📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সুলতান নুরুদ্দিন মাহমূদের ইন্তেকাল

📄 সুলতান নুরুদ্দিন মাহমূদের ইন্তেকাল


[৫৬৯ হিজরি/১১৭৪ খ্রিষ্টাব্দ]
ইসলামি ইতিহাসের এই ক্ষণজন্মা মহান শাসক ও সেনানায়কের জীবনচরিত ও কীর্তি-অবদান সম্পর্কে খুব কম ঐতিহাসিকই আলোচনা করেছেন। তাই তার জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ. বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ 'আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া'তে যা উল্লেখ করেছেন, তার প্রায় সবটুকুই আমরা এখানে পাঠক সমীপে উপস্থাপন করছি।
ইবনে কাছির রহ. লিখেছেন—
তার পূর্ণ নাম আল-মালিকুল আদিল (ন্যায়পরায়ণ শাসক) নুরুদ্দিন আবুল কাসিম মাহমুদ। পিতার নাম আল-মালিকুল আতাবিক কাসিমুদ্দৌলা ইমাদুদ্দিন আবু সাইদ জিনকি আশ-শাহিদ। পিতামহের নাম আল-মালিক আক সুনকুর আতাবিক কাসিমুদ্দৌলা। তিনি তুর্কি বংশোদ্ভূত ছিলেন এবং সেলজুক সুলতানের অধীনস্থ ছিলেন।
নুরুদ্দিন রহ. ৫১১ হিজরি সনের ১৭ শাওয়াল (১১১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ফেব্রুয়ারি) রবিবার সূর্যোদয়ের সময় আলেপ্পোতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন আলেপ্পো ও মসুলসহ সুবিস্তৃত অঞ্চলের প্রশাসক। তিনি তার পিতার তত্ত্বাবধানে লালিতপালিত হন এবং কুরআনের ইলম, অশ্বারোহণ ও তিরন্দাজির শিক্ষা অর্জন করেন। নুরুদ্দিন সমুন্নত সাহস ও মনোবল, উচ্চাভিলাষ, সৎ চিন্তা, পূর্ণ আত্মমর্যাদাবোধ ও দৃশ্যমান ধার্মিকতার অধিকারী ছিলেন।
৫৪1 হিজরিতে জাবার দুর্গ অবরোধকালে তার পিতা মৃত্যুবরণ করলে আলেপ্পোর শাসনক্ষমতা পুত্র নুরুদ্দিনের হাতে আসে আর মসুলের শাসনক্ষমতা লাভ করেন নুরুদ্দিনের ভাই সাইফুদ্দিন গাজি। নুরুদ্দিন দিনে দিনে তার রাজ্য বিস্তৃত করতে থাকেন। ৫৪৯ হিজরি সনে তিনি দামেশক জয় করেন। তিনি দামেশকবাসীর প্রতি কল্যাণ আচরণ করেন; তাদের জন্য মসজিদ, মাদরাসা ও সরাইখানা প্রতিষ্ঠা করেন, পথচারীদের চলাচলের জন্য প্রশস্ত সড়ক ও বিশ্রামের জন্য ছাউনি ও উদ্যান নির্মাণ করেন। তিনি দামেশকের বাজারগুলোর আয়তন সম্প্রসারণ করেন এবং বকরিপাল, তরমুজ ইত্যাদির গুদামের কর রহিত করেন।
নুরুদ্দিন হানাফি মাজহাবের অনুসারী ছিলেন। তিনি উলামায়ে কেরামকে কেবল ভালোবাসতেন না, বরং তাদের সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করতেন। তিনি দরিদ্র-অসহায়দের প্রতি সদাচরণ করতেন। তিনি বিচারকার্যে ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতেন এবং বিশুদ্ধ শরিয়তের অনুসরণ করতেন।
সুলতান নুরুদ্দিন বিচার-মজলিসের আয়োজন করতেন এবং নিজে তার তত্ত্বাবধান করতেন। তার বিচারসভায় আলিম-ফকিহ, সকল মাজহাবের মুফতি ও বিচারকগণ সমবেত হতো। মুসলিম-জিম্মি নির্বিশেষে সকলে যেন ন্যায়বিচার লাভের জন্য তার কাছে আসতে পারে, এজন্য তিনি প্রতি মঙ্গলবার কুশকের ঝুলন্ত মসজিদে বসতেন।
সুলতান নুরুদ্দিন দামেশকের ইহুদিদের বিধ্বস্ত ও ধ্বংসপ্রায় বসতির চারপাশে প্রাচীর নির্মাণ করে দেন। তিনি দামেশকের কিসান দ্বার বন্ধ করে দেন এবং আল-ফারজ দ্বার উন্মুক্ত করে দেন। আল-ফারজ দ্বারের স্থানে ইতিপূর্বে পরিপূর্ণ কোনো নগরদ্বার ছিল না।
তিনি তার শাসন-অঞ্চলে সুন্নাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন, বিদআত নির্মূল করেন এবং হুদুদ আইন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি আজানে 'হাইয়া আলা খাইরিল আমাল'-এর পরিবর্তে 'হাইয়া আলাস সালাহ' ও 'হাইয়া আলাল ফালাহ' উচ্চারণের নির্দেশ দেন। তার পিতা ও পিতামহের শাসনামলে এ অঞ্চলে শিয়া রাফিজিদের রীতি দৃশ্যমান ও প্রবল থাকায় আজানে 'হাইয়া আলা খাইরিল আমাল' উচ্চারণ করা হতো।
সুলতান নুরুদ্দিন বহু দুর্গ জয় করেন। বহুবার তিনি খ্রিষ্টান ফিরিঙ্গি বাহিনীকে ছিন্নভিন্ন করে দেন এবং মুসলমানদের হাত থেকে খ্রিষ্টানদের দখলকৃত সুরক্ষিত-দুর্ভেদ্য বিভিন্ন দুর্গ পুনরুদ্ধার করেন। পূর্বের বিভিন্ন বছরের ধারাবিবরণীতে এর বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
তিনি দামেশকে একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। শাম অঞ্চলে এর আগে-পরে এরূপ সমৃদ্ধ হাসপাতাল কখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এতিমদের লেখাপড়া ও সুশিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য তিনি এতিমদের শিক্ষকদের জন্য প্রচুর সম্পদ ওয়াকফ করেন এবং তাদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করেন।
মক্কা-মদিনার প্রতিবেশীদের জন্যও তিনি প্রচুর সম্পদ ওয়াকফ করেন। বিধবা নারী ও অসহায় নাগরিকদের ভরণপোষণসহ যাবতীয় কল্যাণমূলক কাজে ব্যয়ের জন্য তিনি বিস্তৃত সম্পদ ওয়াকফ করেছিলেন।
এ সময় জামে দামেশক বিরানপ্রায় পড়ে ছিল। সুলতান নুরুদ্দিন কাজি কামালুদ্দিন মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ শাহরাজুরি মুসিলিকে জামে দামেশকের মুতাওয়াল্লি ও দামেশকের প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত করেন। তিনি জামে দামেশকের সংস্কার করেন এবং চারটি হলকক্ষের(৮৬) সবগুলো উন্মুক্ত করে দেন। ৪৬১ হিজরিতে জামে দামেশকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকে অর্জিত সকল অর্থ সেখানেই ছিল। তিনি জামে দামেশকের জন্য সুনির্দিষ্ট ওয়াকফ সম্পদসমূহের পাশাপাশি অজ্ঞাত ওয়াকফকারীদের সম্পদও পরিবর্ধন করে দেন। এসব সম্পদকে এক বিধানের আওতায় নিয়ে আসা হয় এবং এর নামকরণ করা হয় 'জনকল্যাণ সম্পদ'। দামেশকের অসহায়, দরিদ্র, বিধবা ও এতিম নাগরিকদের জন্য সেখান থেকে ভাতা চালু করে দেওয়া হয়।
নুরুদ্দিন রহিমাহুল্লাহ সুন্দর হস্তলিপির অধিকারী ছিলেন। তিনি প্রচুর দ্বীনি কিতাবাদি অধ্যয়ন করতেন, নববি নির্দেশনাবলি অনুসরণ করতেন। তিনি জামাতে নামাজ আদায়ে যত্নবান ছিলেন। তিনি অধিক পরিমাণে কুরআন তেলাওয়াত করতেন, কল্যাণমূলক কাজ ভালোবাসতেন।
সুলতান নুরুদ্দিন মিতাহারী ও সংযমী ছিলেন। নিজের ও পরিবারের পানাহার ও পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত মিতব্যয়ী ছিলেন। এমনকি কথিত আছে যে, তার শাসনামলের সবচেয়ে দরিদ্র ব্যক্তির খরচও তার চেয়ে বেশি ছিল। তিনি সম্পদ সঞ্চয় করতেন না, পার্থিব চাহিদাকে প্রাধান্য দিতেন না। স্বাভাবিক ও রাগান্বিত—কোনো অবস্থায়ই তার মুখ থেকে কোনো অশ্লীল বা অশোভনীয় উচ্চারণ শোনা যায়নি। তিনি গম্ভীর ও মৌনতাপ্রিয় ছিলেন। ইবনুল আছির বলেন, 'উমর ইবনে আবদুল আজিজের পর নুরুদ্দিনের চেয়ে অধিক ন্যায়পরায়ণ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট অন্য কেউ ছিল না।'
তিনি গনিমত সম্পদ হতে প্রাপ্ত ব্যক্তিগত অংশের অর্থ দিয়ে হিমসে কয়েকটি দোকান ক্রয় করেছিলেন। দোকানগুলোর আয় দিয়েই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। স্ত্রীর ভরণপোষণের খরচও সেখান থেকেই দিতেন, অবশ্য স্ত্রীকে কিছুটা বেশি দিতেন। বাইতুল মাল ও রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তার কতটুকু অর্থ গ্রহণ করা বৈধ হবে—এ বিষয়ে তিনি উলামায়ে কেরামের কাছে ফতোয়া চেয়েছিলেন। উলামায়ে কেরাম যে পরিমাণের কথা উল্লেখ করেন, তিনি ক্ষুধায় মৃত্যুর উপক্রম হলেও তার চেয়ে বেশি গ্রহণ করতেন না।
সুলতান নুরুদ্দিন প্রচুর পোলো খেলতেন। জনৈক বুজুর্গ তাকে এ বিষয়ে তিরস্কার করলে তিনি উত্তর দেন, 'নিঃসন্দেহে প্রত্যেক কাজের ভালো-মন্দ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। আমার এই খেলার উদ্দেশ্য হলো ঘোড়াকে আক্রমণ করেই পিছু হটার (Hit-and-Run) কৌশল শিক্ষা দেওয়া ও অনুশীলন করানো। কারণ, আমরা তো কখনোই জিহাদ পরিত্যাগ করব না।'
তিনি রেশমি কাপড় পরিধান করতেন না, তরবারি ও বর্শার মাধ্যমে নিজ হাতে উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
একদিন তিনি তার জনৈক সঙ্গীকে নিয়ে ঘোড়ায় আরোহণ করে কোথাও যাচ্ছিলেন। সূর্য ছিল তাদের পেছনে, ছায়া ছিল সামনে। তারা দ্রুত ছুটেও ছায়ার নাগাল পাচ্ছিলেন না। ফিরতি পথে ছায়া পেছনে চলে যায় (কারণ, সূর্যের অবস্থান তখন সামনে)। নুরুদ্দিন তার ঘোড়াকে খুব দ্রুতগতিতে পরিচালিত করেন, ছায়াও দ্রুত পিছু পিছু চলতে থাকে!
