📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 তৃতীয় ক্রুসেড

📄 তৃতীয় ক্রুসেড


৫৮৫-৫৮৮ হিজরি/১১৮৯-১১৯২ খ্রিষ্টাব্দ]
মুসলমানরা আল-কুদস পুনরুদ্ধার করার পর ইসলামি প্রাচ্যে ক্রুসেডারদের প্রতিপত্তি আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে। তাদের হাতে থাকে এন্টিয়ক ও সুরের মতো গোটাকয়েক নগরী। এ সময় মুসলমানদের হাতে বিজিত প্রতিটি নগরী হতে ক্রুসেডাররা ধীরে ধীরে সুর নগরীতে আশ্রয় নিতে থাকে। একত্রিত হয়েই তারা সালাহুদ্দিনের সঙ্গে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করতে উদ্বুদ্ধ হয়। সংগঠিত ক্রুসেড শক্তি এবার আক্কা অভিমুখে রওনা হয় এবং জল-স্থল উভয় দিক থেকে আক্কা অবরোধ করে। ৫৮৫ হিজরি সনের ৮ রজব (১১৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ২২ আগস্ট) থেকে শুরু হওয়া এ অবরোধ দুই বছর অব্যাহত থাকে।
সংবাদ পেয়ে মুসলিম বাহিনীও আক্কায় পৌঁছে ক্রুসেডারদের স্থলভাগে অবরুদ্ধ করে রাখে। সুলতান সালাহুদ্দিন নিজে তিল-কায়সানে (Tell Keisan) শিবির স্থাপন করেন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে অনেকবার যুদ্ধ সংঘটিত হলেও কোনো পক্ষই নিরঙ্কুশ জয় অর্জন করতে পারেনি। এরইমধ্যে বেজে ওঠে তৃতীয় ক্রুসেড যুদ্ধের দামামা।
ইউরোপীয় রাজন্যবর্গ সালাহুদ্দিনের হাত থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে তৎকালীন পোপ ৮ম গ্রেগরি (Gregory VIII)-এর নির্দেশে তৃতীয় ক্রুসেড অভিযানের প্রস্তুতি নিতে থাকে। এ অভিযানে খ্রিষ্টান বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল—
• জার্মানির রাজা ১ম ফ্রেডেরিক (Frederick Barbarossa)।
• ফরাসি রাজা ২য় ফিলিপ (Philip Augustus)।
• ইংল্যান্ডের রাজা 'সিংহহৃদয়' খ্যাত প্রথম রিচার্ড (Richard the Lionheart)।
ইউরোপের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রুসেডার বাহিনী ৫৮৫ হিজরি সনের রজব মাসে আক্কার উদ্দেশে রওনা হয়। জার্মানি থেকে প্রায় এক লক্ষ সৈন্য নিয়ে রওনা হওয়ার পর রাজা ১ম ফ্রেডেরিক ৫৮৬ হিজরি সনের জুমাদাল উলা মাসে (১১৯০ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে) পথিমধ্যে ডুবে মারা গেলে তার নেতৃত্বাধীন জার্মান বাহিনীর সৈন্যরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং অধিকাংশই নিজ ভূখণ্ডে ফিরে যায়। অল্পকিছু সৈন্য আক্কায় পৌঁছায়।
অপরদিকে ২য় ফিলিপের নেতৃত্বাধীন ফরাসি বাহিনী ও ১ম রিচার্ডের নেতৃত্বাধীন ইংরেজ বাহিনী সিসিলিতে একত্রিত হয়। এরপর তারা নিজেরা পরস্পরে বিরোধে জড়িয়ে পড়ায় দীর্ঘ সময় সিসিলিতেই অবস্থান করে। কিছুদিন পর ফরাসিরা সিসিলি ত্যাগ করে আক্কা অভিমুখে রওনা হয়।
ইংরেজরাও আক্কার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু পথিমধ্যে ঝড়ের কবলে পড়ে ইংরেজ নৌবহর সাইপ্রাস দ্বীপে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। সাইপ্রাস তখন বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। সাইপ্রাসে অবতরণ করার পর রাজা রিচার্ড বাইজান্টাইনদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন এবং সাইপ্রাস দখল করে সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। এরইমধ্যে বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক গাই রিচার্ডের কাছে দ্রুত ক্রুসেড অভিযানে যোগ দেওয়ার আবেদনবার্তা পাঠালে রিচার্ড সমুদ্রপথে আক্কা অভিমুখে যাত্রা করেন। অথচ এই গাইকে সুলতান সালাহুদ্দিন বন্দি করার পরও ক্ষমা করে ছেড়ে দিয়েছিলেন। ফরাসি ও ইংরেজ বাহিনী আক্কায় পৌঁছে যাওয়ায় অবরোধকারী ক্রুসেডারদের মনোবল বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
৫৮৭ হিজরি সনের ১৭ জুমাদাল উখরা (১১৯১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জুলাই) শুক্রবার হঠাৎ করেই আক্কা নগরপ্রাচীরের শীর্ষদেশে ক্রুশচিহ্নিত পতাকা উড়তে থাকে। মুসলমানরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে এবং ক্রুসেডারদের বর্বর হামলার শিকার হয়। ষাট হাজার মুসলিম নাগরিকের প্রাণবিয়োগের পর আক্কার কর্তৃত্ব চলে যায় ক্রুসেডারদের হাতে।
আক্কা দখল করার পর ক্রুসেডার বাহিনীর সদস্যরা সেখানেই আনন্দ-উল্লাসে মত্ত হয়ে যায় এবং দীর্ঘদিন সেখানেই কাটিয়ে দেয়। অথচ তারা বের হয়েছে 'পবিত্র ভূমি' বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে!
