📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 আইয়ুবি রাষ্ট্রের সুলতানদের বংশলতিকা

📄 আইয়ুবি রাষ্ট্রের সুলতানদের বংশলতিকা


[নামের পাশে বন্ধনীতে উল্লেখিত নাম্বার দ্বারা সুলতানদের ক্রমধারা বোঝানো হয়েছে]
আবুশ শোকর নাজমুদ্দিন আইয়ুব বিন শাযি
শাখা-১:
আল-মালিকুল আদিল আবু বকর সাইফুদ্দিন আহমাদ (৪) (৫৯৭-৬১৫ হি./১২০০-১২১৮ খ্রি.)
আল-মালিকুল কামিল আবুল মাআলি নাসিরুদ্দিন মুহাম্মাদ (৫) (৬১৫-৬৩৫ হি./১২১৮-১২৩৮ খ্রি.)
আল-মালিকুস সালিহ আবুল ফুতুহ নাজমুদ্দিন আইয়ুব (৭) (৬৩৭-৬৪৭ হি./১২৪০-১২৪৯ খ্রি.)
আল-মালিকুল মুআযযাম তুরান শাহ (৮) (৬৪৭-৬৪৮ হি./১২৪৯-১২৫০ খ্রি.)
আল-মালিকুল আদিল আবু বকর সাইফুদ্দিন মুহাম্মাদ (৬) (৬৩৫-৬৩৭ হি./১২৩৮-১২৪০ খ্রি.)
মাসউদ ইউসুফ
আল-মালিকুল আশরাফ মুযাফফারুদ্দিন মুসা (৯)
(বাহরি মামলুকদের হাতে পতন ঘটে)
শাখা-২:
আল-মালিকুন নাসির আবুল মুযাফফার সালাহুদ্দিন ইউসুফ (১) (৫৬৪-৫৮৯ হি./১১৬৯-১১৯৩ খ্রি.)
আল-মালিকুল আজিজ আবুল ফাত্‌হ ইমাদুদ্দিন উসমান (২) (৫৮৯-৫৯৫ হি./১১৯৩-১১৯৯ খ্রি.)
আল-মালিকুল মানসুর নাসিরুদ্দিন মুহাম্মাদ (৩) (৫৯৫-৫৯৭ হি./১১৯৯-১২০০ খ্রি.)

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সালাহুদ্দিন আইয়ুবির পিতা নাজমদ্দিন আইয়ুব বিন শাখির পরিচিতি

