📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 হালাকু খানের চাচাতো ভাই বারকে খানের ইসলাম গ্রহণ

📄 হালাকু খানের চাচাতো ভাই বারকে খানের ইসলাম গ্রহণ


আইনে জালুতের যুদ্ধে পরাজয়ের পর তাতারদের মাঝে অন্তর্বিরোধ শুরু হয়। হালাকু খানের সেনাপতিরা বিভিন্ন যুদ্ধে অর্জিত সম্পদ ও ভূখণ্ডে নিজেদের অংশ দাবি করে। ৬৬০ হিজরি সনে হালাকু খান ও তার চাচাতো ভাই বার্কে খানের মধ্যে বিরোধ শুরু হলে এই সংঘাত চরমে পৌঁছায়। বার্কে খান মুসলমানদের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করে সুলতান আয-যাহির বাইবার্সকে নিম্নোক্ত বার্তা প্রেরণ করেন—
আপনি ইসলামের প্রতি আমার ভালোবাসার কথা জানেন আর হালাকু খান মুসলমানদের প্রতি কী অন্যায় আচরণ করেছে— তা-ও জানেন। তাই আপনি এক প্রান্ত হতে অগ্রসর হোন আর আমি আরেক প্রান্ত হতে; দুজন মিলে তাকে পরাজিত কিংবা রাজ্যছাড়া করব। তার হাত থেকে আমরা যে ভূখণ্ড জয় করতে পারব, তার দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব আপনার।
বার্কে খানের প্রস্তাব সুলতান বাইবার্সকে মুগ্ধ করে। তাতারদের মোকাবিলায় আল্লাহ তাআলা তার জন্য এক অপ্রত্যাশিত পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন এবং তাতারদের পারস্পরিক বিরোধে জড়িয়ে দিয়েছেন।
কিছুদিন পরই হালাকু খান ও বার্কে খানের মধ্যে এক তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে হালাকু খান পরাজিত হন এবং কোনোমতে অবশিষ্ট সীমিত সংখ্যক সৈন্য নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করেন।
এরপর বার্কে খান কনস্টান্টিনোপলে অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় কোণঠাসা কনস্টান্টিনোপলের শাসক বার্কে খানের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করে। সংবাদ পেয়ে সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স বার্কে খানের কাছে বহুমূল্য প্রচুর উপহারসামগ্রী প্রেরণ করেন।
এরপর তাতারদের একটি প্রতিনিধিদল বাইবার্সের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিরাপত্তাপ্রার্থনা করে। তিনি তাদের নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং তাদের উষ্ণ আপ্যায়নের পাশাপাশি বিশাল জায়গির প্রদান করেন।
৬৬৩ হিজরি সনে (১২৬৫ খ্রিষ্টাব্দে) মৃগিরোগে আক্রান্ত হয়ে হালাকু খানের মৃত্যু হয়। তাকে উর্মিয়া হ্রদের শাহি দ্বীপে (Shahi Island) সমাহিত করা হয়।
হালাকু খানের মৃত্যুর পর তার পুত্র আবাগা খান তাতারদের শাসনভার গ্রহণ করেন। আবাগা খান ছিলেন হালাকু খানের দশ পুত্রের একজন। বার্কে খান আবাগা খানের দায়িত্বভার গ্রহণের কথা জানতে পেরে তার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন এবং তাকে পরাজিত করে তার বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দেন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 বারকে খানের ইন্তেকাল

📄 বারকে খানের ইন্তেকাল


বার্কে খান (বিন জোচি খান বিন চেঙ্গিস খান) ইসলাম ও উলামায়ে কেরামের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। সুলতান আয-যাহির বাইবার্স তার সঙ্গে সদুপদেশ বিনিময় করতেন এবং তার প্রেরিত দূতদের যথেষ্ট সম্মান করতেন। ৬৬৫ হিজরি সনে (১২৬৬ খ্রিষ্টাব্দে) বার্কে খানের মৃত্যু হয়।
বার্কে খানের ইন্তেকালের পর মানকুতামুর বিন তোগান বিন বাতু বিন জোচি খান বিন চেঙ্গিস খান নামক জনৈক তাতার তার স্থলাভিষিক্ত হন। মানকুতামুর-ও মুসলিম ছিলেন। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় বার্কে খানের আদর্শ অনুসরণ করেন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 নতুন করে তাতারদের হুমকি

