📄 ইযযুদ্দিন বিন আব্দুস সালাম
বাগদাদ ও শামে তাতারদের আগ্রাসনের সংবাদ মিশরে পৌঁছলে করণীয় নির্ণয়ের জন্য মামলুক রাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় আলিম-উলামা ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ পরামর্শে বসে। পরামর্শে কাজি বদরুদ্দিন সানজাওয়ি ও শায়খুল ইসলাম ইযযুদ্দিন বিন আবদুস সালামও উপস্থিত ছিলেন। পরামর্শে উপস্থিত জনৈক ব্যক্তি যুদ্ধব্যয় নির্বাহের জন্য জনসাধারণের কাছ থেকে কিছু অর্থ গ্রহণের মত পেশ করলে শায়খ ইযযুদ্দিন দাঁড়িয়ে বলেন, 'যখন বাইতুল মালে কোনো সম্পদ থাকবে না, এরপর আপনারা নিজেদের সঞ্চিত স্বর্ণ-রুপা-অলংকার ইত্যাদিও খরচ করে ফেলবেন এবং যুদ্ধাস্ত্র বাদ দিয়ে বাকি আর্থিক বিবেচনায় জনসাধারণ ও আপনারা সমপর্যায়ে পরিণত হবেন আর সৈন্যদের কাছে আরোহণের ঘোড়া ছাড়া অন্য কিছু থাকবে না, কেবল তখন শাসকের জন্য শত্রুর মোকাবিলায় জনগণের সম্পদ গ্রহণ করা বৈধ হবে। কারণ, শত্রু যখন আক্রমণ করে বসে, তখন আপন আপন জানমাল দিয়ে তাদের প্রতিরোধ করা সকলের ওপর অপরিহার্য হয়ে যায়।'
📄 তাতার আগ্রাসন মোকাবিলায় মুসলমানদের অভিযান
মিশরের সুলতান সাইফুদ্দিন কুতুজ সার্বিক দিক বিবেচনা করে তাতাররা মিশরে আগমনের পূর্বে নিজেই অগ্রসর হয়ে তাদের ওপর আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার বাহিনী প্রস্তুত করে শাম অভিমুখে রওনা হন। সংবাদ পেয়ে কিতবুগার নেতৃত্বে বিশাল তাতার বাহিনী কুতুজের বাহিনীর দফারফা করতে অগ্রসর হয়।
৬৫৮ হিজরি সনের রমজান মাসে (১২৬০ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে) আইনে জালুতের প্রান্তরে উভয় পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে তাতার বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়, তাদের সেনাপতি কিতবুগা ও বহু সৈন্য নিহত হয়। সুলতান সাইফুদ্দিন কুতুজ সেনাপতি রুকনুদ্দিন বাইবার্স বুনদুকদারিকে পরাজিত তাতার বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবনের নির্দেশ দিলে তিনি আলেপ্পো পর্যন্ত তাদের পশ্চাদ্ধাবন করেন।
আইনে জালুতের যুদ্ধের এক বিস্ময়কর দৃশ্যপট
আইনে জালুতের যুদ্ধ চলাকালে সুলতান কুতুজের ঘোড়াটি প্রতিপক্ষের নিক্ষিপ্ত তিরের আঘাতে মারা যায়। তিনি তৎক্ষণাৎ অতিরিক্ত ঘোড়ার দায়িত্বশীল কাউকে না পেয়ে পদব্রজেই যুদ্ধ করতে থাকেন। তার চারপাশে তখন প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছিল। মুসলিম সুলতান হিসেবে তিনি যুদ্ধের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন।
জনৈক মুসলিম সেনাপতি সুলতানকে পদব্রজে লড়াইরত দেখতে পেয়ে নিজ ঘোড়া থেকে নেমে পড়েন এবং আল্লাহর শপথ দিয়ে সুলতানকে তার অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণের অনুরোধ করেন। কিন্তু সুলতান কুতুজ তাকে বাধা দিয়ে বলেন, 'আমি মুসলমানদেরকে তোমার কল্যাণ-অবদান থেকে বঞ্চিত করতে পারি না।' এরপর তিনি পদব্রজেই লড়াই করতে থাকেন। কিছুক্ষণ পর দায়িত্বশীলগণ অতিরিক্ত ঘোড়া নিয়ে এলে তিনি তাতে আরোহণ করেন।
