📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 দ্বিতীয় ক্রুসেড

📄 দ্বিতীয় ক্রুসেড


৫৪০-৫৪৩ হিজরি/১১৪৫-১১৪৮ খ্রিষ্টাব্দ]
১১৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে তৎকালীন পোপ ৩য় ইউজেন (Pope Eugene III) দ্বিতীয় ক্রুসেডের ডাক দেন। ইউরোপ থেকে পরিচালিত দ্বিতীয় ক্রুসেডের উদ্দেশ্য ছিল ক্রুসেডারদের হাত থেকে মুসলমানরা এডেসাসহ যে সমস্ত অঞ্চল পুনরুদ্ধার করেছিল, সেখানে পুনরায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং জিনকি পরিবারের কর্তৃত্বপূর্ণ আবির্ভাবের পর পুনরায় শাম অঞ্চলে খ্রিষ্টানদের অবস্থান সুদৃঢ় করা। দ্বিতীয় ক্রুসেড অভিযানে খ্রিষ্টান বাহিনীর নেতৃত্ব দেন ফ্রান্সের রাজা ৭ম লুই (Louis VII) ও জার্মানির রাজা ৩য় কনরাড (Conrad III)।
জার্মান বাহিনী উপকূলীয় পথ ধরে বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে রওনা হয়। পথিমধ্যে দোরিলায়ুমে রোমান সেলজুক বাহিনী তাদের ওপর আক্রমণ করে এবং তাদেরকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। সেলজুকরা এ যুদ্ধে বর্ণনাতীত যুদ্ধলব্ধ সম্পদ লাভ করে। সেলজুকদের আক্রমণে জার্মান বাহিনী কার্যত বিধ্বস্ত হয়ে যায়। বিশ হাজার সৈন্যের মধ্যে আঠারো হাজার সৈন্যই এ সময় নিহত হয়। ৫৪২ হিজরি সনের ২৮ জুমাদাল উলা (১১৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ অক্টোবর) সংঘটিত এ যুদ্ধ ইতিহাসে ২য় দোরিলায়ুমের যুদ্ধ নামে খ্যাত। জার্মান রাজা ৩য় কনরাড অবশিষ্ট দুই হাজার সৈন্য নিয়ে চরম নিঃস্ব-রিক্ত ও লাঞ্ছনাকর অবস্থায় নিকিয়ায় ফিরে যান এবং ফরাসি বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন।
ফ্রান্সের রাজা লুই যদিও তুলনামূলক নিরাপদ পথ বেছে নিয়েছিলেন, কিন্তু তিনিও সেলজুকদের আক্রমণ থেকে রেহাই পাননি। বাধ্য হয়ে তিনি অভিযানের মূল লক্ষ্য এডেসা পুনরুদ্ধারের কথা বেমালুম ভুলে যান এবং গতিপথ পরিবর্তন করে সাগরপথে এন্টিয়ক হয়ে বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছান।
বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছার পর সুবিশাল ক্রুসেডার বাহিনী ৭ম লুই ও ৩য় কনরাডের নেতৃত্বে ৫৪৩ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে (১১৪৮ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে) দামেশক অবরোধ করে। ক্রুসেডার বাহিনীর মোকাবিলায় দামেশকের এক লক্ষ ত্রিশ হাজার সৈন্যের এক বাহিনী বেরিয়ে আসে। উভয়পক্ষের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়। যুদ্ধের প্রথম দিন প্রায় দুইশ মুসলিম সৈন্য শহিদ হয়। খ্রিষ্টান পক্ষ হারায় অগণিত সৈন্য।
যুদ্ধ দীর্ঘ সময় পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হলে দামেশকে সংরক্ষিত মাসহাফে উসমানি জামে দামেশকের আঙিনায় উপস্থিত করা হয়। জনগণ মাসহাফে উসমানির পাশে সমবেত হয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে কায়মনোবাক্যে দোয়া করতে থাকে। মহিলা ও শিশুরা মাথা উন্মুক্ত করে কান্নাকাটি করে আল্লাহর তাআলার দরবারে সাহায্যপ্রার্থনা করতে থাকে। দামেশকের প্রশাসক মুজিরুদ্দিন আবিক আলেপ্পোর অধিপতি নুরুদ্দিন মাহমুদ ও তার ভাই মসুলের শাসক সাইফুদ্দিন গাজির কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। তারা দুজন অন্যান্য আরও সেনাপতিসহ দ্রুত সত্তর হাজার সৈন্য নিয়ে দামেশকের উদ্দেশে রওনা হয়ে হিমসে অবতরণ করেন। হিমসে পৌঁছে নুরুদ্দিন মুইনুদ্দিনের কাছে নিম্নোক্ত বার্তা প্রেরণ করেন—
