📄 সপ্তম ক্রুসেড
[৬৪৭-৪৮ হিজরি/১২৪৯-৫০ খ্রিষ্টাব্দ]
সুলতান আস-সালিহ আইয়ুবের হাতে আল-কুদসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিক্ষুব্ধ ইউরোপ নতুন করে ক্রুসেডের ডাক দেয়। ফ্রান্সের রাজা নবম লুই ইউরোপজুড়ে ক্রুসেড যুদ্ধের প্রচারণা চালান এবং তৎকালীন পোপ ৪র্থ ইনোসেন্ট (Pope Innocent IV)-এর সমর্থন লাভ করেন। দীর্ঘ তিন বছর ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণের পর আস-সালিহ আইয়ুবের শাসনামলের শেষদিকে ৬৪৬ হিজরি সনের জুমাদাল উলা (১২৪৮ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট) মাসে রাজা লুই আঠারোশ জাহাজের একটি বিশাল নৌবহর নিয়ে মিশর অভিমুখে রওনা হন। ক্রুসেডার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল এক লক্ষের অধিক। ৬৪৭ হিজরি সনের ২২ সফর (১২৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ৬ জুন) ক্রুসেডার বাহিনী দিমইয়াতে পৌঁছে কয়েকদিনের প্রচণ্ড যুদ্ধের পর দিমইয়াত দখল করে নেয়।
আইয়ুবি সুলতান আল-মালিকুস সালিহ আইয়ুব তখন অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন। ক্রুসেডারদের আগমনের সংবাদ পেয়ে সুলতানের স্ত্রী শাজারাতুদ-দুর সুলতানের পুত্র তুরান শাহের কাছে বার্তা পাঠিয়ে তাকে দ্রুত মিশরে চলে আসতে বলেন। তুরান শাহ তখন জাযিরা অঞ্চলে অবস্থান করছিলেন। ১৫ শাবান (২৩ নভেম্বর) সুলতান আইয়ুব মৃত্যুবরণ করলে শাজারাতুদ-দুর তার মৃত্যুসংবাদ গোপন রাখেন এবং সুলতানের নকল স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিভিন্ন নির্দেশনা জারি করে সকলকে বোঝান যে, সুলতানই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। তিনি সেনাপতি ও রাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সমবেত করে জানান যে, সুলতান তাদেরকে সুলতান-পুত্র তুরান শাহের নামে বায়আত গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে সকলে তুরান শাহের নামে বায়আত গ্রহণ করে।
এদিকে ক্রুসেডার বাহিনী দিমইয়াত দখল করার প্রায় ছয় মাস পর মানসুরা নগরী অভিমুখে রওনা হয়। কিন্তু তারা ইতিপূর্বে আল-কামিলের আমলে যে ভুল করেছিল, এবারও সেই একই ভুল করে। ইতিপূর্বে বিভিন্ন যুগে মিশর বিজয়ী অভিযাত্রীগণ ফারামা হয়ে সিনাই মরুঅঞ্চল পাড়ি দিয়ে মিশরে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু ক্রুসেডাররা পূর্বের ন্যায় এবারও দিমইয়াত ও মানসুরা হয়ে মিশরে প্রবেশের চেষ্টা করে। এ পথে তাদের অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে প্রচুর খাল, নদী ও শাখা নদী প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।
৬৪৭ হিজরি সনের ১৪ রমজান (১২৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ডিসেম্বর) ক্রুসেডার বাহিনী মানসুরা নগরীর নিকটে আল-বাহরুস সাগিরের তীরে এসে পৌঁছায়। ক্রুসেডাররা এ সময় টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে নদী পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করলেও অপর পাড়ে অবস্থানরত আইয়ুবি বাহিনীর তীব্র তিরবৃষ্টির কারণে ব্যর্থ হয়। এরপর তারা স্থানীয় এক খ্রিষ্টান নাগরিকের মাধ্যমে কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত নদীর তুলনামূলক অপ্রশস্ত একটি অংশের কথা জানতে পারে। তৎক্ষণাৎ ক্রুসেডার বাহিনীর একটি অংশ রাজা ৯ম লুইয়ের ভাই রবার্টের নেতৃত্বে গোপনে মূল বাহিনী থেকে সরে পড়ে এবং নদী পাড়ি দিয়ে পেছন দিক থেকে মুসলিম বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। অল্পসময়ের মধ্যেই ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনীটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে যায়। সেদিন ছিল ৬৪৭ হিজরি সনের ৪ জিলকদ (১২৫০ খ্রিষ্টাব্দের ৮ ফেব্রুয়ারি)।