পরবর্তী সময়ে জনৈক প্রশাসক তাকে বলেন, 'সুলতান, আপনি অমুকের ঘোড়ায় কেন আরোহণ করলেন না? শত্রুরা আপনাকে অশ্বহীন অবস্থায় লক্ষ করলে তো আপনাকে হত্যা করে ফেলত আর আপনার অবর্তমানে ইসলাম ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত।' তখন তিনি উত্তর দেন, 'আমাকে হত্যা করা হলে তো আমি জান্নাতে চলে যেতাম। আর ইসলামের কথা বলছ?! ইসলামের এক মহান রব আছেন; যিনি ইসলামকে কখনো নিশ্চিহ্ন হতে দেবেন না। ইসলামি ইতিহাসে কত-শত মহান ব্যক্তি নিহত হয়েছেন; অমুক, অমুক শাসক শহিদ হয়েছেন; কিন্তু তাদের অবর্তমানে আল্লাহ তাআলা এমন সব ব্যক্তিকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, যারা ইসলামের প্রতিরক্ষায় কাজ করেছেন এবং ইসলামকে নিশ্চিহ্ন হতে দেননি।'
আইনে জালুতে তাতার বাহিনীর পরাজয়ের সংবাদ দামেশকে পৌঁছলে সেখানে অবস্থানরত তাতাররা পালিয়ে যায়। দামেশকের মুসলিম অধিবাসীগণ তাদের পিছু নিয়ে তাদেরকে হত্যা করে এবং তাদের হাতে বন্দি মুসলমানদের মুক্ত করে। এই আকস্মিক পট পরিবর্তনে তাতারদের সহায়তাকারী খ্রিষ্টানরা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। খ্রিষ্টানরা যে গির্জা থেকে ক্রুশ বের করে সড়কে সড়কে প্রদক্ষিণ করত, মুসলমানরা আক্রমণ চালিয়ে সে গির্জায় আগুন লাগিয়ে দেয়। যেসব খ্রিষ্টান মুসলমানদেরকে ক্রুশের সম্মানে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করত, মুসলমানরা তাদের বাড়িঘরও জ্বালিয়ে দেয়। জনৈক শিয়া রাফিজি মুসলমানদের সম্পদ আত্মসাৎ করতে তাতারদের সহায়তা করেছিল। বিক্ষুব্ধ মুসলমানরা তাকে হত্যা করে।
সেনাপতি রুকনুদ্দিন বাইবার্স শামের অধিকাংশ এলাকা আইয়ুবি পরিবারের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে মামলুক রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হন। রুকনুদ্দিনের সাফল্যে খুশি হয়ে সুলতান কুতুজ তাকে আলেপ্পোর প্রশাসক নিযুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তিনি তার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সক্ষম হননি। মিশরে ফেরার পর বাইবার্স তাকে হত্যা করে মিশরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
রুকনুদ্দিন বাইবার্সের দায়িত্বগ্রহণের মধ্য দিয়েই মূলত বাহরি মামলুক রাষ্ট্রের প্রকৃত শাসনব্যবস্থার সূচনা হয়।
টিকাঃ