আমার অঞ্চলের অস্ত্রধারী সৈন্যদের নিয়ে আমি চলে এসেছি। আমি চাচ্ছি, আমার প্রতিনিধিগণ দামেশকে চলে যাক আর আমি খ্রিষ্টানদের মুখোমুখি হই। যদি আমি পরাজিত হই, তাহলে আমি আমার বাহিনী নিয়ে দামেশকের অভ্যন্তরে নগরীর প্রতিরক্ষার চেষ্টা করব; আর যদি বিজয়ী হই, তাহলে নগরীর কর্তৃত্ব তোমাদের হাতেই থাকবে। আমরা দামেশকের কর্তৃত্ব নিয়ে তোমাদের সঙ্গে কোনো বিরোধে জড়াব না।
কিন্তু নুরুদ্দিনের বার্তা পেয়ে দামেশকের শাসক মুজিরুদ্দিন ও সেনাপ্রধান মুইনুদ্দিন আনুর ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা আশঙ্কা করে যে, নুরুদ্দিন দামেশক দখল করার মনস্থ করেছেন। তাদের নির্দেশে দামেশকের নগরদ্বার বন্ধ করে দিয়ে নুরুদ্দিন ও সাইফুদ্দিনের প্রবেশের পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়।
এরপর মুইনুদ্দিন দুটি বার্তা তৈরি করে একটি ক্রুসেডার বাহিনীর নেতৃবৃন্দের কাছে প্রেরণ করেন, অপরটি প্রেরণ করেন ক্রুসেডার বাহিনীকে সহায়তাকারী শামের উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী খ্রিষ্টান নেতৃবৃন্দের কাছে। প্রথম বার্তায় তিনি লেখেন—প্রাচ্যের অধিপতি এসে পড়েছেন। তোমরা স্বেচ্ছায় কেটে পড়ো, আর না হয় আমি তার হাতে রাজ্য ছেড়ে দেবো। তখন তোমাদের পস্তাতে হবে।
আর দ্বিতীয় বার্তায় তিনি লেখেন—তোমরা কোন বুদ্ধিতে আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তাদের (ক্রুসেডার বাহিনীর) কাছে সাহায্য চাইলে?! তোমরা তো ভালো করেই জানো যে, তারা যদি দামেশক দখল করতে পারে, তাহলে তোমাদের কর্তৃত্বে থাকা উপকূলীয় অঞ্চলগুলোও ছিনিয়ে নেবে। অপরদিকে আমি যদি আমার রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় দুর্বলতা বোধ করি, তাহলে সামান্য দ্বিধা না করে দামেশকের নিয়ন্ত্রণ সাইফুদ্দিনের হাতে ছেড়ে দেবো। আর তোমরা জানো, যদি তিনি দামেশকের কর্তৃত্ব লাভ করেন, তাহলে শাম অঞ্চলে তার সামনে টিকে থাকার মতো শক্তি তোমাদের নেই।
নুরুদ্দিন ও সাইফুদ্দিনের আগমনের কথা শুনে ক্রুসেডার বাহিনী পলায়ন করে। কিন্তু মুসলিম বাহিনী তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে এবং অসংখ্য খ্রিষ্টান সৈন্যকে হত্যা করে। ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ. বলেন-
খ্রিষ্টান ফিরিঙ্গিরা (দামেশক) নগরী প্রায় দখল করেই ফেলেছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলা দামেশককে রক্ষা করেন এবং আপন কুদরত ও ক্ষমতা দ্বারা নিরাপদ রাখেন। ... কাফির শত্রুরা কখনোই দামেশক দখল করতে পারবে না, (ইনশাআল্লাহ)। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভাষ্যমতে দামেশক হলো সেই মহান নগরী, যা ফিতনা ও দুর্যোগকালে ইসলামের দুর্গ হবে। (কিয়ামতের পূর্বে ফিতনার যুগে) ঈসা বিন মরিয়ম দামেশকেই অবতরণ করবেন।
খ্রিষ্টান ফিরিঙ্গিরা দামেশকের অনেক অধিবাসীকে হত্যা করে। নিহতদের মধ্যে দামেশকের মহান ফকিহ মালিকি মাজহাবের শায়খ হুজ্জাতুল ইসলাম আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন দুনাস ফিন্দালাবিও ছিলেন। (৭৯)
৫৪४ হিজরি সনে নুরুদ্দিন এন্টিয়ক অভিমুখে রওনা হন। এ অভিযানে তিনি ক্রুসেডার বাহিনীকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলেন। তিনি এন্টিয়ক রাজ্যে প্রবেশ করে আছি নদীর পূর্বে অবস্থিত সকল এলাকা অধিকার করতে সক্ষম হন। এ বছরই নুরুদ্দিনের ভাই সাইফুদ্দিন গাজি ইন্তেকাল করেন।