এদিকে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের রাজার মধ্যে নতুন করে শুরু হয় বিরোধ ও সংঘাত। এর পরিণতিতে ফরাসি রাজা ফিলিপ দেশে ফিরে যান। এরপর সালাহুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী ও ১ম রিচার্ডের নেতৃত্বাধীন ক্রুসেডার বাহিনীর মাঝে একের পর এক রক্তক্ষয়ী লড়াই অব্যাহত থাকে। জয়-পরাজয়ের পাল্লা ছিল উভয়দিকেই দোদুল্যমান।
এসব যুদ্ধের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আরসুফের (Apollonia) যুদ্ধ। এ যুদ্ধে ক্রুসেডাররা জয়ী হয়। ক্রুসেডারদের দৃষ্টিতে এ বিজয় ছিল হিত্তিনের যুদ্ধের পরাজয়ের প্রতিশোধ।
এরপর শুরু হয় ৫৮৮ হিজরি সন। ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ.-এর বরাতে আমরা সে বছরের বিবরণ তুলে ধরছি-
বছরের শুরুতে সুলতান সালাহুদ্দিন আল-কুদসে তাঁবুতে অবস্থান করছিলেন। তিনি নগরপ্রাচীর নির্মাণের কাজ তার সন্তান ও সেনাপতিদের মাঝে ভাগ করে দিয়েছিলেন। তিনি নিজেও নির্মাণকাজে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন এবং ঘোড়ায় করে পাথর বহনের কাজ করেন। আলিম-উলামা ও কারিগণও প্রাচীর নির্মাণে কাজ করছিল। অভিশপ্ত ফিরিঙ্গিরা আসকালান ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দিক থেকে আল-কুদস দখলের চেষ্টা করলেও প্রহরীদের কারণে কাছে আসার সাহস করছিল না। তবে তারা আল-কুদস অবরোধ ও ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের বিষয়ে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিল। প্রহরীদের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই তাদের লড়াই হচ্ছিল এবং লড়াইতে কখনো মুসলিম প্রহরীরা, আবার কখনো ফিরিঙ্গিরা জয়ী হচ্ছিল।
৯ জুমাদাল উলা ফিরিঙ্গিরা দারুম দুর্গ দখল করে নেয়। তারা দুর্গের অভ্যন্তরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, অসংখ্য নাগরিককে হত্যা করে এবং শিশুদেরকে বন্দি করে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। এরপর তারা একযোগে আল-কুদসের উদ্দেশে রওনা হয়। সুলতান মুসলমানদের নিয়ে তাদের প্রতিরোধে বের হন। উভয় দল মুখোমুখি হলে শয়তানের দল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে। সুলতান আল-কুদসে ফিরে আসেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়-
﴿وَرَدَّ اللَّهُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِغَيْظِهِمْ لَمْ يَنَالُوا خَيْرًا وَكَفَى اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ
الْقِتَالَ وَكَانَ اللَّهُ قَوِيًّا عَزِيزًا ﴾
আর আল্লাহ কাফিরদেরকে তাদের ক্রোধ সহকারে এমন অবস্থায় ফিরিয়ে দিলেন যে, তারা কোনো সুফল অর্জন করতে পারল না। মুমিনদের পক্ষ হতে যুদ্ধের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ সর্বশক্তিমান, পরাক্রমশালী। [সুরা আহযাব: ২৫]
এরপর ইংল্যান্ডের রাজা মুসলমানদের একটি ক্ষুদ্র অংশের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে। সে ছিল তৎকালীন সবচেয়ে শক্তিশালী ফিরিঙ্গি শাসক। আল্লাহ তার প্রতি অভিসম্পাত করুন। সে মুসলমানদের ওপর রাতের আঁধারে হামলা চালায় এবং অনেক মুসলমানকে হত্যা করে। বন্দি হয় পাঁচশ মুসলমান। ফিরিঙ্গিরা উট, ঘোড়া ও খচ্চরসহ প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ লাভ করে। উটের সংখ্যাই ছিল তিন হাজার। এর ফলে ফিরিঙ্গিদের সামরিক শক্তি আরও সমৃদ্ধ হয়। সুলতান এ সংবাদ জানতে পেরে অত্যন্ত ব্যথিত হন এবং বন্দিদের পরিণাম নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। অর্জিত উট, ঘোড়া ও খচ্চরগুলো ইংরেজ বাহিনীর পশুচালকদের দায়িত্বে দিয়ে দেওয়া হয়। নতুন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ইংরেজরা এবার আল-কুদস অবরোধের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে অগ্রসর হয়। ইংরেজ রাজা উপকূলীয় খ্রিষ্টান অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে বার্তা পাঠিয়ে তাদেরকে অবরোধে অংশ নিতে আহ্বান জানালে সেখানকার যোদ্ধারা ইংরেজদের সঙ্গে যোগ দেয়। সুলতান সালাহুদ্দিন তাদের প্রতিরোধে যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তিনি নগরপ্রাচীর নির্মাণ সম্পন্ন করেন, নগরীর চারপাশে গভীর পরিখা খনন করেন, প্রাচীরের ওপর মিনজানিক স্থাপন করেন এবং আল-কুদসের পার্শ্ববর্তী পানির উৎসগুলোর পানি সেচে ফেলার নির্দেশ দেন।
১৯ জুমাদাল উখরা শুক্রবার রাতে সুলতান তার সেনাপতিদের সমবেত করেন এবং এই আকস্মিক বেদনাদায়ক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ চান। প্রত্যেকে আপন আপন মত প্রকাশ করে। ইমাদ আল-কাতিব প্রস্তাব দেন-সাহাবায়ে কেরাম যেভাবে শাহাদাতের বায়আত গ্রহণ করতেন, উপস্থিত সকলে সেভাবে কুব্বাতুস সাখরার কাছে গিয়ে শাহাদাতের বায়আত গ্রহণ করবে। সকলে তার প্রস্তাবে সম্মতি জানায়। তখন বিভিন্নজন বিভিন্ন পরামর্শই দিচ্ছিলেন, আর সুলতান নির্বাক-চিন্তিত বসে ছিলেন। সুলতানকে গম্ভীর দেখে সবাই নীরব হয়ে যায়। মনে হচ্ছিল, তাদের মাথার ওপর পাখি বসে আছে। কিছুক্ষণ পর সুলতান নীরবতা ভঙ্গ করে বলেন-
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। দুরূদ ও শান্তি বর্ষিত হোক রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর। জেনে রেখো, তোমরা আজ ইসলামের সৈনিক ও প্রহরী। তোমরা জানো যে, মুসলমানদের জানমাল ও পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তা-দায়িত্ব তোমাদের ওপরই অর্পিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন এ সম্পর্কে তোমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। আর তোমরা ব্যতীত অন্য কোনো মুসলিম রাষ্ট্র বা জনগোষ্ঠী এই শত্রুদের প্রতিরোধে অগ্রসর হবে না। আল্লাহ না করুন! তোমরা যদি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করো, তাহলে এ ভূখণ্ড বেদখল হয়ে যাবে, মুসলিম জনসাধারণ ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হবে এবং মুসলমানদের সম্পদ ও স্ত্রী-সন্তানদের কেড়ে নেওয়া হবে। মসজিদগুলো থেকে কুরআন সরিয়ে ফেলে ক্রুশ স্থাপন করে পূজা শুরু হবে, নামাজ বন্ধ করে দেওয়া হবে। এ সবকিছুর হেফাজতের দায়িত্ব তোমাদেরই। তোমরাই এর দায়িত্ব গ্রহণ করেছ এবং মুসলমানদের নিরাপত্তাদান ও অসহায়-দুর্বলদের সহায়তা করার জন্য বাইতুল মাল হতে ভাতা গ্রহণ করেছ। সুতরাং, রাজ্যের সমস্ত মুসলমানদের নিরাপত্তা ও শান্তি তোমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ওয়াস সালাম।
সুলতানের বক্তব্য শেষ হলে সাইফুদ্দিন আল-মাশতুব দাঁড়িয়ে বলেন— হে আমাদের মনিব, আমরা আপনার অধীনস্থ ও আপনার গোলাম। আপনি আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, আমাদের মহান ও মর্যাদাসম্পন্ন করেছেন। আমরা আপনার পূর্ণ অনুগতরূপে আপনার সম্মুখে উপস্থিত আছি। আল্লাহর শপথ! মৃত্যু পর্যন্ত আমরা সকলে আপনার সহায়তায় অবিচল থাকব।