১০০. আইনে জালুতের যুদ্ধের পঞ্চাশ দিন পরই দামেশক থেকে মিশরে ফেরার পথে সালিহিয়া নামক এলাকায় সাইফুদ্দিন কুতুজ নিহত হন। তবে তার হত্যাকারী ও হত্যার কারণ নির্ণয়ে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। অগ্রগণ্য মতানুসারে রুকনুদ্দিন বাইবার্সই তাকে হত্যা করেন। ঐতিহাসিক ইবনে খালদুনের মতে সাইফুদ্দিন কুতুজ ইতিপূর্বে মামলুক সেনাপতি ফারিসুদ্দিন আকতাইকে হত্যা করেছিলেন বলে মামলুকরা তার প্রতি বিক্ষুব্ধ ছিল। তাকে হত্যা করা ছিল সেই অতীত হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ। অপরদিকে জালালুদ্দিন সুযুতি রহ. তারিখুল খুলাফা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, কুতুজ বাইবার্সকে আলেপ্পোর প্রশাসনদায়িত্ব প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েও পরে তা ভঙ্গ করেন। এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে বাইবার্স তাকে হত্যা করেন। এ ছাড়া আরও কিছু কারণ ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন।
📄 আইনে জালুতের যুদ্ধের এক বিস্ময়কর দৃশ্যপট
আইনে জালুতের যুদ্ধ চলাকালে সুলতান কুতুজের ঘোড়াটি প্রতিপক্ষের নিক্ষিপ্ত তিরের আঘাতে মারা যায়। তিনি তৎক্ষণাৎ অতিরিক্ত ঘোড়ার দায়িত্বশীল কাউকে না পেয়ে পদব্রজেই যুদ্ধ করতে থাকেন। তার চারপাশে তখন প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছিল। মুসলিম সুলতান হিসেবে তিনি যুদ্ধের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন।
জনৈক মুসলিম সেনাপতি সুলতানকে পদব্রজে লড়াইরত দেখতে পেয়ে নিজ ঘোড়া থেকে নেমে পড়েন এবং আল্লাহর শপথ দিয়ে সুলতানকে তার অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণের অনুরোধ করেন। কিন্তু সুলতান কুতুজ তাকে বাধা দিয়ে বলেন, 'আমি মুসলমানদেরকে তোমার কল্যাণ-অবদান থেকে বঞ্চিত করতে পারি না।' এরপর তিনি পদব্রজেই লড়াই করতে থাকেন। কিছুক্ষণ পর দায়িত্বশীলগণ অতিরিক্ত ঘোড়া নিয়ে এলে তিনি তাতে আরোহণ করেন।
পরবর্তী সময়ে জনৈক প্রশাসক তাকে বলেন, 'সুলতান, আপনি অমুকের ঘোড়ায় কেন আরোহণ করলেন না? শত্রুরা আপনাকে অশ্বহীন অবস্থায় লক্ষ করলে তো আপনাকে হত্যা করে ফেলত আর আপনার অবর্তমানে ইসলাম ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত।' তখন তিনি উত্তর দেন, 'আমাকে হত্যা করা হলে তো আমি জান্নাতে চলে যেতাম। আর ইসলামের কথা বলছ?! ইসলামের এক মহান রব আছেন; যিনি ইসলামকে কখনো নিশ্চিহ্ন হতে দেবেন না। ইসলামি ইতিহাসে কত-শত মহান ব্যক্তি নিহত হয়েছেন; অমুক, অমুক শাসক শহিদ হয়েছেন; কিন্তু তাদের অবর্তমানে আল্লাহ তাআলা এমন সব ব্যক্তিকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, যারা ইসলামের প্রতিরক্ষায় কাজ করেছেন এবং ইসলামকে নিশ্চিহ্ন হতে দেননি।'
