক ও হালাকু খানের পুত্র আবাগা খানকে। সিদ্ধান্ত হয়, ফরাসি রাজা ৯ম লুই মামলুক রাষ্ট্রের পশ্চিমে অবস্থিত তিউনিসিয়ায় ঘাঁটি স্থাপন করে পর্যায়ক্রমে (লিবিয়ার) ত্রিপোলি ও কায়রো দখল করে আল-কুদস অভিমুখে অগ্রসর হবেন; অ্যাডওয়ার্ড ও হিউ নৌপথে আক্কায় পৌঁছে আল-কুদসে হামলা চালাবেন আর আবাগা খান মামলুক রাষ্ট্রের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে একে একে আলেপ্পো ও দামেশক দখল করে নেবেন, তারপর ফ্রান্স-ইংল্যান্ড-সাইপ্রাস বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়ে আল-কুদস দখলে অংশ নেবেন।
রুকনুদ্দিন বাইবার্স এ সম্বন্ধে বিস্তারিত কিছু জানতেন না। তিনি এন্টিয়ক রাজ্যের পতন ঘটানোর পর রাজধানী কায়রোতে ফিরে যান। কিছুদিন পর তিনি আবারও শাম অঞ্চলে গমন করেন। এবার তিনি আক্রমণ করেন শামের নাসিরিয়া পার্বত্যাঞ্চলে অবস্থিত শিয়া বাতিনি রাজ্য মাসইয়াফে। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, ৬৫৪ হিজরি সনে (১২৫৬ খ্রিষ্টাব্দে) পারস্যের বাতিনি রাজ্যের পতন ঘটলেও শামের বাতিনি রাজ্যটি টিকে ছিল। পূর্বে নাসিরিয়া পর্বতমালা হতে পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত এবং উত্তরে এন্টিয়ক রাজ্যসীমা হতে দক্ষিণে ত্রিপোলি রাজ্যসীমা পর্যন্ত ছিল শামের বাতিনি রাজ্যসীমা। রাজ্যজুড়ে ছিল দুর্ভেদ্য উনিশটি দুর্গ। বাইবার্স তার বাহিনীকে অনেকগুলো ভাগে বিভক্ত করে প্রতিটি দুর্গকে তিনদিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলেন। খোলা থাকে কেবল পশ্চিমে সাগরের দিক। সুকঠিন অবরোধ ও অনবরত গোলা নিক্ষেপের মাধ্যমে সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স এক বছরের মধ্যে একে একে সবগুলো দুর্গের পতন ঘটাতে সক্ষম হন। এর ফলে পৃথিবী শিয়া বাতিনি গোষ্ঠীর বর্বরতা থেকে চিরতরে নিষ্কৃতি লাভ করে।
রাজা ৯ম লুই ফরাসি বাহিনীর সঙ্গে ইতালির নেপলস ও আন্দালুসের খ্রিষ্টরাজ্য নাফারের সহায়ক বাহিনী নিয়ে ৬৬৮ হিজরি সনের জিলকদ মাসে (১২৭০ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে) তিউনিসিয়ার উপকূলীয় নগরী কার্থেজে (Carthage) পৌঁছান। তিউনিসিয়ার তৎকালীন শাসকপরিবার বনু হাফস মুসলমান হলেও ইউরোপীয় খ্রিষ্টানদের সঙ্গে মিত্রতা বজায় রেখে চলত। কিন্তু তিউনিসিয়ায় পৌঁছেই ক্রুসেডার বাহিনী মহামারির শিকার হয় এবং অনেক সৈন্য আমাশয়ে আক্রান্ত হয়ে ইহধাম ত্যাগ করে। খোদ রাজা লুই-ও ২৫ আগস্ট মারা যান। তখন বাকিরা সামনে অগ্রসর না হয়ে সেখান থেকেই নিজ নিজ দেশে ফিরে যায়। এ সংবাদ জানতে পেরে অ্যাডওয়ার্ড ও হিউয়ের নেতৃত্বাধীন ইংল্যান্ড ও সাইপ্রাসের বাহিনী এবং আবাগা খানের নেতৃত্বাধীন তাতার বাহিনীও অভিযানের চিন্তা বাদ দেয়। ফলে অষ্টম ক্রুসেডও পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
শাম অঞ্চলে বাতিনি রাজ্যের অবরোধে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় বাইবার্স ক্রুসেডারদের সংগঠিত হওয়ার সংবাদ জানতে পেরে দ্রুত কায়রোতে ফিরে এসেছিলেন। ক্রুসেডারদের প্রস্থানের পর তিনি পুনরায় শাম অঞ্চলে ফিরে যান। ১২৭১ খ্রিষ্টাব্দের শুরুতে তিনি জয় করেন ত্রিপোলি রাজ্যের অধীনস্থ বুর্জ সাফিতা (Chastel Blanc)। এরপর তিনি অবরোধ করেন ত্রিপোলি নগরী।
টিকাঃ
১০২. ইলখানাত: ইলখানাত অর্থ ছোট সাম্রাজ্য। বাগদাদসহ পারস্যের বিভিন্ন অঞ্চল জয় করার পর তাতাররা সেখানে স্বতন্ত্র একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল, যার নামকরণ করা হয় 'ইলখানাত'। মূল তাতার সাম্রাজ্যের চেয়ে আয়তনে ছোট হওয়ায় এবং মূল সাম্রাজ্যের অধীনস্থ হওয়ায় সুবিশাল সাম্রাজ্যটির এই নামকরণ করা হয়! ইলখানাতসহ অন্যান্য তাতার রাজ্যের বিস্তারিত ইতিহাস সামনে চতুর্থ খণ্ডে আলোচনা করা হবে।