সাইফুদ্দিনের বক্তব্য শেষ হলে উপস্থিত অন্যরাও অনুরূপ অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। সকলের বক্তব্য শুনে সুলতান আনন্দিত হন, তাঁর হৃদয় প্রশান্ত হয়।
এরপর সকলে সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করে। পরে সুলতান জানতে পারেন যে, জনৈক গভর্নর বলেছেন, 'আমাদের আশঙ্কা হচ্ছে যে, আমাদের পরিণতিও আক্কাবাসীর মতো হবে। এরপর ফিরিঙ্গিরা একের পর এক অন্যান্য ইসলামি অঞ্চলগুলোও দখল করে নেবে। আমার মতে এটাই কল্যাণকর হবে যে, আমরা নগরীর বাইরে গিয়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করব। যদি আমরা তাদের পরাজিত করতে পারি, তাহলে তাদের হাত থেকে অন্যান্য অঞ্চলও পুনরুদ্ধার করতে পারব। আর ফলাফল যদি এর বিপরীত হয়, তবুও সেনাবাহিনী নিরাপদে থাকবে। তখন শত্রুপক্ষ আল-কুদস দখল করে নিলেও অন্যান্য ইসলামি অঞ্চল দীর্ঘকাল নিরাপদ থাকবে।'
এরপর গভর্নর ও সেনাপতিগণ সুলতানকে অনুরোধ করে বলে, 'আপনি যদি চান যে, আমরা ফিরিঙ্গিদের অবরোধের মাঝে আল-কুদসেই অবস্থান করব, তাহলে অনুগ্রহ করে আপনি বা আপনার পরিবারস্থ কেউ আমাদের সঙ্গে থাকুন। তাহলে পুরো বাহিনী আপনার নির্দেশনা মেনে চলবে। কারণ, (আপনার অনুপস্থিতিতে) কুর্দিরা তুর্কিদের মানে না, তুর্কিরাও কুর্দিদের অমান্য করে।'
গভর্নরদের অনুরোধ-বার্তা পেয়ে সুলতান অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং সেদিন সারা রাত করণীয় নির্ধারণে চিন্তাভাবনায় কাটিয়ে দেন। অবশেষে সুলতান সিদ্ধান্ত নেন যে, বালাবাক্কু অঞ্চলের প্রশাসক (সুলতান সালাহুদ্দিনের ভ্রাতুষ্পুত্র বাহরাম শাহ) তার নায়েব হিসেবে আল-কুদসে অবস্থান করবেন।
সেদিন ছিল শুক্রবার। সুলতান জুমার নামাজ আদায়ে উপস্থিত হওয়ার পর মুয়াজ্জিন আজান দিলে তিনি দুই আজানের মাঝে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। এরপর তিনি সিজদাবনত হয়ে কায়মনোবাক্যে আল্লাহ তাআলার দরবারে দোয়া ও কাকুতিমিনতি করতে থাকেন। সুলতান আল্লাহ তাআলার কাছে নিজের দুর্বলতা ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করে এই সংকট হতে মুক্তি প্রার্থনা করেন।
পরদিন শনিবার নগরীর নিরাপত্তারক্ষীরা পত্র মারফত সুলতানকে জানায় যে, শত্রুপক্ষ নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্সের রাজা চাচ্ছে অবরোধ অব্যাহত রেখে আল-কুদস জয় করতে আর ইংরেজরা চাচ্ছে ফিরে যেতে। ফ্রান্স-অধিপতির বক্তব্য হলো—আমরা বহুদূর থেকে প্রচুর সম্পদ খরচ করে এ পর্যন্ত এসেছি বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধার করার জন্য। লক্ষ্য পূরণের আর মাত্র একটি ধাপ বাকি আছে। তাই আমরা তা পূরণ করবই। অপরদিকে ইংরেজরা বলছে—এই নগরী অবরোধ করা আমাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, নগরীর আশপাশের পানির উৎসগুলো ফুরিয়ে গেছে। দীর্ঘ কষ্টের পর যতদিনে আমাদের কাছে পানি পৌঁছবে, ততদিনে কেবল অবরোধপ্রচেষ্টাই ব্যর্থ হবে না; সৈন্যদের প্রাণও ওষ্ঠাগত হয়ে পড়বে।
এরপর ফরাসি-ইংরেজ উভয় পক্ষ এ মর্মে একমত হয় যে, তারা করণীয় নির্ধারণের জন্য নিজেদের মধ্য থেকে তিনশজন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করবে। এরপর সেই তিনশজন তাদের মধ্য হতে বারোজনকে বাছাই করবে। বারোজন আবার নিজেদের মধ্য হতে তিনজনকে চূড়ান্ত মীমাংসাকারী হিসেবে নির্বাচিত করবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনজন নির্বাচিত হওয়ার পর তারা সারা রাত করণীয় সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে এবং পরদিন সকালে জানিয়ে দেয় যে, তারা চিন্তাভাবনা করার পর সকলের প্রস্থানের বিষয়ে একমত হয়েছে। কারও পক্ষে এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা সম্ভব হয়নি। সকলে বিফল মনোরথে প্রত্যাবর্তনের পথ ধরে। আল্লাহ তাদের সকলের ওপর অভিসম্পাত করুন। খ্রিষ্টান বাহিনী জুমাদাল উখরা মাসের একুশ তারিখ সকালে পথিমধ্যে রামলায় অবতরণ করে। নিজেদের ভূখণ্ড ও পরিবার-পরিজন হতে দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদে তারা অস্থির হয়ে পড়েছিল।
সুলতান সালাহুদ্দিন আশঙ্কা করছিলেন যে, প্রচুর বাহন ও সম্পদের শক্তিতে বলীয়ান খ্রিষ্টান বাহিনী মিশরে হামলা করতে পারে। তাই তিনি তার বাহিনী নিয়ে খ্রিষ্টান বাহিনীর উদ্দেশে বের হন। ইংরেজরাও মিশরের প্রতি প্রচণ্ড লালায়িত ছিল। কিন্তু আল্লাহ তাদেরকে নিষ্ফল করে দেন।
সুলতানের বাহিনীর আগমন সংবাদ পেয়ে ইংরেজরা নিরাপত্তাপ্রার্থনা করে সন্ধি করার উদ্দেশ্যে একের পর এক কয়েকজন দূত সুলতানের কাছে প্রেরণ করে। তাদের সন্ধিপ্রস্তাবে উল্লেখ ছিল-তিন বছর উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে, আসকালানের অধিকার তাদেরকে ফিরিয়ে দিতে হবে, বাইতুল মুকাদ্দাসের আল-কিয়ামা গির্জা (The Church of the Holy Sepulchre) তাদেরকে দান করতে হবে এবং কোনোপ্রকার বিনিময় ব্যতিরেকে খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদেরকে আল-কিয়ামা গির্জা পরিদর্শন ও তীর্থযাত্রার সুযোগ দিতে হবে। সুলতান আল-কিয়ামা গির্জা তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে সম্মত হলেও আসকালান ফিরিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং তীর্থযাত্রীদের ওপর যৎসামান্য মাশুল ধার্যের কথা বলেন। কিন্তু ইংরেজরা দাবি জানায় যে, মুসলমানরা যদি আসকালানের নিরাপত্তাপ্রাচীর পুনর্নির্মাণ করে তার নিয়ন্ত্রণ ইংরেজদের বুঝিয়ে না দেয়, তাহলে তারা সন্ধি করবে না। ফলে সুলতানও তাদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি না করার সিদ্ধান্ত নেন।
এরপর সুলতান সালাহুদ্দিন জাফা পৌঁছে কঠিন অবরোধ আরোপ করেন এবং জাফা জয় করেন। ফিরিঙ্গিদের আবেদনের কারণে তাদের ছোট-বড় সকলকে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়। এরইমধ্যে সমুদ্রপথে সামরিক সহায়তা চলে আসায় ইংরেজ বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং তারা বিশ্বাসঘাতকতা করে মুসলিম বাহিনীর ওপর হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। অভিশপ্ত ইংরেজ রাজা আক্রমণ চালিয়ে জাফা পুনরুদ্ধার করে। যেসব মুসলমান পেছনে পড়ে গিয়েছিল, তাদেরকে বন্দি করে ইংরেজ রাজার সামনে হত্যা করা হয়। ইংরেজ বাহিনীর হামলার আশঙ্কায় সুলতান তার বাহিনী নিয়ে অবরোধস্থল থেকে পিছিয়ে যান। ইংরেজ রাজা যদিও জাফা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়; কিন্তু সে অবাক বিস্ময়ে ভাবতে থাকে—সুলতান কীভাবে মাত্র দু-দিনের অবরোধেই এই বিশাল নগরীটি জয় করে ফেললেন! অন্য কোনো সামরিক শক্তি তো দুই বছরেও তা জয় করতে পারবে না। রাজা তো কল্পনাও করেননি যে, অসামান্য বীরত্ব ও দূরদর্শিতার অধিকারী এই সুলতান শুধু তার আগমনের কারণেই অবরোধস্থল থেকে পিছিয়ে যাবেন। অথচ তিনি ও তার সৈন্যরা তো নৌবহর থেকে বিনা অস্ত্রে বেরিয়েছিলেন!