এরপর মসুলে সাইফুদ্দিনের উত্তরাধিকারগণ প্রশাসনিক দায়িত্ব লাভ করলেও তাদের ওপর নুরুদ্দিনের প্রভাব ও কর্তৃত্ব ছিল।
জিনকি পরিবারের ঐক্য ও সুদৃঢ় সামরিক শক্তি প্রত্যক্ষ করে ক্রুসেডাররা উপলব্ধি করে যে, জিনকি পরিবারকে পরাভূত করে শাম ও ইরাকের উত্তরাঞ্চলে সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্ন দেখা দিবাস্বপ্ন ছাড়া অন্য কিছু নয়। তাই এদিকে অভিযানের চিন্তা বাদ দিয়ে এবার তারা দৃষ্টি নিবদ্ধ করে দক্ষিণ-পশ্চিমে উবায়দিদের অধিকৃত অঞ্চলের প্রতি।
মিশরের উবায়দি সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে ৫৪৮ হিজরি সনে (১১৫৩ খ্রিষ্টাব্দে) বাইতুল মুকাদ্দাস খ্রিষ্টরাজ্যের শাসক তৃতীয় বল্ডউইন (Baldwin III) উবায়দিদের কাছ থেকে আসকালান(৮০) দখল করে নেন। এর ফলে পুরো শাম ও ফিলিস্তিনের উপকূলীয় অঞ্চলে ক্রুসেডারদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য নিশ্চিত হয়। মুসলমানরা বারবার আক্রমণ করলেও শেষ পর্যন্ত আসকালান নৌবন্দরের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়।
আসকালান ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় নুরুদ্দিন জিনকি দামেশক নিয়ে নতুন করে চিন্তিত হয়ে পড়েন। কারণ, দামেশকের কারণেই তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে অগ্রসর হতে পারছিলেন না। সবদিক বিবেচনা করে তিনি এবার দামেশকে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। ৫৪৯ হিজরি সনের মুহাররম মাসে (১১৫৪ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে) নুরুদ্দিন জিনকি দামেশক অবরোধ করেন। তিনি দশদিন দামেশক অবরোধ করে রাখলেও সেখানে কোনো আক্রমণ করেননি। তিনি এ সময় বলেন, ‘মুসলমানদের পরস্পর একে অপরকে হত্যা করার কোনো প্রয়োজন নেই।’ নুরুদ্দিন দামেশকের প্রশাসক মুজিরুদ্দিনের কাছে বার্তা প্রেরণ করে তার দামেশকে আগমনের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি লেখেন—
আমি তোমাদের সঙ্গে লড়াই করতে এখানে আগমন করিনি। আমি মুসলমানদের এই অভিযোগের কারণে এখানে আসতে বাধ্য হয়েছি যে, কৃষকদের সম্পদ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তাদের স্ত্রী-সন্তানদের খ্রিষ্টানদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। অথচ কেউ তাদের সাহায্য করছে না। আল্লাহর শোকর! তিনি আমাকে মুসলমানদের সাহায্য করার ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার ক্ষমতা দিয়েছেন এবং প্রচুর সম্পদ ও সামরিক শক্তি দান করেছেন। এই নেয়ামতের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও নির্যাতিত এসব মুসলমানের আহ্বান উপেক্ষা করে তাদের সাহায্য না করা আমার জন্য বৈধ হতে পারে না। অধিকন্তু আমার জানা আছে যে, তোমরা নিজেদের ভূখণ্ডের নিরাপত্তারক্ষায় অক্ষম। এই দুর্বলতার কারণেই তোমরা আমার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ফিরিঙ্গিদের সাহায্যপ্রার্থনা করেছ। তোমরা অসহায়-দুর্বল নাগরিকদের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করে তা খ্রিষ্টানদের পেছনে ব্যয় করেছ। এমন গর্হিত আচরণ না আল্লাহ তাআলা পছন্দ করবেন, না কোনো মুসলমান বরদাশত করবে।
কিন্তু মুজিরুদ্দিন নুরুদ্দিনের বার্তা উপেক্ষা করে খ্রিষ্টানদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাদেরকে নুরুদ্দিনের বাহিনীর ওপর আক্রমণের প্রতি প্ররোচিত করেন। বিনিময়ে দেওয়া হয় প্রচুর অর্থসম্পদ প্রদানের পাশাপাশি বালাবাক্কু দুর্গ প্রদানের প্রস্তাব!