📄 সালাহুদ্দিন আইয়ুবির পিতা নাজমদ্দিন আইয়ুব বিন শাখির পরিচিতি


নাজমুদ্দিন আইয়ুব ছিলেন ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম মহান বীর যোদ্ধা। তিনি অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সেলজুক সুলতান মুহাম্মাদ বিন মালিক শাহের সেবক ছিলেন। নাজমুদ্দিনের সততা, বিশ্বস্ততা এবং বীরত্ব ও সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে সুলতান মুহাম্মাদ তাকে তিকরিত দুর্গের প্রশাসক নিযুক্ত করেন। নাজমুদ্দিন সেখানে ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় একদিন মসুলের প্রশাসক সুলতান ইমাদুদ্দিন জিনকি এক যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিকরিতে আগমন করেন। নাজমুদ্দিন তাকে আশ্রয় দেন, তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন এবং তার পূর্ণ সেবা-শুশ্রূষা করেন। পনেরো দিন তার কাছে অবস্থান করার পর ইমাদুদ্দিন মসুলে ফিরে যান। নাজমুদ্দিনের এই নিষ্ঠাপূর্ণ আচরণ সুলতান ইমাদুদ্দিনের হৃদয়ে দাগ কাটতে সক্ষম হয়।
পরবর্তীকালে সেলজুক সুলতান গিয়াসুদ্দিন মাসউদ বিন মুহাম্মাদ তাকে সরিয়ে ইরাকের পুলিশ বিভাগের প্রধান মুজাহিদুদ্দিন নাহরুযকে তিকরিত দুর্গের দায়িত্ব প্রদান করেন। নাজমুদ্দিনও তিকরিতেই বসবাস করতে থাকেন। এর কিছুদিন পর কোনো কারণে নাহরুয নাজমুদ্দিনের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে দুর্গ থেকে বের করে দেন। যে রাতে নাজমুদ্দিন তিকরিত দুর্গ ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, সে রাতেই তার পুত্র সালাহুদ্দিন ইউসুফ ভূমিষ্ঠ হন। বাসস্থান থেকে বিতাড়িত হওয়ার দিন পুত্র সালাহুদ্দিনের আগমনকে তিনি অশুভ মনে করেছিলেন। তখন জনৈক ব্যক্তি তাকে বলে, 'আপনি আজ এই নবজাতককে অশুভ মনে করছেন! এমনকি হতে পারে না যে, একদিন এই নবজাতকের হাতেই এক সুবিশাল ও সুবিখ্যাত রাজত্বের ক্ষমতা থাকবে?!' ইতিহাস সাক্ষী, সেদিনের সেই অজ্ঞাত ব্যক্তিটির আশাবাদ ও শুভকামনা একদিন অক্ষরে অক্ষরে বাস্তব হয়েছিল। তিকরিত ছেড়ে নাজমুদ্দিন আইয়ুব ও তার ভাই আসাদুদ্দিন শিরকুহ মসুলে সুলতান ইমাদুদ্দিনের খেদমতে হাজির হন এবং নিজেদের যোগ্যতা ও নিষ্ঠাপূর্ণ কর্মদক্ষতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে জিনকি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন। পরবর্তী সময়ে সুলতান নুরুদ্দিন জিনকি নাজমুদ্দিন আইয়ুবকে বালাবাক্কুর গভর্নর নিযুক্ত করেন আর তার ভাই আসাদুদ্দিন শিরকুহ পরিণত হন জিনকি সেনাবাহিনীর অন্যতম জ্যেষ্ঠ সেনাপতিতে।
৫৮২ হিজরি সনে বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের অধীনস্থ কারাক অঞ্চলের প্রশাসক রেনাল্ড (Reynald) মুসলমানদের একটি বাণিজ্য কাফেলার ওপর আক্রমণ করে। অথচ বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের সঙ্গে তখন সুলতান সালাহুদ্দিনের শান্তিচুক্তি কার্যকর ছিল এবং চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল, যেকোনো মুসলিম কাফেলা নির্বিঘ্নে মিশর থেকে শামে আসা-যাওয়া করতে পারবে; ক্রুসেডাররা তাতে কোনোপ্রকার বাধা সৃষ্টি করবে না।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 হিত্তিনের যুদ্ধ

