📄 আয-যাহির রুকনুদ্দিন বাইবার্স বুনদুকদারি
প্রতিষ্ঠাকালীন সংগ্রাম-পরবর্তী সময়ের প্রথম শাসক হিসেবে রুকনুদ্দিন বাইবার্সকেই বাহরি মামলুক রাষ্ট্রের প্রথম সুলতান বিবেচনা করা হয়।
দায়িত্ব গ্রহণের পরই তিনি সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থা সুবিন্যস্তকরণ, সেনাবাহিনীর সংস্কার ও নৌবহর নির্মাণে কাজ শুরু করেন। এরপর তিনি শামের নিরাপত্তাব্যবস্থা দৃঢ়করণে মনোযোগ দেন এবং দামেশক ও কায়রোর মাঝে ডাকবাহী কবুতরবিশিষ্ট দ্রুতগামী ডাকব্যবস্থার প্রচলন করেন। সুলতান বাইবার্স সালাহুদ্দিন আইয়ুবির ন্যায় ইসলামের সেবা করার এবং ক্রুসেডারদের দখলে থাকা শামের অবশিষ্ট অঞ্চল থেকেও তাদেরকে উচ্ছেদ করার আকাঙ্ক্ষা লালন করতেন। ইসলামের সেবার জন্য আরও মজবুত নেতৃত্ব অর্জনের লক্ষ্যে তিনি তাতারদের আগ্রাসনের পর বাগদাদ থেকে পালিয়ে বেড়ানো জনৈক আব্বাসি রাজপুত্রকে মিশরে নিয়ে আসেন এবং তার হাতে খিলাফতের বায়আত গ্রহণ করে খিলাফতব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করেন। এর মাধ্যমে শুরু হয় মিশরকেন্দ্রিক আব্বাসি খিলাফতব্যবস্থা। নতুন এই খলিফার নাম (২য় মুসতানসির বিল্লাহ) আবুল কাসিম আহমাদ।
কিছুদিন পর খলিফা ২য় মুসতানসির বিল্লাহ তাতারদের হাত থেকে বাগদাদ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়ে নিহত হন। এরপর আরেক আব্বাসি যুবরাজ হাকিম বি আমরিল্লাহ আবুল আব্বাস আহমাদের হাতে বায়আত গ্রহণ করা হয়। মিশরের পরবর্তী আব্বাসি খলিফাগণ ছিলেন এই হাকিম বি আমরিল্লাহরই বংশধর। এরপর দীর্ঘদিন আব্বাসি খিলাফত চলার পর কালের পরিক্রমায় উসমানিরা তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়।
📄 হালাকু খানের চাচাতো ভাই বারকে খানের ইসলাম গ্রহণ
আইনে জালুতের যুদ্ধে পরাজয়ের পর তাতারদের মাঝে অন্তর্বিরোধ শুরু হয়। হালাকু খানের সেনাপতিরা বিভিন্ন যুদ্ধে অর্জিত সম্পদ ও ভূখণ্ডে নিজেদের অংশ দাবি করে। ৬৬০ হিজরি সনে হালাকু খান ও তার চাচাতো ভাই বার্কে খানের মধ্যে বিরোধ শুরু হলে এই সংঘাত চরমে পৌঁছায়। বার্কে খান মুসলমানদের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করে সুলতান আয-যাহির বাইবার্সকে নিম্নোক্ত বার্তা প্রেরণ করেন—
আপনি ইসলামের প্রতি আমার ভালোবাসার কথা জানেন আর হালাকু খান মুসলমানদের প্রতি কী অন্যায় আচরণ করেছে— তা-ও জানেন। তাই আপনি এক প্রান্ত হতে অগ্রসর হোন আর আমি আরেক প্রান্ত হতে; দুজন মিলে তাকে পরাজিত কিংবা রাজ্যছাড়া করব। তার হাত থেকে আমরা যে ভূখণ্ড জয় করতে পারব, তার দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব আপনার।
বার্কে খানের প্রস্তাব সুলতান বাইবার্সকে মুগ্ধ করে। তাতারদের মোকাবিলায় আল্লাহ তাআলা তার জন্য এক অপ্রত্যাশিত পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন এবং তাতারদের পারস্পরিক বিরোধে জড়িয়ে দিয়েছেন।
কিছুদিন পরই হালাকু খান ও বার্কে খানের মধ্যে এক তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে হালাকু খান পরাজিত হন এবং কোনোমতে অবশিষ্ট সীমিত সংখ্যক সৈন্য নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করেন।
এরপর বার্কে খান কনস্টান্টিনোপলে অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় কোণঠাসা কনস্টান্টিনোপলের শাসক বার্কে খানের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করে। সংবাদ পেয়ে সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স বার্কে খানের কাছে বহুমূল্য প্রচুর উপহারসামগ্রী প্রেরণ করেন।