📄 নবম ক্রুসেড
ত্রিপোলি অবরোধের সংবাদ জানতে পেরে ইউরোপের টনক নড়ে ওঠে। আল-কুদস, এডেসা, এন্টিয়ক সবই হাতছাড়া হয়ে গেছে। এখন যদি ত্রিপোলি ও আক্কারও পতন ঘটে, তাহলে ইসলামি প্রাচ্য থেকে ক্রুসেডারদের নামনিশানাই মুছে যাবে। তাতারদের সহায়তায় এবার ঘোষিত হয় নবম ক্রুসেড।
অষ্টম ক্রুসেডের মতো এবারও অভিযানে যোগ দেয় ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, সাইপ্রাস ও তাতার রাজ্য ইলখানাত। আবাগা খান অবশ্য এবার নিজে না এসে তার আস্থাভাজন সেনাপতি সামাগার (Samagar)-কে প্রেরণ করেন। পরিকল্পনা করা হয়, ইউরোপীয় ক্রুসেডাররা মামলুক সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্সকে যুদ্ধে ব্যস্ত রাখবে, এ ফাঁকে তাতার বাহিনী শামের বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে নেবে।
৬৭০ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে (১২৭১ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে) সামাগারের নেতৃত্বে ত্রিশ হাজার সৈন্যের বিশাল এক বাহিনী উত্তর দিক থেকে মামলুক রাষ্ট্রে পা রাখে। প্রথমেই তারা আলেপ্পোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, এরপর একে একে হামলা চালায় মাআররাতুন-নোমান ও আফামিয়া নগরীতে। সংবাদ পেয়ে সুলতান বাইবার্স অল্পকিছু সৈন্যকে ত্রিপোলিতে রেখে বাকিদের নিয়ে দ্রুত আফামিয়া অভিমুখে অগ্রসর হন। বাইবার্সের রওনা হওয়ার সংবাদ পেয়েই তাতার বাহিনী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাতে শুরু করে। বাইবার্স দ্রুত গতিতে তাদের ধাওয়া করে মামলুক রাজ্যের শেষ সীমা খাবুর নদী পর্যন্ত পৌঁছে যান। কিন্তু তার আগেই তাতাররা পালিয়ে ইলখানাত রাজ্যে চলে যায়!
সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স যখন তাতারদের তাড়া করে শামের উত্তর প্রান্তে পৌঁছে গেছেন, ওদিক থেকে ইউরোপীয় ক্রুসেডাররা তখন ফিলিস্তিন অঞ্চলে হামলা চালায়। মামলুক বাহিনী অন্যদিকে ব্যস্ত থাকায় ইংল্যান্ডের যুবরাজ অ্যাডওয়ার্ডের নেতৃত্বে ক্রুসেডার বাহিনী অনেকটা বিনা যুদ্ধে একে একে মন্টফোর্ট দুর্গ (Montfort Castle), নাজারেথ নগরী ও কাকুন দুর্গ দখল করে নেয়।
সংবাদ পেয়ে কালবিলম্ব না করে সুলতান বাইবার্স শামের দক্ষিণ প্রান্তে ছুটে আসেন। বত্রিশ হাজার সৈন্যবিশিষ্ট ক্রুসেডার বাহিনীর মোকাবিলা করতে তিনি মাত্র বিশ হাজার সৈন্য নিয়েই আক্কায় পৌঁছান। বাইবার্সের আগমনে অ্যাডওয়ার্ডের যুদ্ধস্পৃহা মুহূর্তেই উবে যায়। তিনি বাইবার্সের কাছে দূত প্রেরণ করে সন্ধিচুক্তির আবেদন জানান! ৬৭০ হিজরি সনের শাওয়াল মাসে (১২৭২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। 'কায়সারিয়ার চুক্তি' নামে খ্যাত দশ বছর দশ মাস দশ দিন মেয়াদি চুক্তিটির ধারাগুলো হলো-
* মন্টফোর্ট, নাজারেথ ও কাকুন দুর্গের অধিকার মুসলমানরা ফেরত পাবে।
* এসব এলাকার যেসব মুসলিম নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে, তাদের পরিবারকে নিহত প্রত্যেক ব্যক্তির বিপরীতে প্রতি বছর তিনশ ষাট দিরহাম প্রদান করতে হবে। এই ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে দুই ক্রুসেড রাজ্য বাইতুল মুকাদ্দাস ও ত্রিপোলি।
* খ্রিষ্টানরা তীর্থযাত্রার জন্য আল-কুদসে আগমন করলে নির্দিষ্ট দর্শনার্থী মাশুল প্রদান করতে হবে।
* তীর্থযাত্রীরা ইসলামি ভূখণ্ডে ধর্মপ্রচার করতে পারবে না, ভূমি ক্রয় করতে পারবে না, ইসলামি ভূখণ্ডের কোনো খ্রিষ্টান নাগরিকের সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে না এবং তীর্থযাত্রার আগে-পরে মিলিয়ে অতিরিক্ত দুই দিনের বেশি অবস্থান করতে পারবে না।