এরপর ইংরেজ রাজা পুনরায় সন্ধিচুক্তির আবেদন জানায় এবং আসকালানকে চুক্তির আওতায় রাখার অনুরোধ করে। সুলতান এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। অতঃপর সে রাতেই সুলতান সতেরোজন অশ্বারোহী যোদ্ধা ও অল্প কয়েকজন পদাতিক সৈন্য নিয়ে ইংরেজ শিবিরের দিকে অগ্রসর হন এবং ইংরেজ রাজাকে অবরুদ্ধ করে ফেলেন। এ সময় যদি মুসলিম বাহিনীর সৈন্যরা অটল-অবিচল থাকত, তাহলে ইংরেজ রাজার বাঁচার কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু মুসলিম সৈন্যরা প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালাতে অস্বীকৃতি জানায়। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ! সুলতান তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে তিক্ত ওষুধ সেবনের অনুরোধ করা হলে যেভাবে সে অস্বীকৃতি জানায়, সকলে তেমনই সুলতানের নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছিল।
ওদিকে ইংরেজ রাজা তার সৈন্যদের নিয়ে আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। সে মুসলিম বাহিনীর ডানবাহু ও বামবাহুকে যুদ্ধের আহ্বান জানায়। কিন্তু একজন বীর যোদ্ধা বা সাহসী সৈনিকও প্রতিপক্ষের আহ্বান গ্রহণ করে লড়াই করতে অগ্রসর হয়নি। অবস্থাদৃষ্টে ব্যথিত-চিত্ত সুলতান প্রস্থানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সৈন্যদের এরূপ অবাধ্যতায় তিনি প্রচণ্ড মনঃক্ষুণ্ণ হন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। সুলতান পারলে এসব অবাধ্য সৈন্যদের একজনকেও বাইতুল মাল থেকে এক পয়সা ভাতা নিতে দিতেন না।
এরইমাঝে ইংল্যান্ডের রাজা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। অসুস্থ ইংরেজ রাজা মুসলিম সুলতানের কাছে ফলমূল ও বরফ চেয়ে বার্তা পাঠালে সুলতান উদারচিত্তে তার চাওয়া পূরণ করেন। অল্প কদিনের মধ্যেই সে সুস্থ হয়ে ওঠে। সুস্থ হওয়ার পরই পরিবার-পরিজন ও মাতৃভূমির বিরহে অস্থির হয়ে ওঠা ইংরেজ রাজা বারবার দূত পাঠিয়ে সুলতানকে সমঝোতাচুক্তি করার অনুরোধ জানায় এবং আসকালানের দাবি ছেড়ে দিয়ে সুলতানের দাবিমতো চুক্তি করতেই সম্মতি জানায়। সতেরো শাবান উভয় পক্ষের মাঝে সন্ধিচুক্তি লিপিবদ্ধ হয়। খ্রিষ্টান রাজন্যবর্গ চুক্তিরক্ষার দৃঢ় অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করে, মুসলিম প্রশাসক ও আমিরগণও চুক্তিরক্ষার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে সম্মতিপত্র লিপিবদ্ধ করে।
সুলতানদের রীতি অনুযায়ী সুলতান সালাহুদ্দিন লিখিত অঙ্গীকারের পরিবর্তে কেবল মৌখিক সম্মতি প্রদান করেন। সমঝোতা সম্পন্ন হওয়ায় উভয় পক্ষই বেশ আনন্দিত হয় এবং আনন্দ ও স্বস্তি প্রকাশ করে। সুলতান আল-কুদসে ফিরে এসে নগরীর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অন্যান্য নাগরিক ব্যবস্থাপনা আরও সুগঠিত ও সুবিন্যস্ত করার প্রতি মনোযোগ দেন।
সুলতান এ বছরই হজ আদায়ের মনস্থ করেন এবং নিজের ইচ্ছার কথা জানিয়ে হিজায, ইয়ামেন, মিশর ও শাম অঞ্চলে বার্তা প্রেরণ করে এ জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ প্রদান করেন।
সুলতানের মনোবাঞ্ছা জানতে পেরে কাজি ফাযিল(৯৬) বার্তা পাঠিয়ে তাকে এ সময় হজে যেতে বারণ করেন। তিনি লেখেন—আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, আপনার অনুপস্থিতির সুযোগে ফিরিঙ্গিরা আমাদের রাজ্য দখল করে নিতে পারে, রাজ্যজুড়ে দাঙ্গাহাঙ্গামা, অন্যায়-অত্যাচার এবং জনগণ ও সেনাদের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। সৈন্যগণের মাঝে কল্যাণকামিতার অভাব রয়েছে। তাই এ বছর হজ আদায়ের পরিবর্তে মুসলমানদের রক্ষণাবেক্ষণে কাজ করা আপনার জন্য কল্যাণকর হবে। শত্রুপক্ষ এখনো শামে অবস্থান করছে। আপনি জানেন যে, তারা মূলত শক্তি সঞ্চয় ও জনবলে আরও সমৃদ্ধ হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্যই আপাতত সমঝোতা করেছে। কিছুদিন পরই তারা প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা করবে।
কাজি ফাযিলের বার্তা পেয়ে সুলতান তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং এ বছর হজ আদায়ের সংকল্প ত্যাগ করে তা সবাইকে জানিয়ে দেন। এরপর তিনি পুরো রমজান মাস আল-কুদসেই অবস্থান করে সিয়াম, সালাত ও কুরআন তিলাওয়াতে কাটিয়ে দেন। যখনই কোনো ফিরিঙ্গি শাসক-প্রশাসক আল-কুদস ভ্রমণে আসত, সুলতান তাদের সর্বোচ্চ আতিথেয়তা প্রদান করতেন। প্রতিটি খ্রিষ্টরাজ্যের রাজন্যবর্গ ছদ্মবেশে আল-কিয়ামা গির্জা পরিদর্শনে আগমন করত এবং পরিচয় গোপন রেখে সুলতানের দস্তরখানে উপস্থিত সবার সঙ্গে শরিক হতো।
সুলতান এসব বিস্তারিত জানতেন না। তাই তিনি তাদের প্রতি যথেষ্ট সম্মানমূলক আচরণ করতেন এবং সদাচরণ ও অনুগ্রহ প্রদর্শন করতেন। (৯৭)
এভাবেই উভয় পক্ষের মাঝে 'রামলা চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ধারা হলো—
* ক্রুসেডাররা সুর (Tyre) থেকে হাইফা (Haifa) পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করতে পারবে।
* কোনোপ্রকার 'দর্শনার্থী মাশুল' প্রদান ছাড়াই খ্রিষ্টানরা আল-কুদসে ভ্রমণ করতে পারবে।
* আগামী তিন বছর আট মাস উভয় পক্ষের মাঝে শান্তি অবস্থা বিরাজমান থাকবে।
এই চুক্তি সম্পাদনের কারণে ইংরেজ রাজা ১ম রিচার্ড ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। চুক্তি সম্পাদনের কিছুদিন পরই তিনি শামের উপকূলীয় অঞ্চল ত্যাগ করে নিজ দেশে ফিরে যান।