তখন তিনি তার সঙ্গীকে বলেন, 'জানো, আমাদের এই পরিস্থিতির সঙ্গে কীসের তুলনা হতে পারে? আমি একে তুলনা করছি দুনিয়ার সঙ্গে। যে দুনিয়ার নাগাল পেতে পিছু ছুটে বেড়ায়, দুনিয়া তার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ায়। আর যে দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে পালাতে চায়, দুনিয়া তার পিছু ছুটতে থাকে।' এই হাকিকত ও অকাট্য বাস্তবতাই ফুটে উঠেছে জনৈক কবির নিম্নোক্ত কাব্যপঙ্ক্তিতে—
مَثَلُ الرِّزْقِ الَّذِي تَطْلُبُه * مَثَلُ الظَّلِّ الَّذِي يَمْشِي مَعَكَ أَنْتَ لَا تُدْرِكُهُ مُسْتَعْجِلًا * فَإِذَا وَلَّيْتَ عَنْهُ تَبِعَكَ
যে জীবন-জীবিকার খোঁজে তুমি হয়রান-পেরেশান, দৃষ্টান্ত তার সঙ্গে তোমার ওই ছায়া চলমান।
হাজারো চেষ্টায় বৃথা প্রচেষ্টায় পাবে নাকো তার নাগাল, নাও ফিরিয়ে দৃষ্টি তোমার, হবে সে তোমার কাঙাল।
সুলতান নুরুদ্দিন হানাফি মাজহাবের ফকিহ ছিলেন। তিনি হাদিসের শিক্ষাগ্রহণ করেছেন, হাদিস রেওয়ায়েতও করেছেন। হাদিস শ্রবণ করেছেন এবং শুনিয়েছেন। রাতভর প্রচুর নামাজ পড়তেন, সাহরির সময় হতে দিবসে ঘোড়ায় আরোহণের পূর্ব পর্যন্ত সময় নামাজে কাটিয়ে দিতেন। কবির ভাষায়—
جَمَعَ الشَّجَاعَةَ وَالْخُشُوعَ لَدَيْهِ * مَا أَحْسَنَ الشُّجْعَانَ فِي الْمَحَارِبِ
তার মাঝে দেখি অবাক সমাবেশ বীরত্ব ও খোদাভীতির, মিম্বরে শুনি খতিব-কণ্ঠে—চির উন্নত মম শির!
তার সহধর্মিণী (দামেশকের আতাবিক মুইনুদ্দিনের কন্যা) ইসমাতুদ্দিন খাতুনও তার ন্যায় অধিক ইবাদতগোজার ছিলেন। তিনিও রাত্রিকালে অধিক ইবাদত করতেন। একরাতে ঘুম থেকে জাগতে না পারায় তার নির্ধারিত অজিফা ছুটে যায়। সকালে তিনি খুব বিষণ্ণ হয়ে পড়েন। সুলতান নুরুদ্দিন স্ত্রীকে বিষণ্ণতার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান যে, গত রাতে ঘুমের কারণে তিনি আপন অজিফা আদায় করতে পারেননি। তখন নুরুদ্দিন তার দুর্গে যারা শেষ রাতে তাহাজ্জুদ আদায় করতে চায়, তাদের জাগ্রত হওয়ার সুবিধার্থে প্রতিদিন সাহরির ওয়াক্তে দামামা বাজানোর নির্দেশ দেন। তিনি দামামা-বাদককে এর বিনিময়ে প্রচুর হাদিয়া-তোহফা প্রদান করেন। কবি যেন এমন মহান ব্যক্তিদের সম্পর্কেই বলেছেন—
فَأَلْبَسَ اللهُ هَاتِيْكَ الْعِظَامَ وَإِنْ * بَلِيْنَ تَحْتَ الثَّرَى عَفْوًا وَغُفْرَانًا سَقَى تَرَى أُوْدِعُوهُ رَحْمَةً مَلَأَتْ * مَثْوَى قُبُورِهِم رَوْحًا وَرَيْحَانًا
কবর-দেশের ছোঁয়ায় যদিও হয়ে পড়েছে জীর্ণ-শীর্ণ, আল্লাহ সেই অস্থি-মজ্জাকেই পরিয়ে দিয়েছেন ক্ষমা ও মার্জনার পোশাক!
আল্লাহ তাদের সমাধিকে রহমতে সিক্ত করুন, দান করুন আনন্দ ও সুবাস।
ইবনুল আছির উল্লেখ করেন, একদিন নুরুদ্দিন পোলো খেলছিলেন। তিনি দেখতে পেলেন যে, জনৈক ব্যক্তি মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে কারও সঙ্গে কথা বলছে এবং তার দিকে ইঙ্গিত করছে। তখন নুরুদ্দিন তার প্রহরীকে লোকটির কাছে তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানার জন্য পাঠালেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেল যে, লোকটি একজন মধ্যস্থতাকারীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। সে দাবি করছে যে, নুরুদ্দিনের কাছে তার কিছু পাওনা আছে এবং পাওনা আদায়ের জন্য সে বিচারকের শরণাপন্ন হতে চায়। প্রহরী ফিরে এসে নুরুদ্দিনকে এ কথা জানালে তিনি তার হাতের পোলো খেলার মুগুর (Mallet) রেখে দিয়ে তৎক্ষণাৎ অভিযোগকারীকে সঙ্গে নিয়ে কাজি শাহরাজুরির উদ্দেশে পায়ে হেঁটে রওনা হন। পাশাপাশি তিনি দূত মারফত আগেই কাজি সাহেবের কাছে সংবাদ পাঠান যে, তার সঙ্গে যেন অন্যান্য বাদী-বিবাদীর মতোই আচরণ করা হয়। উভয়ে কাজির দরবারে পৌঁছলে নুরুদ্দিন বাদীকে সঙ্গে নিয়ে কাজির সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। অবশেষে সাক্ষ্যপ্রমাণ গ্রহণ ও তর্কবিতর্ক শেষ হয়। বিচারকের যাচাইয়ে নুরুদ্দিনের কাছে লোকটির কোনো পাওনা প্রমাণিত হওয়া দূরে থাক, উল্টো লোকটির কাছে সুলতান নুরুদ্দিনের পাওনা প্রমাণিত হয়। পুরো বিচার-প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সুলতান নুরুদ্দিন বলেন, 'আমি তার সঙ্গে এ জন্যই বিচারকের দরবারে উপস্থিত হয়েছি, যেন কাউকে শরিয়তের বিধানের প্রতি আহ্বান করা হলে সে অনুপস্থিত না থাকতে পারে। আমরা যারা প্রশাসনের ছোট-বড় যেকোনো দায়িত্ব পালন করছি, সকলেই প্রিয়।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার শরিয়তের খাদিম ও প্রহরী। সুতরাং আমরা নবীজির নির্দেশনা এবং দ্বীন ও শরিয়তের দাবির সামনে অনুগত শিরে দণ্ডায়মান হব। নবীজি যা করতে আদেশ করেছেন, আমরা তা মান্য করব; যা করতে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকব। আমি ভালো করেই জানি যে, এই লোকটির আমার কাছে কোনো পাওনা নেই। তা সত্ত্বেও আমি তোমাদের সাক্ষী রেখে বলছি, সে যা দাবি করেছে, আমি তাকে তা দিয়ে দিলাম এবং হাদিয়া হিসেবে দিলাম।'
ইবনুল আছির বলেন, নুরুদ্দিনই প্রথম শাসক, যিনি 'দারুল আদল' (ন্যায়বিচার কক্ষ) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি সপ্তাহে দু-বার, মতান্তরে চারবার বা পাঁচবার তার বিচারকক্ষে বসতেন। মজলিসে বিচারক ও সকল মাজহাবের আলিম ও ফকিহগণ উপস্থিত থাকতেন। সেদিন বিচারকক্ষের দ্বারে কোনো প্রহরী থাকত না। সবল-দুর্বল নির্বিশেষে সকলে সেখানে উপস্থিত হতে পারত। তিনি নিজে মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন, জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। তিনি অন্যায়-অত্যাচারের মূলোৎপাটন করতেন এবং অত্যাচারীর কাছ থেকে অত্যাচারিতের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতেন।
এর কারণ হলো, সুলতান নুরুদ্দিনের কাছে সেনাপতি আসাদুদ্দিন শিরকুহের যথেষ্ট মূল্যায়ন ছিল। তিনি সুলতানের এত বেশি আস্থাভাজন ছিলেন যে, মনে হতো—তিনিও নুরুদ্দিনের ক্ষমতার অংশীদার! রাষ্ট্রের মহান সেনাপতি হিসেবে শিরকুহ প্রচুর সম্পদ, জায়গির ভূমি ও শস্যক্ষেত্রের মালিক ছিলেন। তার প্রতিনিধিরা সেগুলোর দেখাশোনা করত এবং কখনো কখনো জায়গিরভূমির প্রতিবেশীদের ওপর জুলুম করে ফেলত। কোনো সেনাপতি বা আমির কারও প্রতি জুলুম করলে কাজি কামালুদ্দিন শাহরাজুরি তাকে ছাড় দিতেন না; বরং ন্যায়বিচার করতেন। তবে আসাদুদ্দিন শিরকুহের ওপর তিনি কখনো প্রভাব খাটাতেন না।