উত্তরের এই অব্যাহত অভিযানব্যস্ততা সুলতান বাইবার্সকে মিশরের দক্ষিণাঞ্চলের বিষয়ে উদাসীন করতে পারেনি। ৬৭৪ হিজরি সনে তিনি নুবিয়া অঞ্চলে বাহিনী প্রেরণ করেন এবং সেখানকার অধিবাসীদের বশীভূত করে পুনরায় জিজিয়া প্রদানে বাধ্য করতে সক্ষম হন। ইতিপূর্বে তারা জিজিয়া প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
৬৭৬ হিজরি সনের ২৭ মুহাররম (১২৭৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ জুন) সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স ইন্তেকাল করেন। এরপর মিশরের ক্ষমতা নিয়ে সংঘাত শুরু হয় এবং বাইবার্সের দুই পুত্র আস-সাইদ নাসিরুদ্দিন বারাকা ও আল-আদিল বদরুদ্দিন সুলামিশ একের পর এক শাসনভার গ্রহণ করেন। কিন্তু তাদের একজনেরও শাসনামল দীর্ঘায়ত হয়নি। অবশেষে মিশরের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন আল-মালিকুল মানসুর সাইফুদ্দিন কালাউন আস-সালিহি। তিনি ৬৭৮ হিজরি সন হতে ৬৮৯ হিজরি সন (১২৭৯-১২৯০ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী একশ বছরেরও অধিক সময় মিশরের ক্ষমতার লাগাম কালাউন-পরিবারের হাতেই ছিল।
ক্ষমতা সুসংহত হওয়ার পর সুলতান কালাউন ক্রুসেডারদের সঙ্গে দশ বছর মেয়াদি শান্তিচুক্তি করেন। চুক্তির অন্যতম ধারা ছিল—এ সময় তিনি মিশরের পণ্যবাহী জাহাজকে শামের খ্রিষ্টান নিয়ন্ত্রিত বন্দরগুলোতে প্রবেশের অনুমতি দেবেন না এবং খ্রিষ্টানরা তাদের নগরীগুলোতে নতুন করে কোনো প্রতিরক্ষামূলক স্থাপনা নির্মাণ করতে পারবে না। চুক্তির এ ধারাগুলো দ্বারাই অনুমান করা যায় যে, সমকালীন ক্রুসেড শক্তি কতটা দুর্বল ও হীনবল হয়ে পড়েছিল।
ক্রুসেডারদের সঙ্গে সুলতান কালাউনের সমঝোতাচুক্তি মূলত তার প্রজ্ঞাপূর্ণ বিবেচনাবোধেরই নিদর্শন ছিল। কারণ, তাতাররা তখন নতুন করে মিশরে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
📄 দ্রষ্টব্য : অমুসলিমদের ধর্মত্যাগে বাধ্য করা ইসলামে বৈধ নয়
হিমসের যুদ্ধের কিছুদিন পূর্বে সুলতান মানসুর কালাউন দামেশকে এই রাজকীয় বার্তা প্রেরণ করেন যে, ইতিপূর্বে যাদের নাম জিম্মি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে, তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করা হলো। যারা ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাবে, তাদেরকে শূলে চড়ানো হবে।
সুলতানের নির্দেশ জারি হওয়ার পর কেউ ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে তাকে গলায় রশি ঝুলিয়ে শূলে চড়াতে নিয়ে যাওয়া হতো। ফলে তারা বাধ্য হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। তারা বলত—শাসক ইসলাম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়ায় আমরা ঈমান এনেছি।
এরইমধ্যে হিমসের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এরপর সে বছরেরই (৬৮০ হিজরি সনের) শাওয়াল মাসে জোরপূর্বক ইসলামগ্রহণকারী জিম্মিদের বিষয়ে একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে বেশ কয়েকজন মুফতি লিখে জানান যে, জিম্মিদেরকে জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা হয়েছে; সুতরাং তাদের নিজ ধর্মে প্রত্যাবর্তনের অধিকার আছে। কাজি জামালুদ্দিন বিন আবু ইয়াকুব মালিকির কাছেও জিম্মিদের জোরপূর্বক ইসলামগ্রহণের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। তখন তাদেরকে নিজ ধর্মে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ প্রদান করা হয়।
এরপর তাদের অধিকাংশই নিজ ধর্মে ফিরে যায় এবং পূর্বের ন্যায় তাদের ওপর জিজিয়া আরোপ করা হয়।