📄 হিত্তিনের যুদ্ধ


কিন্তু কারাকের প্রশাসক চুক্তিভঙ্গ করে কাফেলার সদস্যদের বন্দি করে এবং ইসলামের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি চরম ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে বন্দিদেরকে বলে, 'তোমরা যদি মুহাম্মাদের ধর্মে বিশ্বাসী হয়ে থাকো, তাহলে এখন তাকে ডাকো, সে এসে তোমাদের মুক্ত করুক এবং এই বিপদ থেকে উদ্ধার করুক!' সালাহুদ্দিনের কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি রেনাল্ডকে বন্দি করতে পারলে নিজ হাতে হত্যা করার শপথ করেন।
খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের এই চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণের পর সুলতান সালাহুদ্দিন দ্রুত যুদ্ধপ্রস্তুতি গ্রহণ করেন। সময়টি ছিল মুসলিম হাজিদের হজ শেষে হিজায ভূমি থেকে প্রত্যাবর্তনের সময়। কারাকের প্রশাসক রেনাল্ড প্রত্যাবর্তনরত হজ কাফেলার ওপর আক্রমণ করার পরিকল্পনা করছিল। সালাহুদ্দিন তাদের নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে মুসলিম বাহিনী নিয়ে রওনা হন এবং পুরো খ্রিষ্টান বিশ্বের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। সুলতান সালাহুদ্দিন বুছরার সন্নিকটে কাসরুস সালামায় শিবির স্থাপন করেন। মুসলিম হজ কাফেলা নিরাপদে পথ অতিক্রম করা পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করেন। হাজি সাহেবরা এ সময় সালাহুদ্দিনের জন্য নুসরত ও বিজয়লাভের দোয়া করে।
হিত্তিনের যুদ্ধ [রবিউস সানি ৫৮৩ হিজরি] [জুলাই ১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দ]
৫৮৩ হিজরি সনের ১৭ রবিউল আউয়াল সুলতান সালাহুদ্দিন দামেশক থেকে বেরিয়ে আসেন। রাসুল-মা' নামক স্থানে পৌঁছার পর তিনি এলাকাটিকে তার বাহিনীর সৈন্যদের সমবেত হওয়ার কেন্দ্র নির্বাচন করেন। এরপর তিনি তার পুত্র আল-মালিকুল আফজালকে সেখানে রেখে নিজে বুছরা অভিমুখে রওনা হন। অপরদিকে মুযাফফারুদ্দিন কুকুবুরি চলে যান আক্কায়। সালাহুদ্দিন এরপর বুছরা থেকে কারাক ও শাওবাকের (Shoubak) দুর্গের উদ্দেশে গমন করেন; তারপর ফিরে যান তাবারিয়ায় (Tiberias)।
এ সময় এবং পূর্ববর্তী সময়গুলোতে যখনই কেউ সুলতান সালাহুদ্দিনের দিকে তাকাত, তাকে বিষণ্ণ, চিন্তিত ও ভারাক্রান্ত দেখতে পেত। এ সময় তিনি পানাহারের প্রতিও নিরাসক্ত হয়ে পড়েছিলেন; একান্ত বাধ্য হলে সামান্য কিছু খাবার গ্রহণ করতেন। তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দেন, 'বাইতুল মুকাদ্দাস ক্রুসেডারদের হাতে; আমি কীভাবে পানাহার, নিদ্রা আর আনন্দে ডুবে থাকি?' সুলতান সালাহুদ্দিনের বন্ধু ও সঙ্গী কাজি বাহাউদ্দিন ইবনে শাদ্দাদ ক্রুসেড যুদ্ধ চলাকালে সালাহুদ্দিনের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, 'তার কাছে আল-কুদসের বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ ও ভারবাহী ছিল যে, পাহাড়ও তা বহন করতে পারবে না।'