এভাবেই দীর্ঘ পাঁচ বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, অসংখ্য প্রাণহানি ও বিভিন্ন নগরী সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হওয়ার পর তৃতীয় ক্রুসেড যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। তৃতীয় ক্রুসেড যুদ্ধে জার্মানি হারায় তাদের রাজাকে, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড হারায় তাদের নির্বাচিত ও সুদক্ষ অনেক সৈনিক ও সেনাপতিকে। যদিও সম্মিলিত ক্রুসেডার বাহিনী বাইতুল মুকাদ্দাসসহ শামের বিভিন্ন অঞ্চল জয়ের স্বপ্ন নিয়ে অভিযানে বের হয়েছিল; কিন্তু তাদের চেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। এ অভিযানে তারা কেবল আক্কা অধিকার করতে সক্ষম হয়। তৃতীয় ক্রুসেড অভিযানে ইউরোপিয়ান বাহিনী যে পরিমাণ ভোগান্তি ও ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে, কোনোকিছুর বিনিময়েই তার প্রতিকারবিধান সম্ভব ছিল না। অপরদিকে সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রহ.-এর দিক থেকে বিবেচনা করলে বলতে হয়, আরসুফ ও জাফার যুদ্ধে প্রচুর সৈন্যক্ষয় এবং শাম অঞ্চলের প্রশাসকদের অসহযোগিতার কারণে তিনি কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জনে ব্যর্থ হন এবং যেকোনো মূল্যে আল-কুদসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে উপকূলীয় অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
এরপর সুলতান সালাহুদ্দিনের সুশাসনে জনসাধারণ নিরাপদে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকে। তার উদার আচরণের কারণে বাইতুল মুকাদ্দাসে খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের আগমনের হারও প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যায়। ইংল্যান্ড অধিপতি ১ম রিচার্ড অধিক হারে তীর্থযাত্রীদের আগমনে সুলতান সালাহুদ্দিনের ক্রুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা করে সুলতানের কাছে বার্তা প্রেরণ করেন যে, তিনি যেন বাইতুল মুকাদ্দাসে তীর্থযাত্রীদের অবাধ প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন এবং রাজা রিচার্ডের লিখিত পত্র বা নিদর্শন ছাড়া কাউকে সেখানে প্রবেশের অনুমতি না দেন। কিন্তু সুলতান এ প্রস্তাবে অসম্মতি জানিয়ে প্রত্যুত্তরে লেখেন, তারা এত দূর থেকে এই পবিত্র স্থান পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে এসে পৌঁছেছে। আমি তাদের বাধাদান মোটেও বৈধ মনে করি না।
এর কিছুদিন পরই মহান সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি অসুস্থ হয়ে পড়েন। বারো দিন অসুস্থ থাকার পর ৫৮৯ হিজরি সনের ২৭ সফর (১১৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ৩ মার্চ) বুধবার তার বিদেহী আত্মা পরম প্রভুর সান্নিধ্যে গমন করে। সুলতান সালাহুদ্দিনের বিদায়ের দিন ছিল খোলাফায়ে রাশিদিন-পরবর্তী সময়ে ইসলাম ও মুসলিম জাতির জন্য সবচেয়ে দুর্যোগপূর্ণ দিন।
বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধারকারী এই মহান মুসলিম বীর যখন ইন্তেকাল করেন, তখন তার ব্যক্তিগত সঞ্চয়ে ছিল মাত্র সাতচল্লিশটি দিরহাম এবং একটি দিনার! এ ছাড়া অন্য কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তার ছিল না।
তার মৃত্যুর সময় মানুষ মনে করেছিল যে, তিনি তার লালিত স্বপ্ন 'মসজিদুল আকসা মুক্তকরণ' পূর্ণ করেই মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা ছিল আরও অনেক উচ্চ ও বিস্তৃত। তিনি একদিন আপন আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে বলেছিলেন, 'আমার তামান্না হলো—আল্লাহ তাআলা যখন অবশিষ্ট উপকূলীয় অঞ্চলও জয় করা সহজ করে দেবেন, তখন আমি পুরো রাজ্যকে সুবিন্যস্তরূপে বণ্টন করে প্রশাসকদের হাতে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেবো আর নিজে সমুদ্রপৃষ্ঠ পাড়ি দিয়ে দ্বীপে-দ্বীপে অভিযান চালিয়ে কাফেরদের পশ্চাদ্ধাবন করব। এরইমধ্যে হয়তো আমার ডাক এসে যাবে কিংবা আল্লাহর জমিনে কোনো কাফির-অস্বীকারকারী বাকি রাখব না।'
সুলতান সালাহুদ্দিনের ইন্তেকালের পর তার পুত্র আল-আজিজ ইমাদুদ্দিন শাসনক্ষমতা গ্রহণ করেন। কিন্তু শুরুতেই তিনি তার ভাই দামেশকের প্রশাসক আফজালের সঙ্গে বিরোধ ও লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন। দু-ভাইয়ের সংঘাতের সমাপ্তি ঘটে আফজালকে দামেশক থেকে নির্বাসিত করার মাধ্যমে। দামেশকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন সালাহুদ্দিনের ভাই ও জাযিরার প্রশাসক আল-আদিল সাইফুদ্দিন মুহাম্মাদ। সাইফুদ্দিন অত্যন্ত দূরদর্শী ও প্রাজ্ঞ শাসক ছিলেন। দামেশকের অভ্যন্তরীণ সমস্যাদি দমন করার পর শামের সকল অঞ্চল তার বশীভূত হয়ে যায়।
৫৯৫ হিজরি সনে (১১৯৮ খ্রিষ্টাব্দে) আল-আজিজ ইমাদুদ্দিন ইন্তেকাল করেন। তখন তার চাচা সাইফুদ্দিন মিশরে এসে সালাহুদ্দিনের অপর দুই পুত্রকে পরাভূত করেন এবং নতুন শাসক (আল-আজিজ ইমাদুদ্দিনের পুত্র) মানসুর বিন আল-আজিজকে বরখাস্ত করে মিশরের শাসনভার গ্রহণ করেন। তখন মানসুরের বয়স ছিল মাত্র নয় বছর। ৫৯৬ হিজরি সনের মধ্যে সালাহুদ্দিনের রাষ্ট্রের অধিকাংশ অঞ্চল আল-আদিল সাইফুদ্দিনের আয়ত্তে চলে আসে। তার শাসনাধীন মিশর রাষ্ট্র পরিণত হয় সমকালীন বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্রে।
৫৯৭ হিজরিতে মিশরে প্রথমে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং তারপর ব্যাপক মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে মিশরের পরিস্থিতি বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু এর মাঝেও সুলতান আল-আদিল রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুতকরণে সামান্য ছাড় না দিয়ে মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার এবং ক্রুসেডারদের দমনে একক শক্তিতে পরিণত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন।
৫৯৩ হিজরি সনে সুলতান আল-আদিল সাইফুদ্দিন যখন শাম অঞ্চলে রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুতকরণে ব্যস্ত ছিলেন, তখন ক্রুসেডাররা জার্মানির সামরিক সহায়তা লাভ করে। মুসলমানদের পারস্পরিক বিভেদের সুযোগ নিয়ে তারা এ সময় আবারও বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে। ক্রুসেডার বাহিনী যুদ্ধে সাইফুদ্দিনকে পরাজিত করে তার কাছ থেকে বৈরুতের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেয়। কিন্তু এরপরই তারা নিজেদের মধ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। আল-আদিল সাইফুদ্দিন জাফা ও রামলা ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে তাদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করেন। তার ধারণা ছিল—এর ফলে তিনি তার অবস্থান সুদৃঢ় করার সুযোগ লাভ করবেন।