📄 নতুন করে তাতারদের হুমকি


এর কিছুদিন পর হালাকু-পুত্র আবাগা খান সুলতান বাইবার্সের কাছে নিম্নোক্ত বার্তা প্রেরণ করেন-
'তুমি হচ্ছ সিভাস অঞ্চলের একজন ক্রীতদাসমাত্র। তুমি কীভাবে পৃথিবীর অধিপতির বিরোধিতা করার দুঃসাহস দেখাও?! মনে রেখো, তুমি আসমানের ওপর আত্মগোপন করো কিংবা অতল ভূগর্ভে, আমার হাত থেকে কোনোমতেই নিষ্কৃতি পাবে না। সুতরাং নিজের ভালো চাইলে রাজাধিরাজ আবাগা খানের সঙ্গে সমঝোতা করে নাও।'
বাইবার্স তখন দামেশকে ছিলেন। তার কাছে এই বার্তা পৌঁছলে তিনি দূতদেরকে বলেন, 'তাকে জানিয়ে দিয়ো যে, আমিও আমার দাবি নিয়ে তার পেছনেই লেগে আছি। সে (ও তার পূর্বপুরুষগণ) খলিফার কাছ থেকে যেসব ভূখণ্ড দখল করেছে এবং অন্য যেসব এলাকায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে, সব তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া পর্যন্ত আমি শান্ত হব না।'
খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের সহায়তায় আবাগা খানের নেতৃত্বাধীন তাতাররা শামের মুসলমানদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলে। কিন্তু ৬৬৯ হিজরি সনে হালাকু খানের উত্তরসূরি আবাগা খান ও তার জ্ঞাতিভাই মানকুতামুরের মধ্যে লড়াই হলে আবাগা খান পরাজিত হয়। সুলতান বাইবার্সের কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হন। সুলতান তখন আসকালানে ছিলেন।
৬৭১ হিজরি সনে বাইবার্সের কাছে সংবাদ পৌঁছায় যে, একদল তাতার সৈন্য ফুরাত নদী পাড়ি দিয়ে পুনরায় শামে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। সংবাদ পেয়ে কালবিলম্ব না করে সুলতান তার বাহিনী নিয়ে রওনা হন এবং ফুরাত অতিক্রম করে তাতারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। এ যুদ্ধে তার সঙ্গে আমির সাইফুদ্দিন কালাউন ও বদরুদ্দিন বাইসারিও ছিলেন। যুদ্ধে প্রচুর সংখ্যক তাতার সৈন্য নিহত হয়।
৬৭৫ হিজরি সনে তাতারদের সঙ্গে মুসলমানদের আরেকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে বেশ কয়েকজন শ্রেষ্ঠতম মুসলিম সেনাপতি শহিদ হলেও বিজয় শেষপর্যন্ত মুসলমানদের পদচুম্বন করে।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সুলতান বাইবার্স