আইনে জালুতে তাতার বাহিনীর পরাজয়ের সংবাদ দামেশকে পৌঁছলে সেখানে অবস্থানরত তাতাররা পালিয়ে যায়। দামেশকের মুসলিম অধিবাসীগণ তাদের পিছু নিয়ে তাদেরকে হত্যা করে এবং তাদের হাতে বন্দি মুসলমানদের মুক্ত করে। এই আকস্মিক পট পরিবর্তনে তাতারদের সহায়তাকারী খ্রিষ্টানরা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। খ্রিষ্টানরা যে গির্জা থেকে ক্রুশ বের করে সড়কে সড়কে প্রদক্ষিণ করত, মুসলমানরা আক্রমণ চালিয়ে সে গির্জায় আগুন লাগিয়ে দেয়। যেসব খ্রিষ্টান মুসলমানদেরকে ক্রুশের সম্মানে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করত, মুসলমানরা তাদের বাড়িঘরও জ্বালিয়ে দেয়। জনৈক শিয়া রাফিজি মুসলমানদের সম্পদ আত্মসাৎ করতে তাতারদের সহায়তা করেছিল। বিক্ষুব্ধ মুসলমানরা তাকে হত্যা করে।
সেনাপতি রুকনুদ্দিন বাইবার্স শামের অধিকাংশ এলাকা আইয়ুবি পরিবারের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে মামলুক রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হন। রুকনুদ্দিনের সাফল্যে খুশি হয়ে সুলতান কুতুজ তাকে আলেপ্পোর প্রশাসক নিযুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তিনি তার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সক্ষম হননি। মিশরে ফেরার পর বাইবার্স তাকে হত্যা করে মিশরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
রুকনুদ্দিন বাইবার্সের দায়িত্বগ্রহণের মধ্য দিয়েই মূলত বাহরি মামলুক রাষ্ট্রের প্রকৃত শাসনব্যবস্থার সূচনা হয়।
📄 আয-যাহির রুকনুদ্দিন বাইবার্স বুনদুকদারি
প্রতিষ্ঠাকালীন সংগ্রাম-পরবর্তী সময়ের প্রথম শাসক হিসেবে রুকনুদ্দিন বাইবার্সকেই বাহরি মামলুক রাষ্ট্রের প্রথম সুলতান বিবেচনা করা হয়।
দায়িত্ব গ্রহণের পরই তিনি সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থা সুবিন্যস্তকরণ, সেনাবাহিনীর সংস্কার ও নৌবহর নির্মাণে কাজ শুরু করেন। এরপর তিনি শামের নিরাপত্তাব্যবস্থা দৃঢ়করণে মনোযোগ দেন এবং দামেশক ও কায়রোর মাঝে ডাকবাহী কবুতরবিশিষ্ট দ্রুতগামী ডাকব্যবস্থার প্রচলন করেন। সুলতান বাইবার্স সালাহুদ্দিন আইয়ুবির ন্যায় ইসলামের সেবা করার এবং ক্রুসেডারদের দখলে থাকা শামের অবশিষ্ট অঞ্চল থেকেও তাদেরকে উচ্ছেদ করার আকাঙ্ক্ষা লালন করতেন। ইসলামের সেবার জন্য আরও মজবুত নেতৃত্ব অর্জনের লক্ষ্যে তিনি তাতারদের আগ্রাসনের পর বাগদাদ থেকে পালিয়ে বেড়ানো জনৈক আব্বাসি রাজপুত্রকে মিশরে নিয়ে আসেন এবং তার হাতে খিলাফতের বায়আত গ্রহণ করে খিলাফতব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করেন। এর মাধ্যমে শুরু হয় মিশরকেন্দ্রিক আব্বাসি খিলাফতব্যবস্থা। নতুন এই খলিফার নাম (২য় মুসতানসির বিল্লাহ) আবুল কাসিম আহমাদ।
কিছুদিন পর খলিফা ২য় মুসতানসির বিল্লাহ তাতারদের হাত থেকে বাগদাদ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়ে নিহত হন। এরপর আরেক আব্বাসি যুবরাজ হাকিম বি আমরিল্লাহ আবুল আব্বাস আহমাদের হাতে বায়আত গ্রহণ করা হয়। মিশরের পরবর্তী আব্বাসি খলিফাগণ ছিলেন এই হাকিম বি আমরিল্লাহরই বংশধর। এরপর দীর্ঘদিন আব্বাসি খিলাফত চলার পর কালের পরিক্রমায় উসমানিরা তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়।