সুলতান সালাহুদ্দিনের বিস্তৃত পরিকল্পনা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে সমকালীন খ্রিষ্টান নেতৃবৃন্দ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সৈন্যসমাবেশ শুরু করে। এরপর তারাও তাবারিয়া অভিমুখে রওনা হয়। উভয় বাহিনী হিত্তিন নামক স্থানে পরস্পর মুখোমুখি হয়। মুসলিম বাহিনী পূর্বেই যুদ্ধক্ষেত্রের আশেপাশের পানির উৎসগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করায় ক্রুসেডার বাহিনী এ সময় প্রচণ্ড পানিস্বল্পতার সম্মুখীন হয়।
উভয় পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধের পর সুলতান সালাহুদ্দিন নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেন। চরমভাবে পরাজিত ক্রুসেডার বাহিনীর একজন সদস্যও পালিয়ে যেতে পারেনি। হয় তারা নিহত হয়; কিংবা বন্দি হয়।
যুদ্ধে নিহত ক্রুসেডার সৈন্যের সংখ্যা ছিল দশ হাজার। যুদ্ধক্ষেত্রেই আক্কার বিশপ নিহত হন এবং তার হাতে থাকা 'সত্য ক্রুশ'(৯০) মাটিতে পড়ে থাকে। মুসলমানরা ক্রুশটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এ ঘটনা ছিল খ্রিষ্টান বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় দুর্যোগ। তারা নিশ্চিত হয়ে যায় যে, তাদের কপালে নিশ্চিত মৃত্যু ও ধ্বংস রয়েছে। এরপর মুসলমানরা পলায়নপর ক্রুসেডারদের পিছু নিয়ে নিকটবর্তী পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করতে থাকে এবং তাদের তরবারির আঘাতে খ্রিষ্টান সৈন্যরা লুটিয়ে পড়তে থাকে। বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা গাই (Guy of Lusignan)-এর পাশে থাকে মাত্র দেড়শ সৈন্য। ক্লান্তি ও ক্ষুৎপিপাসায় একসময় তারা পাহাড় থেকে পড়ে গিয়ে মারা যায়। বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা গাই ও কারকের প্রশাসক রেনাল্ড মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দি হয়।
সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবির জন্য একটি তাঁবু প্রস্তুত করা হয়। তাঁবুতে সুলতানের বিজ্ঞ উপদেষ্টা ও সেনাপতিরা সমবেত হয়। সকলে কৃতজ্ঞতায় আল্লাহর দরবারে সিজদাবনত হয়ে পড়ে। এরপর সুলতানের নির্দেশে বন্দি দুই রাজাকে উপস্থিত করা হয় এবং তাঁবুর ভেতরে বসানো হয়।
প্রচণ্ড পিপাসায় কাতর বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক পানি পান করতে চাইলে তার জন্য ঠান্ডা পানি পরিবেশন করা হয়। সামান্য পানি পান করার পর তিনি অবশিষ্ট পানি রেনাল্ডকে দিতে উদ্যত হলে সালাহুদ্দিন বজ্রকণ্ঠে বলে ওঠেন, 'আমরা এ পানি তাকে পান করার জন্য দিইনি। কাজেই তার নিজেকে নিরাপদ ভাবার কোনো সুযোগ নেই।' ক্রুদ্ধ সুলতান দাঁড়িয়ে যান এবং রেনাল্ডকে তার গর্হিত আচরণ ও নবীজির শানে ধৃষ্টতার জন্য ভর্ৎসনা করেন। এরপর তিনি আপন প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে নিজ হাতে তাকে হত্যা করেন। রেনাল্ডের পরিণতি স্বচক্ষে অবলোকন করে বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা গাই ভীত হয়ে পড়লে সুলতান সালাহুদ্দিন তাকে শান্ত করতে বলেন, 'রাজাদের হত্যা করা রাজন্যবর্গের নীতি নয়; কিন্তু এই লোক সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।'
এরপর বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ও তার জীবিত অনুচরদের সসম্মানে দামেশকে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

