📄 আল-কুদস পুনরুদ্ধার
583 হিজরি সনের জুমাদাল উলা মাসে সুলতান সালাহুদ্দিন আক্কায় (Acre) প্রবেশ করেন। মুসলিম বাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে সেখানকার ক্রুসেডাররা পালিয়ে সুর (Tyre) নগরীতে চলে যায়। এরপর সালাহুদ্দিন তিবনিন (Tebnine), সিডোন (Sidon), ব্যাবলস (Byblos) ও বৈরুতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর তিনি উপকূলীয় পথ ধরে আসকালানে পৌঁছে আসকালান অবরোধ করেন। চৌদ্দ দিনের অবরোধের পর আসকালানবাসী আত্মসমর্পণ করে। এর মাধ্যমে একদিকে বাইতুল মুকাদ্দাস অবরোধ করার পথ সুগম হয়, অপরদিকে উপকূলীয় পথ ধরে বহির্বিশ্ব থেকে সাহায্য আগমনের পথও বন্ধ হয়ে যায়।
রামলা, দারুম, গাজা, বেথেলহাম, নাতরুন ইত্যাদি এলাকা বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করলে সালাহুদ্দিন আইয়ুবি এবার বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখী হন। তিনি সেখানে কোনো রক্তপাত ঘটাতে চাননি। কিন্তু ক্রুসেডাররা আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে সুলতান সালাহুদ্দিন বাধ্য হয়ে শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে বাইতুল মুকাদ্দাসে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ফিরিঙ্গিরা সন্ধিচুক্তি করতে সম্মত হয় এবং এই শর্তে চুক্তি সম্পাদিত হয় যে—আগামী চল্লিশ দিন তাদেরকে বাইতুল মুকাদ্দাস ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। বিনিময়ে পুরুষগণ জনপ্রতি দশ দিনার, নারীগণ জনপ্রতি পাঁচ দিনার এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিনিময়ে জনপ্রতি দুই দিনার প্রদান করতে হবে। কেউ নির্ধারিত দিনার প্রদান করতে না পারলে সে বন্দি বিবেচিত হবে। যারা শর্ত মেনে প্রস্থান করবে, তাদেরকে নিরাপদে সুর নগরীতে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
বাইতুল মুকাদ্দাস জয় করার পর মুসলমানরা প্রথম জুমা মসজিদুল আকসায় আদায় করতে পারেনি। তারা এ সময় ক্রুশ, খ্রিষ্টান সন্ন্যাসী ও শূকর ইত্যাদি সরিয়ে মসজিদ পরিষ্কার করায় ব্যস্ত ছিল।
583 হিজরি সনের ২7 রজব (1187 খ্রিষ্টাব্দের ২ অক্টোবর) মসজিদুল আকসায় প্রথম খুতবা প্রদান করেন দামেশকের কাজি মুহিউদ্দিন ইবনুয যাকি। তিনি তার খুতবায় বলেন—
উপস্থিত লোকসকল! আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের সুসংবাদ গ্রহণ করো। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই হচ্ছে মুমিন বান্দার চূড়ান্ত লক্ষ্য ও সর্বোচ্চ মর্যাদাপ্রাপ্তি। এ সুসংবাদ বাস্তবায়িত হয়েছে আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে তোমাদের হাতে এই হৃত ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে, দীর্ঘ প্রায় এক শতাব্দী মুশরিকদের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার পর আপন অবস্থানে ইসলামের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে এবং আল্লাহ তাআলার এই মহান ঘরকে পবিত্র করার মাধ্যমে। তিনি এ ঘরকে সমুন্নত ও উচ্চ মর্যাদা দানের নির্দেশ দিয়েছেন এবং এখানে তার নাম উচ্চারণের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা তোমাদের মাধ্যমে এখানে ছড়িয়ে পড়া শিরকের মূলোৎপাটন করেছেন, আপন দ্বীনের রীতি-নীতি চালু করেছেন এবং তার একত্ববাদের নীতিমালা সমুন্নত করেছেন। কেননা, এ নগরী তো একত্ববাদের নীতিমালার ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ নগরী হচ্ছে তোমাদের পিতা ইবরাহিমের আবাসভূমি, তোমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মিরাজের সূচনাভূমি। ইসলামের প্রাথমিক যুগে এই মসজিদুল আকসা ছিল তোমাদের নামাজের কিবলা। এ ভূখণ্ড নবীগণের আবাসস্থল, আউলিয়ায়ে কেরামের গন্তব্যস্থল, রাসুলগণের কেন্দ্রস্থল এবং ওহি অবতরণস্থল। এখানেই অবতীর্ণ হয়েছে কত শত বিধিবিধান, আদেশ-নিষেধ। এ হচ্ছে সমাবেশস্থল ও উত্থানস্থল। এই সেই পবিত্র ভূমি, যার কথা আল্লাহ তাআলা তার মহাগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
এই সেই মসজিদ, যেখানে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নৈকট্যশীল ফিরেশতাদের নিয়ে নামাজ আদায় করেছেন। এই সেই ভূমি, যেখানে আল্লাহ তাআলা তার বান্দা, রাসুল এবং মরিয়মের উদ্দেশে প্রেরিত 'কালিমা' ও রুহ ঈসাকে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা তাকে রিসালাত ও নবুওয়তের মর্যাদা দান করে সম্মানিত করেছেন, আবদিয়াত ও দাসত্বের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করেননি। আল্লাহ তাআলা বলেন-
( لَنْ يَسْتَنكِفَ الْمَسِيحُ أَنْ يَكُونَ عَبْدًا لِلَّهِ
মাসিহ কখনো আল্লাহর বান্দা হওয়াকে লজ্জার বিষয় মনে করে না। [সুরা নিসা : ১৭২]
তিনি আরও ইরশাদ করেন—
لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ )
যারা বলে—মারিয়াম-তনয় মাসিহই আল্লাহ, তারা নিশ্চিত কাফির হয়ে গেছে। [সুরা মায়িদা: ১৭]
এই মসজিদুল আকসা হচ্ছে প্রথম কিবলা, দ্বিতীয় মসজিদ ও তৃতীয় হারাম শরিফ। মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববির পর শুধু এ মসজিদের উদ্দেশ্যেই সফর করা যায়। সেই দুই স্থানের পর কেবল এখানেই কোমর বাঁধা হয়। যদি তোমরা আল্লাহ তাআলার মনোনীত ও নির্বাচিত না হতে, তাহলে তিনি তোমাদেরকে এই মর্যাদায় ভূষিত করতেন না। এ মর্যাদায় আর কেউ তোমাদের অংশীদার নয়, নয় সমকক্ষ। স্বাগত তোমাদের এই মহান বাহিনীকে! যাদের হাতে নববি মুজিজা বাস্তবায়িত হয়েছে, বদরের ঘটনা পুনঃসম্পাদিত হয়েছে এবং সিদ্দিকি দৃঢ়তা, উমরি বিজয়াভিযান, উসমানি বাহিনীপ্রেরণ ও আলাবি প্রচণ্ড হামলার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়েছে।
তোমরা ইসলামের জন্য কাদিসিয়া, ইয়ারমুক ও খায়বারের ইতিহাসের নবায়ন করেছ, আবার ফিরিয়ে এনেছ খালিদের বীরত্বের স্মৃতি। আর তাই আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের নবীর পক্ষ হতে উত্তম বিনিময় দান করুন।...