নুরুদ্দিন যখন দারুল আদল প্রতিষ্ঠা করেন, তখন আসাদুদ্দিন তার প্রতিনিধিদের কাছে গিয়ে বলেন, 'আমার সম্পদের যত বড় ক্ষতিই হোক না কেন, তোমরা কারও সঙ্গে এমন কোনো আচরণ করবে না, যার কারণে সে জুলুমের দাবি করতে পারে। কারণ, নুরুদ্দিনের কাছে অত্যাচারী বিবেচিত হওয়ার চেয়ে বা সাধারণ কোনো প্রজার সঙ্গে বিবাদী হিসেবে নুরুদ্দিনের সামনে দাঁড়ানোর চেয়ে আমার সম্পদ নষ্ট হওয়া আমার কাছে শতগুণ প্রিয়।' তখন থেকে তার প্রতিনিধিরা কর্মক্ষেত্রে অনেক বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে থাকে। নুরুদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ করেন যে, দারুল আদলে কেউ আসাদুদ্দিনের নামে অভিযোগ জানাতে আসে না। তিনি কাজি কামালুদ্দিন শাহরাজুরিকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে পুরো বিষয়টি অবগত করেন। সবকিছু জেনে নুরুদ্দিন কৃতজ্ঞতায় সিজদাবনত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি আমার সঙ্গীদেরকে নিজ থেকে ন্যায় প্রতিষ্ঠাকারী বানিয়েছেন।'
সুলতান নুরুদ্দিনের বীরত্ব ও সাহসিকতা সম্পর্কে বলা হয়, তার চেয়ে অধিক দুঃসাহসী ও অশ্বপৃষ্ঠে অবিচল কোনো অশ্বারোহী পাওয়া যায় না। তিনি পোলো খেলায় দক্ষ ছিলেন। অনেক সময় তিনি মুগুরের আঘাতে বল ছুড়ে মারতেন, তারপর দ্রুত বলের পেছনে ছুটে শূন্য থেকেই বলটি ধরে ফেলতেন। এরপর ছুড়ে মারতেন ময়দানের অপর প্রান্তে। বলে আঘাত করার সময় কখনো তার হাতের মুগুর মাথার ওপর উঠত না। খেলার প্রতি তুচ্ছতা প্রদর্শনের জন্য তিনি হাতের মুগুর জামার আস্তিন দিয়ে ঢেকে রাখতেন। তাই তার হাতে মুগুরও দৃশ্যমান হতো না। যুদ্ধের ময়দানে তিনি ছিলেন অটল-অবিচল-প্রত্যয়ী ও দুঃসাহসী এক বীর যোদ্ধা। বীরত্বের উপমা হিসেবে তার নাম উল্লেখ করা হতো। তিনি বলতেন, 'আমি একাধিকবার শাহাদাতের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম, কিন্তু শাহাদাত-সৌভাগ্য নসিব হয়নি। যদি আমার মাঝে কোনো কল্যাণ-গুণ থাকত এবং আল্লাহ তাআলার কাছে আমার সামান্য মূল্যও থাকত, তাহলে তিনি অবশ্যই আমাকে শাহাদাতের সৌভাগ্য দান করতেন। অবশ্য আমলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।'
কুতুবুদ্দিন নিশাপুরি একদিন তাকে বললেন, 'হে আমাদের মহান মনিব সুলতান! আল্লাহর শপথ করে বলছি—নিজেকে কখনো ঝুঁকির মুখে ফেলবেন না। আপনি নিহত হলে তো পুরো জাতিই ধ্বংসের শিকার হবে, রাষ্ট্র বেদখল হয়ে যাবে এবং মুসলমানরা অসহায় হয়ে যাবে।' তার কথা শুনে নুরুদ্দিন উত্তর দিলেন, 'কুতুবুদ্দিন! চুপ করো; আল্লাহ তাআলার শানে গোস্তাখি করছ! আরে! মাহমুদ কে? আমার জন্মের পূর্বে আল্লাহর দ্বীন ও মুসলমানদের ভূখণ্ড কে রক্ষা করত? এক ও অদ্বিতীয় উপাস্য আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্য কেউ? বলো, মাহমুদ কে?' (বর্ণনাকারী বলেন,) তার কথা শুনে উপস্থিত সবাই কাঁদতে লাগল।
এক যুদ্ধে তিনি জনৈক খ্রিষ্টান রাজাকে বন্দি করেন। এরপর তিনি তার উপদেষ্টাপর্ষদ ও সেনাপতিদের কাছে পরামর্শ চান যে, তাকে কি হত্যা করা হবে, না মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে? করণীয় নির্ধারণে সেনাপতিগণ মতানৈক্যে জড়িয়ে পড়ে। অবশ্য শেষপর্যন্ত নুরুদ্দিন তাকে মুক্তিপণ গ্রহণ করে ছেড়ে দেওয়াই শ্রেয় মনে করেন। তিনি বন্দি রাজার জনৈক অনুচরকে তার রাজ্যে পাঠিয়ে মুক্তিপণ নিয়ে আসতে বলেন। সে খুব শীঘ্রই মুক্তিপণ নিয়ে ফিরলে নুরুদ্দিন রাজাকে মুক্ত করে দেন। সেই খ্রিষ্টান রাজা আপন রাজ্যে পৌঁছেই মৃত্যুবরণ করেন। এতে নুরুদ্দিন ও তার সঙ্গীরা অত্যন্ত বিস্মিত হন। নুরুদ্দিন মুক্তিপণের অর্থ দিয়ে দামেশকের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। (৮৭) পুরো রাজ্যে এ হাসপাতালের সঙ্গে তুল্য কোনো হাসপাতাল ছিল না। হাসপাতালটি কেবল দরিদ্র ও অসহায় নাগরিকদের জন্য নির্ধারিত ছিল। অবশ্য দুর্লভ কোনো ওষুধ যদি সেখানে ছাড়া অন্য কোথাও না পাওয়া যেত, তাহলে ধনীরাও সেখানে চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারত। তা ছাড়া ধনী-দরিদ্র যে কেউ যখনই হাসপাতালে উপস্থিত হতো, তাকে হাসপাতালের বিশেষ (শক্তিবর্ধক ও রোগপ্রতিরোধক) পানীয় পান করানো হতো। স্বয়ং নুরুদ্দিন রহ.-ও হাসপাতালে এসে উক্ত পানীয় সেবন করেছেন। (৮৮)
(ইবনে কাছির রহ. বলেন,) অনেক বলে-হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত এর প্রজ্বলিত অগ্নি কখনো নির্বাপিত হয়নি। বাস্তব বিষয়ে আল্লাহই অবগত আছেন।
সুলতান নুরুদ্দিন বিভিন্ন সড়ক ও পথের পাশে অনেক ছাউনি ও সরাইখানা নির্মাণ করেন। তিনি দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে নিরাপত্তারক্ষী নিয়োজিত করেন এবং তাদের কাছ থেকে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে পাওয়ার জন্য বার্তাবাহী কবুতরের ব্যবস্থা করেন। তিনি প্রচুর খানকাও প্রতিষ্ঠা করেন।
সুলতান নুরুদ্দিন তার কাছে ফুকাহায়ে কেরাম, উলামা-মাশায়েখ ও সুফি-বুজুর্গদের সমবেত করতেন এবং তাদের সম্মান করতেন। তিনি সৎ লোকদের ভালোবাসতেন। একবার কুতুবউদ্দিন নিশাপুরি নামক তার এক সেনাপতি তার কাছে জনৈক আলিমের বিষয়ে অভিযোগ করলে নুরুদ্দিন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে বলেন, 'ধিক তোমাকে! তোমার অভিযোগ যদি সত্যিও হয়, তারপরও তার এত অধিক পরিমাণ নেক আমল আছে, যা তার উক্ত অপরাধ মোচন করে দেবে। তোমার অভিযোগ যদি সত্যিও হয়, তারপরও (একজন আলিমের প্রতি অভিযোগ আনায়) তোমার যে অপরাধ হয়েছে, তার কাফফারা হওয়ার মতো নেক আমল তোমার নেই। অধিকন্তু আল্লাহর শপথ! আমি তোমার অভিযোগ সত্যায়নই করছি না। তুমি যদি ভবিষ্যতে কখনো আমার কাছে তার বিষয়ে বা অন্য কারও বিষয়ে অভিযোগ করো, তাহলে আমি অবশ্যই তোমাকে শান্তি দেবো।' এরপর কুতুবুদ্দিন নিশাপুরি কখনো আর এরূপ অভিযোগ করেননি।
তিনি হাদিসে নববির পাঠদানের জন্য দামেশকে একটি দারুল হাদিস প্রতিষ্ঠা করেন। ইবনুল আছিরের ভাষ্যমতে তিনিই প্রথম দারুল হাদিস (নামক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান) প্রতিষ্ঠা করেন। (৮৯)