টিকাঃ
৯৪. Guillaume de Tyr, 1, p. 354.
৯৫. Raymond d'Aigles, p. 300.
৯৬. মূল নাম আবদুর রহিম বায়সানি। ‘কাজি ফাযিল' নামে ইতিহাসে খ্যাত। তিনি ছিলেন সমকালীন শ্রেষ্ঠতম লেখক ও সাহিত্যিক। সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি তাকে আপন উজির ও উপদেষ্টা নিযুক্ত করেছিলেন। সালাহুদ্দিন আইয়ুবি তার সম্পর্কে মন্তব্য করেন—'তোমরা এ কথা ভেবো না যে, আমি সৈন্যবলে ও তোমাদের তরবারির জোরে রাজ্য বিস্তৃত করি; আমি তো রাজ্য জয় করি কাজি ফাযিলের কলমের মাধ্যমে।' কাজি ফাযিলের জন্ম ৫২৯ হিজরি সনে (১১৩৫ খ্রিষ্টাব্দে) ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের আসকালানে আর মৃত্যু ৫৯৬ হিজরি সনে (১২০০ খ্রিষ্টাব্দে) কায়রোতে।
৯৭. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১২/৩২২-৩২৫।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 চতুর্থ ক্রুসেড

📄 চতুর্থ ক্রুসেড


[৫৯৯-৬০০ হিজরি/১২০২-১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ]
সুলতান সালাহুদ্দিনের মৃত্যুর পরই তার কাছে হৃত ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে খ্রিষ্টানদের প্রধান ধর্মীয় গুরু পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট (Innocent III) ইউরোপে নতুন ক্রুসেডের ডাক দেন।
এবারের অভিযানে নেতৃত্ব প্রদান করে ফ্রান্সের আঞ্চলিক রাজন্যবর্গ। তারা ফ্রান্স থেকে প্রথমে মিশরে অভিযান পরিচালনার, এরপর বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
কিন্তু এরইমধ্যে কনস্টান্টিনোপলে বাইজান্টাইন সম্রাট ২য় ইসহাক (Isaac II Angelos) তার বিরুদ্ধে পরিচালিত এক বিদ্রোহে ক্ষমতাচ্যুত হন এবং তার পুত্র ৪র্থ অ্যালেক্সিয়াস (Alexius IV Angelus) পালিয়ে পশ্চিম ইউরোপে এসে পোপ ও ক্রুসেডারদের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করেন। বিনিময়ে তিনি পূর্ব ইউরোপের অর্থোডক্স চার্চকে পোপের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়ার এবং ক্রুসেডারদের মিশর অভিযানে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য কর্তৃক সামরিক সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন।
ফলে সংগঠিত ক্রুসেড শক্তি নিজেদের লক্ষ্যপথ পরিবর্তন করে এবার কনস্টান্টিনোপল অভিমুখী হয়। ক্রুসেডাররা কনস্টান্টিনোপলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সেখানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। পরিস্থিতি এত শোচনীয় হয়ে পড়ে যে, অনেক বাইজান্টাইন নাগরিক তখন মনে-প্রাণে কামনা করছিল—হায়! এর পরিবর্তে যদি কনস্টান্টিনোপল মুসলমানদের কর্তৃত্বে চলে যেত! ক্রুসেডাররা বিভিন্ন গির্জা ও উমাইয়া শাসনামলে নির্মিত প্রাচীন মসজিদটি জ্বালিয়ে দেয় এবং নগরীজুড়ে ব্যাপক লুটতরাজ চালায়। ক্রুসেডারদের আগ্রাসনের কারণে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং কয়েকটি রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
এই অভিযানের ফলে (বিভক্ত হওয়ার পর) প্রথমবারের মতো প্রাচ্যকেন্দ্রিক অর্থোডক্স চার্চ পশ্চিমা ক্যাথলিক চার্চের বশীভূত হয়ে পড়ে। এরপর ক্রুসেড যোদ্ধাদের যুদ্ধস্পৃহায় ভাটা সৃষ্টি হয় এবং মিশর ও বাইতুল মুকাদ্দাস অভিযানের চিন্তা বাতিল হয়ে যায়। খ্রিষ্টানদের এই পূর্ব-পশ্চিমের ব্যাপক সংঘাত শামের স্থলপথকে অত্যন্ত দুর্গম ও বিপজ্জনক করে তোলে। ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে গবেষণাকারী জনৈক ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছেন—
নিঃসন্দেহে চতুর্থ ক্রুসেড অভিযান ছিল এ বিষয়ের সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা যে, পুরো ক্রুসেড পরিকল্পনাটাই একটি ব্যর্থ পরিকল্পনা।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 পঞ্চম ক্রুসেড

📄 পঞ্চম ক্রুসেড


[৬১০-৬১৮ হিজরি/১২১৩-১২২১ খ্রিষ্টাব্দ]
৬১০ হিজরি সনে (১২১৩ খ্রিষ্টাব্দে) পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট পঞ্চম ক্রুসেড অভিযানের ডাক দেন। চতুর্থ অভিযানের মতো এবারও লক্ষ্য ছিল আইয়ুবি রাষ্ট্রকে পরাভূত করে আল-কুদস পুনর্দখল করা। পোপের নির্দেশে পরবর্তী দু-বছর ক্যাথলিক ইউরোপজুড়ে ক্রুসেড অভিযানের প্রচারণা চালানো হয়। ৬১২ হিজরি সনের রজব মাসে (১২১৫ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে) রোমে পোপের নেতৃত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং পুরো অভিযানের রূপরেখা চূড়ান্ত করার পাশাপাশি অভিযানে রওনা হওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয় ১২১৭ খ্রিষ্টাব্দ।
পঞ্চম ক্রুসেডে যেসব ইউরোপিয়ান শাসকগণ নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলো—
• ডিউক অব অস্ট্রিয়া ৬ষ্ঠ লিওপোল্ড (Leopold VI)।
• হাঙ্গেরির রাজা ২য় অ্যান্ড্রু (Andrew II)।
• সাইপ্রাসের শাসক ১ম হিয়ো (Hugh I)।
• কাউন্ট অব ত্রিপোলি ৪র্থ বোহেমন্ড (Bohemond IV of Antioch)।
অবশ্য অভিযান শুরু হওয়ার পূর্বেই ৬১৩ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে (১২১৬ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে) পোপ ৩য় ইনোসেন্ট ইহধাম ত্যাগ করেন। আর অভিযান শুরু হতে না হতেই হাঙ্গেরির রাজা ২য় অ্যান্ড্রু নিজ দেশে ফিরে যান।
ক্রুসেডাররা মিশরে পৌঁছার পূর্বেই ৬১৫ হিজরি সনে (১২১৮ খ্রিষ্টাব্দে) সুলতান আল-আদিল সাইফুদ্দিন মাহমুদ মৃত্যুবরণ করেন। এরপর আইয়ুবি রাষ্ট্রের হাল ধরেন তার পুত্র আল-কামিল মুহাম্মাদ।