📄 ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সুলতান বাইবার্স


মামলুক রাষ্ট্রকে একইসঙ্গে তিন-তিনটি প্রবল শক্তিধর প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করতে হয়েছিল। একদিকে ছিল ধেয়ে আসা তাতারিদের হুমকি, আরেকদিকে ছিল ক্রুসেডারদের অব্যাহত রাজ্যবিস্তৃতির প্রচেষ্টা। আর তৃতীয় শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল শিয়া বাতিনি গোষ্ঠী।
তাতারদের দমন করার পাশাপাশি সুলতান আয-যাহির রুকনুদ্দিন বাইবার্স সমকালীন খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের অন্তরেও প্রবল ভীতি সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এ কারণে খ্রিষ্টান শাসকদের অনেকে তার সঙ্গে সন্ধি করেছিল।
তাতারদের সঙ্গে সম্মুখ সমরে লড়াই করে তাদেরকে প্রতিরোধ করার সুযোগ থাকলেও খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। কারণ, খ্রিষ্টানরা শামের যেসব এলাকা দখল করে নিয়েছিল, সব জায়গায়ই তারা নগরীর চারপাশে দুর্ভেদ্য দুর্গ ও নগরপ্রাচীর নির্মাণ করেছিল এবং দুর্গ প্রতিরক্ষার জন্য নাইট টেম্পলার ও নাইট হসপিটালার সংগঠনের কর্মীদের নিয়োজিত রেখেছিল। তাই ক্রুসেডারদের দমন করতে সম্মুখ সমরে লড়াইয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল কঠোর অবরোধ আরোপের মাধ্যমে তাদেরকে দুর্বল করে তোলা। শাম অঞ্চলে তখনও তিনটি ক্রুসেড রাজ্য টিকে ছিল—বাইতুল মুকাদ্দাস, ত্রিপোলি ও এন্টিয়ক।
সুলতান বাইবার্স ৬৬১ হিজরি সনে (১২৬৩ খ্রিষ্টাব্দে) শামের ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ লড়াই শুরু করেন। প্রথমেই তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যভুক্ত নাজারেথ (Nazareth) অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করেন এবং নগরীটি জয় করে নেন। এরপর তিনি রাজ্যটির রাজধানী আক্কা অভিমুখে অগ্রসর হন। আক্কার উপকণ্ঠে সংঘটিত প্রচণ্ড এক যুদ্ধে বাইবার্স বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ৩য় কনরাড (Conrad III)-কে পরাজিত করেন। পরাজিত কনরাড পালিয়ে আক্কার দুর্গে আশ্রয় নেন। সুলতান বাইবার্স কিছু সৈন্যকে আক্কা অবরোধে নিয়োজিত রেখে নিজে আরসুফ অভিমুখে রওনা হন। টানা চল্লিশ দিন অবরোধ করে রাখার পর আরসুফের ক্রুসেডার সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করে।
পরের বছর সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের আরেক দুর্ভেদ্য দুর্গ আতলিত (Athlith) অবরোধ করেন এবং যুদ্ধের মাধ্যমে জয় করে নেন। আতলিত বিজয়ের পর তিনি হাইফা অবরোধ করেন। সুলতানের নির্দেশে মুসলিম সৈন্যরা নগরপ্রাচীর লক্ষ্য করে বিরামহীন পাথর ও গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। একপর্যায়ে নগরপ্রাচীর ভেঙে পড়লে মুসলিম বাহিনী হাইফায় প্রবেশ করে নগরীটি দখল করে নেয়।
৬৬৩ হিজরি সনে (১২৬৫ খ্রিষ্টাব্দে) বাইবার্সের নেতৃত্বে মামলুক বাহিনী কায়সারিয়া অবরোধ করে। নাইট হসপিটালারদের সঙ্গে নিয়ে ক্রুসেডার বাহিনী চল্লিশ দিন পর্যন্ত অবিচল থাকলেও একপর্যায়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। কায়সারিয়া জয়ের পর বাইবার্স তার অন্যতম সেনাপতি কালাউন ও আল-মানসুর আলিকে পাঠান আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত কিলিকিয়া অঞ্চল জয়ের জন্য আর নিজে রওনা হন সাফাদ (Safad) নগরী জয়ের লক্ষ্যে।
কালাউন ও আল-মানসুর আলির নেতৃত্বে মামলুক বাহিনীর একটি অংশ ৬৬৪ হিজরি সনের (১২৬৬ খ্রিষ্টাব্দের) মধ্যে আদানা ও তারসুস-সহ পুরো কিলিকিয়া রাজ্য জয় করে। এদিকে সুলতান বাইবার্স নিজে বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যভুক্ত সাফাদ নগরী অবরোধ করেন। দুই হাজার নাইট টেম্পলারের উপস্থিতি সত্ত্বেও ভীত ক্রুসেডাররা আত্মসমর্পণ করে সাফাদ নগরী বাইবার্সের হাতে তুলে দেয়। এরপর বাইবার্স একে একে আসকালান ও জাফা জয় করেন। এর ফলে শামের পুরো উপকূলীয় অঞ্চল মুসলমানদের অধিকারে চলে আসে আর ক্রুসেড রাজ্য বাইতুল মুকাদ্দাস সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে কেবল আক্কা নগরীতে।
বাইতুল মুকাদ্দাস ক্রুসেড রাজ্যের দফারফা করে সুলতান বাইবার্স ৬৬৬ হিজরি সনে (১২৬৮ খ্রিষ্টাব্দে) এন্টিয়ক অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করেন। দীর্ঘ অবরোধের পর ৬৬৬ হিজরি সনের ৪ রমজান (১২৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ মে) এন্টিয়কের সাধারণ জনগণ আত্মসমর্পণ করলে এন্টিয়কের পতন ঘটে। নগরীর নিরাপত্তায় নিয়োজিত দশ হাজার ক্রুসেডার সৈন্য আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানিয়ে দুর্গে আশ্রয় নিলে মামলুক বাহিনী আক্রমণ চালিয়ে ২০ মে তাদেরকেও পরাভূত করে।