কিন্তু দামেশকের অধিবাসীরা তো নুরুদ্দিনেরই প্রতীক্ষা করছিল! তারা এবার অগ্রসর হয়ে নুরুদ্দিনের জন্য নগরীর প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। নুরুদ্দিন দামেশকে প্রবেশ করে সাধারণ নিরাপত্তা ঘোষণা করেন এবং জনগণের ওপর আরোপিত কর বাতিল করেন। তিনি মুজিরুদ্দিনকেও নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং তাকে হিমসে পাঠিয়ে দেন। এরপর তিনি দামেশককেই তার রাজ্যের রাজধানী নির্বাচিত করেন।
বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে, নুরুদ্দিন দামেশক অধিকার করার পর ক্রুসেডার রাজন্যবর্গ বার্তা পাঠিয়ে নুরুদ্দিনকে অভিনন্দন জানায়, তার আস্থা ও সুসম্পর্ক কামনা করে এবং তার প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করে। উল্লেখ্য, দামেশক ছিল আসকালান পুনরুদ্ধারের একমাত্র পথ। পূর্বেই বলা হয়েছে, ৫৪৮ হিজরি সনে ক্রুসেডাররা আসকালান দখল করে নিয়েছিল।
৫৫০ হিজরি সনকে ইসলামি রাষ্ট্রগুলোর 'সম্মিলনের বর্ষ' গণ্য করা হয়।
দীর্ঘদিন ক্রুসেডারদের পরোক্ষ প্রভাবে পরিচালিত দামেশক অঞ্চলকে ইতিমধ্যে নুরুদ্দিন আপন রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। এর ফলে সমগ্র শাম অঞ্চল নুরুদ্দিনের শাসনাধীনে চলে এসেছে এবং একক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। নুরুদ্দিন এবার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন মিশরের প্রতি। কারণ, শাম ও মিশর মিলে যদি একক শক্তিতে পরিণত হয়, তাহলে তা ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে এক দুর্জেয় শক্তিরূপে আবির্ভূত হতে পারবে। কিন্তু এ সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং আপন লক্ষ্য ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে বাধার সম্মুখীন হন। নুরুদ্দিনের অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে ক্রুসেডাররা কয়েকটি যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীকে পরাজিত করে। আল্লাহ তাআলার অপার অনুগ্রহে কিছুদিন পরই নুরুদ্দিন জিনকি সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নবোদ্যমে অগ্রসর হন। ৫৫৯ হিজরিতে (১১৬৪ খ্রিষ্টাব্দে) নুরুদ্দিন হারিম দুর্গ জয় করেন এবং দুর্গটিকে খ্রিষ্টান-দখলমুক্ত করেন। তুমুল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অত্যন্ত সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য দুর্গটি মুসলমানদের অধিকারে আসে। হারিমের বিজয়াভিযান ছিল অন্যতম মহান বিজয়াভিযান।
আমরা যদি তৎকালীন আব্বাসি খিলাফতের রাজধানী বাগদাদের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করি, তাহলে দেখতে পাব—বাগদাদ তখন সেলজুক সুলতান মুহাম্মাদ বিন মুগিছুদ্দিন মাহমুদ বিন ২য় মালিক শাহ কর্তৃক অবরুদ্ধ! আব্বাসি খলিফা বাগদাদে খুতবায় সেলজুক সুলতানের নাম পাঠের নির্দেশ জারি করতে অস্বীকৃতি জানানোয় বাগদাদের এই পরিণতি!