সুলতান নুরুদ্দিন অত্যন্ত গম্ভীর ও প্রতাপসম্পন্ন ছিলেন। প্রশাসক ও সেনাপতিদের অন্তরে তার ব্যক্তিত্বের প্রবল ভীতি ও প্রতাপ কাজ করত। তার অনুমতি ব্যতীত কেউ তার সামনে বসার সাহস করত না। আমির নাজমুদ্দিন আইয়ুব ব্যতীত অন্য কেউ অনুমতি ছাড়া তার সামনে বসত না। সেনাপতি আসাদুদ্দিন শিরকুহ, আলেপ্পোর নায়েব (প্রশাসক) মাজদুদ্দিন বিন দায়ার ন্যায় রাষ্ট্রের বিশিষ্ট ও জ্যেষ্ঠতম ব্যক্তিবর্গও তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকত। কিন্তু কোনো আলিম বা ফকিহ আগমন করলে নুরুদ্দিন তার সম্মানে দাঁড়িয়ে যেতেন এবং কয়েক কদম এগিয়ে আসতেন; এরপর তাকে প্রশান্তি ও ধীরস্থিরতার সঙ্গে নিজের সঙ্গে গালিচায় বসাতেন। কোনো আলিমকে প্রচুর পরিমাণ হাদিয়া প্রদান করার পর তিনি বলতেন, 'তারা হচ্ছেন আল্লাহর সৈনিক। তাদের দোয়ার বরকতেই আমরা শত্রুদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করি। আমি যে হাদিয়া প্রদান করি, তার চেয়ে বাইতুল মালে অনেক গুণ বেশি অধিকার তাদের আছে। সুতরাং, তারা যদি তাদের অধিকারের এই যৎসামান্য প্রাপ্তিতেই আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন, তাহলে তো আমাদের প্রতি তাদের অপার অনুগ্রহ।'
একবার তার সম্মুখে একটি হাদিস পাঠ করা হয়, যাতে উল্লেখ ছিল— 'নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তরবারি গলায় ঝুলিয়ে বের হলেন।' হাদিসটি শ্রবণ করে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে কী আমল প্রমাণিত আর আজ মানুষের রীতি কেমন বদলে গেছে! এখন সেনাপতি ও সাধারণ সৈন্য সকলে নবীজির সুন্নাত বাদ দিয়ে কোমরে তরবারি ঝুলিয়ে বের হয়।'
এরপর তিনি তার সৈন্যদের তখন থেকে তরবারি গলায় ঝুলিয়ে বের হওয়ার নির্দেশ দেন। পরবর্তী দিন তিনি নিজে ও পুরো সেনাবাহিনী গলায় তরবারি ঝুলিয়ে শোভাযাত্রায় বের হন। এভাবেই তিনি প্রিয় নবীজির আনুগত্যে সচেষ্ট ছিলেন। আল্লাহ তার প্রতি দয়ার আচরণ করুন।
একদিন তার উজির কবি মুওয়াফফাকুদ্দিন খালিদ বিন মুহাম্মাদ বিন নাসর কায়সারানি তাকে জানান যে, তিনি স্বপ্নে নিজেকে নুরুদ্দিনের পরিধেয় বস্ত্র ধৌতরত অবস্থায় দেখেছেন। এ কথা শোনামাত্র সুলতান নুরুদ্দিন তাকে পুরো রাষ্ট্র থেকে যাবতীয় কর রহিত করার প্রজ্ঞাপন জারি করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, 'এটাই হচ্ছে তোমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা।' এরপর তিনি জনসাধারণের কাছে বার্তা পাঠিয়ে ইতিপূর্বে তাদের কাছ থেকে গ্রহণকৃত করের ব্যাপারে তাকে দায়মুক্ত করে দেওয়ার অনুরোধ করেন। তিনি তাদেরকে জানান, পূর্বে গ্রহণকৃত যাবতীয় অর্থ ব্যয় করা হয়েছে আপনাদের শত্রু বিধর্মীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এবং আপনাদের রাজ্য ও পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তা রক্ষায়। তিনি তার রাজ্যের সকল অঞ্চলে উক্ত বার্তা প্রেরণ করেন। সুলতান সরকারি ঘোষক ও দ্বীনি নসিহতকারীদের নির্দেশ দেন যে, তারা যেন কেবল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কর-গ্রহণের বৈধতা ঘোষণা করে। তিনি সিজদাবনত হয়ে দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি উশর উসুলকারী ও কর আদায়কারী অত্যাচারী কুকুর মাহমুদের প্রতি দয়া করুন।’
কথিত আছে, সুলতান নুরুদ্দিন কর খাতে অর্জিত অর্থ কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহার করায় বুরহানুদ্দিন বলখি আপত্তি প্রকাশ করেন। একবার তিনি সুলতান নুরুদ্দিনকে বলেন, ‘আপনার বাহিনীতে ঢোল-দামামা ও পানীয়ের প্রচলন আছে। এরপরও কীভাবে আপনারা নুসরত ও বিজয় লাভের আশা করেন?’
সুলতান নুরুদ্দিনের রাজ্য থেকে কর রহিত করে দেওয়ার কারণ সম্পর্কে আরেকটি ঘটনা বর্ণিত আছে। তার আমলের একজন বিখ্যাত বুজুর্গ ছিলেন আবু উসমান মুনতাখাব বিন আবু মুহাম্মাদ ওয়াসিতি। তার কোনো সম্পদ ছিল না; তিনি কারও কাছ থেকে কিছু গ্রহণও করতেন না। তার শুধু একটি জুব্বা ছিল। ওয়াজের মজলিসের উদ্দেশে বের হওয়ার সময় তিনি তা পরিধান করতেন। তার নসিহতের মজলিসে হাজার হাজার লোক সমবেত হতো। তিনি একবার সুলতান নুরুদ্দিনকে কয়েকটি কাব্যপঙ্ক্তি শোনান। পঙ্ক্তিগুলোতে তার রাজ্যের বিভিন্ন অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে এবং সুলতানকে কঠিনভাবে ভীতি প্রদর্শন ও সতর্ক করা হয়েছে। পঙ্ক্তিগুলো হলো—
مَثَّلْ وُقُوْفَكَ أَيُّهَا الْمَغْرُورُ * يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَاءُ تَمُوْرُ
إِنْ قِيْلَ نُورُ الدِّيْنِ رُحْتَ مُسْلِمًا * فَاحْذَرْ بِأَنْ تَبْقَى وَمَا لَكَ نُوْرُ
ওহে প্রবঞ্চিত! কিয়ামত দিবসে আকাশ যখন আন্দোলিত হবে, ভেবেছ কি তখন বিচার-দরবারে কীভাবে দাঁড়িয়ে রবে?!
যদি বলা হয়—নুরুদ্দিন! তুমি তো মুসলমান অবস্থায় মারা গেছ; সাবধান! থাকবে না নুর, তোমাকে সেদিন জাগতে হবে।
أَنْهَيْتَ عَنْ شُرْبِ الْخُمُوْرِ وَأَنْتَ فِي * كَأْسِ الْمَظَالِمِ طَائِسٍ مَحْمُوْرُ
عَطَّلْتَ كَاسَاتِ الْمُدَامِ تَعَفُّفًا * وَعَلَيْكَ كَاسَاتُ الْحَرَامِ تَدُورُ
পরের তরে হারাম করেছ মদের আসর; নিজেই বেহুঁশ জুলুম নেশায় তন্দ্রা বিভোর!
সেজেছ সাধু, সুরার পেয়ালা ফেলেছ ছুড়ে; অথচ হাজার হারাম পাত্র চারিপাশে ঘোরে!
مَاذَا تَقُوْلُ إِذَا نُقِلْتَ إِلَى الْبِلَى * فَرْدًا وَجَاءَكَ مُنْكَرُ وَنَكِيرُ؟ مَاذَا تَقْوْلُ إِذَا وَقَفْتَ بِمَوْقِفِ * فَرْدًا ذَلِيْلًا وَالْحِسَابُ عَسِيرُ؟
থাকবে যখন একাকী কবরে ভেবেছ কি? মুনকার-নাকিরের প্রশ্নবানে বলবে কী?
বিচারের দিন হয়ে হীনবল কী দেবে জবাব? ভয়াবহ দিন, হিসাবও তো বড় কঠিন হিসাব!
وَتَعَلَّقَتْ فِيْكَ الْخُصُومُ وَأَنْتَ فِي * يَوْمِ الْحِسَابِ مُسَلْسَلُ مَجْرُورُ وَتَفَرَّقَتْ عَنْكَ الْجُنُودُ وَأَنْتَ فِي * ضِيْقِ الْقُبُورِ مُوَسَّدُ مَقْبُورُ
হাতে-পায়ে বেঁধে শেকল-বেড়ি টানবে তোমায় নরক পানে, তখনো শত্রু পেছনে তোমার থাকবে লেগে পাওনা টানে।
এত জনবল, সৈন্যসকল তোমায় যাবে একলা ফেলে, একাকী থাকবে শুয়ে চোখের জলে বিঘত সাতেক মাটির কোলে।
وَوَدِدْتَ أَنَّكَ مَا وَلِيْتَ وِلَايَةً * يَوْمًا وَلَا قَالَ الْأَنَامُ أَمِيرُ وَبَقِيْتَ بَعْدَ الْعِزَّ رَهْنَ حُفَيْرَةٍ * فِي عَالَمِ الْمَوْتَى وَأَنْتَ حَقْيْرُ
কামনা করবে তুমি জীবন যদি হতো তোমার ঝঞ্ঝামুখর রণাঙ্গনা; যদি না থাকত শাসন, বলত না কেউ-জি হুজুর আর জাহাঁপনা!
হারিয়ে যশ-ক্ষমতা জগৎজোড়া খ্যাতির মায়া, কবরে থাকবে শুয়ে বন্দি হয়ে জীর্ণ কায়া!