টিকাঃ
১০১. প্রথম ক্রুসেড অভিযানের মাধ্যমে আল-কুদস নগরী খ্রিষ্টানদের দখলে চলে যাওয়ার পর নগরীটি অভিমুখে খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের আগমন বেড়ে গেলে পথে তাদের নিরাপত্তা প্রদানের লক্ষ্যে হুগো ডি পায়েন্স (Hugue de payens) নামক জনৈক ফরাসি যোদ্ধা নাইট টেম্পলার (Knights Templar) নামক সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। মসজিদুল আকসার যে অংশটিকে ইহুদিরা সুলায়মানি মন্দির (Solomon's Temple)-এর স্থান বলে দাবি করে থাকে, হুগো সে জায়গাটিকে তার সামরিক সংগঠনটির মূল কার্যালয় নির্বাচিত করেন। এ কারণেই সংস্থাটির সদস্যগণ দাউদের উপাসনালয়ের প্রতি সম্বন্ধিত হয়ে Knights Templar বা উপাসনালয়ের যোদ্ধা নামে পরিচিতি লাভ করে। মাত্র নয়জন সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা নাইট টেম্পলার প্রথমদিকে সাধারণ মানুষের দান-দক্ষিণার ওপর নির্ভর করে চলত। এরপর ১১২৯ খ্রিষ্টাব্দে তারা কাউন্সিল অব ট্রয়সের অনুমোদন লাভ করে। ১১৩৯ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন পোপ ২য় ইনোসেন্ট সংগঠনটিকে একটি আজ্ঞাপত্র প্রদান করেন এবং একমাত্র পোপের আইন ব্যতীত অন্য সকল আইনকানুন হতে সংগঠনটিকে মুক্ত ঘোষণা করেন। এরপর থেকেই সংগঠনটির ভাগ্য বদলে যায় এবং তারা খ্রিষ্টান সমাজ হতে প্রচুর সাহায্য-সহযোগিতা লাভ করতে থাকে। সর্বোৎকৃষ্ট অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ও সর্বোচ্চ মানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নাইট টেম্পলারের সদস্যরা অধিকাংশ ক্রুসেড যুদ্ধে অগ্রবর্তী বাহিনী হিসেবে লড়াই করত। খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীরা নাইট টেম্পলারের সদস্যদের কাছে নিজেদের সম্পদ গচ্ছিত রেখে একটি ঋণপত্র গ্রহণ করত এবং বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছে ঋণপত্রটি ফেরত দিয়ে নিজেদের সম্পদ বুঝে নিত। ঐতিহাসিকদের মতে এটিই ছিল বিশ্বে প্রথম হুন্ডি বা চেকের ব্যবহার। এভাবে দান ও চুক্তি লেনদেনের মাধ্যমে ধর্মীয়-সামরিক সংগঠন নাইট টেম্পলার বিশাল বহুজাতিক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানেও পরিণত হয়। সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি কর্তৃক আল-কুদস নগরী পুনরুদ্ধারের পর শামে খ্রিষ্টানরা যেমন ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তেমনই নাইট টেম্পলাররাও বারবার তাদের মূলকেন্দ্র পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় এবং সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে খ্রিষ্টান বিশ্বে তাদের জনপ্রিয়তায় ধস নামে।