৫৫8 হিজরি সনে ক্রুসেডাররা বিশাল সামরিক শক্তি সহযোগে মিশর দখলের উদ্দেশে রওনা হয়। কিন্তু নুরুদ্দিন জিনকি তাদের প্রতিহত করেন।
এরপর মিশরকে কেন্দ্র করে নাটকীয় নানা ঘটনা ঘটতে থাকে এবং উবায়দি সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। এর বিস্তারিত বিবরণ উবায়দি সাম্রাজ্যসংক্রান্ত স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদে অতিবাহিত হয়েছে। অবশেষে মিশরের শাসনভার চলে আসে সালাহুদ্দিন আইয়ুবির কাছে।
৫৬৫ হিজরি সনে (১১৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) খ্রিষ্টান বাহিনী দিমইয়াত অবরোধ করলে সুলতান নুরুদ্দিন জিনকি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। সে সময় একদিন জনৈক হাদিসশিক্ষার্থী তাকে প্রিয় নবীজির হাদিস পাঠ করে শোনানোর সময় মৃদু হাসি পরম্পরাবিশিষ্ট একটি হাদিস(৮১) পাঠ করে। তখন উক্ত হাদিসের রীতি অনুযায়ী হাসির ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে তাকে মৃদু হাসার অনুরোধ করা হলে তিনি অসম্মতি জানিয়ে বলেন, 'দিমইয়াতের মুসলিম অধিবাসীরা খ্রিষ্টান বাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ হয়ে আছে। মুসলমানদের এই দুর্দিনে আল্লাহ তাআলা আমাকে হাসতে দেখবেন-এটা ভাবতেও আমার লজ্জা হচ্ছে।'
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আবু শামা রহ. বর্ণনা করেন- যে রাতে খ্রিষ্টান বাহিনী দিমইয়াত থেকে সরে যেতে বাধ্য হলো, সে রাতে মানসুরা দুর্গের আবু দারদা মসজিদের ইমাম নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নে দেখলেন। নবীজি স্বপ্নযোগে তাকে বললেন, 'নুরুদ্দিনকে আমার সালাম বলো এবং তাকে সুসংবাদ জানিয়ে দিয়ো যে, ফিরিঙ্গিরা দিমইয়াত থেকে চলে গেছে।' (ইমাম বলেন) আমি বললাম, 'আল্লাহর রাসুল, সংবাদ প্রদানের সময় আমি প্রমাণস্বরূপ কী নিদর্শন পেশ করব?' নবীজি উত্তর দিলেন, 'হারিম দুর্গ বিজয়ের দিন সে যে সিজদা করেছিল, তা প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করবে। সিজদায় সে বলেছিল-“হে আল্লাহ, কুকুর মাহমুদ কে?! আপনি আপনার দ্বীনকে সাহায্য করুন।"'
নুরুদ্দিন যখন আবু দারদা মসজিদে ফজর নামাজ আদায় করতে উপস্থিত হলেন, তখন ইমাম সাহেব তাকে সুসংবাদ জানালেন এবং নিদর্শন সম্পর্কেও অবগত করলেন। স্বপ্নের বৃত্তান্ত বর্ণনা করতে গিয়ে যখন 'কুকুর মাহমুদ কে?!(৮২) কথাটির প্রসঙ্গ এলো, তখন ইমাম সাহেব তা উচ্চারণ করতে বিব্রতবোধ করছিলেন। নুরুদ্দিন জিনকি তাকে বললেন, 'বলুন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে যা বলতে নির্দেশ দিয়েছেন, তা বলুন।' এরপর ইমাম সাহেব বাকি বৃত্তান্তও উল্লেখ করলেন। নুরুদ্দিন বললেন, 'আপনি সত্য বলেছেন।' এরপর নুরুদ্দিন আনন্দে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। (৮৩)
৫৬৬ হিজরি সনে সুলতান নুরুদ্দিন রাক্কায় অভিযান চালিয়ে সেখানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর তিনি একে একে নুসায়বিন(৮৪), খাবুর ও সিনজারও দখল করেন। তিনি সিনজার অঞ্চলের প্রশাসনিক দায়িত্ব তার জামাতা ও ভ্রাতুষ্পুত্র ইমাদুদ্দিন বিন মওদুদকে প্রদান করেন। এরপর সুলতান নুরুদ্দিন মসুলে পৌঁছে সেখানে চব্বিশ দিন অবস্থান করেন এবং আরেক ভ্রাতুষ্পুত্র সাইফুদ্দিন গাজি বিন মওদুদকে সেখানকার দায়িত্বে বহাল রাখেন। তিনি সাইফুদ্দিনকে মসুলের পাশাপাশি জাযিরা অঞ্চলের দায়িত্বও প্রদান করেন। নুরুদ্দিন তার আরেক মেয়েকে ভ্রাতুষ্পুত্র সাইফুদ্দিনের কাছে বিয়ে দেন। নুরুদ্দিন সাইফুদ্দিনকে জামে মসুল নির্মাণের নির্দেশ দেন এবং নিজেই নির্মাণকাজের তদারকি করেন। মসুলে অবস্থানের শেষ রাতে তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, নবীজি তাকে বলছেন, 'তোমার কাছে এখন তোমার রাষ্ট্রই প্রিয় হয়ে গেছে। আর তাই তুমি জিহাদ ও শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই ছেড়ে দিয়েছ!' নুরুদ্দিন তৎক্ষণাৎ জেগে উঠে সফরের প্রস্তুতি শুরু করেন এবং সেদিন ভোরেই শাম অভিমুখে যাত্রা করেন। (৮৫)