وَحُشِرْتَ عُرْيَانًا حَزِيْنًا بَاكِبًا * قَلِقًا وَمَالَكَ فِي الْأَنَامِ مُجِيْرُ أَرَضِيْتَ أَنْ تَحْيَا وَقَلْبُكَ دَارِسُ * عَافِي الْخَرَابِ وَجِسْمُكَ الْمَعْمُورُ
উঠবে রোজ হাশরে নগ্নদেহে, চোখের জলে পাগলপারা; রবে না তোমার পাশে আপন-স্বজন, সবাই যেন বাঁধনহারা!
আবারও ঘটবে যখন হৃদয় তরে দেহের মিলন, চাও কি তুমি; আবাদ ওই দেহের মাঝে হৃদয় তোমার রইবে পড়ে বিরানভূমি?
أَ رَضِيْتَ أَنْ يَحْظُى سِوَاكَ بِقُرْبِهِ * أَبَدًا وَأَنْتَ مُعَذِّبُ مَهْجُورُ
مَهِّدْ لِنَفْسِكَ حُجَّةٌ تَنْجُوْ بِهَا * يَوْمَ الْمَعَادِ وَيَوْمَ تَبْدُو الْعُوْرُ
তবে কি চাও কি তুমি, সবাই যখন করবে গ্রহণ তাহার শরণ; অসহায় করবে তুমি আর্তনাদে-যন্ত্রণাতে শান্তিবরণ?
এখনো যায়নি বেলা অস্তাচলে, নাও গুছিয়ে নাজাত-ওজর; পরকাল বড়ই কঠিন করবে প্রকাশ সকল জনের গোপন খবর!
আবু উসমান ওয়াসিতির পঙ্ক্তিগুলো শুনে নুরুদ্দিন খুব ক্রন্দন করেন এবং পুরো রাজ্যের সব ধরনের কর রহিত করার নির্দেশ দেন।
মসুলের শায়খ উমর মাল্লা সে যুগের একজন দুনিয়াবিমুখ বুজুর্গ ছিলেন। সুলতান নুরুদ্দিন মসুলের প্রশাসক ও সেনাপতিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তারা যেন উমর মাল্লাকে না জানিয়ে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে। এ কারণে তিনি তাদেরকে যা আদেশ করতেন, সকলে তা মানত। সুলতান নুরুদ্দিন প্রত্যেক রমজানে তার কাছ থেকে ইফতার-দ্রব্য ধার করতেন। তিনি সুলতানের জন্য ফিতিত (শুকনো রুটির টুকরা) ও রিকাক (পাতলা রুটি) প্রেরণ করতেন। সুলতান পুরো রমজান তা দিয়েই ইফতার করতেন। উমর মাল্লা একবার সুলতান নুরুদ্দিনের উদ্দেশে লেখেন, 'বিশৃঙ্খলাকারীদের সংখ্যা বেড়ে গেছে। তাদের ব্যাপারে প্রশাসননীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। আর হত্যা, প্রহার ও শূলে চড়ানো ব্যতীত কোনো নীতি কার্যকর হবে না। কাউকে যদি নির্জন স্থানে হত্যা করা হয়, তাহলে কে আসবে সে বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে?' প্রত্যুত্তরে সুলতান নুরুদ্দিন পত্রের অপর পিঠে লেখেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তাদের জন্য শরিয়ত প্রণয়ন করেছেন এবং মানুষের কল্যাণক্ষেত্র সম্পর্কে তিনিই সর্বাধিক অবগত। আল্লাহ তাআলা যদি মাসলাহাত ও কল্যাণদাবির মাঝে শরিয়তের তুলনায় শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত রাখতেন, তাহলে মাসলাহাতকেই আমাদের শরিয়ত নির্ধারণ করতেন।
সুতরাং আল্লাহ-নির্ধারিত শরিয়তের সঙ্গে আমাদের পক্ষ থেকে কোনো সংযোজনের প্রয়োজন নেই। শরিয়তে কোনো কিছু সংযোজনের দাবি করার অর্থ হলো, শরিয়ত অসম্পূর্ণ, বান্দা সংযোজনের মাধ্যমে তার পূর্ণতা সাধন করছে! নিঃসন্দেহে এটা আল্লাহ তাআলা ও তার শরিয়তের প্রতি চরম দুঃসাহসিকতা প্রদর্শন। আর অন্ধ হৃদয় ও ভ্রষ্ট বিবেকধারীকে হিদায়াত দেওয়া হয় না। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ও আপনাকে সিরাতে মুসতাকিম ও সঠিক পথের নির্দেশনা দান করুন।'
সুলতানের উত্তর উমর মাল্লার কাছে পৌঁছলে তিনি মসুলের জনসাধারণকে জড়ো করে তাদের সামনে পত্রটি পাঠ করেন এবং বলতে থাকেন, 'দেখো! একজন দুনিয়াবিরাগী যাহিদ শাসকের উদ্দেশে কী বার্তা পাঠিয়েছেন আর শাসক প্রত্যুত্তরে কী লিখেছেন!'
একবার শায়খ আবুল বায়ানের এক ভাই সুলতান নুরুদ্দিনের কাছে এসে জনৈক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ জানাতে লাগল যে, সে আমাকে গালিগালাজ করেছে, আমাকে কপট ও প্রতারক বলে অপবাদ দিয়েছে, আমাকে ..., আমাকে ....। এভাবে সে একের পর এক নানা অভিযোগ উল্লেখ করতে লাগল। তখন সুলতান নুরুদ্দিন তাকে বললেন, আল্লাহ তাআলা কি কুরআনে বলেননি—
﴿وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَهِلُونَ قَالُوا سَلَمًا﴾
এবং অজ্ঞ লোক যখন তাদেরকে লক্ষ করে (অজ্ঞতাসুলভ) কথা বলে, তখন তারা শান্তিপূর্ণ কথা বলে। [সুরা ফুরকান: ৬৩]
﴿وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَهِلِينَ﴾
আর অজ্ঞদের উপেক্ষা করো। [সুরা আরাফ: ১৯৯]
এ কথা শুনে লোকটি চুপ হয়ে গেল এবং উপযুক্ত কোনো জবাব খুঁজে পেল না।
ফকিহ আবুল ফাতহ আশরি বলেন, সুলতান নুরুদ্দিন যথাসময়ে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায়ে পূর্ণ যত্নবান ছিলেন। তিনি নামাজের যাবতীয় শর্ত বজায় রেখে ধীরস্থির ও প্রশান্ত চিত্তে রুকু-সিজদাসহ নামাজের প্রতিটি রোকন আদায় করতেন। তিনি রাতে অধিক নামাজ আদায় করতেন, প্রতিটি কাজের জন্য আল্লাহ তাআলার দরবারে কাকুতিমিনতি করে দোয়া করতেন।
তিনি আরও বলেন, নির্ভরযোগ্য একদল বুজুর্গের কাছে আমি জানতে পেরেছি যে, ফিরিঙ্গিরা বাইতুল মুকাদ্দাস দখল করার পর তারা সেখানে জিয়ারতের উদ্দেশ্যে গমন করেছিল। তারা সেখানে বসবাসকারী খ্রিষ্টানদের বলতে শুনেছে— 'নিশ্চয়ই কাসিম ইবনে কাসিমের (তারা এর দ্বারা নুরুদ্দিনকে বোঝাচ্ছিল) আল্লাহ তাআলার সঙ্গে গোপন সম্পর্ক রয়েছে। সে সৈন্যবলে আমাদের বিরুদ্ধে জয়ী হয় না; জয়ী হয় দোয়া ও রাতের নামাজের মাধ্যমে। সে রাতে নামাজ পড়ে আল্লাহর দরবারে হাত উত্তোলন করে দোয়া করে; আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন এবং তার কাঙ্ক্ষিত বস্তু দান করেন। এভাবেই সে আমাদের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়।' তিনি বলেন, এমনই ছিল সুলতান নুরুদ্দিনের প্রতি কাফিরদের ধারণা।
শায়খ আবু শামা বর্ণনা করেন, নুরুদ্দিন (দামেশকের) মায়দান এলাকার (সংলগ্ন জঙ্গলভূমি বাদে) বাগানগুলো ওয়াকফ করে দেন। তিনি পুরো সম্পদের অর্ধেক ওয়াকফ করেন জামে দামেশকের উন্নয়নের জন্য, বাকি অর্ধেকের দুই-দশমাংশ ওয়াকফ করেন হানাফিদের জন্য প্রতিষ্ঠিত মাদরাসার উন্নয়নের জন্য আর বাকি আট-দশমাংশ ওয়াকফ করেন নয়টি মসজিদের উন্নয়নের জন্য। মসজিদগুলো হলো—কাসিয়ুন পর্বতের মসজিদে সালিহিন, জামে কেল্লা, মসজিদে আতিয়া, আসকারের মসজিদে ইবনে লাবিদ, ঝুলন্ত রামাহিনের মসজিদ, সালিহিয়ার মসজিদে আব্বাস, দারুল বিততিখ (ফলপট্টি) এর ঝুলন্ত মসজিদ, এবং ইহুদিদের গির্জার পাশে সুলতান নুরুদ্দিন কর্তৃক সংস্কারকৃত মসজিদ। উল্লিখিত প্রতিটি মসজিদের জন্য মোট সম্পদের বাইশ ভাগের এক ভাগ করে বরাদ্দ করা হয়। (৯০)
সুলতান নুরুদ্দিনের কীর্তি-অবদান ও গুণ-বৈশিষ্ট্যের বিবরণ তো অনেক দীর্ঘ। আমরা এখানে সেগুলোর সামান্য কিছু উল্লেখ করেছি, যেন পাঠকবৃন্দ তার সমৃদ্ধ ও কর্মময় জীবনের বাকি দিকগুলো সম্পর্কেও ধারণা করতে পারেন।
শায়খ শিহাবুদ্দিন আবু শামা আল-মাকদিসি তার ‘আর-রাওযাতাইন ফি তারিখিদ দাওলাতাইন’ গ্রন্থের শুরুতে সুলতান নুরুদ্দিনের বিভিন্ন কীর্তি ও গুণের কথা উল্লেখ করেছেন এবং তার প্রশংসায় কাসিদা রচনা করেছেন। তিনি বর্ণনা করেন, আসাদুদ্দিন মিশর জয় করার কিছুদিন পর মৃত্যুবরণ করলে সালাহুদ্দিন মিশরের গভর্নর নিযুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে সুলতান নুরুদ্দিন একাধিকবার সালাহুদ্দিনকে অপসারণ করে অন্য কাউকে তার স্থলাভিষিক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে উপর্যুপরি লড়াইয়ের ব্যস্ততার কারণে তিনি তার ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে পারছিলেন না। এরইমধ্যে তার মৃত্যুর নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে আসে।