তুরানশাহ তখনও মিশরে এসে পৌঁছাননি। শাজারাতুদ-দুর তাই ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় তার স্বামীর প্রতিষ্ঠিত বাহরি মামলুক বাহিনীকে প্রেরণ করেন। বাহরি মামলুক বাহিনীর প্রবল আক্রমণে নদী অতিক্রমকারী ক্রুসেডার বাহিনীটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। জীবিত দু-চারজন তাড়া খেয়ে নদীতে পড়ে গিয়ে প্রাণ হারায়।
এরইমধ্যে তুরানশাহ উপস্থিত হন এবং তার সৈন্যদের নিয়ে দিমইয়াত থেকে মানসুরা আসার পথের মাঝে অবস্থান নেন। ৬৪৭ হিজরি সনের ৯ জিলহজ (১২৫০ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ মার্চ) এ পথে ক্রুসেডার বাহিনীর জন্য রসদপত্র নিয়ে একটি নৌবহর এগিয়ে এলে মিশরীয় নৌবাহিনী তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় তারা প্রতিপক্ষের আশিটির অধিক জাহাজ আটক করতে সক্ষম হয়। ফলে ক্রুসেড শিবিরে প্রচণ্ড খাদ্যাভাব দেখা দেয়। ৬৪৮ হিজরি সনের ২ মুহাররম (১২৫০ খ্রিষ্টাব্দের ৬ এপ্রিল) তুরানশাহ তার বাহিনী নিয়ে ফারিসকুর নামক স্থানে ক্রুসেডারদের নৌবাহিনীর মোকাবিলা করেন এবং প্রচণ্ড যুদ্ধের পর তাদেরকে পরাজিত করেন। প্রায় পাঁচ হাজার ক্রুসেডার সৈন্য এ সময় নিহত হয়।
এদিকে রাজা ৯ম লুইয়ের নেতৃত্বে মূল ক্রুসেডার বাহিনী নদী পাড়ি দিয়ে মামলুক বাহিনীর মুখোমুখি হয়। মুসলিম বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে প্রায় ত্রিশ হাজার ক্রুসেডার সৈন্য নিহত হয়, নদীতে ডুবে মারা যায় প্রচুর সৈন্য। পরাজিত ক্রুসেডার বাহিনী পলায়ন করার সময় রাজা ৯ম লুইকে জীবিত অবস্থায় বন্দি করা হয় এবং মানসুরার দারে ইবনে লুকমানে(৯৯) আটকে রাখা হয়। পরে এক কোটি ফ্রাংক মুক্তিপণ প্রদানের বিনিময়ে তিনি তার পরিজন ও অন্যান্য বন্দি সৈন্যসহ মুক্তিলাভ করেন।
সুলতান তুরান শাহ 'আল-মালিকুল মুআযযাম' উপাধি ধারণ করে আইয়ুবি রাষ্ট্রের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি ক্রুসেডারদের দমন করার পর শাজারাতুদ-দুরের কাছে তার পিতার সম্পদ দাবি করেন এবং মামলুকদের বিভিন্নভাবে হুমকি প্রদান করেন। অবশেষে দায়িত্ব গ্রহণের সত্তর দিনের মাথায় মামলুকরা তুরান শাহকে হত্যা করে উম্মে খলিল শাজারাতুদ-দুরকে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে। ইতিপূর্বে কোনো নারী মুসলমানদের শাসনভার গ্রহণ করেনি। শাজারাতুদ-দুর এর তিন মাস পরই নিজেকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেন।