ক্রুসেডার বাহিনী মিশর অভিমুখে অগ্রসর হয় এবং তুমুল লড়াইয়ের পর ১২১৯ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে দিমইয়াত দখল করে নেয়। আল-কামিল দিনরাত তাদের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখলেও তাদেরকে দিমইয়াত থেকে সরাতে ব্যর্থ হন। বাধ্য হয়ে তিনি ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দকে দিমইয়াত ত্যাগের বিনিময়ে প্রলুব্ধকর সন্ধিচুক্তির প্রস্তাব দেন। কিন্তু নিজেদের সামরিক শক্তি ও সংখ্যাধিক্যের গর্বে অন্ধ ক্রুসেড শক্তি সরাসরি সন্ধিপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং কায়রো অভিমুখে অগ্রসর হয়।
ক্রুসেডার বাহিনী তিনদিক থেকে জলভাগ দ্বারা বেষ্টিত একটি এলাকা দিয়ে কায়রোর দিকে অগ্রসর হয়। এলাকাটি পূর্ব দিক থেকে মানজালা হ্রদ (Lake Manzala), পশ্চিম দিক থেকে দিমইয়াত (শাখা) নদী এবং দক্ষিণ দিক থেকে আল-বাহরুস সাগির দ্বারা বেষ্টিত ছিল। ইসলামি নৌবহর তাদের প্রতিরোধের জন্য নীলনদে অবস্থান নিয়েছিল।
নীলনদে তখন ভরা জোয়ার চলছিল। মুসলমানরা নদীর বিভিন্ন বাধ কেটে দিলে উক্ত এলাকা পানিতে ডুবে যায় এবং ক্রুসেডারদের সামনে গমনের পথ বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে তারা দিমইয়াতে ফিরে যেতে উদ্যত হয়। কিন্তু দিমইয়াতে প্রত্যাবর্তনের একমাত্র সংকীর্ণ পথটিতে আল-কামিল তার সৈন্যদের মোতায়েন করে রেখেছিলেন। আল-কামিলের সৈন্যরা এবার ক্রুসেডারদের পথ আগলে দাঁড়ায়।
অবরুদ্ধ ও কোণঠাসা ক্রুসেডাররা এবার নিজেরাই সন্ধিচুক্তির আবেদন জানায়। আল-কামিল এই শর্তে তাদের সঙ্গে চুক্তি করতে সম্মত হন যে, তারা দিমইয়াত অঞ্চল মুসলমানদের কাছে সমর্পণের প্রতিশ্রুতি পূরণে বাধ্য হওয়ার জন্য আপাতত কয়েকজন খ্রিষ্টান রাজন্যকে জামানতস্বরূপ আল-কামিলের হাতে তুলে দেবে। অবশেষে ৬১৮ হিজরি সনের রজব (১২২১ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট) মাসে ক্রুসেডাররা দিমইয়াত ত্যাগ করে। আল্লাহর অনুগ্রহে আল-কামিল দিমইয়াতে প্রবেশ করেন। এভাবেই ইউরোপের খ্রিষ্টানশক্তির পঞ্চম ক্রুসেড অভিযানও পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ষষ্ঠ ক্রুসেড

📄 ষষ্ঠ ক্রুসেড


[৬২৫-৬২৬ হিজরি/১২২৮-১২২৯ খ্রিষ্টাব্দ]
৬২৫ হিজরি সনে (১২২৮ খ্রিষ্টাব্দে) জার্মানির রাজা ২য় ফ্রেডেরিক (Frederick II) খ্রিষ্টরাজ্য বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসনক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে অভিযান পরিচালনার মনস্থ করেন। ইউরোপীয় সম্মিলিত বাহিনী তার সঙ্গে এ অভিযানে যোগ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ফ্রেডেরিকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বেচ্ছাচারিতার কারণে পোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের খ্রিষ্টান রাজন্যবর্গ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয় এবং তার সঙ্গে অভিযানে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। অবশেষে ফ্রেডেরিক একাই মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
অন্যান্য খ্রিষ্টান রাজার তুলনায় ফ্রেডেরিকের মাঝে গোঁড়ামি কম থাকায় পোপ মনে করতেন যে, ফ্রেডেরিক বোধহয় মুসলমানই হয়ে গেছে! ফ্রেডেরিক মুসলমানদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করতেন।
আইয়ুবি রাষ্ট্র তখন ভেতর-বাহির উভয় দিক থেকেই হুমকির সম্মুখীন ছিল। একদিকে সুলতান আল-কামিলের সঙ্গে তার ভাই মুআযযাম ও আশরাফের প্রচণ্ড বিরোধ চলছিল এবং একে কেন্দ্র করে পারস্পরিক লড়াইয়ের উপক্রম হয়েছিল, অপরদিকে বাইরে থেকে খোয়ারিজমিরাও আইয়ুবি সাম্রাজ্যের ঘাড়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছিল। চেঙ্গিস খানের আগ্রাসনে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়া খোয়ারিজমিরা তখন ইস্পাহানে সমবেত হয়ে শক্তি সঞ্চয়ে সচেষ্ট ছিল এবং ধীরে ধীরে শাম ও ইরাকের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। দ্বিমুখী চাপে অস্থিরপ্রায় আইয়ুবি সুলতান আল-কামিল যখন জানতে পারেন যে, নতুন বিপদরূপে জার্মানির রাজা ফ্রেডেরিক আবির্ভূত হতে যাচ্ছেন, তখন তিনি ফ্রেডেরিকের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করেন। চুক্তির শর্তের মধ্যে ছিল—আল-কামিল আল-কুদস, (তীর্থযাত্রীদের যাত্রাপথে অবস্থিত) আক্কা ও জাফার নিয়ন্ত্রণ ফ্রেডেরিকের হাতে ছেড়ে দেবেন এবং বন্দি ফিরিঙ্গিদের মুক্তি দেবেন। অপরদিকে আল-কামিল যখন যেকোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন, হোক সে খ্রিষ্টান, ফ্রেডেরিক তখন কামিলকে সহায়তা করবেন এবং পরবর্তী সাড়ে দশ বছর শামে অন্যান্য ক্রুসেড শাসকের কাছে কোনো ধরনের সামরিক সাহায্য পৌঁছতে বাধা প্রদান করবেন। এভাবে জার্মানির রাজা ফ্রেডেরিক বিনা যুদ্ধেই আল-কুদসের কর্তৃত্ব লাভ করেন। নিঃসন্দেহে এটি ছিল আইয়ুবি সুলতান আল-কামিলের জীবনের অন্যতম গর্হিত অন্যায়। তার এই নির্বুদ্ধিতার কারণে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি কর্তৃক পুনরুদ্ধারের মাত্র বিয়াল্লিশ বছর পর মুসলমানরা আবারও আল-কুদসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।
ফ্রেডেরিকের সঙ্গে সমঝোতা করার পর সুলতান আল-কামিল এবার তার পূর্ণ শক্তি ব্যয় করেন নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে তাদের শাসনাধীন অঞ্চল কেড়ে নেওয়ার কাজে। অবশেষে আইয়ুবি পরিবারের সকল প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাভূত করে তিনি পুরো অঞ্চল নিজের কর্তৃত্বে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। এ সময় প্রায় নয় বছর তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে কোনো লড়াই করেননি। আল-কামিল মুহাম্মাদ তার শাসনামলের শেষদিকে ৬৩৫ হিজরি সনে দামেশক দখলের উদ্দেশ্যে অভিযানে বের হন এবং দামেশক জয় করেন। এ বিজয়ের কিছুদিন পরই তিনি ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর পর আইয়ুবি পরিবারের প্রশাসকদের পারস্পরিক সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