অবশেষে শুরু হয় ৫৬৯ হিজরি সন, তার জীবনের শেষ বছর। এ বছর তিনি মিশরে প্রবেশ করার দৃঢ় সংকল্প করেন। তিনি মসুল ও অন্যান্য অঞ্চলের সেনাপতিদের কাছে বার্তা পাঠিয়ে নির্দেশ দেন যে, তারা যেন তার অনুপস্থিতিতে খ্রিষ্টানদের সম্ভাব্য হামলা থেকে শাম অঞ্চলের নিরাপত্তারক্ষায় মনোযোগী থাকে। তিনি নিজে মূল বাহিনী নিয়ে মিশর অভিমুখে রওনা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সালাহুদ্দিন এ খবর শুনে খুবই ভীত হয়ে পড়েন।
ঈদুল ফিতরের দিন সুলতান নুরুদ্দিন দামেশকের ময়দানে আখযারের (সবুজ প্রাঙ্গণ) সম্মুখভাগে ঈদের নামাজ আদায় করেন। সেদিন ছিল রবিবার। এরপর তিনি ময়দানের উত্তর প্রান্তে লক্ষ্যভেদের অনুশীলন করেন। তাকদির যেন অদৃশ্য থেকে তাকে বলছিল, এটাই তোমার জীবনের শেষ ঈদ! এরপর তিনি বিশাল দস্তরখানের আয়োজন করেন এবং সবাইকে তৃপ্তির সঙ্গে আপ্যায়ন গ্রহণ করতে বলেন। ঈদের দিনই সুলতানের পুত্র সালিহ ইসমাইলের খতনা করানো হয়। ঈদ ও খতনাকে উপলক্ষ্য করে পুরো নগরী সজ্জিত করা হয় এবং দামামা বাজানো হয়।
সোমবার তিনি অভ্যাস অনুযায়ী অশ্বারোহণ করেন, পোলো অনুশীলনও করেন। এরপর তিনি হঠাৎ করেই স্বভাববিরোধী এক আচরণ করেন এবং জনৈক সেনাপতির ওপর ক্রুদ্ধ হন। তিনি প্রচণ্ড রাগান্বিত অবস্থায়ই দ্রুত দুর্গে চলে যান। সুলতানের মনমেজাজ বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে, দেহ-মন অস্বাভাবিক হয়ে যায়। তিনি আশেপাশের সবকিছু উপেক্ষা করে বিষণ্ণ মনে নিজের মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন। দীর্ঘ এক সপ্তাহ সুলতান সবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন। এদিকে সুলতানের অবস্থা শঙ্কাপূর্ণ, ওদিকে জনগণ ব্যস্ত তার পুত্রের খতনা উপলক্ষ্যে আয়োজিত আনন্দ উৎসবে। সকলের আনন্দ একসময় বিষাদে রূপ নেয়; নির্মম বাস্তবতা মুছে দেয় হাসি- আনন্দ। সুলতান কণ্ঠনালিতে ডিপথেরিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ায় কথা বলতেও অক্ষম হয়ে পড়েন। সুলতানকে শিঙ্গা লাগানো ও দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের অনুরোধ করা হলে তিনি ইঙ্গিতে অসম্মতি জানান। আল্লাহ তাআলার ফয়সালা ও সিদ্ধান্ত তো সুনির্ধারিত ও অবধারিত। এ বছরেরই ১১ শাওয়াল (১১৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ মে) বুধবার আটান্ন বছর বয়সে তিনি আপন প্রভুর ডাকে সাড়া দেন। জীবনের আটাশটি বছর তিনি শাসন দায়িত্ব পালন করেছেন। দামেশকের দুর্গের মসজিদে তার জানাজার নামাজ আদায় করা হয়। তিনি নিজেই দারবের বাবুল খাওয়াছিন ও বাবুল খামিইয়িনের মধ্যবর্তী স্থানে(৯১) নিজের কবরের স্থান নির্ধারিত করে রেখেছিলেন। তার মৃতদেহ সেখানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং দাফন করা হয়। প্রত্যেক পথিক সুলতান নুরুদ্দিনের সমাধি জিয়ারত করে, কবরের জানালার সঙ্গে গলা লাগিয়ে বরকত গ্রহণ করে। যেহেতু তিনি কণ্ঠনালির রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন, তাই মানুষ বলে, এটি 'শহিদ' নুরুদ্দিনের সমাধি। তার পুত্রকেও শহিদ বলা হতো। সুলতান নুরুদ্দিনের উপাধি ছিল 'কাসিম'। খ্রিষ্টানরা তাকে কাসিম ইবনুল কাসিম বলে অভিহিত করত। (৯২)

টিকাঃ
৮৬. জামে দামেশকের সুবিস্তৃত অংশে চারটি প্রশস্ত হলকক্ষ রয়েছে। খোলাফায়ে রাশিদিনের চার মহান সদস্যের নামে হলগুলোর নামকরণ করা হয়। বিভিন্ন যুগে হলকক্ষগুলো বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানে আবু বকর রাযি. মিলনায়তনটি মসজিদের জাদুঘর হিসেবে, উমর রাযি. মিলনায়তনটি মসজিদের প্রশাসনিক দপ্তর হিসেবে এবং উসমান রাযি. মিলনায়তনটি বিশেষ অতিথিদের অভ্যর্থনাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আর আলি রাযি. মিলনায়তনটিতে হজরত হুসাইন রাযি.-এর মাজার আছে। শেষোক্ত হলকক্ষটি বর্তমানে হুসাইন মিলনায়তন নামে অধিক প্রসিদ্ধ।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ঐতিহাসিকভাবে দামেশকের জামে উমাবিতে হজরত হুসাইন রাযি.- এর মাজার থাকা প্রমাণিত নয়। হজরত হুসাইন রাযি.-এর মাজার সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে। সুনিশ্চিতভাবে কোনো স্থানেই তার মাজার প্রমাণিত নয়। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর অনেক আলিমের মতে হুসাইন রাযি.-এর কর্তিত মস্তক মদিনায় জান্নাতুল বাকিতে ফাতিমা রাযি.-এর কবরের পাশে দাফন করা হয়। অপরদিকে শিয়াদের প্রসিদ্ধ বিশ্বাসমতে তাকে কারবালাতেই দাফন করা হয়।
৮৭. সুলতান নুরুদ্দিন মাহমুদ জিনকি রহ. ৫৪৮ হিজরি সনে (১১৫৪ খ্রিষ্টাব্দে) জামে দামেশকের পশ্চিমে হারিকা (Al-Hariqa) এলাকায় তেরোশ শয্যাধারণে সক্ষম হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমদিকে হাসপাতালটি দরিদ্র-অসহায়দের জন্য একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও অল্পদিনের মধ্যেই ইসলামি বিশ্বের অন্যতম প্রসিদ্ধ চিকিৎসাকেন্দ্র, মেডিকেল কলেজ ও ফার্মাসি গবেষণাকেন্দ্রে পরিণত হয়। প্রতিষ্ঠাতা নুরুদ্দিন রহ.-এর প্রতি সম্বন্ধ করে হাসপাতালটি (البيمارستان النوري )আন-নুরি হাসপাতাল) নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। ইবনে সিনা ও যাহরাবির ন্যায় জগদ্বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানীগণ এখানে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। ইবনুন নাফিস ও ইবনে আবি উসায়বার ন্যায় খ্যাতনামা চিকিৎসকগণ এখানে শিক্ষাগ্রহণের পাশাপাশি অধ্যাপনা করেছেন। ইবনে আবুল হাকাম নামে খ্যাত মুহাম্মাদ বিন উবায়দুল্লাহ আল-বাহিলি (মৃত্যু: ৫৭০ হিজরি/ ১১৭৪ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন হাসপাতালটির প্রথম চিকিৎসক।
ইতিহাসের বিভিন্ন স্তরে আন-নূরি হাসপাতাল যেমন সংস্কার-পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারণে সমৃদ্ধ হয়, তেমনই একবার তাতারি শাসক তৈমুর লং কর্তৃক ধ্বংসযজ্ঞেরও শিকার হয়। উসমানি খিলাফতের শেষদিকে দামেশকের নতুন হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হলে আন-নুরি হাসপাতালের চিকিৎসকরা সেখানে চলে যায় এবং হাসপাতালটি অনেকটা বন্ধ হয়ে যায়। ১৩১৮ হিজরি সনে উসমানি খলিফা ২য় আবদুল হামিদের শাসনামলে আন-নুরি হাসপাতাল কমপ্লেক্স বালিকা বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। এরপর ১৩৫৮ হিজরিতে একে বাণিজ্যিক বিদ্যালয়ে পরিণত করা হয়। সবশেষে ১৩৯৬ হিজরি সনে একে চিকিৎসা ও বিজ্ঞান জাদুঘরে পরিণত করা হয়। আন-নুরি হাসপাতাল ভবনকে দামেশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপত্য বিবেচনা করা হয়।
হাসপাতালটির প্রধান পরিচালকের উদ্দেশে লিখিত অসিয়তনামায় অন্যান্য নির্দেশনার সঙ্গে নিম্নোক্ত নির্দেশনাও উল্লেখ ছিল-