৫৬৭ হিজরি সনের প্রথম জুমার দিন (১১৭১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে) সুলতান নুরুদ্দিন সালাহুদ্দিন আইয়ুবিকে মিশরে আব্বাসি খলিফার নামে খুতবা পাঠের নির্দেশ জারি করতে বলেন। এর মাধ্যমে সালাহুদ্দিনের শিক্ষক নুরুদ্দিন পুরো বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর একক নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার প্রতি আপন সুগভীর ঈমানের কথাই যেন ঘোষণা করেন। এ পদক্ষেপের মাধ্যমেই তিনি মিশরের উবায়দি সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটান। নিঃসন্দেহে তার এই পদক্ষেপ পরবর্তীকালে ক্রুসেডারদের মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
মিশরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জিনকি রাষ্ট্রসীমা নুবিয়া অঞ্চল থেকে হামাদান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এই সুবিশাল ভূখণ্ডের মাঝে কেবল খ্রিষ্টান রাষ্ট্রগুলো বাদে বাকি সব এলাকা ছিল তার কর্তৃত্ব ও শাসনাধীন।

টিকাঃ
৭৯. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১২/২১০।
৮০. ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন নগরী আসকালান বর্তমানে দখলদার ইসরাইলের অধিকারে আছে। বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ বিন উমর রাযি. আসকালান সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন—
لكل شي ذروة، وذروة الشام عسقلان প্রতিটি বস্তুর একটি চূড়া থাকে; শামের চূড়া হলো আসকালান।
৮১. যেসব হাদিস বর্ণনা করার সময় প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃদু হেসেছিলেন এবং নবীজির অনুসরণে উক্ত হাদিসের প্রত্যেক বর্ণনাকারী হাদিসটি বর্ণনার সময় মৃদু হেসেছেন, সেসব হাদিসকে (الحديث المسلسل بالتبسم )মৃদু হাসি পরম্পরাবিশিষ্ট হাদিস) বলে।
৮২. নুরুদ্দিন সিজদায় গিয়ে এ কথা বলেছিলেন। তিনি জানতেন, নিশ্চয়ই নুসরত ও সাহায্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আসে, মাহমুদের পক্ষ থেকে নয়। কারণ, মহা পরাক্রমশালী সত্তা আল্লাহ তাআলার সামনে মাহমুদ তো কিছুই নয়। [মূল গ্রন্থের টীকা]
৮৩. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১২/২৪২।
৮৪. আরবি নাম نصیبین (নাসীবীন), ইংরেজি নাম Nusaybin (নুসায়বিন)।
৮৫. প্রায় তিন বছর পর ৫৬৮ হিজরি সনে মসজিদটির নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়। সুলতান নুরুদ্দিন ৫৬৮ হিজরি সনে দ্বিতীয়বার মসুল সফর করেন এবং উক্ত মসজিদে নামাজ আদায় করেন। পরবর্তীকালে মসজিদটি 'জামে নুরি' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। বিগত ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দের ২১ জুন মসুলে আইএস দমনে আন্তর্জাতিক জোটের পরিচালিত অভিযানের সময় উপর্যুপরি বোমা হামলায় মসজিদে নুরি ধ্বংস হয়ে যায়। উভয় পক্ষই এর জন্য একে অপরকে দায়ী করে আসছে। বর্তমানে ইউনেস্কোর সহায়তায় এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থায়নে মসজিদটির পুনর্নির্মাণকাজ চলছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00