অপরদিকে নাইট হসপিটালার (Knights Hospitaller) সংগঠনটি মূলত ক্রুসেড অভিযান শুরু হওয়ার বেশ কয়েক বছর পূর্বে ১০৭০ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আল-কুদস নগরীতে আগত দরিদ্র তীর্থযাত্রীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদানের লক্ষ্যে ইউরোপীয় কিছু খ্রিষ্টান বণিকের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি দাতব্যসংস্থা হিসেবে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সংগঠনটির কার্যালয় ছিল বাইতুল মুকাদ্দাসের আল-কিয়ামা গির্জা (The Church of the Holy Sepulchre)-এর পাশে। সংস্থার সদস্য ও কর্মীদের Hospitallers (চিকিৎসাসেবাকর্মী) বলে অভিহিত করা হতো। নাইট হসপিটালার সংস্থার সদস্যরা সরাসরি রোমের পোপের নির্দেশনা মেনে চলত বলে কর্মক্ষেত্রে ব্যাপক স্বাধীনতা ভোগ করত। ক্রুসেডারদের আল-কুদস দখলকালে তারা বিভিন্ন তথ্য দিয়ে তাদেরকে সহায়তা করেছিল। ক্রুসেডাররাও তাদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে প্রচুর উপঢৌকন দিয়ে তাদেরকে খুশি রাখত। আল-কুদসসহ ফিলিস্তিনের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি পুরো ইউরোপজুড়ে সংস্থাটির প্রচুর দাতা ছিল। ফলে দিনে দিনে সংস্থাটি অঢেল বিত্ত-বৈভব ও ভূসম্পত্তির মালিক হয়ে যায়।
ক্রুসেড রাজ্য বাইতুল মুকাদ্দাসের তৃতীয় শাসক ২য় বল্ডউইন (শাসনকাল : ১১১৮-১১৩১ খ্রিষ্টাব্দ) তার শাসনামলের শুরুতে হসপিটালার সংস্থাটিকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার উদ্যোগ নেন। এর ফলে সংস্থাটির প্রভাব-প্রতিপত্তি অনেক বেড়ে যায় এবং সংস্থার সদস্যরা প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত সামরিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও ভূমিকা রাখতে শুরু করে।
খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীর শুরুর অংশে বিভিন্ন যুদ্ধে ক্রুসেডাররা নাইট টেম্পলার ও নাইট হসপিটালারের সদস্যদের ওপর যথেষ্ট নির্ভর করত। সংগঠনদুটি কোনো খ্রিষ্টান শাসকের আনুগত্যের পরিবর্তে সরাসরি পোপের আনুগত্য করত এবং কেবল পোপের অনুমোদন থাকলে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করত। সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবির আল-কুদস পুনরুদ্ধারের পর অন্যান্য খ্রিষ্টান সংগঠনের ন্যায় নাইট হসপিটালারের জনপ্রিয়তায়ও ভাটা শুরু হয়। চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুর দিকে তৎকালীন পোপের প্ররোচনায় ফরাসি রাজা উভয় সংগঠনের বেশকিছু নেতাকে হত্যা করেন। ফলে ধীরে ধীরে সংগঠনদুটি বিলুপ্ত হয়ে যায়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00