প্রধান পরিচালক যেন হাসপাতালের প্রশাসনিক দায়িত্বশীল ও সেবকদেরকে অসুস্থ-পীড়িত ব্যক্তিদের সুন্দর সেবাদানে উদ্বুদ্ধ করেন, রোগীদের সঙ্গে কঠোর আচরণের পরিবর্তে কোমল স্বরে কথা বলার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকে যেন মনে রাখে যে, অদৃশ্য হতে সেই মহান সত্তা তাদের প্রতিটি আচরণ-উচ্চারণ পর্যবেক্ষণ করছেন, যিনি তাদের প্রতিটি অবহেলার হিসাব নেবেন।
বলাই বাহুল্য, প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকেই এ নির্দেশনা যথাযথভাবে পালিত হয়েছিল। আন্দালুসের বিখ্যাত সাহিত্যিক, ভূগোলবিশারদ ও পরিব্রাজক ইবনে জুবায়র (৫৪০-৬১৪ হি./১১৪৫-১২১৭ খ্রি.) আন-নুরি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার বছর-ত্রিশ পর ৫৮০ হিজরি সনে (১১৮৪ খ্রিষ্টাব্দে) দামেশক ভ্রমণের সময় হাসপাতালটি পরিদর্শন করেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন-
হাসপাতালের পরিচালকদের হাতে রেজিস্টার ছিল। তাতে সকল রোগীর নাম লেখা ছিল এবং প্রত্যেকের নামের পাশে তার কী ওষুধপথ্য ও খাবারদাবার প্রয়োজন, তা-ও উল্লেখ ছিল। চিকিৎসকগণ প্রতিদিন সকালে আসেন, রোগীদের খোঁজখবর নেন এবং প্রত্যেক রোগীর জন্য তার উপযোগী ওষুধপত্র ও খাবারদাবারের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। হাসপাতালটিতে শৃঙ্খলাবদ্ধ উন্মাদ রোগীদের জন্যও আলাদা চিকিৎসাব্যবস্থা আছে।
৮৮. সুলতান নুরুদ্দিন তখন বলেন, 'এ পানীয় আমার জন্য এবং সকল মুসলমানের জন্য হালাল।' অর্থাৎ তিনি হাসপাতালটি কেবল দরিদ্রদের জন্য ওয়াকফ করলেও উক্ত পানীয়সহ যেসব ওষুধ রাষ্ট্রের অন্য কোথাও পাওয়া যায় না, সেগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত রেখেছিলেন।
৮৯. প্রতিষ্ঠাতা সুলতান নুরুদ্দিন রহ.-এর প্রতি সম্বন্ধ করে দারুল হাদিসটি 'দারুল হাদিস আন-নুরিয়া' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। সুলতান নুরুদ্দিন সে যুগের বিখ্যাত মুহাদ্দিস হাফেজ ইবনে আসাকির রহ.-কে উক্ত দারুল হাদিসের প্রথম শায়খুল হাদিস নির্বাচিত করেছিলেন এবং দারুল হাদিস ও তার শিক্ষার্থীদের জন্য প্রচুর সম্পদ ওয়াকফ করেছিলেন। অনেক সময় স্বয়ং সুলতান ইবনে আসাকিরের হাদিসের দরসে শরিক হতেন। কথিত আছে, হাফেজ ইবনে আসাকির তার সুবিখ্যাত ও সুবিশাল ইতিহাসগ্রন্থ 'তারিখে দামেশক' এই দারুল হাদিসে বসেই সংকলন করেন। হাফেজ ইযযুদ্দিন বিন আবদুস সালাম, ইমাম যাহাবি ও বিখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনুল আছিরের ন্যায় খ্যাতনামা ব্যক্তিগণ এখান থেকে হাদিসের পাঠ গ্রহণ করেছেন। আল্লামা নববি রহ.-এর প্রসিদ্ধ শাগরিদ আলাউদ্দিন ইবনুল আত্তার এবং বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও হাফেজে হাদিস আল্লামা আলামুদ্দিন বিরযালি এখানে শায়খুল হাদিসের দায়িত্ব পালন করেছেন। আরেক প্রসিদ্ধ আলিম ও ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ. দারুল হাদিস আন-নুরিয়ার তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। এমন হাজারও প্রথিতযশা মনীষীর স্মৃতিধন্য দারুল হাদিস আন-নুরিয়া বর্তমানে বিরান পড়ে আছে।
৯০. সূক্ষ্ম হিসাবে প্রতিটি মসজিদের জন্য বরাদ্দকৃত অংশ ছিল ওয়াকফভূমির সাড়ে বাইশ ভাগের এক ভাগ বা পঁয়তাল্লিশ ভাগের দু-ভাগ (২/৪৫)।
৯১. সুলতান নুরুদ্দিনের সমাধি দামেশকে তার প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা আন-নূরিয়ার সন্নিকটে অবস্থিত।
৯২. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১২/২৫৮-২৬৪।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সুলতান নুরুদ্দিনের ইন্তেকাল-পরবর্তী পরিস্থিতি

📄 সুলতান নুরুদ্দিনের ইন্তেকাল-পরবর্তী পরিস্থিতি


নুরুদ্দিনের মৃত্যুর পর তার পুত্র সালিহ ইসমাইলের নামে বায়আত গ্রহণ করা হয়। সালিহ তখন বয়সের বিবেচনায় একেবারেই নবীন ও অল্পবয়স্ক ছিলেন। তাই সেনাপতি শামসুদ্দিন ইবনে মুকাদ্দিমকে তার তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করা হয়। এ সময় জিনকি রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রশাসক ও সেনাপতিরা বিরোধে জড়িয়ে পড়ে এবং মতবিরোধকে কেন্দ্র করে পুরো রাষ্ট্রে অস্থিরতা-অরাজকতা শুরু হয়। রাজ্যজুড়ে মদের অবাধ ব্যবহার শুরু হয়; অথচ সুলতান নুরুদ্দিনের জীবদ্দশায় কেউ এর সাহসও করতে পারত না। চতুর্দিক থেকে ইসলামের শত্রুরা মুসলমান ও ইসলামি ভূখণ্ডের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি ফেলতে থাকে। ফিরিঙ্গিরা মুসলমানদের হাত থেকে দামেশক নগরীর কর্তৃত্ব কেড়ে নেওয়ার সংকল্প করে। তখন শামসুদ্দিন ইবনে মুকাদ্দিম ফিরিঙ্গিদের প্রতিরোধে অগ্রসর হন এবং বানিয়াসের কাছে তাদের মুখোমুখি হন। কিন্তু তিনি তাদের প্রতিরোধে দৃঢ়তার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হন এবং শেষপর্যন্ত প্রচুর সম্পদ প্রদান করে তাদের সঙ্গে সন্ধি করেন। অবশ্য তিনি যদি ফিরিঙ্গিদের (মিশরের প্রশাসক) আল-মালিকুন নাসির সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবির আগমনের ভয় না দেখাতেন, তাহলে তারা সন্ধিপ্রস্তাবেও রাজি হতো না। সালাহুদ্দিনের কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হন এবং সংখ্যায় স্বল্প ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে আপস করায় ও তাদেরকে অর্থ প্রদান করায় ইবনে মুকাদ্দিম আতাবিকসহ শামের বিভিন্ন অঞ্চলের সেনাপতি ও প্রশাসকদের কাছে পত্র পাঠিয়ে তাদেরকে ভর্ৎসনা করেন। সালাহুদ্দিনের পত্র পেয়ে অনুতপ্ত হওয়া দূরে থাক, সেনাপতি ও প্রশাসকগণ উল্টো কঠোর ভাষায় জবাবি পত্র প্রেরণ করে। তখন সুলতান সালাহুদ্দিন শাম অভিমুখে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু এরইমধ্যে ৫৭০ হিজরি সনে ফিরিঙ্গিরা মিশরে হামলা চালায়। এদিকে উবায়দিরাও সালাহুদ্দিনকে হটিয়ে ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করার জন্য সার্বক্ষণিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। বাধ্য হয়ে সালাহুদ্দিন শাম অভিযানের পরিকল্পনা আপাতত মুলতবি রাখেন।
এ সময় সিসিলি থেকে ক্রুসেডারদের বিশাল এক নৌবহর মিশরে আক্রমণ চালানোর লক্ষ্যে রওনা হয়। ইতিপূর্বে ইতিহাসে এত বিশাল নৌবহরের কোনো দৃষ্টান্ত নেই। নৌবহরটিতে ছিল সৈন্যবহনকারী দুইশ জাহাজ, অশ্ববহনকারী ছত্রিশটি জাহাজ, যুদ্ধাস্ত্রে পূর্ণ ছয়টি বিশাল জাহাজ এবং রসদসামগ্রীতে পূর্ণ চল্লিশটি বড় জাহাজ। নৌবহরটিতে পঞ্চাশ হাজার পদাতিক সৈন্য এবং দেড় হাজার অশ্বারোহী সৈন্য ছিল। ক্রুসেডার বাহিনী আলেকজান্দ্রিয়ায় পৌঁছেই কামান ও মিনজানিক স্থাপন করে আক্রমণ শুরু করে। এ সময় আলেকজান্দ্রিয়াবাসী বীরত্বের সঙ্গে তাদের প্রতিরোধ করে। দ্বিতীয় দিন অন্যান্য অঞ্চল থেকেও মুসলিম সৈন্যগণ ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় আলেকজান্দ্রিয়ায় পৌঁছে যায়। তৃতীয় দিনই মুসলিম সৈন্যদের প্রচণ্ড আক্রমণে ক্রুসেডাররা পিছু হটে এবং পলায়নের পথ ধরে। মুসলমানরা ক্রুসেডারদের কামানগুলো জ্বালিয়ে দেয় এবং পলায়নরত ক্রুসেডারদের তাড়া করে। অসংখ্য খ্রিষ্টান সৈন্য নিহত হয়, অনেকে পানিতে ডুবে মারা যায়। এভাবে ক্রুসেডারদের মিশর দখলের চেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায়।