সুলতান আল-কামিল একজন কর্মোদ্যমী শাসক ছিলেন। সেচব্যবস্থার সংস্কার ও কৃষিশিল্পে ব্যাপক কাজ করায় তার শাসনামলে মিশরে প্রভূত উন্নতি হয়। অর্থনৈতিক উন্নতি সাধিত হয়। তিনি সালাহুদ্দিন দুর্গের(৯৮) নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন এবং প্রচুর ধর্মীয় শিক্ষাঙ্গন প্রতিষ্ঠা করেন। আইয়ুবি রাজপরিবারের অধিকাংশ সদস্যের ন্যায় তিনিও জ্ঞানানুরাগী ও আলিমদের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। হাদিস শ্রবণ ও দ্বীনি আলোচনার জন্য প্রতি শুক্রবার রাতে তিনি উলামায়ে কেরামের মজলিসে শরিক হতেন।
কিন্তু নিজের ক্ষমতা রক্ষা করার জন্য তিনি মুসলমানদের পবিত্র ভূমি রক্ষায় শিথিলতা করেছেন এবং আল-কুদস-সহ বিভিন্ন ইসলামি ভূখণ্ড খ্রিষ্টানদের হাতে তুলে দিতে দ্বিধা করেননি। তাহলে তার নাগরিক উন্নয়ন এবং জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানপ্রীতির কী মূল্যই-বা আছে?! সুলতান আল-কামিলকে তার সেই সাধের ক্ষমতা ত্যাগ করতে হয়েছে, ত্যাগ করতে হয়েছে পৃথিবীর মায়া, ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেনি তার পরবর্তী আইয়ুবি প্রজন্মও; কিন্তু ইতিহাস আজও সযত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছে ইসলাম ও ইসলামি ভূখণ্ডের প্রতি তার সেই অবহেলা ও অন্যায় আচরণের দাস্তান।
আল-কামিলের মৃত্যুর পর তার পুত্র (২য় আদিল) সাইফুদ্দিন আবু বকর তার স্থলাভিষিক্ত হন। কিন্তু তিনি শাসনকার্যে মনোযোগী হওয়ার পরিবর্তে খেল-তামাশায় মত্ত ছিলেন। ফলে প্রশাসকগণ মিলে দু-বছর পর ৬৩৭ হিজরি সনে তাকে অপসারণ করে।
এরপর আইয়ুবি রাষ্ট্রের হাল ধরেন আল-কামিলের আরেক পুত্র আল-মালিকুস সালিহ আইয়ুব। সালিহ আইয়ুব ছিলেন আইয়ুবি রাষ্ট্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক। তিনি সবধরনের ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা নির্মূল করে যথাযথভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। সুলতান আইয়ুব ৬৩৮ হিজরি সনে নীলনদের রওজা দ্বীপে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন এবং প্রচুর তুর্কি মামলুক (ক্রীতদাস) ক্রয় করে সেখানে জড়ো করেন। অষ্টম আব্বাসি খলিফা মুতাসিম যেমন সেনাবাহিনীতে প্রচুর পরিমাণ তুর্কি ক্রীতদাস অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে তারাই তার সন্তানদের হাত থেকে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব কেড়ে নিয়েছিল, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে সুলতান আস-সালিহ আইয়ুবের ক্ষেত্রেও। তার সংগৃহীত এসব তুর্কি ক্রীতদাসই পরে তার বংশধরদের হাত থেকে আইয়ুবি রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব কেড়ে নেয় এবং মামলুক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। রওজা দ্বীপে সংগঠিত হওয়ায় ইতিহাসে তারা ‘বাহরি মামলুক’ নামে পরিচিত।
সুলতান আস-সালিহ আইয়ুবের চাচা সালিহ ইসমাইল ছিলেন তার অন্যতম প্রতিপক্ষ। তিনি দামেশক দখল করে নেন এবং ক্রুসেডারদের সঙ্গে আঁতাঁত করে তাদের হাতে বিভিন্ন অঞ্চল ছেড়ে দেন। পরে সুলতান আইয়ুব বিভিন্ন খোয়ারিজম গোত্রের সহায়তা নিয়ে শত্রুদের পরাভূত করেন।
দ্বিতীয়বার আল-কুদস পুনরুদ্ধার
সুলতান আস-সালিহ আইয়ুব ৬৪২ হিজরি সনে (১২৪৪ খ্রিষ্টাব্দে) আল-কুদস পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দেন। তেরো হাজার সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে তিনি রওনা হন আল-কুদস অভিমুখে। সংবাদ পেয়ে শামের বিভিন্ন এলাকার ক্রুসেডাররা সমবেত হয়ে ব্যাপক সৈন্যসমাবেש ঘটায়। পরিতাপের বিষয়, এ সময় হিমস ও আলেপ্পোসহ শামের বিভিন্ন এলাকার আইয়ুবি প্রশাসকগণ ক্রুসেডারদের সমর্থন জানায় এবং আল-মালিকুস সালিহের বাহিনীর প্রতিরোধের লক্ষ্যে ক্রুসেডারদের সঙ্গে নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে জড়ো হয়! সম্মিলিত বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় বিশ হাজার। আল-কুদসের পথে গাজার নিকটে আল-মালিকুস সালিহের বাহিনী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয় এবং তাদেরকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। এরপর তারা সামনে অগ্রসর হয়ে আল-কুদস অবরোধ করে। মুসলিম বাহিনীর প্রবল আক্রমণে এগারো হাজার সৈন্যবিশিষ্ট আল-কুদসের স্থানীয় ক্রুসেডার বাহিনীর প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে; পনেরো বছর পর আবারও আল-কুদসে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
এরপর থেকে একটানা ছয়শ তিরানব্বই বছর পবিত্র আল-কুদস নগরী ইসলামি শাসনাধীন ছিল। ১৩৩৫ হিজরি সনে (১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে) ব্রিটিশ বাহিনী আল-কুদস দখল করে নেয় এবং পরবর্তী সময়ে ইহুদিদের হাতে তুলে দেয়।
সুলতান আইয়ুব ৬৪৩ হিজরি সনে দামেশক এবং ৬৪৫ হিজরি সনে আসকালান পুনরুদ্ধার করেন। এভাবে আইয়ুবি রাষ্ট্র পুনরায় তার পিতামহ আল-মালিকুল আদিল সাইফুদ্দিনের শাসনামলের ন্যায় বিস্তৃতি লাভ করে।

টিকাঃ
৯৮. সালাহুদ্দিন দুর্গ: মিশরের কায়রোতে আল-মুকাত্তাম পাহাড়ের পাদদেশে প্রতিষ্ঠিত একটি দুর্গ। এটি আল-জাবাল দুর্গ ও কায়রো দুর্গ (The Citadel of Cairo) নামেও পরিচিত। প্রথম আইয়ুবি সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি দুর্গটির নির্মাণকাজ শুরু করেন আর পঞ্চম আইয়ুবি সুলতান আল-কামিলের হাতে এর নির্মাণ সমাপ্ত হয়। আল-কামিলের শাসনকাল থেকে পরবর্তী ছয় শতকের অধিক কাল ধরে সালাহুদ্দিন দুর্গই ছিল মিশর শাসকের সরকারি বাসভবন। সালাহুদ্দিন দুর্গকে মধ্যযুগে নির্মিত অন্যতম দুর্ভেদ্য সামরিক দুর্গ মনে করা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00