টিকাঃ
৯০. প্রচলিত খ্রিষ্টধর্মের অনুসারীদের বিশ্বাস অনুযায়ী যে কাষ্ঠখণ্ডে হজরত ঈসা মাসিহ আ.-কে শূলে চড়ানো হয়, তার ভগ্নাবশেষকে সত্য ক্রুশ (The True Cross) বলা হয়। খ্রিষ্টানদের মহাসভার সিদ্ধান্ত ও খ্রিষ্টান চার্চের ঐতিহাসিক সক্রেটিস (Socrates Scholasticus)-এর দাবি অনুযায়ী ৩২৬-৩২৮ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন রোমান সম্রাট কনস্টান্টাইনের মা হেলেনা উক্ত ক্রুশ আবিষ্কার করেন। অপরদিকে ইসলামি বিশ্বাসমতে হজরত ঈসা আ.-কে শূলে চড়ানো হয়নি; বরং মহান আল্লাহ তাআলা তাকে আপন কুদরতে আসমানে তুলে নিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন-
وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ) তারা তাকে হত্যা করেনি, শূলেও চড়ায়নি; কিন্তু তাদের ধাঁধায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। [সূরা নিসা: ১৫৭]

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 আল-কুদস পুনরুদ্ধার

📄 আল-কুদস পুনরুদ্ধার


583 হিজরি সনের জুমাদাল উলা মাসে সুলতান সালাহুদ্দিন আক্কায় (Acre) প্রবেশ করেন। মুসলিম বাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে সেখানকার ক্রুসেডাররা পালিয়ে সুর (Tyre) নগরীতে চলে যায়। এরপর সালাহুদ্দিন তিবনিন (Tebnine), সিডোন (Sidon), ব্যাবলস (Byblos) ও বৈরুতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর তিনি উপকূলীয় পথ ধরে আসকালানে পৌঁছে আসকালান অবরোধ করেন। চৌদ্দ দিনের অবরোধের পর আসকালানবাসী আত্মসমর্পণ করে। এর মাধ্যমে একদিকে বাইতুল মুকাদ্দাস অবরোধ করার পথ সুগম হয়, অপরদিকে উপকূলীয় পথ ধরে বহির্বিশ্ব থেকে সাহায্য আগমনের পথও বন্ধ হয়ে যায়।
রামলা, দারুম, গাজা, বেথেলহাম, নাতরুন ইত্যাদি এলাকা বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করলে সালাহুদ্দিন আইয়ুবি এবার বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখী হন। তিনি সেখানে কোনো রক্তপাত ঘটাতে চাননি। কিন্তু ক্রুসেডাররা আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে সুলতান সালাহুদ্দিন বাধ্য হয়ে শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে বাইতুল মুকাদ্দাসে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ফিরিঙ্গিরা সন্ধিচুক্তি করতে সম্মত হয় এবং এই শর্তে চুক্তি সম্পাদিত হয় যে—আগামী চল্লিশ দিন তাদেরকে বাইতুল মুকাদ্দাস ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। বিনিময়ে পুরুষগণ জনপ্রতি দশ দিনার, নারীগণ জনপ্রতি পাঁচ দিনার এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিনিময়ে জনপ্রতি দুই দিনার প্রদান করতে হবে। কেউ নির্ধারিত দিনার প্রদান করতে না পারলে সে বন্দি বিবেচিত হবে। যারা শর্ত মেনে প্রস্থান করবে, তাদেরকে নিরাপদে সুর নগরীতে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
বাইতুল মুকাদ্দাস জয় করার পর মুসলমানরা প্রথম জুমা মসজিদুল আকসায় আদায় করতে পারেনি। তারা এ সময় ক্রুশ, খ্রিষ্টান সন্ন্যাসী ও শূকর ইত্যাদি সরিয়ে মসজিদ পরিষ্কার করায় ব্যস্ত ছিল।
583 হিজরি সনের ২7 রজব (1187 খ্রিষ্টাব্দের ২ অক্টোবর) মসজিদুল আকসায় প্রথম খুতবা প্রদান করেন দামেশকের কাজি মুহিউদ্দিন ইবনুয যাকি। তিনি তার খুতবায় বলেন—