ওদিকে সুলতান সালাহুদ্দিন উবায়দিদের সব চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র সফলতার সঙ্গে দমন করেন। অবশেষে মিশরের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণ নিশ্চিত হওয়ার পর সুলতান সালাহুদ্দিন শাম অভিমুখে রওনা হন। তার এ অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল এ অঞ্চলের ইসলামি শক্তিকে ঐক্যবদ্ধকরণ, শামবাসীর প্রতি সদাচরণ, শামের সমতল ও পাহাড়ি ভূমিতে নিরাপত্তাপ্রতিষ্ঠা, অবাধ্যদের দমন করে ইসলামের সহায়তাকরণ এবং কুরআনের প্রচার-প্রসার ও সকল ভ্রান্ত ধর্মের অপনোদন।
৫৭০ হিজরি সনেই সুলতান সালাহুদ্দিন তার ভাই আবু বকরকে মিশরে অস্থায়ী নায়েব নিযুক্ত করে দামেশক অভিমুখে যাত্রা করেন। তিনি কোনো ধরনের রক্তপাত ছাড়াই দামেশকে প্রবেশ করেন এবং নুরুদ্দিনের মৃত্যুপরবর্তী সময়ে সেখানে সৃষ্ট সকল বিশৃঙ্খলা দূর করেন। এরপর তিনি তার আরেক ভাই সাইফুল ইসলাম তুগতেকিনকে দামেশকের প্রশাসক নিযুক্ত করে আলেপ্পো অভিমুখে রওনা হন। এ সময় আলেপ্পোর সেনাপতিগণ ও একদল উবায়দি মিলে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করলেও আল্লাহ তাআলা ইসলামের এই মহান সৈনিককে রক্ষা করেন এবং তিনি তাদের সকলকে হত্যা করেন।
সুন্নিদের কাছে মিশরের কর্তৃত্ব হারানো শিয়া উবায়দিরা কিন্তু নিশ্চুপ বসে ছিল না। তারা এবার খ্রিষ্টরাজ্য ত্রিপোলির খ্রিষ্টান শাসক কুমাছের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং সালাহুদ্দিনের বিরুদ্ধে তাদেরকে সহায়তা করলে বিপুল পরিমাণ সম্পদ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু সুলতান সালাহুদ্দিন ছিলেন চূড়ান্ত পর্যায়ের সতর্ক ও দূরদর্শী। তিনি তাদের সকল চক্রান্ত প্রতিহত করেন এবং হিমস, আলেপ্পো ও হামা অঞ্চল পুনরুদ্ধার করে ইসলামি ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হন। সালাহুদ্দিন মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করতে তার চেষ্টা জারি রাখেন। এভাবে এ অঞ্চলের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার অব্যাহত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সালাহুদ্দিন এমন এক সুবিশাল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, যার ব্যাপ্তি ছিল উত্তর ইরাক (কুর্দিস্তান), শাম, মিশর ও বারকা (Cyrenaica) অঞ্চলজুড়ে। সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবির প্রতিষ্ঠিত এই রাষ্ট্র পরিচিতি লাভ করে আইয়ুবি রাষ্ট্র নামে।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 আইয়ুবি রাষ্ট্রের সুলতানদের বংশলতিকা

📄 আইয়ুবি রাষ্ট্রের সুলতানদের বংশলতিকা


[নামের পাশে বন্ধনীতে উল্লেখিত নাম্বার দ্বারা সুলতানদের ক্রমধারা বোঝানো হয়েছে]
আবুশ শোকর নাজমুদ্দিন আইয়ুব বিন শাযি
শাখা-১:
আল-মালিকুল আদিল আবু বকর সাইফুদ্দিন আহমাদ (৪) (৫৯৭-৬১৫ হি./১২০০-১২১৮ খ্রি.)
আল-মালিকুল কামিল আবুল মাআলি নাসিরুদ্দিন মুহাম্মাদ (৫) (৬১৫-৬৩৫ হি./১২১৮-১২৩৮ খ্রি.)
আল-মালিকুস সালিহ আবুল ফুতুহ নাজমুদ্দিন আইয়ুব (৭) (৬৩৭-৬৪৭ হি./১২৪০-১২৪৯ খ্রি.)
আল-মালিকুল মুআযযাম তুরান শাহ (৮) (৬৪৭-৬৪৮ হি./১২৪৯-১২৫০ খ্রি.)
আল-মালিকুল আদিল আবু বকর সাইফুদ্দিন মুহাম্মাদ (৬) (৬৩৫-৬৩৭ হি./১২৩৮-১২৪০ খ্রি.)
মাসউদ ইউসুফ
আল-মালিকুল আশরাফ মুযাফফারুদ্দিন মুসা (৯)
(বাহরি মামলুকদের হাতে পতন ঘটে)
শাখা-২:
আল-মালিকুন নাসির আবুল মুযাফফার সালাহুদ্দিন ইউসুফ (১) (৫৬৪-৫৮৯ হি./১১৬৯-১১৯৩ খ্রি.)
আল-মালিকুল আজিজ আবুল ফাত্‌হ ইমাদুদ্দিন উসমান (২) (৫৮৯-৫৯৫ হি./১১৯৩-১১৯৯ খ্রি.)
আল-মালিকুল মানসুর নাসিরুদ্দিন মুহাম্মাদ (৩) (৫৯৫-৫৯৭ হি./১১৯৯-১২০০ খ্রি.)

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সালাহুদ্দিন আইয়ুবির পিতা নাজমদ্দিন আইয়ুব বিন শাখির পরিচিতি

📄 সালাহুদ্দিন আইয়ুবির পিতা নাজমদ্দিন আইয়ুব বিন শাখির পরিচিতি


নাজমুদ্দিন আইয়ুব ছিলেন ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম মহান বীর যোদ্ধা। তিনি অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সেলজুক সুলতান মুহাম্মাদ বিন মালিক শাহের সেবক ছিলেন। নাজমুদ্দিনের সততা, বিশ্বস্ততা এবং বীরত্ব ও সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে সুলতান মুহাম্মাদ তাকে তিকরিত দুর্গের প্রশাসক নিযুক্ত করেন। নাজমুদ্দিন সেখানে ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় একদিন মসুলের প্রশাসক সুলতান ইমাদুদ্দিন জিনকি এক যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিকরিতে আগমন করেন। নাজমুদ্দিন তাকে আশ্রয় দেন, তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন এবং তার পূর্ণ সেবা-শুশ্রূষা করেন। পনেরো দিন তার কাছে অবস্থান করার পর ইমাদুদ্দিন মসুলে ফিরে যান। নাজমুদ্দিনের এই নিষ্ঠাপূর্ণ আচরণ সুলতান ইমাদুদ্দিনের হৃদয়ে দাগ কাটতে সক্ষম হয়।
পরবর্তীকালে সেলজুক সুলতান গিয়াসুদ্দিন মাসউদ বিন মুহাম্মাদ তাকে সরিয়ে ইরাকের পুলিশ বিভাগের প্রধান মুজাহিদুদ্দিন নাহরুযকে তিকরিত দুর্গের দায়িত্ব প্রদান করেন। নাজমুদ্দিনও তিকরিতেই বসবাস করতে থাকেন। এর কিছুদিন পর কোনো কারণে নাহরুয নাজমুদ্দিনের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে দুর্গ থেকে বের করে দেন। যে রাতে নাজমুদ্দিন তিকরিত দুর্গ ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, সে রাতেই তার পুত্র সালাহুদ্দিন ইউসুফ ভূমিষ্ঠ হন। বাসস্থান থেকে বিতাড়িত হওয়ার দিন পুত্র সালাহুদ্দিনের আগমনকে তিনি অশুভ মনে করেছিলেন। তখন জনৈক ব্যক্তি তাকে বলে, 'আপনি আজ এই নবজাতককে অশুভ মনে করছেন! এমনকি হতে পারে না যে, একদিন এই নবজাতকের হাতেই এক সুবিশাল ও সুবিখ্যাত রাজত্বের ক্ষমতা থাকবে?!' ইতিহাস সাক্ষী, সেদিনের সেই অজ্ঞাত ব্যক্তিটির আশাবাদ ও শুভকামনা একদিন অক্ষরে অক্ষরে বাস্তব হয়েছিল। তিকরিত ছেড়ে নাজমুদ্দিন আইয়ুব ও তার ভাই আসাদুদ্দিন শিরকুহ মসুলে সুলতান ইমাদুদ্দিনের খেদমতে হাজির হন এবং নিজেদের যোগ্যতা ও নিষ্ঠাপূর্ণ কর্মদক্ষতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে জিনকি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন। পরবর্তী সময়ে সুলতান নুরুদ্দিন জিনকি নাজমুদ্দিন আইয়ুবকে বালাবাক্কুর গভর্নর নিযুক্ত করেন আর তার ভাই আসাদুদ্দিন শিরকুহ পরিণত হন জিনকি সেনাবাহিনীর অন্যতম জ্যেষ্ঠ সেনাপতিতে।
৫৮২ হিজরি সনে বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের অধীনস্থ কারাক অঞ্চলের প্রশাসক রেনাল্ড (Reynald) মুসলমানদের একটি বাণিজ্য কাফেলার ওপর আক্রমণ করে। অথচ বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের সঙ্গে তখন সুলতান সালাহুদ্দিনের শান্তিচুক্তি কার্যকর ছিল এবং চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল, যেকোনো মুসলিম কাফেলা নির্বিঘ্নে মিশর থেকে শামে আসা-যাওয়া করতে পারবে; ক্রুসেডাররা তাতে কোনোপ্রকার বাধা সৃষ্টি করবে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00