এরপর তাতারদের একটি প্রতিনিধিদল বাইবার্সের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিরাপত্তাপ্রার্থনা করে। তিনি তাদের নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং তাদের উষ্ণ আপ্যায়নের পাশাপাশি বিশাল জায়গির প্রদান করেন।
৬৬৩ হিজরি সনে (১২৬৫ খ্রিষ্টাব্দে) মৃগিরোগে আক্রান্ত হয়ে হালাকু খানের মৃত্যু হয়। তাকে উর্মিয়া হ্রদের শাহি দ্বীপে (Shahi Island) সমাহিত করা হয়।
হালাকু খানের মৃত্যুর পর তার পুত্র আবাগা খান তাতারদের শাসনভার গ্রহণ করেন। আবাগা খান ছিলেন হালাকু খানের দশ পুত্রের একজন। বার্কে খান আবাগা খানের দায়িত্বভার গ্রহণের কথা জানতে পেরে তার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন এবং তাকে পরাজিত করে তার বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দেন।
📄 বারকে খানের ইন্তেকাল
বার্কে খান (বিন জোচি খান বিন চেঙ্গিস খান) ইসলাম ও উলামায়ে কেরামের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। সুলতান আয-যাহির বাইবার্স তার সঙ্গে সদুপদেশ বিনিময় করতেন এবং তার প্রেরিত দূতদের যথেষ্ট সম্মান করতেন। ৬৬৫ হিজরি সনে (১২৬৬ খ্রিষ্টাব্দে) বার্কে খানের মৃত্যু হয়।
বার্কে খানের ইন্তেকালের পর মানকুতামুর বিন তোগান বিন বাতু বিন জোচি খান বিন চেঙ্গিস খান নামক জনৈক তাতার তার স্থলাভিষিক্ত হন। মানকুতামুর-ও মুসলিম ছিলেন। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় বার্কে খানের আদর্শ অনুসরণ করেন।
📄 নতুন করে তাতারদের হুমকি
এর কিছুদিন পর হালাকু-পুত্র আবাগা খান সুলতান বাইবার্সের কাছে নিম্নোক্ত বার্তা প্রেরণ করেন-
'তুমি হচ্ছ সিভাস অঞ্চলের একজন ক্রীতদাসমাত্র। তুমি কীভাবে পৃথিবীর অধিপতির বিরোধিতা করার দুঃসাহস দেখাও?! মনে রেখো, তুমি আসমানের ওপর আত্মগোপন করো কিংবা অতল ভূগর্ভে, আমার হাত থেকে কোনোমতেই নিষ্কৃতি পাবে না। সুতরাং নিজের ভালো চাইলে রাজাধিরাজ আবাগা খানের সঙ্গে সমঝোতা করে নাও।'
বাইবার্স তখন দামেশকে ছিলেন। তার কাছে এই বার্তা পৌঁছলে তিনি দূতদেরকে বলেন, 'তাকে জানিয়ে দিয়ো যে, আমিও আমার দাবি নিয়ে তার পেছনেই লেগে আছি। সে (ও তার পূর্বপুরুষগণ) খলিফার কাছ থেকে যেসব ভূখণ্ড দখল করেছে এবং অন্য যেসব এলাকায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে, সব তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া পর্যন্ত আমি শান্ত হব না।'
খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের সহায়তায় আবাগা খানের নেতৃত্বাধীন তাতাররা শামের মুসলমানদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলে। কিন্তু ৬৬৯ হিজরি সনে হালাকু খানের উত্তরসূরি আবাগা খান ও তার জ্ঞাতিভাই মানকুতামুরের মধ্যে লড়াই হলে আবাগা খান পরাজিত হয়। সুলতান বাইবার্সের কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হন। সুলতান তখন আসকালানে ছিলেন।
৬৭১ হিজরি সনে বাইবার্সের কাছে সংবাদ পৌঁছায় যে, একদল তাতার সৈন্য ফুরাত নদী পাড়ি দিয়ে পুনরায় শামে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। সংবাদ পেয়ে কালবিলম্ব না করে সুলতান তার বাহিনী নিয়ে রওনা হন এবং ফুরাত অতিক্রম করে তাতারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। এ যুদ্ধে তার সঙ্গে আমির সাইফুদ্দিন কালাউন ও বদরুদ্দিন বাইসারিও ছিলেন। যুদ্ধে প্রচুর সংখ্যক তাতার সৈন্য নিহত হয়।
৬৭৫ হিজরি সনে তাতারদের সঙ্গে মুসলমানদের আরেকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে বেশ কয়েকজন শ্রেষ্ঠতম মুসলিম সেনাপতি শহিদ হলেও বিজয় শেষপর্যন্ত মুসলমানদের পদচুম্বন করে।