উপস্থিত লোকসকল! আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের সুসংবাদ গ্রহণ করো। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই হচ্ছে মুমিন বান্দার চূড়ান্ত লক্ষ্য ও সর্বোচ্চ মর্যাদাপ্রাপ্তি। এ সুসংবাদ বাস্তবায়িত হয়েছে আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে তোমাদের হাতে এই হৃত ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে, দীর্ঘ প্রায় এক শতাব্দী মুশরিকদের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার পর আপন অবস্থানে ইসলামের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে এবং আল্লাহ তাআলার এই মহান ঘরকে পবিত্র করার মাধ্যমে। তিনি এ ঘরকে সমুন্নত ও উচ্চ মর্যাদা দানের নির্দেশ দিয়েছেন এবং এখানে তার নাম উচ্চারণের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা তোমাদের মাধ্যমে এখানে ছড়িয়ে পড়া শিরকের মূলোৎপাটন করেছেন, আপন দ্বীনের রীতি-নীতি চালু করেছেন এবং তার একত্ববাদের নীতিমালা সমুন্নত করেছেন। কেননা, এ নগরী তো একত্ববাদের নীতিমালার ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ নগরী হচ্ছে তোমাদের পিতা ইবরাহিমের আবাসভূমি, তোমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মিরাজের সূচনাভূমি। ইসলামের প্রাথমিক যুগে এই মসজিদুল আকসা ছিল তোমাদের নামাজের কিবলা। এ ভূখণ্ড নবীগণের আবাসস্থল, আউলিয়ায়ে কেরামের গন্তব্যস্থল, রাসুলগণের কেন্দ্রস্থল এবং ওহি অবতরণস্থল। এখানেই অবতীর্ণ হয়েছে কত শত বিধিবিধান, আদেশ-নিষেধ। এ হচ্ছে সমাবেশস্থল ও উত্থানস্থল। এই সেই পবিত্র ভূমি, যার কথা আল্লাহ তাআলা তার মহাগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
এই সেই মসজিদ, যেখানে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নৈকট্যশীল ফিরেশতাদের নিয়ে নামাজ আদায় করেছেন। এই সেই ভূমি, যেখানে আল্লাহ তাআলা তার বান্দা, রাসুল এবং মরিয়মের উদ্দেশে প্রেরিত 'কালিমা' ও রুহ ঈসাকে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা তাকে রিসালাত ও নবুওয়তের মর্যাদা দান করে সম্মানিত করেছেন, আবদিয়াত ও দাসত্বের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করেননি। আল্লাহ তাআলা বলেন-
( لَنْ يَسْتَنكِفَ الْمَسِيحُ أَنْ يَكُونَ عَبْدًا لِلَّهِ
মাসিহ কখনো আল্লাহর বান্দা হওয়াকে লজ্জার বিষয় মনে করে না। [সুরা নিসা : ১৭২]
তিনি আরও ইরশাদ করেন—
لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ )
যারা বলে—মারিয়াম-তনয় মাসিহই আল্লাহ, তারা নিশ্চিত কাফির হয়ে গেছে। [সুরা মায়িদা: ১৭]
এই মসজিদুল আকসা হচ্ছে প্রথম কিবলা, দ্বিতীয় মসজিদ ও তৃতীয় হারাম শরিফ। মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববির পর শুধু এ মসজিদের উদ্দেশ্যেই সফর করা যায়। সেই দুই স্থানের পর কেবল এখানেই কোমর বাঁধা হয়। যদি তোমরা আল্লাহ তাআলার মনোনীত ও নির্বাচিত না হতে, তাহলে তিনি তোমাদেরকে এই মর্যাদায় ভূষিত করতেন না। এ মর্যাদায় আর কেউ তোমাদের অংশীদার নয়, নয় সমকক্ষ। স্বাগত তোমাদের এই মহান বাহিনীকে! যাদের হাতে নববি মুজিজা বাস্তবায়িত হয়েছে, বদরের ঘটনা পুনঃসম্পাদিত হয়েছে এবং সিদ্দিকি দৃঢ়তা, উমরি বিজয়াভিযান, উসমানি বাহিনীপ্রেরণ ও আলাবি প্রচণ্ড হামলার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়েছে।
তোমরা ইসলামের জন্য কাদিসিয়া, ইয়ারমুক ও খায়বারের ইতিহাসের নবায়ন করেছ, আবার ফিরিয়ে এনেছ খালিদের বীরত্বের স্মৃতি। আর তাই আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের নবীর পক্ষ হতে উত্তম বিনিময় দান করুন।...

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00