এরপর মামলুকরা আইয়ুবি পরিবারের জনৈক রাজপুত্র আল-আশরাফ মুসা বিন ইউসুফ বিন মাসউদ বিন আল-কামিলকে সুলতান পদে অধিষ্ঠিত করে। মাত্র আট বছর বয়সী অপ্রাপ্তবয়স্ক মুসার তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করা হয় সুলতান আল-মালিকুস সালিহ আইয়ুবের ক্রীতদাস ইযযুদ্দিন আইবেক তুর্কমানিকে। ইযযুদ্দিন শাজারাতুদ-দুরকে বিয়ে করেন এবং কিছুদিন না যেতেই মুসাকে অপসারণ করে নিজেই রাষ্ট্রের একচ্ছত্র ক্ষমতা অর্জন করেন। এর মাধ্যমে মিশরে আইয়ুবি রাষ্ট্রের পতন ঘটে। শামে অবশ্য এরপরও কিছুদিন আইয়ুবি রাষ্ট্র টিকে ছিল। পরবর্তী সময়ে শামকেন্দ্রিক আইয়ুবি রাষ্ট্র সীমিত স্বাধীনতাসহ মামলুকদের বশ্যতা স্বীকার করে নেয়।
ঐতিহাসিকগণ আইয়ুবি রাষ্ট্র সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন-
আইয়ুবি রাষ্ট্রের শুরু থেকে শেষ পুরো ইতিহাস জিহাদ ও বিজয়াভিযানের ইতিহাস। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা সালাহুদ্দিন আইয়ুবি ও শেষ সুলতান তুরান শাহ উভয়ই জীবনভর নিরলসভাবে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই করে উদ্ভাসিত বিজয়-ইতিহাস রচনা করেছেন। দুজনের মাঝেও এমন কয়েকজন শাসক বিগত হয়েছেন, যারা ক্রুসেডারদের আক্রমণ প্রতিরোধে এ দুজনের চেয়ে কম ছিলেন না। আইয়ুবি রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ই যেন হয়েছিল ইসলামি প্রাচ্যে ইউরোপের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে এবং তাদের এই কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে ছয়শ বছরেরও অধিক সময়ের জন্য পিছিয়ে দিত। কোমলতা ও উদারতা, সততা ও বিশ্বস্ততার বহিঃপ্রকাশ এবং সাম্প্রদায়িকতা পরিহারের মাধ্যমে আইয়ুবি রাষ্ট্র ক্রুসেডারদের সামনে এক মঙ্গলকামী শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। আইয়ুবি শাসকগণ নিজেদের সমুন্নত আচরণের মাধ্যমে ক্রুসেডারদের সামনে তুলে ধরেছিলেন শত্রুর সঙ্গে আচরণের এক অনুপম নীতি; শিখিয়েছিলেন মানুষের সঙ্গে কীরূপ সদাচরণ করতে হয়; চরম নিন্দনীয় পাশবিক গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িকতা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং প্রতারণা ও প্রবঞ্চনা ইত্যাদি কীভাবে পরিহার করতে হয়। তৎকালীন চরম সাম্প্রদায়িক ইউরোপিয়ান খ্রিষ্টান শক্তির মোকাবিলায় যদি আইয়ুবি রাষ্ট্র বাধা হয়ে না দাঁড়াত, তাহলে আন্দালুসের মতো শাম, মেসোপটেমিয়া, মিশর ও উত্তর আফ্রিকার সুবিস্তৃত ভূখণ্ড থেকেও ইসলামের নাম-নিশান মুছে যেত।
আমাদের মতে ঐতিহাসিকগণের এই মন্তব্য জিনকি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। জিনকি রাষ্ট্রের কর্ণধারগণও ক্রুসেডারদের প্রতিরোধে অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করেছিল।
যারা মুসলমানদের রাষ্ট্র ও ভূখণ্ড জবরদখল করেছিল এবং মসজিদুল আকসার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছিল, জিনকি ও আইয়ুবি রাজবংশের এই অব্যাহত সংগ্রাম ও অভিযানের কারণে তাদের মোকাবিলায় মুসলিম জনসাধারণের অন্তরে ঈমানি চেতনা পুনঃজাগ্রত হয়েছিল।
এর পাশাপাশি এই অব্যাহত যুদ্ধাভিযানের ফলেই প্রাচ্যের রোমান (বাইজান্টাইন) সাম্রাজ্য অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং এর ফলেই ক্রুসেড যুদ্ধ শেষ হওয়ার অব্যবহিত পরেই উসমানি সাম্রাজ্যের হাতে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে। সে ইতিহাস সামনে যথাস্থানে উল্লেখ করা হবে।
টিকাঃ
৯৯. তৎকালীন মিশরের কাজি ছিলেন ইবরাহিম বিন লুকমান। তার বাড়িতেই রাজা লুইকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল।